মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত ময়মনসিংহের সুরবালারা আজও অবহেলিত
প্রকাশ: ০৮:৫০ pm ০৮-০৬-২০১৮ হালনাগাদ: ০৮:৫০ pm ০৮-০৬-২০১৮
 
আতাউর রহমান জুয়েল
 
 
 
 


দীর্ঘ ৯ মাস যুদ্ধের পর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। আর এই স্বাধীনতা এসেছে নারী পুরুষের যৌথ অবদানের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে সারা দেশের মতো ময়মনসিংহের সংখ্যালঘু নারীরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দেশ স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। 

যুদ্ধকালীন সময়ে সংখ্যালঘু নারীরা মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন ভাবে সহায়তা করেছে। বিশেষ করে জেলার সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া এলাকায় নারীরা খাদ্যসহ বিভিন্ন জিনিসপত্র দিয়ে সাহায্য করেছে। রাজাকার ও পাকবাহিনীর কবল থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের রক্ষা করতে জীবন বাজি রেখে নারীরা নানা ছল করে তাদের লুকিয়ে রেখেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের নানা খবর দেয়ার ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা রেখেছে। যুদ্ধকালীন সময়ে রাজাকার আলবদররা বেছে বেছে হিন্দু পাড়ায় এবং আদিবাসী এলাকায় পাক আর্মিদের নিয়ে গিয়ে হামলা চালিয়ে অসহায় নারীদের পাশবিক নির্যাতন করেছে।

যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সংখ্যালঘু নারীদের ওপর নির্যাতনের কোন প্রতিবাদ কিংবা প্রতিকার আজও দেখা যায়নি। এখনও সংখ্যালঘু এসব নির্যাতনের শিকার নারীরা সরকারী সাহায্য ও সহযোগিতা থেকে বঞ্চিত আছে। অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও ফুলপুরের বীরঙ্গনা সুরবালা আজও পায়নি স্বীকৃতি কিংবা সরকারী সহযোগিতা। নিচে তার জীবনের কথা তুলে ধরা হলো।

১৯৭১ সালের ১৯ জুলাই। ময়মনসিংহের ফুলপুরের পশ্চিম বাখাই গ্রামের হিন্দুপাড়ায় বাড়ির আঙ্গিনায় নির্জন দুপুরে ঢেকিতে ধান ভানতে ছিলেন নীগেন্দ্র চন্দ্র সিংহের গর্ভবতী স্ত্রী সুরবালা সিংহ। বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুন্দরী বধুকে দেখে লোভ হয় পাক হানাদার বাহিনীর। এমন সময় একদল পাকিস্তানী আর্মি ও রাজাকাররা হানা দেয় সুরবালা সিংহের বাড়িতে। তাকে রাইফেলের ভয় দেখিয়ে ঘরে নিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালায়। হায়েনারা চলে গেলে পাড়া প্রতিবেশীরা এসে সেবা-যত্ন করে সুস্থ্য করে তোলে। এ ঘটনার ১৫ দিনের মাথায় স্বামী নীগেন্দ্র চন্দ্র সিংহকে স্থানীয় রাজাকার ও দালালদের সহযোগিতায় তাঁকেসহ ঐ দিন ১৩ জনকে (১৯৭১ সালের ৪ঠা আগস্ট) আটক করে নিয়ে যায় ফুলপুরের সরচাপুর গোদারাঘাট পাকি আর্মি ক্যাম্পে। সেখানে নীগেন্দ্র চন্দ্র সিংহ সহ ৯জনকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরদিনই বাড়ি ছাড়েন সুরবালাসহ স্বজনরা পাড়ি জমান ভারতে। সেখানে তিন বৎসরের ছেলে মলিন মারা যায় পেটের পীড়ায়। গর্ভবতী সুরবালা ভারতীয় আশ্রয় শিবিরে প্রসব করেন একটি ছেলে সন্তান। নাম রাখা হয় মুক্তি। সেও ১মাস পর মারা যায়। সাথে ছিল তিন মেয়ে সুনিতী রানী, শিউলী রানী ও পুষ্প রানী। যুদ্ধ শেষে স্বামী সন্তান হারিয়ে রিক্তহস্তে ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশে। আঁকড়ে থাকেন স্বামীর ভিটার অবশিষ্ট স্মৃতি নিয়ে। তেলের ঘানি টেনে বাকি জীবন টুকু কাটিয়েছেন। আশির্ধো সুরবালা বয়সের ভারে আর পারেন না ঘানি টানতে। তবুও জীবন চালাতে হয়। স্বামী পুত্র হারা সুরবালা তিন মেয়ে নিয়ে কোনমতে বেঁচে আছেন। রোগে-শোকে শরীর ভেঙ্গে গিয়েছে। তার পরও মিলেনি মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি (বীরাঙ্গনা হিসেবে)। তিন মেয়ের স্বামী মারা গিয়েছে অনেক আগেই। বড় মেয়ে সুনিতী রানী সুরবালাকে দেখভাল করেন। 

বিভিন্ন সময় সহযোগীতার হাত বাড়িয়ে ছিলেন ডাঃ এম.এ হাসান, স্থানীয় সাংবাদিক এ.টি.এম রবিউল করিম, সাবেক সংসদ সদস্য হায়াতোর রহমান খান বেলাল, ঢাকার জনৈক একজন হিন্দু মহিলা ও সর্বশেষ সুরবালাকে একটি ছোট ঘর করে দেন ব্যারিস্টার আবুল কালাম আজাদ। সুরবালা সিং ময়মনসিংহ জেলার সর্ব প্রথম জনসম্মুখে আসেন তার ওপর চলা পাশবিক নির্যাতনের কাহিনী নিয়ে। শুধু সুরবালা না, পাক আর্মিদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিল জেলার অসংখ্য সংখ্যালঘু পরিবারের নারীরা। অনেকেই সম্ভ্রম হারিয়ে পালিয়ে গিয়েছিল ভারতে। পাক আর্মিরা মুক্তাগাছার বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে পাকি বর্বরতার সূচনা করেছিল হিন্দু সংখ্যালঘু জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর বাড়ি আক্রমণের মধ্য দিয়ে। 

এই গ্রামের অরুণ চন্দ্র দাস (৬২) ও শহীদ পরিবারের সদস্য কায়া রাণী দে (৭০) জানান, পাক আর্মিরা গ্রামে ঢোকেই প্রথমে ব্রাশ ফায়ার ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। বাড়ি বাড়ি খুঁজে লোকদের ধরে এনে ঠাকুর বাড়ির সামনে জড়ো করে। পরে রাজাকাররা বেছে বেছে কয়েকজনকে ছেড়ে দেয়। ঠাকুর বাড়ির যতীন্দ্র কুমার রায়, দিলীপ কুমার ঠাকুর, নারায়ণ কুমার দে ও জীতেন্দ্র প্রসাদ ঠাকুর এই চারজনকে এক কাতারে গুলি করে হত্যা করে। পড়ে থাকায় নারায়ণের লাশ খেয়ে ফেলে শেয়াল কুকুরে। 

এই গ্রামের কাশেম আলী (৬৭) জানান, তার বাবা শহীদ আজগর আলী ও ভাই উসমানকে ক্ষেতে হালচাষ করা অবস্থায় পাক আর্মিরা গুলি করে হত্যা করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য তাজ উদ্দিন (৬৫) জানান, ময়মনসিংহ থেকে সরাসরি পাক আর্মি স্থানীয় রাজাকার নঈম উদ্দিন মাষ্টার, জবেদ আলী মুন্সি, করিম ফকির, আতিকুর রহমান, আব্দুস সালাম, নজর আলী ফকিরের সহাতায় বিনোদবাড়ি মানকোন গ্রামে ঢোকে সকাল ৭ টার দিকে। ১০০-১৫০ পাক আর্মি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে রাজাকারদের সঙ্গে নিয়ে হামলে পরে আওয়ামীলীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এই গ্রামে। অগ্নিসংযোগের সঙ্গে চলে নির্বিচারে গণহত্যা। বিনোদনবাড়ি মানকোন থেকে সকালে শুরু হওয়া এই বর্বরতা চলে বাদে মানকোন, দড়িকৃষ্ণপুর,বনবাড়িয়া, কাতলসার, মীর্জাকান্দা, কৈয়ার বিলপাড় ও বাইয়া বিলের পাড়ের প্রায় চার কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত। 

বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল কাশেম এর দাবি, একদিনে সকাল বিকালের এই নিষ্ঠুর বর্বরতায় শিশু ও মহিলাসহ ২শ’ ৫৩ জন নিরীহ মানুষ শহীদ হন।

যাদের হাজারও কষ্টের বিনিময়ে এই দেশ স্বাধীন হয়েছে, এসব নির্যাতিত সংখ্যালঘু নারীদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ণ করবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের বর্তমান সরকার এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।

লেখক- একুশে টেলিভিশনের ময়মনসিংহ বিভাগীয় প্রতিনিধি ও শারি’র দলিত এন্ড মাইনরিটি হিউম্যান রাইটস মিডিয়া ডিফেন্ডার ফোরামের সদস্য।


বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71