মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৬ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনী কর্তৃক ধর্মান্তরের আখ্যান
প্রকাশ: ০৯:২৪ pm ১৮-০৪-২০১৮ হালনাগাদ: ০৯:২৪ pm ১৮-০৪-২০১৮
 
প্রিয়া সাহা 
 
 
 
 


বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ৩০ লক্ষ বাঙালি প্রাণ বিসর্জন দেয় পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে। এই হত্যাকান্ডের সূত্রপাত্র হয় ২৫শে মার্চ থেকে যা যুদ্ধের পুরো নয় মাস জুড়ে চলে। হত্যাকান্ড শুরুর পিছনে সে সময়কার পাকিস্তানের সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের যুক্তি ছিল-পাকিস্তানের বৃহত্তর স্বার্থে কয়েক হাজার মানুষকে হত্যা করাটা বেশি দামি কিছু (তেমন কিছু অপরাধ) হবে না। তাদেরকে কিছু হত্যাকান্ডের নমুনা দেখালেই চুপ হয়ে যাবে। এই লক্ষ্যে এবং একটি অবশ্যম্ভাবী যুদ্ধের প্রস্তুতি হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তান হতে হাজার হাজার সৈন্য পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ে আসা হয়। এসময় প্রশিক্ষিত সৈন্যদের পাশাপাশি বিপুল সংখ্যক সাধারণ সৈন্যও আনা হয়। এ জাতীয় সৈন্যদের বেশিরভাগ ছিল পাকিস্তানি রেঞ্জার্স এবং স্কাউট বাহিনী। অশিক্ষিত এই সৈনিকরা মনস্তাত্তিক ও ধর্মীয় প্রচারণায় কঠোরভাবে প্রভাবিত ছিল। বাংলাদেশে আসার পূর্বে তাদেরকে সুপরিকল্পিতভাবে বোঝানো হয়েছিল যে বাঙালিরা মুসলমান নয়। তারা স্কুলে শিশুকাল থেকে হিন্দু শিক্ষক দ্বারা প্রভাবিত। বাঙালিরা ইসলামি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এজন্যই তারা কাফের বলে পরিগণিত হয়েছে। বড়ো বড়ো শহরগুলোতে ইপিসিএএফের সদস্যদের অত্যাচার বিদেশি গণমাধ্যমগুলো যেন জানতে না পারে সে জন্য তাদের অধিকাংশকে কালো পোশাক দিয়ে গ্রামেগঞ্জে প্রেরণ করা হয়। তারা গ্রামে গ্রামে গিয়ে প্রথমেই স্থানীয় দোসরদের সহায়তায় হিন্দু পাড়াকে টার্গেট করেছে। চালিয়েছে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগ। স্থানীয় রাজাকার, আলবদর, আল সামস ও শান্তি কমিটির সদস্যদের সঙ্গে একত্র হয়ে তারা এই কর্মকান্ড চালায়। এজাতীয় বহু গণহত্যার ঘটনা ঘটেছে যেখানে গ্রামের কিংবা পাড়ার সকল মানুষকে প্রথমে একস্থানে জড়ো করা হয়েছে। পরে তাদের মধ্যে হিন্দু ও মুসলমানকে আলাদা করে শুধুমাত্র হিন্দুদের হত্যা করা হয়েছে।


মার্কিন সাংবাদিক সিডনি শ্যনবার্গের জবানিতে এজাতীয় বেছে বেছে হত্যার বিবরণ পাওয়া যায়। ওই সময় তিনি ছিলেন ‘নিউইয়র্ক টাইমস’-এর দক্ষিণ এশীয় প্রতিনিধি। মুক্তিযুদ্ধের ওপর সংবাদ পরিবেশনের কারণে তাকে ওই সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে বহিষ্কারও করা হয়েছিল। পরে একটি প্রামাণ্যচিত্রে তিনি বলেছেন, ‘আমি যা দেখেছিলাম সেটা ছিল স্পষ্টতই গণহত্যা। হত্যার লক্ষ্য ছিল বাঙালিরা, বিশেষভাবে হিন্দুরা। যে-সব শহরে আমি গিয়েছিলাম সেখানে অনেক বাড়িঘরে চিহ্ন দেওয়া ছিল যাতে সৈন্যরা সেইসব বাড়িতে হামলা চালিয়ে লোকজনকে হত্যা করতে পারে। এসব বাড়ি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সমর্থকদের অথবা হিন্দুদের। আমার দেখা প্রতিটি শহরে প্রতিটি গ্রামে ছিল বধ্যভূমি। এসব স্থানে চেনা কিছু মানুষকে জড়ো করে গুলি করা হতো অথবা সবাইকে এক আঘাতে হত্যা করা হতো। একটা কায়দা ছিল, লোকজনকে একসারিতে দাঁড় করিয়ে মাথায় গুলি করা- যাতে এক বুলেটে পাঁচ-ছয়জনকে হত্যা করা যায়। ব্যাপারটা ছিল একরকমভাবে সংগঠিত।

গণহত্যা সম্পর্কে পাকিস্তানে তৎকালীন মিত্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঢাকাস্থ কনসাল জেনারেলের পাঠানো টেলিগ্রামের শিরোনামই ছিল ‘Selective genocide’ বা বেছে বেছে গণহত্যা। “… with the support of the Pak(istani) Military, non-Bengali Muslims are systematically attacking poor peoples quarters and murdering Bangalis and Hindus. (… পাক (পাকিস্তান) সেনাদের মদদে অবাঙালি মুসলিমরা নিয়ম করে দরিদ্র লোকজনের বাড়িঘর আক্রমণ করছে এবং খুন করছে বাঙালি ও হিন্দুদের।)”

মুক্তিযুদ্ধকালীন ঢাকায় অবস্থানরত বিদেশি সাংবাদিকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাইমন ড্রিং। ১৯৭১ সালের ৩০শে মার্চ ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ তার লেখা ‘ট্যাংকস ক্রাস রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ শীষক প্রতিবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, ‘পাকিস্তানি সৈন্যদের ঠান্ডা মাথায় টানা ২৪ ঘণ্টা গোলা বর্ষণের পর ওই নগরীর ৭ হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকা মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। … হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের একসঙ্গে জড়ো করে মারা হয়েছে, জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বাড়িঘর, বাজার, দোকানপাট।’

১৯৭১ সালের ১২ই এপ্রিল ‘টাইম’ ম্যাগাজিনে ‘পাকিস্তান : পশ্চিমের প্রতি রাউন্ড-১’ শীর্ষক প্রতিবেদনের বলা হয়, ‘গত সপ্তাহে পূর্ব পাকিস্তানে এক বিদেশি কূটনীতিক বলেন, ‘সন্দেহ নেই যে এখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে গণহত্যা শব্দটিই প্রযোজ্য।’ আরেক পশ্চিমা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এটা যথার্থই রক্তস্নান। সৈন্যরা চরম নির্দয়।’

১৮ই এপ্রিল লন্ডন থেকে ‘অবজারভার’ পত্রিকায় ব্রিটিশ সাংবাদিক কলিন স্মিথ তার ‘দ্য ফেডিং ড্রিম অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলেন, ‘আমরা নতুন শহরের কেন্দ্রে পৌঁছে প্রতিটি রাস্তার মোড়ে কেবল মেশিনগান তাক করা অবস্থায় সৈন্যদেরই দেখতে পাই। আর হিন্দু অধ্যুষিত মহল্লাগুলোতে গিয়ে দেখি সারি সারি ফাঁকা বাড়ি, সেখানে মারাত্মক হত্যাকান্ড সংঘটিত হয়েছে।’

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অমুসলমানদের উপর পাকিস্তানি বাহিনী ও তাদের দোসররা হত্যা-ধর্ষণ-লুটপাট- অগ্নিসংযোগের পাশাপাশি আরও যে নির্যাতন চলিয়েছে তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ধর্মান্তরণ। সে সময় পাকিস্তানি দোসরদের একটি অংশ অমুসলমানদের হত্যা না করে ধর্মান্তরণের মাধ্যমে তাদের প্রাণ ভিক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। এর মধ্য দিয়ে ধর্মান্তরিতকে প্রাণে বাঁচিয়ে রাখার বোধ-বিবেচনার চেয়ে নিজ ধর্মে নিয়ে আসার ‘পুণ্য কর্ম’ তাদেরকে এই কাজে বেশি উৎসাহিত করেছিল। সেই সময়ের পরিস্থিতি বিবেচনায় ধর্মান্তরিতরা এটিকে গ্রহণ করেছিলেন “আপদ্ধর্ম” হিসেবে, যার অর্থ দাঁড়ায়-‘জান বাঁচানো ফরজ’। এটি ছিল ঐ সম্প্রদায়ের লোকদের উপর একটি পরোক্ষ এবং মানসিক অত্যাচার। ধর্ষণ যেমন ভুক্তভোগীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে আঘাত করে, এজাতীয় ধর্মান্তরণ তেমনি ভুক্তভোগীকে প্রচন্ড রকম মানসিক আঘাতের জন্ম দেয়। এ জাতীয় অত্যাচারের ফলাফল হয় সুদূরপ্রসারী। ধর্মান্তরিতরা সাময়িক লোকদেখানো ধর্মপালন করতে বাধ্য হলেও মনে প্রাণে তা মেনে নিতে পারেন নি। তাই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অনেকটা অসম্ভবক্ষেত্র ছাড়া এজাতীয় ধর্মান্তরিতদের প্রায় সকলেই পূর্ববর্তী ধর্মবিশ্বাসে ফিরে এসেছিলেন। মৃত্যুর পরও মৃতের দেহাবশেষ পুনরায় স্বধর্ম-রীতি অনুযায়ী দাহ করার নজিরও দেখা যায়। এই গণপ্রত্যাবর্তন থেকে বোঝা যায় যে ধর্মান্তরণের মধ্য দিয়ে তারা কী ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন।

মৃত্যুর পর মৃতের দেহাবশেষ পুনরায় স্বধর্ম-রীতি অনুযায়ী দাহ করার ঘটনা ঘটে বাগেরহটের খাদা গ্রামে। এই গ্রামে নিশিকান্ত হাওলাদারের পরিবার দেশত্যাগ করলেও গ্রামে থেকে যান তিনি। উক্ত এলাকার পিস কমিটির সদস্য ও রাজাকাররা তাঁকে ধর্মান্তরিত করার পর তাঁদের পারিবারিক মন্দিরটি ভেঙে সেটিকে মসজিদে রূপান্তরিত করে। উক্ত বছর রমজান মাসে নওমুসলিম নিশিকান্ত ২৪দিন পর্যন্ত রোজা থাকার পর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে মারা যান। মুসলিম রীতি অনুযায়ী তাকে কবরস্থ করা হয়। এরপর দেশ স্বাধীনের পর তাঁর পরিবারের সদস্যরা দেশে ফিরে নিশিকান্তের দেহাবশেষ কবর থেকে তুলে হিন্দু রীতি অনুযায়ী দাহ করে।

বাগেরহাট জেলার যেসব এলাকায় জোর করে ধর্মান্তরণের ঘটনা ঘটেছিল, তার মধ্যে মাদুরপাল্টা, সাহেবেরমেঠ, ব্রাহ্মণমাঠ, বৈটপুর, কামারডাঙ্গা, কাঠিগোমতী, রাধাবল্লভ, গোপালপুর, ভান্ডারখোলা প্রভৃতি গ্রামের গণধর্মান্তরণের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। মুক্তিযুদ্ধকালীন অমুসলিম সম্প্রদায়ের যারা দেশের মায়া ত্যাগ করে শরণার্থী হিসেবে দেশত্যাগ করেন নি তাদেরই একটি অংশকে পাকিস্তানিদের দোসর মূলত পিস কমিটর সদস্যরা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করে তাদের মুসলমান হতে বাধ্য করে। ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানো হয় যে, মুসলমান নাহলে তাদের অবস্থানের তথ্য পাকিস্তানি সৈন্যদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে, অর্থাৎ হত্যার ব্যবস্থা করা হবে। এ ধরনের ধর্মান্তরণ যে তারা কোনো রকম সাময়িক মুসলমানিত্বের জন্য যে করেনি তা তাদের প্রাসঙ্গিক কিছু আচরণ থেকে বোঝা যায়। যেমন ধর্মান্তরিতদের তারা বাধ্যতামূলকভাবে গরু জবাই করে মেজবানি খাওয়ানোর ফতোয়া দিয়েছিল, মসজিদ তৈরি করানো হয়েছিল, শাঁখা-সিঁদুর ও ধুতি বর্জনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, এবং কোনো কোনো এলাকায় আবাল-বৃদ্ধ সকল পুরুষের জন্য খতনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। এছাড়া সেসময় পিস কমিটির ইচ্ছা অনুযায়ী এসব পরিবারের বিবাহযোগ্যা মেয়েদের একটি অংশকে পিস কমিটির নেতার অনুগত যুবকদের বাড়িতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

তবে সেসময় ধর্মান্তরিত হয়েও এমনকি আবালবৃদ্ধ নির্বিশেষে খতনা করানোর পরও জীবন রক্ষা হয়নি এমন উদাহরণও রয়েছে। হত্যাকারীরা ধর্মান্তরণের চেয়ে আরও বেশি পুণ্য অর্জনের আশায় তাদেরকে হত্যা করে পরকালের জন্য পুণ্যের পাল্লা ভারী করেছিল, পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের সহায় সম্পদ সম্পত্তিরও নিরঙ্কুশ অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছিল। বাগেরহাট জেলার সদর থানার বৈটপুর গ্রামে এ জাতীয় হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটে। এ জাতীয় হত্যাকান্ডের ফলে অনেক নওমুসলিমও দেশত্যাগের সিদ্ধান্ত নেয়। বাগেরহাট জেলার সদর থানার দশানী গ্রামে এ জাতীয় ঘটনা ঘটে।

বাগেরহাটের অনুরূপ টাঙ্গাইল জেলায় অনেকগুলো ধর্মান্তরণের ঘটনা ঘটে। সেই সময়কার স্থানীয় রাজাকার নেতা পিস কমিটির সেক্রেটারী আব্দুল খালেক অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে টাংগাইল বিন্দুবাসিনী স্কুল মাঠে এক সভায় ঘোষণা করেন “পাকিস্তানে একমাত্র মুসলমানরাই থাকবে। পাকিস্তান ইসলামিক রাষ্ট্র। এ রাষ্ট্রে মুসলমান ব্যতীত ভিন্ন জাতির থাকার কোনো অধিকার নেই। নিম্ন জাতের হিন্দু ও অন্যান্য যারা ধোপা, নাপিত, মেথর, মুচি তারা থাকতে পারবে, যেহেতু মুসলমানরা ঐ ধরনের ছোটো কাজ করতে পারে না। যারা স্বেচ্ছায় মুসলমান হবে, তারাই শুধুমাত্র পাকিস্তানে থাকতে পারবে, তবে উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য কেনো হিন্দু মুসলমান হলে তাকে কোরবানী দেওয়া হবে।”

এই ঘোষণার পর টাঙ্গাইলের হিন্দুদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। এসব হিন্দুদের কয়েকজন মুসলিম প্রতিবেশী তাদেরকে ধর্মান্তরণই জীবন বাঁচানো একমাত্র উপায় হিসেবে বর্ণনা করেন। উপায়ন্তর না দেখে উক্ত এলাকার বহু হিন্দু পরিবার ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। এ ধর্মান্তরণের আনুষ্ঠানিকতা হয় টাঙ্গাইল বড় মসজিদে। সেখানে নবাগত মুসলমানদের দেখার জন্য হাজার হাজার লোক জড়ো হলে উপরিউক্ত আব্দুল খালেক রাগান্বিত হয়ে উৎসুক জনতাকে বলতে থাকে-‘এরা এখনও কাফের, কেউ আল্লার ফেরেসতা না, দেখার এমন কিছু হয় নাই’। উক্ত মসজিদের মুয়াজ্জিনকে এসকল নওমুসলিমদের ওজুর নিয়মকানুন ও কালেমা শেখানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়। একবারে এতোগুলো হিন্দুকে মুসলমান বানানোর প্রাথমিক দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পেয়ে সে তখন খুশিতে আত্মহারা। সে পরম যত্নে সবাইকে অজু করিয়ে কলেমা তালিম দিয়ে মসজিদের ভিতরে আনুষ্ঠানিকভাবে নিয়ে গেল। অর্ধেক মসজিদের ভিতরে ঢুকে গেছে এমন সময় পুনরায় আব্দুল খালেক চিৎকার দিয়ে বলতে থাকে-‘এরা এখনও মুসলমান হয় নাই। কোনো কাফের মসজিদের চৌকাঠ পেরোতে পারেনা, আপনারা পেয়েছেন কি, মুসলমান না বানিয়েই মসজিদে নিয়ে এসেছেন।’

এরপর তাদেরকে সত্তিকার মুসলমার বানানো পর্ব শেষ হলে বলা হলো- ‘শুধু আপনারাই মুসলমান হলে চলবে না। বাড়ির মেয়েদেরও মুসলমান হতে হবে। না হলে একত্রে বসবাস করা যাবে না।’ অগত্যা শুরু হলো পরিবারের নারী সদস্যদের মুসলমান হওয়ার পালা। পদ্ধতি সহজ। মা বোনেরা ঘরের মধ্যে থেকে একটা কালো শাড়ীর প্রান্ত ধরে রইলেন, অন্য প্রান্ত বাইরে অবস্থানরত ইমাম সাহেব ধরে কালেমা উচ্চারণ করলেন। এভাবেই সম্পন্ন হলো নারীদের ধর্মান্তরণ। দেশ স্বাধীন হলে ২২ অথবা ২৩ ডিসেম্বর টাংগাইলের তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার ধর্মান্তরিত হিন্দু টাঙ্গাইল কালীমন্দিরে আনুষ্ঠানিকভাবে পুনরায় নিজ ধর্মে প্রত্যাবর্তন করেন।

শুধু একাত্তরের নয় মাস নয়, পাকিস্তানের পুরো শাসনামল জুড়েই ছিল হিন্দু ও অমুসলিমদের সংস্কৃতিকে ধ্বংস করার চক্রান্ত ও তৎপরতা। পশ্চিম পাকিস্তানিদের চোখে বাঙালি সংস্কৃতি ও হিন্দু সংস্কৃতির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় নি। তারা বাংলা ভাষাকেও হিন্দুয়ানী ভাষা ভেবেছে। উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্রের পেছনে তাদের এ জাতীয় ভাবনাও ক্রিয়াশীল ছিল। রবীন্দ্র সংগীতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, পহেলা বৈশাখ পলনের উপর বিধিনিষেধ, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের ফলশ্রুতি দেশত্যাগী হিন্দুদের সম্পত্তি শত্রুসম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা ও বাজেয়াপ্তকরণ, হিন্দুদের সম্পত্তি বিক্রয়ে নিষেধাজ্ঞা, সবকিছুই করেছিল তারা হিন্দুয়ানী সংস্কৃতির প্রতি বিদ্বেষভাবাপন্ন হয়ে। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন অচিরেই ধুলিস্বাৎ হয়ে যায়। ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ফলে অত্যাচারীর পরাজয়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণিত হয় হাজার হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতির শিকড় অনেক গভীরে গ্রথিত। বাঙালির শৌর্য ও বীরত্বও কম কিছু নয়।

বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71