মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৬ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
মুক্তিযুদ্ধে সিরাজগঞ্জের হিন্দু নারীদের স্মরণীয় অবদান
প্রকাশ: ০৪:৫২ pm ২২-০৪-২০১৮ হালনাগাদ: ০৪:৫২ pm ২২-০৪-২০১৮
 
স্বপন মির্জা
 
 
 
 


৭১-এ জুলমবাজ পাকিস্তানীদের পরাধীনতার হাত থেকে বাঁচতে নিরীহ বাঙালীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেশ ও মানুষ বাঁচানোর আন্দোলনে সাড়া দিয়ে গর্জে উঠেছিল। এদেশের কৃষক, কামার-কুমার, শ্রমজীবি, পেশাজীবিসহ সকল শ্রেনীর মানুষ ঐক্যবদ্ধ ভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল আমাদের সোনার বাংলা রক্ষায়। 

সারা দেশের ন্যায় এক্ষেত্রে যমুনা বিধৌত সিরাজগঞ্জের মানুষের অবদানও ছিল স্মরণ করার মত। পুরুষের পাশাপাশি শহরের শিক্ষিত নারীরাও অস্ত্র হাতে নিয়েছিল দুর্বারতা নিয়ে। তখন যুদ্ধে নির্যাতিত হয়েছিল হাজার-হাজার নারী। অগনিত শহীদের রক্তে লাল হয়েছিল বেলকুচির সগুনার হুরাসাগর নদীসহ সমগ্র জেলার খাল-বিল ও নদী-নালা। এ মহান যুদ্ধ চলাকালে সনাতন ধর্মালম্বীরাও বসে থাকেনি। দেশ মাতৃকার টানে তারাও লাঙ্গল ফেলে ষ্টেনগান হাতে নিয়েছিল। এনায়েতপুর থানার গোপিনাথপুর গ্রামের সনাতন বধুরা ভয় উপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রিত গোপন ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের আহারে গ্রাম থেকে চাল-ডাল তুলে খিচুরী রান্না করে দিত। দীর্ঘ দিন তারা নিজেদের বাড়িতেই করে লুকিয়ে রাখতো বীর সন্তানদের। দেশ মাতৃকায় অবদানের কথা কাউকে না জানিয়ে নিজারাই অতীত অবলোকন করেন আপন চিত্রে।

মুক্তিযুদ্ধকালীন সময় সিরাজগঞ্জের দামাল সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা নানা কৌশল অবলম্বন করে পাক হানাদারদের পরাস্ত করতে ঐক্যবদ্ধ ছিল। যমুনা বিধৌত চৌহালী উপজেলার মালিপাড়ায় ক্যাম্প করে পাক হানাদাররা। এদের বিরুদ্ধে চোরা-গুপ্তা হামলা চালাতে গোপন একটি ক্যাম্প করা হয় গোপিনাথপুর গ্রামের তৎকালীন ধর্মদাস সরকারের বাড়িতে। এ টিমের সাথে সম্পৃক্ত তেবাড়িয়ার মুক্তিযোদ্ধা গঙ্গাধরের বোন জামাই বলরাম সরকারের বাড়ির পাশে হওয়ায় নিকট আত্মীয় ধর্মদাস সরকারের বাড়িকেই তারা বেছে নেয়। সুবিশাল বাড়িটির চার দিকে পানি মগ্ন ও জঙ্গল ঘেরা থাকায় বিমান বাহিনী থেকে আসা ঘাটাইিলের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম ইকবাল ও মুক্তিযোদ্ধা রঘুনাথ সরকারের নেতৃত্বে প্রায় ৪০/৫০ জনের এই টিমটি ৭১-এর মে মাসের শেষের দিকে এসে জুন মাসের মাঝামাঝি অবস্থান করে। তখন গ্রামে প্রায় শ’ খানেক হিন্দু পরিবার ছিল। তারাই এ গ্রামসহ আশপাশের গ্রামের প্রতিনিধিত্ব করতো। আর এক মাত্র হাজী রশিদের পরিবারটিই ছিল গ্রামের মুসলমান। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান সম্পর্কে শুধু গ্রামের মানুষ গুলোই অবহিত ছিল। আর তারাই অবস্থানকালীন সময় খাওয়া-পড়াসহ সামগ্রীক সহযোগীতা করেছে ঐক্যবদ্ধভাবে। কৃষিজীবি পরিবারের এই মানুষ গুলো স্বাধীনতার স্বাদ পেতে সকল ভয়-ভীতি উপক্ষো করে আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য প্রদানে ঐক্যবদ্ধ ছিল। তাদের ভরণপোষনে গ্রামের প্রধান ধর্মদাস সরকার, প্রাণবন্ধু সরকার, বাবুরাম সরকার, কলেজ ছাত্র সুধীর সরকার, রামপদ সরকার ছিল দায়িত্বপ্রাপ্ত। তারা বাড়ি-বাড়ি থেকে চাল-ডাল তুলে তা দিয়ে খিচুরী রান্না করে অন্তত দু’বেলা আহারের ব্যবস্থা করতো। কত দিন মুরগীর ব্যবস্থাও হতো। এ কাজে নিষ্ঠার সাথে রাধুনীর দায়িত্ব ছিল অন্তত ১০/১৫ জন হিন্দু নারী। এর মধ্যে বেঁচে আছেন মৃত বেনী মাধব সরকারের স্ত্রী শতবর্ষী খুকী বালা সরকার, মৃত কমল সরকারের স্ত্রী সবিতা রানী সরকার (৭৫) এবং মৃত সুর্য্য কান্ত সরকারের স্ত্রী লক্ষ্মী রানী সরকার (৬৫)। 

তারা জানান, আমাদের স্বামী ও গ্রাম প্রধানদের দেশাত্ববোধে আমরাও জাগ্রত ছিলাম। মুক্তিযুদ্ধে তারা অংশ নিতে না পেরে হতাশা বোধ করতো। তাই গোপন ঘাঁটির মুক্তিযোদ্ধাদের আমরা প্রাণপনে সহযোগীতা করেছি। তারা ওখানে থাকাকালীন গ্রামের পুরুষরা খোঁজ-খবর রাখতো। আর আমরা ছিলাম রান্নার দায়িত্বে। প্রতিদিনই অন্তত ২০ কেজি চাল-ডাল বাড়ি-বাড়ি থেকে গুছিয়ে খিচুরী রান্না করে দিতাম ধর্মদাস সরকারের বাড়িতে আশ্রয় নেয়া মুক্তিযোদ্ধাদের। সেদিনের স্মৃতিচারন করে তারা জানান, অনেক সময় তাড়াহুড়ো করে রান্না করা খিচুরী নিতে গিয়ে শরীরে গরম ছ্যাকা খেতাম। প্রচন্ড ব্যাথা থাকতো কয়েক দিন। তার পরও আমরা দমতাম না। 

এদিকে মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য ভুমিকা পালনকারী এই বিধবা নারীরা এক সময় জমি-জমা নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটলেও, এখন তাদের নানা অভাব তাড়া করে প্রতিক্ষন। বৃদ্ধ হাতে তাঁত শ্রমিকের কাজ করে দু’বেলা খাবার জোটানোই মুশকিল। কোন রকমে ঝুপরী ঘরে বসবাস। আর গায়ে জড়ানো স্বল্প মুল্যের একখানা সাদা শাড়ী দিয়েই চলে-বছরের পর বছর। কেউ খোঁজ নেয়না এই অসহায় বৃদ্ধাদের।

খিচুরী সহযোগীতার আরেক উদ্যোক্তা তখনকার গ্রামের তরুন যুবক সুধীর চন্দ্র সরকার। সে সময় বেলকুচি ডিগ্রী কলেজের প্রথম ব্যাচের ইন্টারমেডিয়েটের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। বর্তমানে যিনি গ্রামের প্রবীন সমাজ-সেবক। তিনি জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের খিচুরী বন্টন কাজে খুবই আনন্দ পেতাম। তার পর ভয়ও পেতাম। এরা এখানে গোপনে অবস্থান নিয়ে রশিদ ভাইয়ের নৌকা করে অস্ত্র-শস্ত্র নিয়ে মাঝে মাঝে মহড়া দিতো। তখন আমরা সাহস পেতাম। মনে হতো আমরাও মুক্তিযোদ্ধা। তখনকার স্মৃতি ভোলার নয়। পুরো গ্রামবাসী এক হয়েই মিলিটারীর ভয় দমিয়ে তাদের সাহায্য করতাম। এসব বিষয় এখন নতুন প্রজন্মের সবারই অজানা। অতীত মনে হলে দেশ মাতৃকায় আবারো উজ্জিবিত হতে মন কাঁদে আমাদের। সেই শত ঘর হিন্দুর মধ্যে আমরাই দেশের মাটি ধরে আঁকড়ে আছি। প্রায় ৭৫ ভাগ পরিবারই শত দুঃখ বেদনা নিয়ে পাড়ি দিয়েছে ভারতে।

এদিকে চৌহালী উপজেলার সদিয়াচাঁদপুর মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার গাজী আব্দুস ছাত্তার খলিফা জানান, অনেক দিন পড় সেই দিনের কথা মনে পড়ে গেল। টাঙ্গাইলের ঘাটাইলের মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল হালিম ইকবালের ঐ গুপ্ত টিম এলাকার মধ্যে পাক মিলিটারীদের ছিল আতংক। তারা গোপনে অবস্থান করে পাক বাহিনীকে ঘিরে সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়ে তাদের পরাস্ত করতো। তবে গ্রামের আশ্রিত মুক্তিযোদ্ধাদের পুরো গ্রামবাসী মিলে যে ভাবে সহযোগীতা করেছে তা কখনো ভোলার নয়। এ জন্য গোপিনাথপুর গ্রামবাসীর তথা খিচুরী রান্না করে দেয়া ঐসব নারীদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাই।

বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71