বুধবার, ১৯ জুন ২০১৯
বুধবার, ৫ই আষাঢ় ১৪২৬
 
 
মুক্তিযুদ্ধ ও সৎসঙ্গের শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য
প্রকাশ: ০৩:৩৪ pm ২০-০৩-২০১৯ হালনাগাদ: ১০:১৩ am ২৩-০৩-২০১৯
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


অধ্যাপক ড. রজত কান্তি ভটাচার্য্য

মানুষ পৃথিবীতে জন্ম নেয়-কর্মে সংযুক্ত হয়-তারপর মৃত্যুবরণ করে। জীবনের অর্জন কেউ শিখে দেখে দেখে। অধিকাংশ মানুষই অবজ্ঞা করে জীবন শিক্ষার পরিপূর্ণতার অভাবে-মানুষেরা হয় কৃষ্টিহারা। ধর্মও তাকে বিকশিত করতে পারে না। রাষ্ট্রের স্বাধীনতা আর জাতীয়তাবাদের অনুভূতি জন্ম নেয় তার অস্তিত্বের দর্শন অনুযায়ী। সে অনুযায়ী শিক্ষা-অর্থনীতি-শিল্প আপন নিয়মে আবর্তিত হয়। রাজনীতি ইহার অভিভাবকের স্থান দখল করে। কিন্তু কুষ্টি বিকশিত করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। কারণ ইহা সামগ্রিক অনুভূতির বিষয়।

মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের দেশের অনেক সূর্যসন্তান প্রাণ দিয়েছেন- যারা চলে গেছেন তাদের অনেকেরেই অসীম ত্যাগ তিতীক্ষার ইতিহাস থেকে বাস্তবে পরবর্তী প্রজন্ম খুব কমই শিক্ষা গ্রহণ করেছে- ইহা আমাদের জন্মগত দারিদ্র। টাঙ্গাইল শহরের পাকুটিয়া গ্রাম। যেখানে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এমনই একটি মানুষ যার নাম প্যারী মোহন আদিত্য। ১৯৩৪ সালের ৫ই জুন, বৃটিশ ভারতের শাসনামলে তার জন্ম। চার ভাইয়ের মধ্যে প্যারী মোহন আদিত্য ছিলেন দ্বিতীয়।

মানুষ তাঁর যোগ্যতা অর্জন করে মানুষের জন্য- ‘মানুষ’ ইশ্বরের সৃষ্টি তাকে যারা প্রকৃত অর্থে ভালবাসে। কিন্তু তারা তেমনতর ভালোবাসা নিয়ে জীবনযাপন করে না- তারা তা দেখেনা। শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৪৪ সালে বাবা মায়ের অস্বচ্ছল সংসারের দায়ভার গ্রহণ করেন। সপ্তাহে তিনদিন লৌহ শিল্পের কাজ করতেন এবং তা বিক্রি করতেন। এভাবে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তার বাবার সাথে কাজের পাশাপাশি লেখাপড়া করতেন। ১৯৫৪ সালেই তিল তিল করে জমানো অর্থ থেকে পাকুটিয়া কিরীটি বাড়ীর সহায়তায় তাদের কিছু জমি ক্রয় করে একটি মনোহারী দোকান স্থাপন করেন। সাথে তাঁর পৌত্রিক পেশাও মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত চালিয়ে যান। পড়ার বিষয়ে প্যারী মোহন আদিত্যের প্রবল আগ্রহ ছিল- সে সময় নজরুল সাহিত্য, রবীন্দ্র সাহিত্য এবং শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের গ্রন্থ পাঠ করতেন। আর সেই ইচ্ছা থেকেই সৎসঙ্গের দীক্ষা গ্রহণ করেন। তিনি গল্প লিখে, গান লিখে ও গেয়ে এবং নাটকে অভিনয়ের মাধ্যমে আনন্দ দিতেন  মানুষকে। 

১৯৪৭ এ প্যারী মোহন আদিত্য দাঙ্গার শিকার হন। ১৯৬৮ সালে তাঁর বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং অবশেষে ১৯৬৯ ও ১৯৭০ সালে বাবা-মা মৃত্যুবরণ করার পর-সে শোক কাটিয়ে উঠতে তার যথেষ্ঠ সময় লাগে। তাঁর আদর্শ ছিল- শ্রীশ্রীঠাকুরের সেই বাণী- ঈশ্বর এক, ধর্ম এক, প্রেরিত পুরুষেরা একই বার্তাবাহী- একই সত্তাবাহী। তিনি ব্যক্তিগত জীবনে মানব সেবা মুলক অফুরন্ত কাজ, সবার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ গভীর দেশ প্রেমের পরিচয় দিয়েছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় তার লেখা সংকলিত করে কাব্যগ্রন্থ রূপে প্রকাশিত না করার জন্য সেই সব ধ্বংস হয়ে গেছে। ১৯৫৭ সালে শ্রীশ্রীঠাকুরের বাণী ও আদর্শ প্রচার করার জন্য ‘সৎসঙ্গ সংবাদ’ নামে একটি পত্রিকা প্যারী মোহন আদিত্য ও কাব্যর্তীথ কুঞ্জ বিহারী মজুমদারের যুগ্ম-সম্পাদনায় এবং রাস বিহারী আদিত্যের সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন সৎসঙ্গের র্কায্যকরি পরিষদের সদস্য। 

প্যারী মোহন আদিত্যের বিশেষ কর্মের মধ্যে অন্যতম ১৯৭০ সালের ভয়াবহ বন্যা এবং জলোচ্ছাসে মৃত্যুপথযাত্রী শত শত দক্ষিণাঞ্চলের মানুষদের সাহায্য সহযোগিতা দেওয়ার কার্যক্রম, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নেতৃত্বে সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জয়লাভের পর ১৯৭১ সালের ২৪শে মার্চ বঙ্গবন্ধুর সাথে সাক্ষাৎ করে আপতকালীন ফান্ডে সৎসঙ্গের পক্ষ থেকে সাহায্য প্রদান, ৭ই মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ শুনে রুখে দাড়িঁয়ে ছিলেন হানাদারদের বিরুদ্ধে প্যারী মোহন আদিত্য। সেবা করেছিলেন  মুক্তিযুদ্ধাদের, আশ্রয় দিয়েছিলেন মুক্তিকামী মানুষদের এবং ১৯৬৮ সলের প্রথম দিকে প্যারী মোহন আদিত্যের উপস্থিতে শ্রীশ্রীঠাকুর বিশেষ ভাবে বলেছিলেন, ’ঐ পদ্মাই গংগা, ওখানে তোরা প্রতি বছর ৩০ শে ভাদ্র গঙ্গা স্নান করবি’। পাবনাতে কেউ ভয়ে যেতে না চাইলেও প্যারী মোহন আদিত্য চিড়া মুড়ি গুড় নিয়ে চলে যেতেন পাবনার হিমাইতপুর গ্রামে। (যা সৎসঙ্গ সংবাদে লেখা আছে)। পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে প্রদর্শিত শ্রীশ্রীঠাকুর ব্যবহৃত পাদুকা ভারতের দেওঘর থেকে প্যারী মোহন আদিত্য’ই বহন করে আনেন। সেটি ছিল ১৯৫৮ সাল।

প্যারী মোহন আদিত্য ছিলেন গ্রাম ও প্রতিবেশীর বন্ধু ও সহযোদ্ধা। কালে কালে আসে ১৯৭১ সাল। ২৫শে মার্চের রাতে পাক বাহিনী যখন নিরস্ত্র বাঙালীর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে, তার ঢেউ লাগে টাঙ্গাইলেও। ১৮ই এপ্রিল পাক-বাহিনী টাঙ্গাইল থেকে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হয়, রাস্তার দুই পার্শ্বের ঘর-বাড়ী জ্বালিয়ে পুঁড়িয়ে আশ্রম এলাকায় প্রবেশ করে এবং ৫/৬টি শেলের আঘাতে মন্দিরে চূড়াটি ভেঙ্গে পড়ে। কিন্তু এ ভক্ত শ্রীশ্রীঠাকুরের সম্মুখে নিঃসঙ্গ চিত্তে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকলেন এবং প্যারী মোহন আদিত্যকে প্রতিকৃতি ভেবে এবং আর কাউকে না পেয়ে গুলি ছুঁড়তে ছুঁড়তে ময়মনসিংহের দিকে অগ্রসর হয়। তারপর ২১শে মে আনুমানিক ৯টায় পাকুটিয়ায় হঠাৎ করে সাড়াশী আক্রমণ চালায় এবং পাক-বাহিনীর কাছে খবর ছিল যে, প্যারী মোহন আদিত্য একজন মুক্তিবাহিনী তাই তাকে ঘাটাইল ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়। তৎপর তিনি সেখান থেকে পালিয়ে আসেন। ১৯৭১ সালে ৮ই আগষ্ট পাকুটিয়া আশ্রমে মুক্তিবাহিনীর সাথে প্রচন্ড গোলাগুলির সময় প্যারী মোহন আদিত্য পাকিস্তানী বাহিনীর গুলিতে তাঁর বুক ঝাঁঝড়া হয়ে যায়। তার সাথে আরো একজন সহযোদ্ধা সহ তাদের মৃতদেহ মন্দির প্রাঙ্গনে পড়ে থাকে। অবশেষে তার স্বজনরা তার সৎকার করেন। এ ঘটনার ধারাবাহিকতায় দীর্ঘ ৪৫ বছর পর স্থানীয় দেশপ্রেমীক জনগণ পাকুটিয়ায় শহীদদের নামে ৪টি সড়কের নামকরণ করেন। একটি সড়কের নামকরণ করা হয়-এই মহান আত্মত্যাগী সমাজ সংগঠক সাংস্কৃতিক কর্মী এবং সাহিত্য প্রেমী শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের নামে। একাত্তরে জন্মভূমি বাংলার স্বাধীকার রক্ষায় মহান মুক্তিযুদ্ধের পীঠস্থান টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলা। প্যারী মোহন আদিত্যে ছিলেন মুক্তিযোদ্ধাদের নিরাপদে আগলে সরিয়ে রেখে তথ্য, রসদ ও আহত গেরিলা যোদ্ধাদের সেবা-সুশ্রুসার দায়িত্বে। 
 
যেভাবে প্যারী মোহন আদিত্যের প্রাণ যায়, তার বিবরণ পাওয়া যায় এলাকার গণ্যমান্য ব্যাক্তি এবং ভারত থেকে প্রকাশিত স্বতিসেবক পত্রিকায় নরেন্দ্র নাথের স্মৃতি চারন মুলক লেখা থেকে, বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত স্মৃতি’৭১, পান্না কায়সার সম্পাদিত হৃদয়ে’৭১, রশিদ হয়দার সম্পাদিত খুজেঁ ফিরি ও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা থেকে। বীর মুক্তিযুদ্ধা মোঃ বেলায়েত হোসেনের ইউটিউব এর ধারন কৃত স্মৃতি চারন থেকে-যেদিনে পাক বাহিনী সাড়াশি আক্রমণ চালায় মধুপুর যাবার পথে, সেদিন গোলার আঘাতে মৃতপ্রায় প্যারী মোহন আদিত্যকে লাথি দিয়ে, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটির সন্ধান চায় কিন্তু দৃঢ় চেতা প্যারী মোহন বেয়নেটের আঘাতের পরও মুখ খোলেননি। 

প্যারী মোহন আদিত্যের সন্তান নটো কিশোর আদিত্য এমন বয়সেই পিতৃহারা হন যে, তাঁর বাবা কেমন দেখতে তা তিনি এখনও জানেন না। সৎসঙ্গের পাকুটিয়া আশ্রমকে এখনও বলা হয় পূন্য পাদুকাপীঠে স্থান- এ নামটি স্বয়ং প্যারীমোহন আদিত্যের দেওয়া। একথাটি স্বীকার করেছেন তারই ভাই অমরেন্দ্রনাথ আদিত্য। তিনি বলেছেন- 

প্যারী’দা যদি শ্রীশ্রীঠাকুরের পাদুকা না নিয়ে আসতেন তাহলে হয়তো পাকুটিয়ায় এই আশ্রম প্রতিষ্ঠিত হতো না। শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মস্থান রক্ষায় সকল ভয়ভীতি উপেক্ষা করে প্যারী’দা অনেকবার পাবনা গিয়েছিলেন। এমনকি শ্রীশ্রী ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের পর তার চিতাভষ্ম নিয়ে এসে পদ্মা নদী সহ বিভিন্ন নদীতে বিসর্জনের আয়োজনেও করেছেন তিনি। প্যারী’দা যখন পাবনার রাস্তায় হাঁটতেন তখন দেখা যেত প্রতিটি মানুষই তাঁর পরিচিত।” এই কথাটি তারই ভাই অমরেন্দ্র আদিত্য স্বীকার করেছেন। 

প্যারী মোহন আদিত্য এক আশ্চর্য্য শক্তির তনয় ছিলেন- একাধারে সাংসারিক কাজ, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড এমনভাবেই করেছেন যে আজ স্বাধীনতার এত বছর পরও অনেকেই প্যারী মোহন আদিত্যের কথা স্মরণ করেন। ১৯৬৪-৬৫ সালে প্যারী মোহন আদিত্যের উপর অনেক বিপদ আসে কিন্তু তিনি ধৈর্য্য ধরে মোকাবেলা করেন। এই তথ্যের লেখক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন নামক বীর মুক্তিযোদ্ধা। ঠাকুরের আদর্শ বলতে যা বোঝায়, তার সবটুকুই প্যারী মোহন আদিত্যের মধ্যে ছিল- তিনি সৎসঙ্গ সংবাদের সহ সম্পাদক ছিলেন। তিনি লিখতেন, সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানবতা ও বাঙালী জাতীয়তাবোধ প্রচার করতেন। এ যেন ছিল বাঙলার স্বাধীনতার আগাম সংকেত, যা থেকে পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়। 

সৎসঙ্গ বাংলাদেশের মুখ্য দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি ও ‘সভাপতি’ কুঞ্জ বিহারী আদিত্য বিভিন্ন ভাবে এসকল তথ্যের স্বীকারোক্তি শুধুমাত্র তাকেই নয় সৎসঙ্গের কর্মধারাকে ব্যতিক্রমী ও বিশ্বজনীনতা দান করেছে। শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের প্রতি জাতির অপূরণীয় ঋণ কোননা কোনভাবে একদিন শোধ হবার পরিবেশ তৈরি হবে, আমরা সেটি বিশ্বাস করি। 

অধ্যাপক ড. রজত কান্তি ভটাচার্য্য
বিশিষ্ট লেখক, শিক্ষক, গবেষক

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71