শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ২রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
ময়মনসিংহের গেরিলাযোদ্ধা বিমল পালের অবিস্মরণীয় অবদান
প্রকাশ: ০৬:৫৩ pm ১৬-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০৯:৫৫ pm ১৬-০৫-২০১৮
 
আতাউর রহমান জুয়েল
 
 
 
 


১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ মাতৃকার টানে ময়মনসিংহের গেরিলাযোদ্ধা বিমল পাল মাকে মিথ্যা বলে ভারতে গিয়েছিলেন যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিতে। তাঁর পুরো পরিবার আত্মীয়-স্বজন মিলে প্রায় ২৫ জনের মতো একটি সংখ্যালঘু দল দেশ ছেড়ে চলে গিয়েছিলো ভারতের শরনার্থী শিবিরে। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে ফিরে এসেছিলো বিমল পালের পরিবার। ফিরে এসে দেখে বাড়ি ঘর ভাংচুর করা, রেখে যাওয়া মালামাল লুটপাট হয়ে গেছে। নতুন করে আবার শুরু করতে হয়েছে তাদের জীবন সংসার।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে ময়মনসিংহ শহরের ৪ নম্বর হরি কিশোর রায় রোডের স্বর্গীয় অরবিন্দ পাল ও স্বর্গীয় সুভাষিনী পালের পুত্র বিমল পালের বয়স সবে মাত্র ১৮। এসএসসি পাশ করে ময়মনসিংহ মিন্টু কলেজের ইন্টারমিডিয়েট প্রথম বর্ষে ভর্তি হয়েছেন। ২৭ মার্চ খাগডহর ইপিআর ক্যাম্পের যুদ্ধে বাঙ্গালীদের হাতে পাকিস্তান সেনারা পরাজিত হয়। এই যুদ্ধের পর ময়মনসিংহ শহর প্রায় এক মাস মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে দখলে থাকার পর ২১ এপ্রিল ময়মনসিংহের পতন ঘটে। এর আগের দিন ২০ এপ্রিল শম্ভুগঞ্জ এলাকায় বোমা হামলার মধ্য দিয়ে আতংক তৈরি ময়মনসিংহ শহরে প্রবেশ করে পাকিস্তানী আর্মিরা। এই দিনই সংখ্যালঘু বিমল পালের পরিবার ও স্বজনসহ প্রায় ২৫ জন জীবন বাঁচাতে ভারতের শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নিতে বাড়ি ঘর রেখে চলে যান ফুলবাড়িয়ার কুশমাইল গ্রামের হিন্দুপাড়ায়। পরিবারের সাথে টগবগে যুবক বিমল পালও ছিলেন। তার সাথে ছিল কলেজে যাওয়ার সঙ্গী একটি বাই-সাইকেল। কুশমাইল হিন্দুপাড়ার অনিল মন্ডলের বাড়িতে বেশ কিছু দিন আশ্রয়ে থাকেন এই পরিবারটি। এসময় মা সুভাষিনী পালের কাছে মামা বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলি যাওয়ার কথা বলে বিমল পাল সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। মামা বাড়িতে গিয়ে ওই দিনই (৯ মে) সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন বিমল পাল ভারতে প্রশিক্ষণ নেয়ার উদ্দেশ্যে। 

নিকলি, করিমগঞ্জ, তাড়াইল, ফুসকা মদন, ঠাকুরকোনা হয়ে সাইকেলে করে চলে যান ভারতের মেঘালয় রাজ্যের বাঘমারা ইয়ুথ ক্যাম্পে। এখানে এসে ক্যাম্প ইনচার্জ আব্দুল মজিদ তারা মিয়ার সাথে পরিচয় ঘটে এবং ভর্তি হন তিনি। ট্রেনিং শুরু হয় বিমল পালের। পরে জুন মাসের প্রথম দিকে তোড়া প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে আবারও রওনা দেন বিমল পাল। ১২ই জন এসে উপস্থিত হন এবং এই ক্যাম্পে প্রায় ১ মাস গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। প্রশিক্ষন শেষে ১৪ই জুলাই বিমল পালের ডাক পরে ঢালু সাব সেক্টরে। এখানে কোম্পানী কমান্ডার ছিলেন আলী হোসেন (হালুয়াঘাট), প্লাটুন কমান্ডার মোজাফফর হোসেন (ফুলবাড়িয়া), সেকশন কমান্ডার ফারুক আহমেদ (নাটক ঘর লেন)। 

গেরিলাযোদ্ধা বিমল পালের প্রথম সমর যুদ্ধ ছিল ১৭ জুলাই হালুয়াঘাটের নাগলা ব্রিজ ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে। এরপর বারমারি এটাক, নুন্নি সীমান্তে পাক বাহিনীর সাথে প্রতিরোধ যুদ্ধ গড়ে তুলেন। এরপর সবচেয়ে বড় যুদ্ধ ছিল ৩ নভেম্বর হালুয়াঘাটের তেলিখালি যুদ্ধ। এই যু্দ্ধে কোম্পানী কমান্ডার আবুল হাশেমের সাথে ১৩ রাজপুত রেজিমেন্ট যুক্ত ছিল। পাক সেনাদের শক্তিশালী ক্যাম্প ১ প্লাটুন ৩৪ পাঞ্জাব, ১ প্লাটুন ৭১ উইং রেঞ্জার সমান সংখ্যক রাজাকার আল বদর ছিল। যুদ্ধে ৮ জন মুক্তিযোদ্ধা ও ২১ জন ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সদস্য শহীদ হন। এর বিপরীতে একজন আত্মসমর্পণ করেন, আর বাকী সবাই প্রাণ হারায় এবং রাজাকার আলবদররা পালিয়ে যায়। পুরো তেলিখালী ক্যাম্প দখলে আসে মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে।

বিমল পাল জানান, মা মারা গেছেন স্বর্গবাসী হয়েছেন, কিন্তু মাকে মিথ্যা কথা বলে যুদ্ধে যাওয়ার সেই কথা আজও ভুলতে পারিনা। তিনি আরও বলেন, ৭১’এর সেই সব স্মৃতিকে ধারণ করে এখন শিশু কিশোরদের গল্প শুনিয়ে থাকি। এখন আমাকে সবাই মুক্তিযুদ্ধের ফেরিওয়ালা বলে ডাকে। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ভারতের শরনার্থী শিবিরগুলোতে তার পরিবারের সদস্যদের খুঁজেছেন। সেই সময় মা-বাবা কিংবা পরিবারের কারও সাথেই তার দেখা মিলেনি। বিমল পাল শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া মানুষের কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন। শরনার্থী শিশু ও বয়স্ক মানুষের কষ্টের স্মৃতি এখনও তিনি ভুলতে পারেন না।

বিমল পাল মিথ্যা বলে ভারতে গিয়ে গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে ফিরে এসে সন্মুখ যুদ্ধে অংশ নিয়েছেন। তবে তার বাবা-মা, ভাই, বোন ও ভগ্নিপতিসহ অনেকেই জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে ভারতে গিয়ে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়ে ছিলেন। বিমল পালের বড় ভাই অমল পাল (৭৫) জানান, ২০ এপ্রিল তারা পরিবারের সদস্যসহ সংখ্যালঘু পরিবারের ২৫ জনের মতো একটি দল ময়মনসিংহের বাসা ছেড়ে ফুলবাড়িযায় অবস্থান নেন। এখানে কিছু দিন থাকার পর অনেক কষ্টে অনেক পথ পাড়ি দিয়ে ভারতের শরনার্থী শিবিরে যাওয়ার পথে কিশোরগঞ্জের নিকলিতে মামার বাড়িতে আশ্রয় নেন। এখানে কিছু দিন অবস্থানের পর নৌকা করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে মিঠামইন হয়ে সিলেট সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতের মইলং শরনার্থী শিবিরে তারা আশ্রয় নিয়েছিলেন। শরনার্থী শিবিরে খাওয়া দাওয়ার কষ্টের সাথে চিকিৎসা সেবার সুয়োগ ছিল খুবই কম। শিবিরে কলেরা ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অসংখ্য শিশু ও বয়স্ক মানুষ মারা গেছেন দাবি করেছেন তিনি। পরে কলকাতার খাসিয়াহিল জেলার বালাহাটি শরনার্থী শিবিরেও তারা বেশ কিছু দিন অবস্থান করেন। এখানে পরিচিতদের মধ্যে অরবিন্দ সাহা ও বিকাশ গাঙ্গুলী পরিবারের সাথে দেখা হয়েছিল জানান অমল পাল। কলকাতাতেই তার বাবা মারা গিয়েছিলেন। পরে দেশ স্বাধীন হলে ২৪ জানুয়ারি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বিমল পালের পরিবার দেশে ফিরে আসেন। ময়মনসিংহ শহরের হরিকিশোর রায় রোডের বাসায় এসে দেখেন ঘরগুলো ভাঙ্গাচুড়া, রেখে যাওয়া মালামাল লুট হয়ে গেছে। বাড়িটিকে দেখে জনপ্রাণীহীন পরিত্যক্ত একটি বাড়ি বলে মনে হয়েছে দাবি করেছেন অমল পাল। 

যুদ্ধ বিধ্বস্ত ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি দেশকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে গড়ে তুলেছিলেন, তেমনি অমল পালের পরিবারটি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে জীবন সংসার শুরু করেছিলেন। শুধু বিমল কিংবা অমল পালই না, ঘর বাড়ি ছেড়ে ভারতের শরনার্থী শিবিরে আশ্রয় নেয়া এ দেশের প্রতিটি পরিবারেরই একই অবস্থা হয়েছিল স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে জানিয়েছেন অমল পাল।


বিডি


 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71