বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
রংপুর সহিংসতা: তাঁরা আছেন ‘তাঁহাদের’ পাহারায়
প্রকাশ: ১০:৫৪ am ৩০-১১-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৫৪ am ৩০-১১-২০১৭
 
গওহার নঈম ওয়ারা
 
 
 
 


একাত্তরেও তাদের কারও কারও বাড়ি পুড়েছিল; ঘরে আগুন লেগেছিল শুধু রাস্তার পাশে যাদের বসতি ছিল, তাদের দু-চারজনের। রংপুর সেনানিবাসে মুক্তিকামী মানুষের তির–ধনুক আর গাদাবন্দুক নিয়ে ব্যর্থ অভিযানের পর (২৮ মার্চ ১৯৭১) শহরের আশপাশের, বিশেষ করে রংপুর, সৈয়দপুরে সড়কের দুপাশের মানুষই ভয়ে সিটিয়ে ছিল; কী জানি কী হয়! অনেকে রাস্তার পাশের গ্রাম ছেড়ে সরে পড়েছিল গহিন গ্রামে। ২৮ মার্চ ঠিক কত মানুষের প্রাণ গিয়েছিল, কোনো দিনও তা জানা যাবে না। সেদিন আহত-নিহত ব্যক্তিদের লাশের ওপর বেয়নেট চার্জ করা হয়। তারপর পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়। সাঁওতাল, ওঁরাও আর বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানের রক্ত সেদিন একসঙ্গে মিশেছিল। এসব জানা আর পুরোনো কথা। বিড়বিড় করে বলে গেলেন ৮০ পেরিয়ে যাওয়া পরিমল বাবু (ছদ্মনাম)। বাড়ির সামনে একচিলতে বাগানে টুকটাক কাজ করছিলেন।

আমাদের কথা হচ্ছিল তঁার ছেলের সঙ্গে। ১৯৭১ সালে তঁাদের বাড়িটি ছিল রাস্তার ধারে। এপ্রিলের প্রথম কি দ্বিতীয় সপ্তাহে সেই বাড়ির একটা ঘর পুড়িয়ে দেয় দখলদার বাহিনী। গানপাউডার ছিটিয়ে লাগানো সেই সব আগুনে পুরো বাড়ি পুড়ত না। কখনো একটা ঘর, কখনো ঘরের অংশ। তাদের লক্ষ্য ছিল রাস্তার দুপাশ পরিষ্কার রাখা। কথা হচ্ছিল ১০ নভেম্বর শুক্রবার দুপুরে রংপুর সদর আর গঙ্গাচড়ার সংগমে অবস্থিত ঠাকুরপাড়া গ্রামের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া আর লুটপাটের ঘটনা নিয়ে। পুলিশের গুলিতে প্রাণ যায় একজনের, আহত হয় অনেকে। মানুষ হারায় ঘরবাড়ি, গরু-ছাগল আর বিশ্বাস। পরিমল বললেন, ‘কোনো দিন ভাবিনি স্বাধীন দেশেআবার আমাদের বাড়িতে দল বেঁধে কেউ কোনো দিন আগুন দেবে। বাবার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে ছেলে বললেন, ‘কদিন থেকেই আমাদের মন কেমন করছিল। অচেনা লোকদের ঘোরাফেরা ছিল আমাদের গ্রামে। মোটরসাইকেল নিয়ে ওরা ওদের বাড়ি (বলা বাহুল্য, ইঙ্গিত ছিল টিটো রায়দের 
বাড়ির প্রতি) চিনে গেছে বারকয়েক।’ শুক্রবারেরসময়সীমা নিয়েও তঁারা উদ্বিগ্ন ছিলেন, কী হয়! কী হয়!

পরিমলের ছেলেরাসহ বড় রাস্তার এপার-ওপার দুই পারের ঠাকুরপাড়ার লোকেরা সবাই বড় রাস্তায় (রংপুর-গঙ্গাচড়া সড়ক) উত্কণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শুক্রবার সকাল থেকে। পুলিশও ছিল সেখানে। আড়াইটা-তিনটার দিকে পুলিশ তাদের বলে বাড়ি চলে যেতে। সবাই একে একে বাড়ি চলে যায়। তারপরই কাতারে কাতারে মারমুখী মানুষ ছুটে আসে, পুলিশের সামনে দিয়ে তারা বিকল্প পথে গ্রামে ঢুকে প্রথমে আগুন দেয় চিনে যাওয়া বাড়িতে। তারপর চলতে থাকে ধ্বংসলীলা। একের পর এক বাড়ি পুড়তে থাকে। পুলিশ তখন নড়েচড়ে বসে কঁাদানে গ্যাস ও গুলি ছোড়ে। তাণ্ডব তখন ছড়িয়ে পড়ে রাস্তার ওপারের ঠাকুরপাড়ার অংশেও। সেখানেই ক্ষতিটা হয় বেশি। তাণ্ডবে ক্ষিপ্ত দুর্বৃত্তের দল ততক্ষণ লুটেরা দস্যুতে পরিণত হয়েছে। এ দেশে মাটি কামড়ে পড়ে থাকা গরিব অসহায় মানুষের গরু-বাছুর, হঁাস-মুরগি ছাড়া আর কীই–বা আছে? ঘরে আগুন দিয়ে সেগুলোই লুটে নিয়ে যায় তস্করের দল। পাকিস্তানিরা আগুন দিত। কোনো কোনো সময় তাদের ফেউ হিসেবে কতিপয় অবাঙালি এসে চালাত লুটপাট—খাসি, গরু, সোনাদানা। এখন শিকারি আর ফেউ এক হয়ে গেছে, যে আগুন দেয়, সে-ই লুট করে।

টিটোদের বাড়ি ছাড়িয়ে পাড়ার ভেতর দিয়ে হঁাটতে হঁাটতে রাস্তার ওপারে ঠাকুরপাড়ার আরেক অংশে গিয়ে দেখি গোপাল রায় (অন্য নাম) হাট থেকে কিনে আনা আমকাঠের একটি দরজা নিয়ে কসরত করছেন। একচালা ঘর প্রশাসনের লোকেরা এসে চটজলদি বানিয়ে দিয়েছেন। তাতে তিনি এখন দরজা লাগাবেন। তাণ্ডবের আগে তঁার একটা চারচালা ঘর ছিল। জানালা-দরজা সবই ছিল সেই ঘরে, এখন একটা বক্স ঘর পেয়েছেন। জানালা-দরজা তঁাকেই বসিয়ে নিতে হবে। চালের আর টিনের বেড়ার মধ্যে প্রায় এক হাত ফঁাক চারদিকেই। কী দিয়ে ঢাকবেন সেই ফঁাকা? রংপুরে এখন বেশ ঠান্ডা, রাতে কুয়াশা পড়ে। দুটি শিশুসন্তান নিয়ে এই ঠান্ডা ঘরেই তঁাদের রাত কাটাতে হচ্ছে। গোপাল মুখ ফুটে বলেই ফেলেন সাধক লালনের বচন, ‘উপায় কী বলো’।

গোপালের সঙ্গে ঘরের কাজে হাত লাগিয়েছেন স্ত্রী রাধা (অন্য নাম)। রাধার কথাবার্তা শুনে মনে হলো, তিনি বুঝি অন্য গ্রামের, অন্য পরিবেশের মেয়ে, বইপত্র পড়েছেন। নাম জানেন মহেশ–স্রষ্টা শরৎ চাটুজ্জের, খোঁজ রাখেন রামু, অভয়নগর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাঝেমধ্যে পত্রপত্রিকা পড়ে। তঁাদের উঠানে একটু দূরেই বসে ছিলেন আরও দুজন মানুষ, একজন বেশ বয়স্ক, অন্যজনের বয়স ২৫-৩০। রাধা তঁাদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন—তাঁদের বাড়ি নীলফামারীর কিশোরগঞ্জে। মাঠের রাস্তায় সাইকেলে ঘণ্টা দুয়েকের পথ। আগে খুব একটা আসতেন না, ঘটনার পর থেকে প্রায়ই আসেন তঁারা। রাধার বাপের বাড়ির লোক তাঁরা। ওই দিন তাঁরা ছুটে এসেছিলেন সন্ধ্যার একটু আগে মোবাইলে খবর পেয়ে। চাল-ডাল আর দুটি মুরগি নিয়ে।

হিন্দুদের ঘরবাড়ি লুটপাট হচ্ছে, আগুন দিয়ে ভিটেছাড়া করা হচ্ছে। সেই সংকটের মুখে কোন সাহসে তঁারা রাধাদের সাহায্যের জন্য ছুটে এসেছিলেন মুসলমানদের গ্রাম আর মাঠের মধ্য দিয়েই? এই প্রশ্নের উত্তরে যেন কেঁপে ওঠে আকাশ-বাতাস—মনে হয় একাত্তরের বাংলাদেশ এখনো বেঁচে আছে। হারিয়ে যায়নি সবটুকু। রাধার বাপের বাড়ির লোকেরা জানান, ঘটনা জানার পর উদ্যোগটা তঁাদের গ্রামের মুসলমানেরাই নেয়। মুরগি আর ডাল তাদেরই ছিল, চালটুকু ছিল শুধু গোপালের শ্বশুরবাড়ির। তঁারাও এসেছিলেন সেদিন একসঙ্গে তঁাদের গঁায়ের মেয়ে রাধার সংকটের কথা শুনে। এসব কথা কারও মুখে শোনা যায়নি বা ফেসবুকে কিংবা কাগজে ছাপা হয়নি। তবে কি রাধা বানিয়ে বলছেন? গল্প শোনাচ্ছেন? মনে হয় না। রাধার বক্তব্য আরও সত্যি হয়ে উঠল যখন তঁাদের উঠান থেকে সুবলদের (অন্য নাম) পোড়া গাছের নিচে নতুন ঘরের সামনে গিয়ে দঁাড়ালাম।

সুবলের মেয়ে কণিকা (অন্য নাম) পরম আদরে একটা বাছুরের গলা জড়িয়ে দঁাড়িয়ে আছে। তার চোখে জল, হাতে কঁাঠালপাতা। বাছুরটাও কেঁদেছিল সেদিন মনে হয়, তার চোখের নিচে জল বয়ে যাওয়ার কালো দাগ। মাত্র গতকাল সুবলদের সব কটি (মোট চারটা) গরু-বাছুর তারা ফেরত পেয়েছে। তস্কররা আগুন দিয়ে গরু–বাছুর লুট করে অন্য গ্রামের মধ্য দিয়ে পালানোর সময় গ্রামবাসী তাদের বাধা দেয়। মারমুখী তস্করদের ধাওয়া দিয়ে অনেকের কাছ থেকে লুটের মালামাল, গরু-বাছুর ছিনিয়ে নিয়ে খবর দেয় ঠাকুরপাড়ায়। গ্রামের মাতব্বর আর ইউপি সদস্যদের নিয়ে যার যার গরু-বাছুর শনাক্ত করে তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে ও হচ্ছে।

এটাও সম্ভব? বাংলাদেশের মানুষ এখনো যে হৃদয়ে অসাম্প্রদায়িক, তাদের হৃদয়ে এখনো একাত্তর জ্বলজ্বল করছে। ছিনিয়ে নেওয়া মালপত্র মারমুখী তস্করদের কাছ থেকে উদ্ধার করে তা আবার যথাযথ মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া অন্তরে মানবিকতা আর সততা না থাকলে সম্ভব কি? আমরা কি তস্করদের বিরুদ্ধে, জঙ্গিদের বিরুদ্ধে মানবিকতায় পরিপূর্ণ হৃদয়ের মানুষগুলোকে সামনে আনতে পারি না? যারা অন্ধকার রাতে চষা মাঠের মধ্য দিয়ে তাদের রাধা বোনদের জন্য ছুটে আসে। খালি হাতে মোকাবিলা করে দুর্বৃত্তদের। এদের সঙ্গে এদের নিয়ে কাজ করার সময় ফুরসত আমাদের মিলবে কি?

গওহার নঈম ওয়ারা: ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মী। শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71