বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক’
রবির আলোয় উদ্ভাসিত পঁচিশে বৈশাখ আজ
প্রকাশ: ০২:২৩ pm ০৮-০৫-২০১৬ হালনাগাদ: ০২:২৩ pm ০৮-০৫-২০১৬
 
 
 


অরুন শীল : আজ বিশ্বকবির ১৫৫তম রবীন্দ্রজয়ন্তী। রবির আলোয় উদ্ভাসিত পঁচিশে বৈশাখ। ১২৬৮ বঙ্গাব্দে এই দিনে তিনি কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। 

বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংগীতেরএই কিংবদন্তি পুরুষের জন্মদিন উদযাপন মানে বাঙালির আত্মপরিচয়ে প্রত্যয়দীপ্ত হওয়া। পঁচিশে বৈশাখে তাকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে সংস্কৃতিমনস্ক বিশ্ব-বাঙালি।১৯১৩ সালে নোবেল পুরস্কারের মতো গৌরবময় স্বীকৃতি অর্জনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষাকে বিশ্বসাহিত্যের আসনে অধিষ্ঠিত করেছেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ। তার অমর সৃষ্টি ‘আমার সোনার বাংলা’ আমাদের তথা স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত।ভারতের জাতীয় সংগীতেরও রচয়িতা তিনি। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বের দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে তার সাহিত্য কর্ম।

১৯১৩ সালে ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন রবি ঠাকুর। তার এ প্রাপ্তি বাংলা সাহিত্যকে বিরল গৌরব এনে দেয়। বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮ নাটক, ১৩ উপন্যাস ও ৩৬ প্রবন্ধ ও অন্য গদ্য সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও অপ্রকাশিত রচনা গ্রন্থাকারে ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্ররচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে।

রবীন্দ্রনাথের গদ্যভাষাও কাব্যিক। ভারতের ধ্রুপদী ও লৌকিক সংস্কৃতি এবং পাশ্চাত্য বিজ্ঞানচেতনা ও শিল্পদর্শন তার রচনায় গভীর প্রভাব বিস্তার করেছিল। কথাসাহিত্য ও প্রবন্ধের মাধ্যমে তিনি সমাজ, রাজনীতি ও রাষ্ট্রনীতি সম্পর্কে নিজ মতামত প্রকাশ করেছিলেন। সাহিত্যের পাশাপাশি রবীন্দ্রনাথের গান বাংলা সংগীত ভাণ্ডারকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। বিপুল ঐশ্বর্য নিয়ে টিকে আছে রবীন্দ্রসংগীত। এর আবেদন যেন কোনো দিন ফুরোবার নয়। বরং যত দিন যাচ্ছে ততই রবীন্দ্র গানের বাণী ও সুরের ইন্দ্রজালে নিজেকে জড়িয়ে নিচ্ছে বাঙালি। তিনিই আবার জীবনসায়াহ্নে লিখেছিলেন- ‘মোর নাম এই বলে খ্যাত হোক, আমি তোমাদেরই লোক।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ যখন ইহধাম ত্যাগ করেন সেদিন শোকার্ত বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম শ্রদ্ধা নিবেদন করে লিখেছিলেন,‘দুপুরের রবি পড়িয়াছে ঢলে অস্তপারে কোলে/ বাংলার কবি শ্যাম বাংলার হৃদয়ের ছবি তুমি চলে যাবে বলে/ শ্রাবণের মেঘ ছুটে এলো দলে দলে।’

বাংলা গদ্যের আধুনিকায়নের পথিকৃত রবিঠাকুর ছোটগল্পেরও জনক। গল্পে, উপন্যাসে, কবিতায়, প্রবন্ধে, নতুন নতুন সুরে ও বিচিত্র গানের বাণীতে, অসাধারণ সব দার্শনিক চিন্তাসমৃদ্ধ প্রবন্ধে, সমাজ ও রাষ্ট্রনীতিসংলগ্ন গভীর জীবনবাদী চিন্তাজাগানিয়া নিবন্ধে, এমনকি চিত্রকলায়ও রবীন্দ্রনাথ চিরনবীন-চির অমর।

তাঁর কবিতা, গান, সাহিত্যের অন্যান্য শাখার লেখনী মানুষকে আজও নতুনের অন্বেষণ পথে, উপলব্ধির পথে আকর্ষণ করে। রবীন্দ্রনাথ আজও আমাদের মনমানসিকতা গঠনের, চেতনার উন্মেষের প্রধান অবলম্বন। আমাদের জাতীয় সঙ্গীতের পাশাপাশি ‘বাংলাদেশ’ নামের বানানটিও আমরা রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে পেয়েছি। বাঙালি তথা বাংলাদেশীদের যাপিত জীবনাচরণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কবিতা ও গান অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। এখনও প্রতি বছর রমনা বটমূলে রবীন্দ্রনাথের গানে গানে পহেলা বৈশাখ উদযাপন আমাদের জাতীয় জীবনের অন্যতম অনুষঙ্গ। আমাদের জীবনের এমন কোনো বিষয় নেই, যেখানে আমরা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে পাই না। তার রচনাবলী আমাদের প্রেরণার শিখা হয়ে পথ দেখায়।

বাংলা সাহিত্যকে তিনি বিশ্বের দরবারে বিশেষ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করেছেন। ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে তিনি প্রথম এশীয় হিসেবে ১৯১৩ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। তিনিই একমাত্র কবি, যিনি বাংলাদেশ ও ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের রচয়িতা। শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীত তাঁর লেখা একটি কবিতার মূল সুর থেকেও উৎসারিত।

বাংলা সন ১২৬৮ সনের ২৫ বৈশাখ (১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে) কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি একাধারের কবি, নাট্যকার, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, গীতিকার,সুরকার, সঙ্গীত পরিচালক, ছোট গল্পকার ও ভাষাবিদ।

দীর্ঘ ৮০ বছরের জীবনে বাংলা সাহিত্যের সবক্ষেত্রে তিনি বিচরণ করেছেন। বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৫২টি কাব্যগ্রন্থ, ৩৮টি নাটক, ১৩টি উপন্যাস ও ৩৬টি প্রবন্ধ ও অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়েছে। তার সর্বমোট ৯৫টি ছোটগল্প ও ১৯১৫টি গান যথাক্রমে গল্পগুচ্ছ ও গীতবিতানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে।

হ্যাঁ, রবীন্দ্রনাথ আমাদেরই লোক!বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বাংলা সাহিত্যের এই নক্ষত্রের আদিপুরুষ ও স্বজনরা ছড়িয়ে আছে খুলনা জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে।রবি ঠাকুরের পূর্বপুরুষের আদি নিবাস খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ নামক গ্রামে। একথা ১৯৫২ সালের আগে কারও জানা ছিল না। এই পিঠাভোগ নামক গ্রামটি ঘাটভোগ ইউনিয়নভূক্ত। খুলনা শহর থেকে ৭ কি. মি. দক্ষিণে আলাইপুর সেতু পার হয়ে আধা কি.মি. পূর্বে ভৈরব নদের ৪শ’ ফুট উত্তরে কবিগুরুর পূর্বপুরুষের বসতভিটে পিঠাভোগের কুশারীবাড়ি। কুশারীরা ছিলেন ব্রাহ্মণ। তাদেরকে পীরালী ঠাকুর বলা হতো।কুশারীদের একাংশ এখনও পিঠাভোগ গ্রামে বসবাস করছে।

বিশ্বকবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর জমিদারির প্রয়োজনে হোক আর রক্তের টানেই হোক পিঠাভোগের কুশারীবাড়ির সাথে যোগাযোগ রাখতেন।পিঠাভোগ রবীন্দ্রনাথের আদি পুরুষের কারুকার্যময় সুদৃশ্য দ্বিতল ভবনের ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অস্তিত্ব ছিল।উল্লেখ্য, যশোর বৃটিশ ভারতের প্রথম ম্যাজিস্ট্রেসি জেলা। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে যশোর জেলার যাত্রা শুরু হয়। তখন রূপসার পিঠাভোগ গ্রামসহ এ অঞ্চল ছিল যশোর জেলার অধীনে।১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে খুলনা মহাকুমা তার ৪০ বছর পর ১৮৮২ সালে জেলা হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পিঠাভোগ ও ঘাটভোগ ভৈরব নদের তীরবর্তী প্রাচীন জনপদ। ভৈরব অববাহিকার স্রোতধারা ধরে যে সব জনপদ গড়ে ওঠে তারই অন্যতম প্রাচীন জনপদ পিঠাভোগ।ঐতিহাসিকদের তথ্য সূত্র অনুযায়ী, পীর খানজাহান আলী (রহ.) বাগেরহাটে আগমনের প্রায় কয়েক শ বছর আগে ভৈরব অববাহিকায় এই প্রাচীন জনপদ গড়ে ওঠে। ঐতিহাসিক যোগসূত্র কে পিঠাভোগ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষ কুশারীদের আর্বিভাব ও গোড়াপত্তন এবং প্রাচীন আদিবসতি বিন্যাসের চিত্র থেকে গ্রামটির প্রাচীনত্ব সম্পর্কে তথ্য মেলে।খ্রি. অষ্টম থেকে একাদশ শতকের মধ্যে আদিশুরের রাজস্বকারে বৌদ্ধ প্রভাবাচ্ছন্ন বঙ্গদেশে হিন্দু ধর্মের বিশুদ্ধতা ফিরিয়া আনতে এ প্রাধান্য বিস্তারের অভিপ্রায়ে কান্যকুঞ্জ থেকে যে পঞ্চ ব্রাহ্মণের আবির্ভাব ঘটে তাদের মধ্যে শাল্ল্যি গোত্রীর ক্ষিতিশ ছিলেন অন্যতম।

পিঠাভোগের কুশারীরা ও শাল্ল্যি গোত্রীয় ক্ষিতিশের বংশজাত ব্রাহ্মণের ধারাবাহিক উত্তর পুরুষ।দালিলিক প্রমাণের ভিত্তিকে পিঠাভোগের সন্তান খুলনার জন্মভূমি নামক স্থানীয় দৈনিকের সেই সময়ে কর্মরত রূপসা উপজেলা প্রতিনিধি অরুণ শীল (বর্তমানে জাতীয় অনলাইন সঙবাদপত্র এই বেলা ডটকমে রাজশাহীতে কর্মরত)কুশারীর বাড়ি রবী ঠাকুরের আদি সম্পর্কিত তথ্য দিয়ে দৈনিক ইত্তেফাকে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। ১৯৯৫ সালের মে মাসে ঐ প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদন থেকে পিঠাভোগ ও কুশারী বংশ সম্পর্কে অবহিত হয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় ও প্রত্মতত্ত্ব বিভাগ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য খুলনার সাবেক জেলা প্রশাসক মো: রিয়াজুল হককে দাপ্তরিক পত্র পাঠায়। জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হক, রূপসা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পি বি রায়, উপজেলা প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম পিঠাভোগের কুশারী বাড়ি পরিদর্শন করেন এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে প্রতিবেদন পাঠায়।কুশারী বাড়ির অট্টালিকা অক্ষত ছিল। অভাব অনটনের কারণে কবির বর্তমান বংশধরেরা সেই ভবনটি বিক্রি করে দেয়। খুলনার জেলা প্রশাসক কাজী রিয়াজুল হকের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় অর্থায়নে পিঠাভোগের গৌরন্দ্র কুশারী ও বরুন কুমার কুশারীর কাছ থেকে ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর ২৬ হাজার টাকা পোনে দশমিক ১৫ একর জমি রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালার পক্ষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ক্রয় করে।

ওই বছরের ২৪ নভেম্বর সরকারিভাবে পিঠাভোগ নির্মিত হয় রবি ঠাকুরের ভাস্কর্য ও রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা। এর পর রুপসার ঐ সময়ের নির্বাহী অফিসার রাহাত আনোয়ার (বর্তমানে রংপুরের জেলা প্রশাসক) শুরু করেন পিঠাভোগে ঘটা করে কবির জন্ম ও মৃত্যুবার্ষিকী।২০০৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ডঃ মসিউর রহমান পিঠাভোগ রবীন্দ্র স্মৃতি সংগ্রহশালা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে অন্তর্ভুক্তকরণসহ উন্নয়নের জন্য তথ্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রীর কাছে আবেদন করে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে কবির বাস্তুভিটা অনুসন্ধানে পরীক্ষামূলক প্রত্মতাত্ত্বিক খনন হয়। কবির পূর্ব পুরুষের বসত ভিটে সংরক্ষণের কোন পদক্ষেপ মন্ত্রণালয় গ্রহণ করেনি।কথিত রয়েছে ভট্ট নারায়ণের পুত্র দ্বীননাথ শাল্ল্যি গোত্রীয় শ্রেণীয় ব্রাহ্মণ মহারাজ্য ক্ষিতিশুরের অনুগ্রহে বর্ধমান জেলার ‘কুশ’ নামক গ্রামে দানস্বত্ব লাভ করে কুশারী গোত্রভুক্ত হন (বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস, ব্রাহ্মণ কাণ্ড, পৃ. ১২১) সেখান থেকে রবী ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের উপাধি কুশারী উদ্ভব হয়। (রবীন্দ্র জীবনী, ১ম খণ্ড, প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়)।কালক্রমে ঢাকা, ঠাকুড়া ও খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রামে কুশারীদের আবাসভূমি হিসেবে গড়ে ওঠে। দ্বীননাথ কুশারীর অক্ষম পুরুষ তারানাথ কুশারী ভৈরব তীরবর্তী পিঠাভোগ গ্রামে বসতি স্থাপন করেনে। তারানাথ কুশারীর দুই পুত্র রামগোপাল ও রামনাধ কুশারী। রামগোপালের পুত্র পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারীই ছিলেন ঠাকুর পরিবারের আদি পুরুষ।ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহি গ্রামের শুকদেব রায় চৌধুরীর কন্যার জন্য ব্রাহ্মণপাত্র পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রচুর অর্থ ব্যয় করে তিনি রূপসা থানার পিঠাভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারীর সঙ্গে মেয়ে বিয়ে দেন।জগন্নাথ কুশারী পীরালি ব্রাহ্মণ পরিণত হয়।ভিন্ন জাতের কন্যা বিয়ে করে জাতিচ্যুত হয়। শেষাবধি তাকে পিঠাভোগ ত্যাগ করে শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহিতে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে হয়। এভাবেই রবি ঠাকুরের দক্ষিণডিহির মাতৃকূল ও শ্বশুরকুলের রায় চৌধুরী বংশের সাথে কবির আদিপুরুষ পিঠাভোগের কুশারী বংশের প্রাচীনকালে আত্মীয়তার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সম্পর্কটি ষোড়শ শতাব্দীর কোন এক সময়ের।এই জগন্নাথ কুশারীর দ্বিতীয় পুত্র পুরুষোত্তম থেকেই ঠাকুর ধারা প্রবাহমান। জগন্নাথ কুশারীর পরবর্তী বংশধর পঞ্চানন কুশারী পারিবারিক মত পার্থক্যের কারণে দক্ষিণডিহি ত্যাগ করে। গঙ্গাঁ তীরে কালিঘাটে কলকাতা শহরে গোবিন্দপুর গ্রামে বসতি স্থাপন করেন। কলকাতায় শহরের গোবিন্দপুরে খুলনার পিঠাভোগ গ্রাম থেকে আগত পঞ্চানন কুশারীকে স্থানীয়রা ভক্তি ভরে গ্রহণ করে।ইংরেজরা তখন আজকের ঐতিহাসিক কলকাতা শহরের গোড়াপত্তন করে। স্থানীয়রা তাদের মুখপাত্র হিসেবে পঞ্চানন কুশারীকে ইংরেজদের সাথে প্রয়োজনীয় যোগাযোগ রাখতে অনুরোধ করে। কুশারীরা দিন ব্রাহ্মণ। স্থানীয় রুচিবান মানুষেরা ব্রাহ্মণ পঞ্চানন কুশারীকে সম্মান করে ঠাকুর বলে ডাকত। এভাবেই পিঠাভোগের কুশারী কলকাতায় ঠাকুর হিসেবে পরিচিতি পান।

এ সময়ে ভাগীরক্ষী নদীতে ইংরেজদের বাণিজ্য তরী ভীড়ত। সেই বাণিজ্য তরীর মাল ওঠানো এবং নামানোর ঠিকাদারী এবং খাদ্য সামগ্রী সরবরাহের ব্যবসা করেন পঞ্চানন কুশারী। এ কাজে নিম্নশ্রেণীর হিন্দুদের শ্রমিক ঐ শ্রমিকেরা পঞ্চানন কুশারীকে ঠাকুর বলে ডাকায় জাহাজের ক্যাপ্টেনদের কাছেও তিনি ঠাকুর বলে পরিচিত পান।তাদের কাগজপত্রে TAGORE বা TAGOURE লেখা দেখা যেত। এখান থেকে ঠাকুর উপাধির প্রচলন (রবীন্দ্র জীবনী ১ম/পৃ. ৩)।কলকাতার গোবিন্দপুর গ্রামের পঞ্চানন ঠাকুরের পরবর্তী বংশধর নীলমনি ঠাকুর অর্থ সম্পদের মালিক হয়ে জোড়া সাঁকোয় যেয়ে বসবাস শুরু করেন। জোড়া সাঁকোয় ঠাকুর বংশেই ১৮৬১ সালে জন্মগ্রহণ করেন বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র নোবেল বিজয়ী বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।পঞ্চানন ঠাকুরের দুই পুত জয়রাম ও রামসন্তোষ এবং শুকদেব এর একপুত্র কৃষ্ণচন্দ্র। এরা তিনজনেই ইংরেজ বণিকদের সহায়তায় ইংরেজি শেখেন এবং ফারসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় জরিপকাজ শুরু হলে জয়রাম ও রামসন্তোষ আমিন পদে নিযুক্ত হন। সে জন্যে খুলনার পৈত্রিক বাসভূমি পিঠাভোগ আমিনের ভিটা বলে খ্যাত। অবশ্য উত্তরপাড়া নরেন্দ্রপুরের আবাসনও আমিনের ভিটা বলে পরিচিত।আমিনের কাজ করে প্রভূত ধন সম্পদ অর্জন করেন এবং জয়রাম আমিন ঠাকুর কলকাতায় ধন সায়রে বাড়ি, জমাজমি ও গঙ্গাতীরে বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন। ১৭৫৬ খ্রিস্টাব্দে জয়রামের মৃত্যু হয়। এ প্রসঙ্গে স্মরণীয় জয়রাম ঠাকুরের বিয়ে হয় দক্ষিণডিহির রায় চৌধুরী বংশের পীরালি ব্রাহ্মণ কন্যা গঙ্গাদেবীর সাথে।সে অর্থে জয়রামের শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহি (রবীন্দ্র জীবনী ১ম/পৃ. ৪)।জয়রাম ঠাকুরের তিন পুত্র নীলমনি, দর্পনারায়ণ ও গোবিন্দরাম। জয়রামের মৃত্যুর পর নীলমনি ও দর্পনারায়ণ ধন সায়রের সম্পত্তি বিক্রি করে নগদ পাঁচ হাজার টাকা পান এবং পলাশীর যুদ্ধের পর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ছয় হাজার টাকা প্রাপ্ত হন এবং জয়রামের নগদ দুই হাজার টাকাসহ তারা মোট তেরো হাজার টাকার মালিক হন। পরে পাথুরেঘাটায় জমি ক্রয় করে তারা বসবাস শুরু করেন।নীলমনি এবং দর্পনারায়ন সাহেবদের সেক্রেটারীর কাজ শুরু করে প্রভূত ধন অর্জন করেন। অতঃপর জমিদারী কিনে জমিদার হন। নীলমনি এই অভিজাত্যের প্রতিষ্ঠাতা। কিছুদিনের মধ্যেই নীলমনি ও দর্পনারায়ণের মধ্যে সম্পদ নিয়ে মনোমালিন্য দেখা দেয়।নীলমনি পাথুরিয়া-ঘাটের সমস্ত সম্পত্তি এক লক্ষ টাকার বিনিময়ে দর্পনারায়ণকে ছেড়ে দিয়ে জোড়াসাঁকোয় এসে আবাস গড়ে তোলেন। নীলমনি থেকেই কুশারী পরিবর্তিত ঠাকুর বংশের নিজস্ব ধারা প্রবাহিত। নীলমনি তার পুত্র কন্যাদের মধ্যে কন্যাদের বিয়ে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ঘরে দিলেও, পুত্রদের বিয়ে দিয়ে ছিলেন খুলনার পীরালি বংশে।(পীরালী বংশ; বিশ্বকোষ ১১/পৃঃ ৪৮৫)। নীলমনির মৃত্যুর পর ঠাকুর পরিবারের প্রধান রামলোচন ধণাঢ্য ও বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হন।রামলোচনের কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি ভ্রাতা রামমনির পুত্র দ্বারকানাথকে দত্তক পুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। রামলোচনের যখন মৃত্যু হয় তখন দ্বারকানাথের বয়স মাত্র বারো-তেরো বছর। এ সময়ে রামমণি জীবিত থাকলেও যাবতীয় ভূ-সম্পত্তি দেখাশোনা করতেন রামলোচনের স্ত্রী নরেন্দ্রপুরের মেয়ে অলকাদেবী।অলকাদেবী দ্বারকানাথের সাথে স্বীয় গ্রামের কন্যা দিগম্বরী দেবীর বিয়ে দেন।(পীরালী বংশ; বিশ্বকোষ ১১/পৃ.৪৮৫)। দ্বারকানাথ ইংরেজি ভাষা ভালোভাবে শিখেছিলেন। এ কারণে ইংরেজদের সহায়তা তিনি লাভ করেন। যৌবনেই তিনি ব্যবসা শুরু করেন, প্রথমে রেশম ও নীল ক্রয়ের ব্যবসা রাহিমপুরে থাকলেও তিনি ২৪ পরগনার কালেক্টর ও লবণ অধ্যক্ষের দেওয়ান পদে নিযুক্ত হন।ইংরেজদের সহচর্যে তিনি ব্যাংক প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত  করেন। ১৮৩৩ খ্রিস্টাব্দে দ্বারকানাথ ঠাকুর কোম্পানী নামে কুঠিস্থাপন করেন, শিলাইদহ ও অন্যান্য নীলকুঠিও কিনে নেন। রানীগঞ্জে কয়লার খনি ও রামনগরে চিনির কারখানা ইজারা নিয়ে পরিচালনা, তার অন্যান্য প্রতিভার বৈশিষ্ট্য। দ্বারকানাথ এই সময় জমিদারি ক্রয় করেন। নাটোরের জমিদারি তার অধীনে চলে আসে।

সুদূর উড়িষ্যা পর্যন্ত দ্বারকানাথের জমিদারি বিস্তৃত হয়। প্রথম বাঙালি দ্বারকানাথ সামাজিক সব বাধা অতিক্রম করে বিলেতে যান। প্রথম জীবনে নিষ্ঠাবান থাকলে তিনি ঐশ্বর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে সংস্কার ত্যাগ করেন। বিলাত থেকে ফিরে কারও ধর্মবিশ্বাসে আঘাত না লাগে সেজন্যে বাড়ির বাইরে বৈঠকখানায় বাস করতেন।তিনি দ্বিতীয়বার বিলেতে যান। বিলেতে যে ঐশ্বর্যের মধ্যে তিনি কাটাতেন সে কারণে তার নাম হয় প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর।দ্বারকানাশের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ। পিতার স্বেচ্ছাচারিতা পুত্রকে স্পর্শ না করে তাই দ্বিগম্বরী দেবী পুত্রকে স্বীয় আদর্শে গড়ে তুলেছিলেন। দেবেন্দ্রনাথ তার জীবনের ধর্ম নিষ্ঠা জননীর নিকট থেকে গ্রহণ করেছিলেন।(মহর্ষির আত্মজীবনী/পরিশিষ্ট পৃ. ২৯৮)।দ্বারকানাথের পুত্রদের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ দীর্ঘ জীবনের অধিকারী। দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুত্র শৈশবে মারা যায়। চতুর্থ পত্র অকালপ্রয়াত হয়। দ্বারকানাথের বৈভবের মধ্যে দেবেন্দ্রনাথ মানুষ হলেও তাকে বৈভবদোষ স্পর্শ করেনি। দেবেন্দ্রনাথের বারো বছর বয়সে খুলনা দক্ষিণডিহির রামনারায়ণ রায় চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীর সাথে বিয়ে দেখা হয়। তখন তার বয়স ছয়-সাত বছর।সারদা দেবীর গর্ভে দেবেন্দ্রনাথের পনেরোটি সন্তান জন্মগ্রহণ করে। সারদা দেবীই রবীন্দ্রনাথের জননী। দেবেন্দ্রনাথ রাজা রামমোহনের ব্রাহ্ম ধর্মের প্রতি আকৃষ্ট হন এবং নিজেকে ব্রাহ্ম ধর্মের উন্নয়নে ব্রতী করেন। তাকে তাই মহর্ষি নামে সম্মানিত করা হয়েছিল।

দেবেন্দ্রনাথ ব্রাহ্মধর্মে আগ্রহী হয়ে উঠলেও হিন্দু ধর্মের পর্ব ও উৎসব বাড়ি থেকে দূর করতে পারেননি। পিঠাভোগ ও দক্ষিণডিহির আচার অনুষ্ঠান ঠাকুর পরিবারে প্রচলিত ছিল (খগেন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়কৃত “রবীন্দ্র কথা” গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।)দেবেন্দ্রনাথের পুত্রদের মধ্যে দ্বিজেন্দ্রনাথ, সত্যেন্দ্রনাথ, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ প্রমুখ স্বনামে খ্যাত।এদের ছোট ভাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথের বাইশ বছর বয়সে বিয়ে হয় দক্ষিণডিহির বেনীমাধব রায় চৌধুরীর কন্যা ভবতারিণী ওরফ মৃনালিনী দেবীর সাথে। অতএব পিতৃকুল মাতৃকুল এবং শ্বশুর কুলের সুবাদে রবীন্দ্রনাথের সাথে খুলনার রূপসা থানার পিঠাভোগ গ্রামের কুশারী বাড়ি এবং ফুলতলা থানার দক্ষিণডিহির রায় চৌধুরী বাড়ি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথ মাতুলালয় দেখবার জন্যে তথা তার বিয়ের মেয়ে দেখবার জন্য ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণডিহিতে আসেন। (রবীন্দ্রজীবনী ১ম/পৃ. ১৯২)। কিন্তু পিতৃপুরুষ কুশারী বংশের ভিটায় আসেননি কোনদিন। প্রশান্ত কুমার পালের রবিজীবনী গ্রন্থ থেকে একটি সূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। কবির বন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিত তখন খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট। তিনি বারে বারে কবিকে খুলনায় আসা জন্যে আহ্বান জানাচ্ছিলেন।  এমতাবস্থায় ১৩০৭ বঙ্গাব্দের ২৮ শ্রাবণ ১৯০০ খ্রিস্টাব্দের ১২ আগষ্ট রবীন্দ্রনাথ প্রিয়নাথ সেনকে চিঠি লিখেছিলেন: “আমি পুণ্যতোয়া পদ্মার দিকে মুখ করে ডাকযোগে তোমার গা ছুঁয়ে বলতে পারি যে তুমি যদি এস তা’হলে আমি খুলনায় যাইনে কিন্তু এই হপ্তার মধ্যে তুমি যদি না এস-তাহলে যদি আমি না যাই ত আমার নাম নেই...। (চিঠিপত্র ৮/১১৮ পত্র ১২০) প্রিয়নাশ যেন আসেননি।কাজেই ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি রবীন্দ্রনাথই খুলনায় গেছেন। (রবিজীবনী ৪র্থ খন্ড পৃঃ ২৯২)। রবীন্দ্রনাথ কবে খুলনায় এসেছিলেন, তার তারিখ নির্ণয় করা শক্ত। তবে তার ক্যাশ বহিতে ১৫ ভাদ্র শুক্রবার ৩১ আগষ্ট এর হিসাব মোতাবেক জানা যায় ‘শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রবাবু মহাশয়ের খুলনায় যাতায়াতের ব্যয় ১৬ টাকা।এর আগে ১০ ভাদ্র, ১৩ ভাদ্র, ১৬ ভাদ্র ও ১৮ ভাদ্র তারিখ তার একাধিক পত্র লেখার খবর পাওয়া যায়। সুতরাং অনুমান করা যায়, রবীন্দ্রনাথ ১৩ ভাদ্র খুলনায় গিয়ে ১৫ বা ১৬ ভাদ্র কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। তার কয়েকদিন পর ২০ ভাদ্র তিনি রাধাকিশোর মাণিক্যকে লিখেছেন: “সম্প্রতি লোকেন্দ্র পালিতের নিমন্ত্রণে খুলনায় গিয়াছিলাম। সেই জন্য মহারাজের প্রীতিপূর্ণ পত্র বিলম্বে পাইয়াছি।(রবিজীবনী ৪র্থ খন্ড/প্রশান্ত কুমার পাল ১৩৯৫ পৃঃ ২৯৩)।এমন শোনা যায়, এ সময়ে রবীন্দ্রনাথের আগমনে তার শ্বশুরবাড়ি দক্ষিণডিহিতে তাকে নেবার জন্য বেজেরডাঙ্গা স্টেশনকে সজ্জিত করা হয়েছিল এবং পালকি প্রস্তুত ছিল। তবে তিনি দক্ষিণডিহি গিয়েছিলেন কিনা তেমন কোন তথ্য উদ্ধার করা যায় না। কিন্তু হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় জানিয়েছেন-রবীন্দ্রনাথ লোকেন পালিতের কাছে পিঠাভোগ গ্রাম সম্পর্কে জানতে চেয়েছিলেন।(রবীন্দ্রনাথের কথা/হরিচরণ বন্দোপাধ্যায় দ্রষ্টব্য) তবে সেখানে যাবার কোনো আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন কিনা তা অজ্ঞাত। রবীন্দ্রনাথ আরো একবার খুলনায় এসেছিলেন ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে।একটি মামলায় স্বাক্ষ্য দিতে। (রবিজীবনী ৬ খন্ড/প্রশান্ত কুমার পাল-পৃ. ৩৪) ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দের ৩১ জুলাই খুলনার সেনহাটি স্কুলের শিক্ষক হীরালাল সেনগুপ্ত প্রণীত ‘হুঙ্কার’ নামে ২৪ পৃষ্ঠার একটি গীতিপুস্তিকা প্রকাশিত হয়। বেঙ্গল লাইব্রেরীর ক্যাটালগ অনুসারে এই বইটির প্রকাশকাল ৩১ জুলাই হলেও একই বছরের আষাঢ় অর্থাৎ জুন মাসের প্রবাসী পত্রিকায় পুস্তকটির সমালোচনা প্রকাশিত হয়।“ইহাতে গ্রন্থকার রচিত কতগুলি গানের প্রারম্ভে বঙ্কিমচন্দ্রের “বন্দেমাতরম” ও অবশেষে রবীন্দ্রনাথের “বাংলার মাটি বাংলার জল” সংযোজিত হইয়াছে। গ্রন্থকারের স্বরচিত গানগুলিতে কবিত্ব চিন্তা ও দেশপ্রীতি আছে।” (প্রবাসী আষাঢ ১৩১৫-পৃ. ১৬৮) এই দেশপ্রীতির কারণে ইংরেজ সরকার গ্রন্থটি বাজেয়াপ্ত করে এবং লেখককে গ্রেফতার করে। লেখকের বাড়ি তল্লাসি করে পুলিশ রবীন্দ্রনাথের একটি চিঠি পায় এবং এই চিঠির কারণেই রবীন্দ্রনাথ এই মামলার সাথে জড়িয়ে পড়েন।এ সম্পর্কে হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন-বইটি কবির নামে উৎসর্গ করা হয়েছিল, কবি তা জানতেন না। বইটি কবির হাতে পড়ার পর তিনি জানতে পারেন। অতঃপর কবি গ্রন্থকারকে একটি চিঠি লেখেন-তাতে কোনো উত্তেজনার প্রশ্রয় ছিল না। স্থির ধীর হয়ে দেশের কাজ করার উপদেশই ছিল।চিঠির ভাবটা এরকম ছিল-ঘরে আগুন লাগিয়ে তামাশা দেখা বুদ্ধিমানের কাজ নয়। সেই চিঠির কারণে খুলনার ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট থেকে কবিকে আহ্বান জানানো হয়। (রবীন্দ্রনাথের কথা/হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় পৃ. ২৮)। এই মামলায় রবীন্দ্রনাথকে জড়ানোর চেষ্টা করা হয়।

খুলনা আদালতের এক বৃদ্ধ উকিলের কাছে শোনা বিবরণ অবলম্বনে কালীপদ রায়ের ‘খুলনার ফৌজদারী আদালতের একটি স্বদেশী মামলায় ভারত সরকারের পক্ষে সাক্ষী রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক প্রবন্ধ (লালমাঠি/পৌষ ১৩৮৫) থেকে উপাত্ত সংগ্রহ করে চিন্ময় সেহানবীশ লিখেছেন: ‘উকিল মশায় কালীপদ রায়কে বলেছিলেন তাঁরা শুনেছিলেন ছোট লাট-এন্ড্রু ফ্রেজারের নাকি গোডায় মতলব ছিল-রবীন্দ্রনাথকেও হরিলাল সেনের সঙ্গে আসামি করে মামলা রুজু করা। কিন্তু সরকার পক্ষের আইনজীবীরা যখন জানালেন যে রবীন্দ্রনাথের বিরুদ্ধে অভিযোগ টেকানো যাবে না বরঞ্চ গোটা মামলাই ফেঁসে যেতে পারে, তার ফলে হীরালাল সেনের বিরুদ্ধে মামলা সরকার তরফের প্রধান সাক্ষী হিসেবে রবীন্দ্রনাথকে ডাকার সিদ্ধান্ত করা হয়।’ (রবীন্দ্রনাথ ও বিপ্লবী সমাজ/চিন্ময় সেহানবীশ ১৩৯২, পৃ. ২৭- ২৮) রবীন্দ্রনাথ একথা জানতেন, বোধ করি তাই রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে লেখেন মকদ্দমায় সাক্ষ্য দিবার জন্য আমাকে খুলনায় টানিয়া লইয়া যাইতে পারে পুলিশের নিকট এইরূপ শুনিয়াছি।

(দেশ/সাহিত্য সংখ্যা-১৩৮৫ পৃ. ১৩/পত্র ১৬) যথারীতি সরকারি সমন আসার পর রবীন্দ্রনাথ ১৬ অগ্রহায়ণ- ১৩১৫ শান্তিনিকেতন থেকে কলকাতায় আসেন এবং ১৮ অগ্রহায়ণ বৃহস্পতিবার খুলনায় রওয়ানা করেন।রবীন্দ্রনাথের ক্যাশবহির হিসাবে আছে: শ্রীযুক্ত বাবু মশায়-১৮ অগ্রহায়ণ খুলনায় গমন করার গমনাগমনের ব্যয়...।(রবিজীবনী ৬ খন্ড-পৃ. ৩৪) পরের দিন ১৯ অগ্রহায়ণ-৪ ডিসেম্বর ১৯০৮ শুক্রবার খুলনার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলাটি ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর আদালতে হাজির ছিলেন। (The Amrita Bayar Patrika. ১৯০৮)।রবীন্দ্রনাথের সাক্ষ্য মোটেই সরকারের পক্ষে যানি। কেননা তিনি নাকি বলেছিলেন ‘স্বাধীনতাকামী তরুণের পক্ষে উত্তেজক কবিতা বা গান লেখা আদৌ অস্বাভাবিক নয়। ওকালতি তার পেশা নয়-সুতরাং কবিতা বা গান কী পরিমাণ উত্তেজক হলে সেটা আইনগত দন্ডীয় হবে সেটা তার জানা নাই।  (প্রাগুক্ত/চিন্ময়-সেহানবীশ-পৃ. ২৮) পরেরদিন আদালত বসলে লঘুপাপে হয় গুরু দন্ড-হীরালাল সেনের ১৮ মাস কারাদন্ড হয়। কোথাও কোথাও ছয় মাসের কথা উল্লিখিত হলেও সে তথ্য সঠিক প্রতীয়মান হয় না। রবীন্দ্রনাথ রায় দানের জন্যে অপেক্ষা করেননি। ২১ অগ্রহায়ণ রবিবার ৬ ডিসেম্বর কলকাতায় ফিরে যান, শান্তিনিকেতনে যান পরের দিন।হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ‘কবি এখানে এসে বললেন, হীরালালের কারাবাসের ব্যবস্থা করে এলাম। মুক্তির পর এখানে আসতে বলেছি। (প্রাগুরু/হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায় পৃ. ২৮) কারামুক্তির পর রবীন্দ্রনাথ হীরালালকে শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয়ে নিয়োগ করেন, ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে। অতঃপর ১৯১২ তে ইংরেজ সরকারের তাড়নায় তাঁকে জমিদারির কাজে সরিয়ে নেন। খুলনায় এমন একটি জনশ্রুতি আছে, এ সময়ে রবীন্দ্রনাথের সাথে তার চাকর এসেছিলেন উমাচরণ।উমাচরণের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ পিঠাভোগ গ্রামের দূরত্ব এবং যাতায়াত ব্যবস্থার খোঁজখবর করেছিলেন। তবে এ তথ্যের কোনো জোরালো সমর্থন পাওয়া যায় না।

কেননা রবীন্দ্রনাথ মাত্র একদিন খুলনায় অবস্থান করেছিলেন-কোথায় ছিলেন তারও কোনো তথ্য উদঘাটন করা দুরুহ। তবে পিতৃপুরুষের আদি নিবাস সম্পর্কে কৌতুহল প্রকাশ করে থাকবেন কালীপদ রায়ের প্রবন্ধ থেকে এমন অনুমান করলেও করা যায়।(লালমাটি-পৌষ-১৩৮৫)এ সূত্রে প্রতীয়মান হয় রবীন্দ্রনাথ একদা যেমন নিজেকে পরিচিত করেছিলেন দ্বারকানাথ ঠাকুরের নাতি বলে, তেমনি হয়ত সঙ্গোপনে নিজেকে পিঠাভোগ গ্রামের জগন্নাথ কুশারীর উত্তরাধিকারী বলেও দাবি করেছিলেন। সুতরাং রবীন্দ্রনাথের সাথে পিঠাভোগ গ্রামের সম্পর্ককে বিচ্ছিন্ন বা অহেতুক বলে উড়িয়ে দেয়ার যৌক্তিকতা আছে বলে বিবেচিত হয় না। ১৯৫২ সালে কলিকাতার বাঙ্গী নাট্য সংস্থা ‘কুশারী পরিবার নামে’ একটি নাটক মঞ্চস্থ করে। যে নাটকের কাহিনীতে পিঠাভোগের কুশারীদের সমাজপতন পীরালী শাখা ভুক্ত হওয়া এবং তারপরবর্তী কাহিনী উপস্থাপন করা হয়। কুশারীরা রবীন্দ্রনাথের আদি পুরুষ এর তার সাক্ষ্য বহন করে। পিঠাভোগ জগন্নাথ কুশারী অধঃস্থন ঠাকুর পরিবারের রবীন্দ্রনাথ আর কোন বংশের সীমানায় সীমাবদ্ধ নয়।রবী ঠাকুরের পূর্ব পুরুষের বাসভুমি খুলনার রূপসা উপজেলার পিঠভোগ গ্রামের ঐতিহ্যের পটভুমি এ কথায় অবচেতন মনেও স্মরণ করতে হয়। সুন্দরবনের ইতিহাস (পৃষ্ঠা. ৩৩৭) এ উল্লেখ আছে ‘খুলনা জেলার আলাইপুরে পূর্ব দিকে পিঠাভোগে কুশারীদের পূর্ব নিবাস ছিল। পিঠাভোগের কুশারীগণ রায় চৌধুরীদের সহিত আত্মীয়তা করিয়া পীরালী হন’।একই ইতিহাসে (পৃষ্ঠা. ৩৩৮) উল্লেখ আছে রবি ঠাকুর যে খুলনা জেলায় পিঠাভোগের কুশারী বংশভূত উহারই সমর্থনে কয়েক বছর পূর্বে কলিকাতায় দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। খুলনা জেলার ইতিহাসে বলা হয়েছে পিঠাভোগ আলাইপুর সংলগ্ন একটি গ্রাম।  কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্ব পুরুষ কুশারীদের আদি বাস ছিল এই গ্রামে।অধ্যাপক সতিশ মিত্র রচিত যশোর-খুলনার ইতিহাস-এ (পৃষ্ঠা. ৩৪০-৩৪১) “ঠাকুর বংশের পূর্ব পুরুষ পঞ্চানন কুশারী খুলনা জেলার পিঠাভোগ গ্রাম পরিত্যক্ত করিয়া কালিঘাটের সন্নিকটে গোবিন্দপুরে আসিয়া বাস করেন। সে সময় গোবিন্দপুরে জেলে, মালো, কৈবর্ত্ত প্রভৃতি জাতির বাস ছিল। তাহারা নবাগত ব্রাক্ষ্মকে ঠাকুর বলিয়া ডাকিতেন।তদবধি পঞ্চানন ও তাহার বংশীয়গণের ঠাকুর উপাধি সর্বজনীন বিদিত হয়ে যায়। শুধু এ বংশের নহে আরও অনেক বংশে এরূপ ঠাকুর উপাধি ছিল। কুশারী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদি বংশ। এই বংশের প্রথম পুরুষ রামগোপাল কুশারী।প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশের খুলনা অঞ্চলে কবির পূর্ব পুরুষের নিবাস। এখানেই আবার তার শ্বশুরবাড়ি।খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার পিঠাভোগ গ্রাম কুশারীদের স্থায়ী ঠিকানা।

আর ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহিতে তার শ্বশুরবাড়ি। কুশারীদের আদি বাড়ি কেমন ছিল, পাকা না কাঁচা এখনও তা উদঘাটিত হয়নি।তবে পিঠাভোগে ব্রিটিশ আমলে একটি পাকা দালান উঠেছিল। সে বাড়িটিও ১৯৯৫ সালে কুশারীদের বর্তমান বংশধরেরা বিক্রি করে দেয়। সেটা আবার এক ব্যবসায়ী কিনে ভেঙে গুঁড়িয়ে, কড়ি, বরগা, জানালা, দরজা বিক্রি করে প্রচুর টাকা অর্জন করেন। রামগোপাল কুশারী স্বীয় বংশের প্রতিষ্ঠাতা।কবি রবীন্দ্রনাথ তার ১৩তম অধস্তন পুরুষ।রামগোপাল কুশারীর ৭৩তম অধস্তন পুরুষের এক ধারা থেকে যায় পিঠাভোগে। আরেক ধারা স্থিত হয় কলকাতায়। কলকাতার কুশারীরা কালক্রমে পরিচিত হয় ঠাকুর নামে। রবীন্দ্রনাথ রামগোপালের ১৩তম অধস্তন পুরুষ। রামগোপাল কুশারীর পুত্র জগন্নাথ কুশারী। তার অধস্তন পুরষেরা যথাক্রমে পুরুষোত্তম, বলরাম, হরিহর ও মহেশ্বর। মহেশ্বর কুশারীর দুই সন্তান-পঞ্চানন, প্রিয়নাথ। দুই ভাইয়ের মধ্যে বনিবনা হয়নি। পঞ্চাননকে বাড়ি এবং পৈতৃক গ্রাম ত্যাগ করতে হয়েছিল।

তিনি কলকাতায় আশ্রয় গ্রহণ করেন। তথ্য সূত্র যশোর-খুলনা অঞ্চলের ইতিহাসবিষয়ক নির্ভরযোগ্য গ্রন্থ সতীশ চন্দ্র মিত্র প্রণীত ‘যশোহর-খুলনার ইতিহাস’ পয়োগ্রাম কসবা অধ্যায়ের বিশ্বকোষের পীরালিবিষয়ক অংশ এবং টিডব্লিউ ফ্যারেলের ‘দি টেগোর ফ্যামিলি’ শীর্ষক গ্রন্থে কবির বংশ পরিচয়ের বিস্তৃত বিবরণ আছে। আছে যশোর-খুলনা অঞ্চলের স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত গ্রন্থ, সংকলন এবং আরও অন্যান্য বইপত্রে।এসব বই থেকে আহরিত তথ্য নির্যাস, যা প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরে সংরক্ষিত রয়েছে তাতে বলা হয়, রবীন্দ্র পরিবারের পূর্ব পুরুষ পঞ্চানন কুশারী পৈতৃক বাড়িঘর ছেড়ে কলকাতা চলে যান। কুশারী ইস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71