সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯
সোমবার, ৩রা আষাঢ় ১৪২৬
 
 
রবীন্দ্রনাথের ১০ রসিকতা
প্রকাশ: ০৫:২৭ am ১৮-০৩-২০১৫ হালনাগাদ: ০৫:২৭ am ১৮-০৩-২০১৫
 
 
 


এক.

সুনয়নী তাঁর রবিকাকাকে নাতনি (শিবানী) ও নাতজামাই দেখাতে নিয়ে এসেছেন। কবি তখন বাঁকুড়ায়। সন্ধ্যায় গানের আসর বসল। শিবানী গান গাইলেন। গান শুনে কবি খুশী হলেন। এরপর প্রতিদিনই শিবানী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পায়ের কাছে গিয়ে বসতেন।

প্রদৌহিত্রী হিসেবে শিবানীর সাহস এবং কৌতূহল একটু বেশিই ছিল। একদিন বলেই ফেললেন, আচ্ছা দাদাভাই, আপনি কখনও প্রেমে পড়েছেন?

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর হেসে বললেন, হ্যাঁ গো নাতনি, তবে তা শুধু পড়াই হয়েছিল, ওঠা আর হয়ে ওঠেনি।

*শিবানী : কবির কাকা গিরীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছোট ছেলে গুণেন্দ্রনাথের কন্যা সুনয়নীর নাতনী

 

দুই.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মেয়ে দেখতে গিয়েছেন। দুটি অল্পবয়সী মেয়ে এসে বসল। একটি সাদাসিধে, জড়ভরতের মত এক কোণে বসে রইল। আর একটি যেমন সুন্দরী, তেমনি চটপটে। চমৎকার তার স্মার্টনেস। একটু জড়তা নেই। বিশুদ্ধ ইংরেজি উচ্চারণ। ভালো পিয়ানো বাজাল। এরপর মিউজিক নিয়ে আলোচনাও হলো। রবীন্দ্রনাথ মুগ্ধ হয়ে ভাবলেন, এবার পেলে হয়!

এমন সময় বাড়ির কর্তা এলেন। তিনি ঘরে ঢুকেই সুন্দরী মেয়েটিকে দেখিয়ে বললেন, এই হলো আমার স্ত্রী এবং জড়ভরতটিকে দেখিয়ে বললেন, এই আমার মেয়ে।

অনেক পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যখন জানতে পারলেন সেই মেয়েটি বিয়ের দু’বছর পর বিধবা হয়েছে, তখন তিনি রসিকতা করে বলেছিলেন, যাক ভালোই হয়েছে, কারণ স্ত্রী বিধবা হলে আবার প্রাণ রাখা শক্ত।

 

তিন.

একবার মৈত্রেয়ী দেবী গুরুদেবের কাছে বিয়ের গল্প শুনতে চাইলে তিনি বললেন, আমার বিয়ের কোন গল্প নেই। আমার বিয়ে যা-তা করে হয়েছিল। বৌঠানেরা বিয়ের জন্য জোরাজোরি শুরু করলে আমি বললাম, তোমাদের যা ইচ্ছা কর। আমার কোন মতামত নেই। … আমি কোথাও যেতে পারব না।

শুনে মৈত্রেয়ী দেবী অবাক হয়ে বললেন, কেন আপনি বিয়ে করতেও যান নি?

কবিগুরু ততধিক অবাক কণ্ঠে উত্তর দিলেন, কেন যাব? আমার একটা মান সম্মান আছে না?

উল্লেখ্য যে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে কনের পিত্রালয়ে নয় জোড়াসাঁকোতেই হয়েছিল।

 

চার.

কবিগুরুর বিয়ের জন্য প্রথম দিকে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বেশ ঘটা করেই। শেষ পর্যন্ত গুরুজনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বিয়ে হলো ঠাকুর স্টেটের কর্মচারী বেণীমাধব রায়ের বড় মেয়ে ভবতারিণী দেবীর সঙ্গে।

বিয়ের বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর দুষ্টুমি করতে লাগলেন। ভাঁড় খেলার সময় ভাঁড়গুলো উপুড় করে দিতে লাগলেন। ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী* বলে উঠলেন, ও কি করিস রবি? এই বুঝি তোর ভাঁড় খেলা? ভাঁড়গুলো সব উলটেপালটে দিচ্ছিস কেন?

রবীন্দ্রনাথ বললেন, জানো না কাকিমা, সব যে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমি ভাঁড়গুলো উলটে দিচ্ছি।

*ত্রিপুরাসুন্দরী দেবী : কবির ছোট কাকিমা

* ১২৯০ সালের ২৪শে অগ্রহায়ণ কবির বিয়ে হয়। কবির বয়স তখন বাইশ বছর

 

পাঁচ.

শান্তিনিকেতনে প্রতিদিন সন্ধ্যায় কবির পায়ে তেল মালিশ করা হতো। একদিন কবির দুই নাতনি গীতা ও দীপ্তি* সেই দাবি নিয়ে কবির কাছে হাজির হলেন। কিন্তু কবির এতে বেজায় আপত্তি। রসিকতা করে বললেন, তোরা সব আধুনিকার দল, আধুনিকারা যে কারুর পা টিপতে চায় তা জানতুম না। তাছাড়া তোদের সব শৌখিন পোশাক, যদি তেল লেগে যায়? তখন কাপড় হয়তো এদেশে কাচাতেই পারবি না, হয়তো আবার কাপড় কাচতে প্যারিস পাঠাতে হবে।

নিষেধ সত্ত্বেও দীপ্তি কবির হাত ধরতেই কবি বললেন, পাণি-পীড়ন তাহলে করবেই? তা কর। তারপর দীপ্তি যখন পা টিপতে শুরু করলেন তখন কবি বললেন, ওঃ এইবার পা নিপীড়ন করবে।

*গীতা ও দীপ্তি : দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বড় মেয়ে সরোজাসুন্দরী দেবীর ছোট দুই মেয়ে

 

ছয়.

বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সক্রিয় ছিলেন। ফলে তিনি মোটেই সময় করে উঠতে পারতেন না। তারপরও নাটোরের মহারাজার মেয়ের বিয়ের নিমন্ত্রণ এড়াতে পারলেন না।

মহারাজা স্বয়ং বিয়ের দিন সন্ধ্যায় দ্বারে দাঁড়িয়ে নিমন্ত্রিতদের অভ্যর্থনা করছিলেন। একটু তাড়াহুড়ো করেই কবি সেখানে উপস্থিত হলেন। কারণ আসতে দেরি হয়ে গেছে। মহারাজা কবিগুরুকে দেখেই অনুযোগ করে বললেন, আমার কন্যাদায়, কোথায় আপনি সকাল-সকাল আসবেন, তা না এসে এলেন দেরিতে।

কবি বললেন, রাজন, আমারও যে মাতৃদায়, দু’জায়গায় সভা করে আসতে হলো।

 

সাত.

একবার দোলপূর্ণিমার দিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে কবি ও নাট্যকার দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের দেখা হয়ে গেল।  পরস্পর নমস্কার বিনিময়ের পর হঠাৎ দ্বিজেন্দ্রলাল রায় জামার পকেট থেকে আবির বের করে কবিগুরুকে বেশ করে রাঙিয়ে দিলেন।

রঞ্জিত রবীন্দ্রনাথ রাগ না করে বরং সহাস্যে বলে উঠলেন, এত দিন জানতাম দ্বিজেন বাবু হাসির গান ও নাটক লিখে সকলের মনোরঞ্জন করে থাকেন। আজ দেখছি শুধু মনোরঞ্জন নয়, দেহরঞ্জনেও তিনি একজন ওস্তাদ।

 

আট.

শান্তিনিকেতনের জন্য টাকা প্রয়োজন। উপস্থিত অনেকেই গুরুদেবকে বিভিন্ন ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। সবার চোখে-মুখে উৎকণ্ঠা। হঠাৎ গুরুদেব বলে উঠলেন, আহা তোমরা এত ভাবছ কেন? টাকা পাবার একটা অতি সহজ উপায় আছে।

সবাই কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলেন, কী সে উপায়?

গুরুদেব এবার রানী চন্দকে আড়চোখে একবার দেখে নিয়ে সবার দিকে ফিরে বললেন, মাত্র সোয়া পাঁচ আনা খরচ।

আসল ঘটনা হলো, রানী চন্দ একবার খুব আগ্রহ নিয়ে গুরুদেবকে মঙ্গলচণ্ডীর ব্রতের কথা বলেছিলেন। বাংলাদেশে এর প্রচলন রয়েছে। তিনি আরও বলেছিলেন, এই ব্রত করলে নির্ধনেরও ধন হয়। এবং খরচও বেশি নয়, মাত্র সোয়া পাঁচ আনা।

সেই থেকে গুরুদেব যখনই আশ্রমের জন্য অর্থ কষ্টে পড়তেন তখনই ঠাট্টা করে বলতেন, তা নন্দলাল, ভাবছ কেন এত? মাত্র তো সোয়া পাঁচ আনার মামলা।

 

নয়.

গুরুদেবের চোখের সমস্যা দেখা দিয়েছে। রানী চন্দ চোখের ড্রপটা আনতেই তিনি চেয়ারে মাথা উপরের দিকে হেলিয়ে দিতে দিতে বললেন, এসেছ তুমি আমার অশ্রুপাত করাতে। আমার চোখের জল ফেলিয়ে তুমি কী সুখ পাও, বলো দেখি।

চোখে ওষুধের ফোঁটা পড়তেই তিনি শিউরে উঠলেন। তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে বললেন, চমক লাগিয়ে দেয় গো, চমক লাগিয়ে দেয়।

বেশ কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে রানী চন্দের দিকে তাকিয়ে বললেন, রূপে নয়, ওষুধের জ্বালায়।

 

দশ.

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ফটোগ্রাফ। সেখানে কবির মুখে আলো-ছায়ার খেলা। ফটোগ্রাফটি হাতে নিয়ে কবি গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, আমার এই ফটোটায় ওরা কেউ কেউ বলে রোদ্দুর পড়ে এমনি হয়েছে। তাই কি! আমি বলি ও আমার জ্যোতি ফুটে বেরোচ্ছে মুখ দিয়ে। এ কি আর সবার ছবিতে হয়।

কবির কথা শুনে সেক্রেটারি* গর্বের সঙ্গে জানালেন, জানেন আমার ফটো তুলে শম্ভুবাবু বিদেশে কম্পিটিশনে প্রাইজ পেয়েছেন।

গুরুদেব এবার চোখ কপালে তুলে আশ্চর্য হয়ে বললেন, বটে! এটা প্রাইজ না হোক, আমার কাছে সারপ্রাইজ তো বটেই!
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71