শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
রমা চৌধুরীর স্বপ্ন বৃথা যেতে পারে না
প্রকাশ: ০৭:৩৪ pm ২২-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:৩৪ pm ২২-০৬-২০১৭
 
 
 


সান মাহামুদ : ‘মুক্তিযুদ্ধ আমার কাঁধে ঝোলা দিয়েছে। আমার খালি পা, দুঃসহ একাকীত্ব মুক্তিযুদ্ধেরই অবদান।

আমার ভিতর অনেক জ্বালা, অনেক দুঃখ। আমি মুখে বলতে না পারি, কালি দিয়ে লিখে যাব। আমি নিজেই একাত্তরের জননী।।’

কথাগুলো ‘একাত্তরের জননী’ হিসেবে সমধিক পরিচিত, সাহিত্যিক-লেখিকা ৭৬ বছর বয়সী রমা চৌধুরীর। যাকে মাস্টারদা সূর্যসেন, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বিপ্লবী বিনোদবিহারী চৌধুরীদের উত্তরাধিকারী বললে অত্যুক্তি হবে না। বাংলাদেশ সৃষ্টির লগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত তার কাছে আমরা জাতীয়ভাবে ক্রমাগত হেরেই গেছি। আজন্ম-সংগ্রামী মানুষটি এখন জীবনের পড়ন্ত বেলায় এসে পৌঁছেছেন। ব্যক্তিগত মতাদর্শ অনুসারে, তিনি এখনও রাষ্ট্রের কাছ থেকে, অন্য কারো কাছ থেকে সাহায্য নিবেন না। কিন্তু, আমাদের নিজেদের বিবেকের কাছে অসহায় আত্মসমর্পন কখনোই কাম্য নয়!

রমা চৌধুরী। জীবনযুদ্ধে হার না মানা এক নারীর নাম। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারান তিনি। শত বাধা পেরিয়ে মা মোতিময়ী চৌধুরীর প্রেরণায় পড়াশোনা চালিয়ে যান। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন রমা চৌধুরী। তিনিই ঢাবি থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রথম নারী। মাত্র ২০ বছর বয়সে কক্সবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। ১৬ বছর শিক্ষকতার পর শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। সেই যুদ্ধ তাকে ঠেলে দেয় নতুন সংগ্রামের পথে। একাত্তরে তিনি হারিয়েছেন সম্ভ্রম। হারিয়েছেন দুই সন্তান। তাকে রেখে দেশান্তরি হয়েছেন স্বামীও। তবু দমে যাননি রমা। লেখালেখিকে পেশা হিসেবে নিয়ে চালিয়ে গেছেন জীবনযুদ্ধ।|

প্রবন্ধ, উপন্যাস ও কবিতা মিলিয়ে রমা চৌধুরীর লেখা ১৮টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তিনি নিজের বই নিজেই ফেরি করে বিক্রি করেন। এ থেকে হওয়া আয় দিয়েই তার থাকা-খাওয়ার সংস্থান হয়। একই সঙ্গে পরিচালনা করছেন ‘দীপংকর স্মৃতি অনাথালয়’ নামে একটি অনাথ আশ্রম।

দুঃখের সঙ্গে জীবন কাটলেও তার দু’চোখে একটি সুখসমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন। গতবছর তিনি পেয়েছিলেন কীর্তিমতী সম্মাননা।  স্কয়ারের ওই অনুষ্ঠানে আমারও থাকার সৌভাগ্য হয়েছিল। আমরা এই মহীয়সী নারীর কাছে জানতে চেয়েছিলাম, তার স্বপ্ন সর্ম্পকে। তখন তিনি বলেছিলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় একটি করে অনাথ আশ্রম খুলতে চান তিনি। তার ইচ্ছা, ‘সব ধর্মের অনাথরা থাকবে সেখানে। সেখান থেকে দীক্ষা নিয়ে তারা প্রবেশ করবে কর্মজীবনে।’ এতো আশ্রম তৈরি করার অর্থ কিভাবে হবে? আমরা এটাও জানতে চেয়েছিলাম উনার কাছে। তিনি আমাদের বলেছিলেন, ‘আমি লিখি, আমার বই বিক্রি করে ওই টাকা দিয়েই আশ্রম গড়বো।’

সঞ্জীব চৌধুরী গেয়েছিলেন, ‘আর একজন কর্নেল তাহের পৃথিবীর সমান বয়সী স্বপ্ন নিয়ে আলিঙ্গন করেন ফাঁসির রজ্জু!’ রমা চৌধুরীর কথাগুলো যেন ঠিক সে রকমই। তারও সাহস, স্বপ্ন এবং হৃদয় যেন পৃথিবীসমান।

এই পৃথিবীসমান হৃদয়ের মানুষটি যখন অর্থের অভাবে হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য হন, তখন আমরা বিবেকের কাছে অপরাধীই হয়ে পড়ি।

১০ দিন ধরে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন এই একাত্তরের জননী। সোমবার বিকালে তার পরিজনরা তাকে বাসায় নিয়ে আসেন। তার দেখভালের দায়িত্বে থাকা প্রকাশক আলাউদ্দিন খোকন যোগাযোগ করা কিছু গণমাধ্যমকে জানান, ১০ জুন তার প্রচণ্ড বুক ও পেটে ব্যথা শুরু হয়, সাথে বমিও হয়। এসময় তাকে নগরীর মেডিক্যাল সেন্টার হাসপাতালের সিসিইউতে ভর্তি করা হয়। কৃত্রিমভাবে খাবার দেওয়া হচ্ছিল। তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিত্সা দরকার। কিন্তু অর্থাভাবে হাসপাতাল থেকে নিয়ে আসতে হয়েছে। গত দশ দিনে দেড় লাখ টাকা বিল হয়েছে।

কিন্তু রমা চৌধুরীকে বাংলাদেশ যেভাবে চিনে, তিনি কখনোই কারো সাহায্য নিবেন না। তাই বলে আমাদের কি কোনো দায়িত্ব নেই? ২০১৩ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই একাত্তরের জননীকে একবার গণভবনে ডেকে নিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী তাকে আধাঘন্টা একান্ত সময় দিয়েছিলেন। কিন্তু রমা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর কাছে তখনো কিছু চাননি। বরং নিজের লেখা বই প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দিয়ে এসেছিলেন।




২০১৩ সালে গণভবনে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে রমা চৌধুরী


‘দু’জনই সব হারিয়েছেন৷ একজন একাত্তরে, আরেকজন পঁচাত্তরের ১৫ আগষ্টে৷ বীরাঙ্গনা রমা চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা৷ তাদের দেখা হয়েছে শনিবার, গণভবনে৷ তারা দু’জনে একান্তে কথা বলেছেন৷ ভাগ করে নিয়েছেন বেদনার গল্প৷’

রমা চৌধুরী একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে সব হারিয়েছেন৷ পাকিস্তানি হায়েনারা একাত্তরে তাঁর সন্তান, ভিটেমাটি, সম্ভ্রম সব কেড়ে নিয়েছে৷ আর তখন তিনি ছিলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক৷ চট্টগ্রামের প্রথম নারী এমএ রমা চৌধুরী ১৯৬২ সাল থেকে ১৬ বছর শিক্ষকতা করেছেন৷ আর গত ২০ বছর ধরে লেখালেখি করে কাটিয়েছেন৷ কিন্তু একাত্তরে সব হারানো এই নারী যেন পথকেই তার ঠিকানা করে নিয়েছেন৷ নিজের লেখনীর মাধ্যমে একক সংগ্রামে দেশের মানুষের কাছে স্বাধীনতার বাণী পৌঁছে দেওয়ার উদ্দেশ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। চট্টগ্রামের রাস্তায় বই ফেরি করে তার জীবন চলে৷ মুক্তিযুদ্ধের দুঃসহ স্মৃতি নিয়ে তিনি লিখেছেন ‘একাত্তরের জননী’।

২০ বছর ধরে লেখাবৃত্তিকে পেশা হিসেবে নিয়েছেন রমা চৌধুরী। যদিও তাঁর লেখাবৃত্তির পেশা একেবারেই স্বনির্বাচিত ও স্বতন্ত্র। তিনি প্রথমে একটি পাক্ষিক পত্রিকায় লিখতেন। বিনিময়ে সম্মানীর বদলে পত্রিকার ৫০টি কপি পেতেন। সেই পত্রিকা বিক্রি করেই চলত তাঁর জীবন-জীবিকা। পরে নিজেই নিজের লেখা বই প্রকাশ করে বই ফেরি করতে শুরু করেন। সেই পেশা এখনো বর্তমান।

চট্টগ্রাম শহরের রাস্তায় পথ চলতে গিয়ে হয়তো কারো চোখে পড়েছে- কাঁধে বইয়ের ঝোলা নিয়ে খালি পায়ে হেঁটে যাচ্ছেন এক আপাতবৃদ্ধা। মধ্যাহ্নের কাঠফাঁটা রোদ, তীব্র, ভ্যাপসা গরম। আগুনের মত তপ্ত পিচ ঢালা রাজপথে তার খালি পায়ে হেঁটে যাওয়া দেখে থমকে যেতে হয় পথিককে। তিনি রমা চৌধুরী, একাত্তরের বীরাঙ্গনা, মুক্তিযুদ্ধের ঝাপটায় ঘরবাড়ি, নিজের সৃষ্টি সর্বোপরি দু’সন্তান হারানো বিপর্যস্ত জীবন সংগ্রামী।

একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধে অগণিত মা, বোন সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন, রমা চৌধুরী তাঁদেরই একজন। শুধু সম্ভ্রমই হারাননি তিনি, এরপর থেকে সামাজিক গঞ্জনা সয়ে আর কখনোই মাথা তুলেও দাঁড়াতে পারেননি। সেদিন যাঁরা শহিদ হয়েছিলেন, তাঁদের তালিকায় হয়ত তাঁর দু’সন্তানের নাম যুক্ত হয়নি। কিন্তু রমা চৌধুরীর কাছে তারা মুক্তিযুদ্ধের বলি।

রমা চৌধুরীর এই দুঃসহ জীবন এবং সংগ্রামের কথা সংবাদ মাধ্যম ছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ওই সময়ে ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়৷ আর তা নজরে আসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার৷ আর তিনি দায়িত্ব দেন তাঁর বিশেষ সহকারী (মিডিয়া) মাহবুবুল হক শাকিলকে (মাত্রই কয়েক মাস হলো তিনি মারা গেছেন)৷ শাকিল ভাই রমা চৌধুরীর প্রকাশকের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন৷ রমা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গণভবনে দেখা করতে আসেন খালি পায়ে৷ ২ সন্তানকে হারানোর পর থেকে রমা চৌধুরী আর পায়ে জুতা বা স্যান্ডেল পড়েন না৷ চলাফেরা করেন নগ্ন পায়ে। রমা চৌধুরীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী একান্তে আধাঘণ্টা কথা বলেন৷ পরবর্তীতে শাকিল ভাই গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, তারা একান্তে কথা বলার সময় তাদের জীবনের সংগ্রাম আর কষ্টের কথা বলেছেন৷ এসময় রমা তাঁর লেখা বই ‘একাত্তরের জননী’ প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন৷ প্রধানমন্ত্রী রমা চৌধুরীর আত্মসম্মান দেখে মুগ্ধ হয়েছেন৷ তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে কোন সহায়তা চাননি৷’

তবে রমা চৌধুরী প্রধানমন্ত্রীকেও অনাথ আশ্রম গড়ার স্বপ্নের কথা বলেছিলেন। আরো বলেছিলেন, সেই স্বপ্ন তিনি পুরণ করতে চান ফেরি করে বই বিক্রির টাকায়৷ কিন্তু এখন তিনি মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এই সময়ে অন্তত রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে সারাজীবন দেশের জন্য বিসর্জন দিয়ে যাওয়া মানুষটির জন্য কিছু করা।  

চট্টগ্রাম নগরীর জামালখান মোমিন রোডে লুসাই ভবনের একটি কক্ষে রমা বসবাস করছেন ১৬ বছর ধরে। রাষ্ট্র বলতে গেলে এতোদিন ধরে তার সাথে অবিচারই করেছে। একজন ‘একাত্তরের জননী’ কখনোই এভাবে বঞ্চিতের কাতারে থাকতে পারেন না।

তার এখন চিকিৎসা অব্যাহত রাখার প্রয়োজন। প্রয়োজন টাকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিষয়টির দায়িত্ব নিবেন, আমরা আশা করছি। সঙ্গে এও অনুরোধ করতে পারি, অন্তত রমা চৌধুরীর অসংখ্য নিঃশেষ হয়ে যাওয়া স্বপ্নের মধ্যে ‘অনাথ আশ্রম’ গড়ার স্বপ্নটাও যেন সরকার পূরণ করে। কারণ রমা চৌধুরীরা স্বপ্ন দেখতেও ভয় পায়। কিন্তু ভালবাসা থেকে বিশাল হৃদয়ের মধ্য থেকে স্বপ্ন চলে আসে। সেই স্বপ্ন পূরণের দায়িত্ব আমাদের উপরও চলে আসে। রমা চৌধুরীর স্বপ্নের অপূর্ণতা মানে বাংলাদেশেরই অপূর্ণতা।

একজন রমা চৌধুরীর কাছে আমাদের হাজারো ঋণ। মহান মানুষরা কখনো ঋণ শোধের অবসর দেয় না। কিন্তু সাধারণের তা যেছে নিতে হয়। risingbd.

লেখক: সাংবাদিক।

(মতামত লেখকের নিজস্ব)

এইবেলাডটকম /আরডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71