বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
বুধবার, ২৮শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
রহস্যময় সম্প্রদায় ইয়াজিদি
প্রকাশ: ০৫:৫৪ pm ২৪-১১-২০১৫ হালনাগাদ: ০৫:৫৪ pm ২৪-১১-২০১৫
 
 
 


অদিতি সরকার : ইয়াজিদি বা এজিদি হচ্ছে একটি কুর্দি নৃ-ধর্মীয় গোষ্ঠী, যাদের রীতিনীতির সাথে জরথুস্ত্র ধর্মমতের সাদৃশ্য রয়েছে। ইয়াজিদিগণ প্রধানত উত্তর ইরাকেরনিনেভেহ প্রদেশে বসবাস করে। আমেরিকা। জর্জিয়া এবং সিরিয়াইয় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ইয়াজিদিদের সাক্ষাৎ মেলে। ১৯৯০ সালের দিকে ইয়াজিদিদের একটা অংশ ইউরোপে বিশেষ করে জার্মানীতে অভিবাসিত হয়। ইয়াজিদিগণ বিশ্বাস করেন, ঈশ্বর পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি সাতটি পবিত্র জিনিস বা ফেরেশতার মাঝে এটাকে স্থাপন করেছেন। এই সাতজনের প্রধান হচ্ছেন মেলেক তাউস, ময়ুর ফেরেশতা। ইয়াজিদিদের বর্ণিত তাউসের সাথে ইসলামধর্মে বর্ণিত শয়তানের সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এমনকি স্বর্গ থেকে শয়তান ও মেলেক তাউসের বিতাড়নের কাহিনী একই, আদমকে সিজদা না করা।



ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের উদ্ভব :

ইয়াজিদি (Yazidi or Yezidi, Azidi or Izdi) সম্প্রদায়ের উদ্ভব শেখ আদি ইবনে মুসাফির (Sheikh‘Adī ibn Musāfir)এর মাধ্যমে। এই আদি, বর্তমান লেবাননের বা’কা উপত্যাকায় (Beqaa Valley) ১০৭০ সনে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উমাইয়া খলিফা মারওয়ান বিন আল-হাকামের একজন উত্তরসূরী। তিনি বালবেকের নিকটস্থ বৈৎ ফার (Bait Far) গ্রামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। সেখানে তার জন্মগ্রহণ করা গৃহটি আজও রয়েছে, আর তা এখন ইয়াজিদিগণের পবিত্র তীর্থস্থান হিসেবে বিবেচিত। ইয়াজিদিগণ আদিকে “তাউস মালেক” বা ময়ূর ফেরেস্তার একজন অবতার বা দেবতা হিসেবেই বিবেচনা করে। ইরাকের লালিশে অবস্থিত তার সমাধিটি ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের প্রধান তীর্থস্থান।



ইয়াজিদিরা একেশ্বরবাদী। তাদের সর্বোচ্চ দেবতার নাম ইয়াজদান। যিনি সাতটি মহাত্মার উৎস এবং এর মধ্যে প্রধান মালিক টাউস। জরথুস্ত্রবাদের রীতি অনুসারে মালিক টাউসকে তারা ময়ূরদূত বা প্রধান দূত হিসেবে চিহ্নিত করে। ইসলাম এবং খ্রিস্ট ধর্মানুসারে ও তাদের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থের বিবরণে মালিক টাউস হলো ইবলিশ শয়তান।




Tawûsê Melek বা ময়ূর ফেরেস্তা (Peacock Angel)-কে কেন্দ্র করে ইয়াজিদি ধর্মবিশ্বাস গড়ে উঠেছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে এলাকায় এই ময়ূর ফেরেস্তার উপাসনা করা হয়, সেখানে কিন্তু এই ময়ূর স্থানীয় নয়। যাইহোক, এই ময়ূর ফেরেস্তা আর কেউ নন, স্বয়ং আযাজিল বা ইবলিস। ইয়াজিদি বিশ্বাসের ভিত্তি Black Book “Kitêba Cilwe” বা “Book of Illumination”-কে মালেক তাউসের বাণী বলে বিশ্বাস করা হয়। ঐ কিতাবে বলা হয়েছে- “I was present when Adam was living in Paradise, and also when Nimrod threw Abraham in fire.”




ইয়াজিদি সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা : এ সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা হলো আমির ইবরাহিম বিন হরব বিন খালেদ বিন ইয়াজিদ। উমাইয়া রাজত্বের পতনের পর হিজরি ১৩২ সনে উত্তর ইরাকে সে একটি দল গঠন করে। উদ্দেশ্য ছিল উমাইয়া রাজত্ব পুনরুদ্ধার করে ইয়াজিদের বংশধরদের ক্ষমতায় বসানো। তারা এ আন্দোলনের জন্য কুর্দি অঞ্চলকে বেছে নেয়।



ইয়াজিদ এর ধর্ম :

এদের ধর্মের বিষয়টাও রহস্যে ঘেরা। এরা মূলত একেশ্বরবাদি। তবে ইসলাম, খ্রিস্টান, ইহুদি এবং জরথ্রুস্টবাদসহ মোটামোটি সব ধর্মের ওপর শ্রদ্ধাশীল। কিন্তু ধর্মীয় আচারগুলোতে তাদের নিজস্ব কিছু পদ্ধতি রয়েছে। ইয়াজিদিদের বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তা বিশ্বকে সৃষ্টি করার পর সাতটি দূতের হাতে এর দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এদের মধ্যে প্রধান দূতের নাম মালিক তাউস। দিনে পাঁচবার এরা মালিক তাউসের উপাসনা করে। সারা পৃথিবীতে ইয়াজিদি ধর্মবিশ্বাসের প্রায় সাত লাখ মানুষ রয়েছে। তবে এদের সিংহভাগের বসবাস উত্তর ইরাকে। ঐতিহাসিকভাবে জরাথ্র“স্ট, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মের কাছে অগ্রহণযোগ্য ইয়াজিদিরা নৃতাত্ত্বিকভাবে ইরাকের কুর্দিশ সম্প্রদায়ভুক্ত। বহুবছর ধরে চাপ, নিপীড়ন ও হুমকির মধ্যে তারা সিনজার পর্বতের আশপাশে বাস করে আসছেন। 
ইয়াজিদি ধর্মের প্রধান কেন্দ্র শেখ আদির সমাধিকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে এবং বাৎসরিক উৎসব উৎযাপিত হয় এই সমাধিস্থলেই। আদির এই সমাধিটি মসূলের উত্তরে, Ash-Shaykh ‘Adi শহরের প্রাক্তন নেস্তোরিয়ান খৃষ্টান আশ্রমে অবস্থিত। আরবীতে লিখিত দু’টি পুস্তিকা, Kitab al-jilwah (“Book of Revelation”) ও  Mashaf rash (“Black Book”), ইয়াজিদিগণের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ। আর শেখ আদিকে প্রশংসা করে লিখিত আরবী স্ববগানও (Arabic hymn) সম্মানের সাথে পঠিত হয়।

তারা তামা দিয়ে ইবলিস (তাউসুল মালায়িকা) এর প্রতিকৃতি বানিয়ে সম্মান করে ও তাওয়াফ করে। তাদের পবিত্রতম স্থান হলো ইরাকের লালেশ উপত্যকায় অবস্থিত মারজাহ নামক স্থান। তাদের ধর্মগ্রন্থের নাম রশ বা কিতাবুল আসওয়াদ (কালো গ্রন্থ)। তাদের কালেমা হলো_ 'আশহাদু ওয়াহিদাল্লাহ, সুলতান ইয়াজিদ হাবিবুল্লাহ।' অর্থাৎ 'সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহর একত্বের ও রাজা ইয়াজিদ আল্লাহর বন্ধু।'

ইয়াজিদি বিশ্বাস মতে, খোদা বিশ্ব সৃষ্টির পর তা সাত পবিত্র আত্মা বা ফেরেস্তার তত্ত্বাবধানে ছেড়ে দেন। এই সপ্তকের মধ্যে প্রধান ছিলেন তাউস মালেক বা ময়ূর ফেরেস্তা। এই তাউস মালেককে মুসলিম এবং খৃষ্টানগণ শয়তান হিসেবেই চিহ্নিত করে থাকেন। অন্যদিকে ইয়াজিদিগণ বিশ্বাস করে, তিনি অমঙ্গল বা wickedness -এর উৎস নন। তারা তাকে পতিত ফেরেস্তা নয়, বরং ফেরেস্তাগণের নেতা হিসেবে বিবেচনা করে। এমনকি “শয়তান” শব্দ উচ্চারণ এবং বলা তাদের জন্যে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তারা এমন ধারণা পোষণ করে যে, মানুষের নিজের হৃদয় এবং আত্মার মধ্যেই অমঙ্গলের উৎস, তাউস মালেকের মধ্যে নয়। এই ধর্মের মূল চালিকা শক্তি তাউস মালেক ও শেখ আদি।


ইয়াজিদিদের আবাসভূমি ও জনসংখ্যা :

সারা বিশ্বে তাদের জনসংখ্যা হলো প্রায় ৫ লাখ। এদের প্রায় দেড় লাখ বসবাস করে ইরাকে। অন্যরা সিরিয়া, তুরস্ক, লেবানন, ইরান, রাশিয়া, জার্মানি, বেলজিয়াম ও আর্মেনিয়ায় বসবাস করছে। তাদের অধিকাংশই জাতিগত কুর্দি হলেও কিছু আরব জাতিগোষ্ঠীর মানুষও আছে। তাদের ভাষা হলো কুর্দি। এটাকে তারা তাদের ধর্মীয় ভাষা বলে বিশ্বাস করে। বাগদাদে রশিদ মহাসড়কে তাদের কেন্দ্রীয় অফিস রয়েছে। অফিসের নাম হলো আল-মাকতাব আল-উমুভি



নারীদের বিষয়ে কঠোর :

ইয়াজিদিদের মধ্যে নারীদের বিষয়ে নেতিবাচক কিছু বিষয় রয়েছে। এরা পরিবারের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য নারীদেরকে হত্যা করে। আর বিশেষ করে কোনো ইয়াজিদি মেয়ে যদি অন্য কোনো সম্প্রদায়ের ছেলেকে বিয়ে করে, তবে তাকে পাথর মেরে হত্যা করা হয়। -

আরো কিছু আচার:

এ সম্প্রদায়ে নতুন কোনো শিশুর জন্ম হলে তাকে পানিতে ডুবিয়ে পবিত্র করা হয়। প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে তিন দিন রোজা রাখে। তবে আশ্চর্য্যের ব্যাপার হলো রোজা শেষে এরা ধর্মীয় গুরুর সাথে মদ পান করে।
প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ১৫ থেকে ২০ তারিখে এরা ইরাকের মসুল শহরের লালেশ এলাকার মন্দিরের সামনের নদীতে ওজু করে।
এদের পুরুষদের মুসলমান ও খ্রিস্টানদের মতো খতনা করানো হয়। এমনকি পশুও কোরবানি করে।



এইবেলা ডটকম
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71