রবিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৯
রবিবার, ৮ই বৈশাখ ১৪২৬
সর্বশেষ
 
 
রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি পাননি টঙ্ক আন্দোলনের কিংবদন্তী কুমুদিনী হাজং
প্রকাশ: ০৪:৫১ pm ০৬-০২-২০১৯ হালনাগাদ: ০৪:৫১ pm ০৬-০২-২০১৯
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


‘শরীর ভালো না। বয়স হয়েছে। এখন একদম দুর্বল হয়ে গেছে। তবুও হাঁটতে চায় কাজ করতে চায়।’

রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি পাননি টঙ্ক আন্দোলনের সংগ্রামী মুখ সর্বশেষ জীবিত কিংবদন্তী কুমুদিনী হাজংয়। বৃটিশ শাসন আমলের শেষ সময়ে কৃষকদের গড়ে তোলা কয়েকটি বড় আন্দোলনের একটি হলো টঙ্ক আন্দোলন। যা সারা ভারতবর্ষকে নাড়া দিয়েছিলো। 

পুরস্কার, সন্মনা পদক বলতে যা আছে তে হলো কয়েকটি সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠন ও পত্রিকার পক্ষ থেকে দেয়া সন্মানা স্মারক!

কথায় কথায় অর্জুন হাজং জানালেন মা বাবার সেই সংগ্রামের ইতিহাসও তার খুব একটা ‘চর্চা’ নেই। জীবিকার তাড়নাতেই কেটে যায় সময়। অন্যকিছু ভাবার সুযোগ খুব একটা হয়ে ওঠে না।

তিনি জানালেন, তার মা সরকারি সুবিধা পায়। সেই সুবিধা কি জানতে চাইলে জানালেন- ‘বয়স্ক ভাতা!

কুমুদিনী হাজংরা পারিবারিকভাবেই যুগযুগ ধরে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে যুক্ত থেকেছেন। কুমুদিনী হাজংয়ের পিতা অতিথ চন্দ্র রায় হাজং ঐতিহাসিক ‘হাতিখেদা বিদ্রোহে’ যুক্ত ছিলেন। হাজংরা ঐতিহাসিকভাবে কৃষি কাজে যুক্ত ছিলেন। তারা মূলত চাষবাস করেই জীবিকা নির্বাহ করতে পছন্দ করতেন। কৃষি কাজই তাদের প্রথা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেখানে সুসং রাজারা হাজংদের বাধ্য করতো হাতি ধরার কাজ করতে। ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দ থেকে হাজংদের জোড় করে হাতি ধরা কাজে নিয়োজিত করায় তারা বিদ্রোহ করে। সেই বিদ্রোহই হাতি খেদা বিদ্রোহ নামে পরিচিতি। কুমুদিনী হাজংয়ের বাবা সেই বিদ্রোহীদের একজন ছিলেন।

মাত্র দু বছর বয়স থাকতেই বাবা-মা হারিয়ে মামার কাছে বড় হয় কুমুদিনী হাজং। ১২ বছর বয়সে বিয়ে হয় লংকেশ্বর হাজংয়ের সাথে। সম্পদ বলতে পৈত্রিক সূত্রে ৪ আড়া (১শ ২৮ শতকে ১ আড়া) জমি পেয়েছিলেন কুমুদিনী হাজং। জমিদারদের টঙ্ক প্রথার অত্যাচারে অতিষ্ঠ হাজংরা গড়ে তোলে টঙ্ক আন্দোলন। অতিরিক্ত খাজনার নামে ফসল লুটণ্ঠ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা এই আন্দোলনে কুমুদিনী হাজং এর স্বামী লংকেশ্বর হাজং ও তাঁর তিন ভাই টঙ্ক আন্দোলনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন। তারা বিভিন্ন সাংগঠনিক কার্যক্রম করায় জমিদার ও ব্রিটিশ পুলিশের রোষানলে পড়েন।

জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারন করলে ব্রিটিশ সরকার দমনে শুরু করে অত্যাচার নির্যাতন। ১৯৪৬ সালের ৩১ জানুয়ারি কুমুদিনী হাজংকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার সময় শুরু হয় এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। তাকে বাঁচাতে গিয়েই প্রাণ দেয় এই আন্দোলনের অন্যতম নেতা রাসমনি হাজং ও সুরেন্দ্র হাজং।

এ ঘটনার পরপরই আত্ম গোপনে চলে যায় কুমুদিনী হাজং। তখন ছদ্মনাম হয় স্বরস্বতী। মামলা হুলিয়া মাথায় নিয়ে গোপনে গোপনে তিনি টঙ্ক আন্দোলন সংগঠিত করতে কাজ করে গেছেন মাঠ পর্যায়ে। সেই ঐতিহাসিক আন্দোলনকারীদের ভেতর একমাত্র তিনিই বেঁচে আছেন এখনো। তবে আজ পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রীয় কোনো স্বীকৃতি পাননি।

ব্রিটিশদের পতনের পর ১৯৫০ সালে টঙ্ক প্রথা বিলুপ্ত হলেও হাজংদের উপর চলে অন্য মাত্রায় অত্যাচার। পাকিস্তান শাসকের চক্রান্ত করে ভূমিহারা করেন এই হাজংদের। ১৯৬৪ সালে তৎকালীন হাজংরা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার শিকার হলে কুমুদিনী হাজং হারান তার পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া সেই ৪ আড়া জমি। ব্রিটিশ পতাকার অবসান হওয়ার পর যে পাকিস্তানি পতাকা এলো সেখানেও তিনি অত্যাচার নির্যাতনের শিকার হয়ে ভূমি হারা হয়েছেন। এরপর দেশ স্বাধীন হলো। তবে কুমুদিনী হাজং ফিরে পাননি তার জমি।

বনবিভাগের একটি টিলার উপর তিনি বসবাস করেন। কথায় কথায় কুমুদিনী হাজং বললেন, ‘এখানে জঙ্গল ছিলো। সাপ আছিলো, শিয়াল আছিলো বাঘ আছিলো... বাবারে বাবা... আমরা সব ছাফ করে বাগান করছি। আম-কাঠাল বাগান। যখন ফল হইছে না তখন ফরেস্টার আইয়া কইছে তোমরা ফল নিও না। তখন কি করমু...।’

বনবিভাগের আইনগত নিষেধাজ্ঞার কারণে সেই ফসল আর নিজেদের হয়নি। এই জমি গাছ সবই বনবিভাগের আওতাধীন। সেই ছোট টিলার উপর অনেকটা আশ্রিত হয়ে আছেন ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের বিপ্লবী কুমুদিনী হাজং।

খোঁজ নিয়ে যতদূর জানা গেছে এই মানুষটি এখনো রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কোনো সন্মননা পায়নি। কোনো সন্মাননা পদক নিয়ে রাষ্ট্র এখন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারেনি কুমুদিনী হাজংয়ের বাড়ির উঠান পর্যন্ত। তবে নিজ হাতে করা বাগানের ফসল নিজে তুলতে পারবেন না সেই নিষেধাজ্ঞা ঠিকই পৌঁছে গেছে তার উঠানে। কারণ এই উঠানতো সরকারি খাস জমি। আর এভাবেই তিন পতাকার তলে কাটিয়ে দিলেন এক সংগ্রামী জীবন।

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71