রবিবার, ১৮ নভেম্বর ২০১৮
রবিবার, ৪ঠা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
রোহিঙ্গা নারী ও শিশুদের ক্ষুধার কান্নায় প্রকম্পিত পাহাড়
প্রকাশ: ১২:২৩ pm ১৩-০৯-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:৪৩ pm ১৩-০৯-২০১৭
 
বরিশাল প্রতিনিধি:
 
 
 
 


কারো কোলে একাধিক শিশু সন্তান কারো কাঁধে বৃদ্ধ মাতা পিতা । শুধুমাত্র জীবনটা বাঁচানোর প্রাণপণ চেষ্টা করে পাহাড় জঙ্গল নদী পাড়ি দিয়ে স্রোতের মত ঢুকছে বালাদেশের ভুখন্ডে । এদের পরিচয় তারা বার্মার রোহিঙ্গা, সম্বলের মধ্যে সঙ্গে রয়েছে পরনের বস্ত্রটুকুই। 

নিজ দেশ বার্মায় এক পক্ষ ধরে সামরিক বাহিনী আর নাক মুখ চোখ বাধা কালো পেষাকধারীরা তাদের নির্বিচারে গুলি ও জবাই করে হত্যা করছে সাথে বাড়িঘরে আগুন দিয়ে জালিয়ে দিচ্ছে। এই অত্যাচার থেকে নিজের প্রাণ বাঁচাতে সপ্তাহ বা তারও অধিক সময় ধরে হাটতে থাকা মানুষগুলো আর তাদের কোলে থাকা শিশুগুলো কতদিন অভুক্ত তার পরিসংখ্যান জানা নেই । সড়কের পাশে গাড়ি দেখলেই ছুটে যাচ্ছে খাদ্যের আশায়,কখনো জুটছে কখনো জুটছে না । তাদের থাকার স্থান বলতে খোলা আকাশের নিচে হাট ঘাট মাঠ জঙ্গলই একমাত্র ভরসা।

এ চিত্র টেকনাফের বিস্তৃত নদী ও পাহাড়ী অঞ্চল থেকে শুরু করে কক্সবাজারের উখিয়ার জঙ্গল মাঠ ঘাট বাজার ছাপিয়ে এখন রামু উপজেলাতেও দৃশ্যমান শুধু রোহিঙ্গা আর রোহিঙ্গা । কক্সবাজার ও টেকনাফের পথ প্রান্তর পাহাড় নদী জঙ্গলে শোনা যায় শুধু ক্ষুধা আর ক্ষুধার কান্না । এক টুকরো রুটি বা বিস্কুট দেখলেও ঝাঁপিয়ে পড়ছে শত শত শিশু ও নারী । নিজের সংসারের সকল সদস্যদের চোখের সামনে জবাই হতে দেখা এক মৃত্যুপুরি থেকে জীবন নিয়ে ফেরা রোহিঙ্গারা আরেক পুরিতে এসে মরতে বসেছে খাদ্য আর চিকিৎসার অভাবে। 

পনের দিনে কত লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে তার পরিসংখ্যান বলা খুবই মুশকিল তবে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট এ,কে,এম মঞ্জুরুল আহসান বলেন।আরো তিন দিন আগে তিন লাখ রোহিঙ্গার অনুপ্রবেশের কথা জানালেও তা এখন পাঁচলাখে ছাড়িয়ে গেছে বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে ।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের (আরাকান) সীমান্তবর্তী এলাকা তুমব্রু,থাইনখালি,ঘুমধুম,পালংখালী ও কুতুপালং এলাকার পাহাড়ী অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে প্রতিটি অঞ্চলে হাজার হাজার অভুক্ত শিশু ও নারীরা পথে প্রান্তরে বসে ঝিমাচ্ছে,যেন মৃত্যু তাদের চোখের সামনে । 

আরাকান রাজ্যে শুধু যে মুসলিমদের প্রতিই নির্যাতন করা হয়েছে তা নয় সমান তালে সেখানকার হিন্দুদেরকেও হত্যা করা হয়েছে এবং নারীদেরকে করা হয়েছে গণধর্ষণ। বাদ যায়নি ৬ মাস/ ৮মাসের গর্ভবতীও।হিন্দুদেরকে সেনাবাহিনীর বদলে নির্যাতন করেছে মুখ চোখ বাঁধা কালো পেষাক ধারীরা, তারা হিন্দু নারী ও মেয়েদের অনেককে ধর্ষণের পরে ছেড়ে দিয়েছে আবার অনেককে গলা কেটে হত্যাও করেছে ।
কুতুপাংলংয়ের এক ইউপি সদস্য স্বপন শর্মা ও বাবুল শর্মার একটি পরিত্যক্ত মুরগির ফার্মে ১২ সেপ্টেম্বর দুপুর পর্যন্ত আশ্রিত ১৬৩ টি হিন্দু পরিবারের ৫৩৩ জন নারী পুরুষ ও শিশু আশ্রয় নিয়েছে । এর মধ্যে রয়েছে পরিবারের সকলকে চোখের সামনে জবাই হতে দেখা ৬ মাসের অন্তঃসত্তা ধর্ষিত আলোচিত গৃহবধু অনিতা ধর (১৫),রয়েছে প্রমিলা শীল (১৮),রিকা ধর (১৮),বীনা শিল(২১), বাকরুদ্ধ কন্ঠে তারা জানিয়েছেন ৩১ আগষ্ট বৃহস্পতিবার বেলা ওঠার পরে তাদের বাড়ি আক্রমণ করে চোখ মুখ বাধা কালো পোষাক ধারীরা। 

প্রথমে ৩ জনে অনিতাকে ধর্ষন করে এবং তার স্বামী মিলিঙ্গা,শশুর লাতু ধর,শাশুড়ি মিনু বালা ধর ও ননদের ছোট্ট মেয়েকে উঠানে নামিয়ে জবাই করে হত্যা করে, এ ঘটনা দেখে অনিতা জ্ঞান হারিয়ে ফেললে তাকে মৃত ভেবে হত্যাকারীরা চলে যায়। এমনি ভাবে প্রমিলা শীলের কোলে ৯ মাসের শিশু সন্তানকে ফেলে দিয়ে তাকে ধর্ষণের পরে স্বামী সহ তার পরিবারের ৫ জনকে জবাই করে, ফকিরা বাজার এলাকায় রিকা ধরের বাড়িতে ১ সেপ্টেম্বর শুক্রবার সকালে ১০/১২ জন কালো পোষাকধারীরা ঢুকে তাকে ২ জনে ধর্ষণ করতে থাকে আর বাকিরা তার স্বামী পবন ধর, শ্রীমন্ত ধর,লামন ধর ও রাজেশ ধরকে গলা কেটে হত্যা করে উঠানে ফেলে রেখে রিকা ধরকে তাদের সাথে বিয়ে বসার প্রস্তুতি নিতে বলে চলে যায়, বীণা শীলের বাড়িতে ঢুকেও কালো পোষাক ধারীরা তার স্বামী রনজিৎ শীল,৫ বছরের মেয়ে রশনী বালা শীল,৩ বছরের ছেলে মানিক শীল,মা অঞ্জু বালা,ভাই,কিরন ধর,ভাসুর বাবুল শীল ও জা লালু বালা শীল (৩৪) কে জবাই করে হত্যা করে । 

ধর্ষণের পরে তাদের সাথে বিয়েতে রাজি হলে হত্যাকারীরা কিছু সময় দেয়, আর এই সময়ের মধ্যেই তারা পালিয়ে প্রাণে বাঁচে । মাইনরিটি অনলাইন এক্টিভিটিজ ফোরাম সহ বেশ কিছু সেচ্ছাসেবী সংগঠন ওই আশ্রয় কেন্দ্রে তাদেরকে ১০/১২ দিনের খাদ্য,জল ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করলেও তা অপ্রতুল ।

অন্যদিকে বার্মার ধুনছে গ্রামের বাসিন্দা আঃ বারি (২৫) জানিয়েছেন, তার পিতা আঃ ছাত্তার সহ পরিবারের ৩ জনকে বার্মার আর্মিরা ৬ দিন আগে গুলি করে হত্যা করেছে। মামুদা বেগম (১৬),রোজিনা আক্তার (১৬),হীরু বেগম  (১৮) এরা সকলেই ৪ থেকে ৮ মাসের গর্ভবতী,কোলেও রয়েছে ২/৩ টি করে শিশু,আশ্রয় নিয়েছে রেজু আমতলীর একটি পাহাড়ের নিচে। ৪ দিন ধরে তারা শুধু পাহাড়ের ঝর্নার জল আর কলা গাছের মাথি খেয়ে বেঁচে আছে। 

শিশুরা ক্ষুধায় এখন আর কান্না করতেও পারছে না । দুর্গম অঞ্চল হওয়ার কারণে এখানে কেউ খাদ্য নিয়েও আসছে না । তবে এ সকল অধিকাংশ নারীদের ভাষ্যমতে তাদের পরিবারের পুরুষদের বার্মার সেনাবাহিনী গুলি করে হত্যা করেছে আর বাকি কিছু পুরুষ তাদের স্ত্রী সন্তানদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়ে যোগ দিচ্ছে প্রতিরোধ যুদ্ধে।এরকম অনেকের স্বামীরা বার্মাতেই পালিয়ে থেকে বিভিন্ন এলাকায় প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশ নিচ্ছে বলে রেজু আমতলী বর্ডারের কাছে আশ্রিতদের কাছ থেকে নিশ্চিত হওয়া গেছে ।

জীবন নিয়ে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ধুনছে গ্রামের জ্ঞানো বালা রুদ্র,কাজল রুদ্র, মহেন্দ্র শীল,নাইশাপুরি গ্রামের আঃ হক,আলমাস বানু বলেন,মিয়ানমারেরসেনাবাহিনী,পুলিশ ও নাডালা বাহিনী এ পর্যন্ত রাখাইন(আরাকান)রাজ্যের গজড়বিল,ছালিপাড়া,রাঙ্গাবাইল্লা,জামবনিয়া সহ ৪০ টি গ্রামে গণহত্যা,ধর্ষণ,ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেওয়া এবং গবাদি পশু সহ সবকিছু লুটে নিয়ে গেছে।
  
কেকেসি/পিএম

 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71