বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
লংগদু আগুন ও আমাদের মানবতা
প্রকাশ: ০৪:৫৭ pm ০৫-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০৫:০৮ pm ০৫-০৬-২০১৭
 
 
 


শ্যামল রায়: গত শুক্রবার রাঙ্গামাটি জেলার লংগদু উপজেলায় স্থানীয় এক যুবলীগ কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনার জের ধরে স্থানীয় আওয়ামীলীগ ও সহযোগী সংগঠনের বিক্ষুদ্ধ কর্মী ও সমর্থকরা উপজেলা সদরের তিনটিলা, মানিকজোড়ছড়া ও বাত্যাপাড়ায় আদিবাসী পাহাড়িদের তিন শতাধিক বাড়ীঘরে হামলা ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছে।

একজন মানব উন্নয়ন সমাজকর্মী হিসাবে এ ঘটনাকে man made didaster বা মানব সৃষ্ট দূর্যোগ ছাড়া অন্য কিছু বলার ভাষা আমার জানা নাই।

স্থানীয় যুবলীগ কর্মী হত্যার অবশ্যই নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। যে পরিবার তার প্রিয়জনকে হারায় কেবল সেই পরিবারই তার প্রকৃত বেদনা ও কষ্ট অনুভব করে।

প্রতিটি জিবনই রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারের কাছে অত্যন্ত মুল্যবান। বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে সুনির্দিষ্ট কোন কারন ছাড়াই ১০-১২ জন লোকের মৃত্যু সংবাদ ইলেকট্রনিক বা প্রিন্ট মিডিয়ার মাধ্যমে আমরা শুনতে পাই। জীবন যেন এক কচু পাতার পানি, স্বাভাবিক মৃত্যুর কোন গ্যারান্টি নাই এখানে।

অথচ পবিত্র ধর্ম ইসলাম বলেছে মানুষ হ'ল আশ্রাফুল মখলুকাত অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা জীব। পৃথিবীব্যাপী সকল ধর্মেই বলা হয়েছে মানুষ তার পূন্যকর্ম ও স্রস্টার সৃষ্টিকে ভালবসার মাধ্যমে কৃত অপরাদ বা পাপ থেকে মুক্তি পেতে পারেন, কিন্তু যে ব্যক্তি মানুষ হত্যা করেছে সে যত পূন্যকাজ বা এবাদত করুক না কেন দুনিয়া এবং আখেরাতে কোথাও তার মুক্তি বা ক্ষমা নাই।

আমাদের দেশে এখন প্রায় সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় ভাব ধারার ব্যপক প্রচার ও প্রসার ঘটেছে, অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতাকে বা বিবেকবুদ্ধিকে অবজ্ঞা করে হলেও ধর্মীয় কার্যক্রমকে সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিচ্ছি কিন্তু ধর্মের এই ছোট্র মর্মবাণীটাকে বেশিরভাগ মানুষই ধারন করি না।

ধর্ম মানুষকে পরিশুদ্ধ করে কিন্তু আধুনিককালে ধর্মকে ব্যবহার করেই হত্যা, নারী ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ এরমত ভয়াবহ অপরাধমুলক কর্মকান্ড প্রতিনিয়ত ঘটছে। অথচ সকল ধর্মের মানুষের চরম আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধিন বাংলাদেশের সকল নাগরিক বাঙ্গালি, পাহাড়ি, আদিবাসী ও সকল নৃগোষ্ঠী মানুষদের সমান অধিকার পবিত্র সংবিধানে উল্লেখ রয়েছে।

কিন্তু বাস্তব অবস্থা হ'ল তার উল্টোটা। একটি বিশেষ ধর্মের বেশিরভাগ ধর্মব্যবসায়ীরা মনে করে তাদের ধর্ম ব্যাতিত অন্য কোন ধর্ম ধর্মই না। এই যে ধর্মের নামে might is right এ চিন্তা থেকে মানুষকে বেড় হয়ে আসতে হবে। ধর্মে might is right বলে কিছু নাই।

কাজেই যে ব্যক্তি যার নিজ ধর্ম সঠিক ভাবে পালন করবে ঐ ব্যক্তির দেহ এবং অন্তরে আধ্যাত্মিক জাগরণ ঘটবেই, আর যিনিই আধ্যাত্মিকতা সম্পন্ন মানুষ তিনি নিজের ধর্মকে যেমন সঠিকভাবে পালন করেন ঠিক অন্য ধর্মকেও তদ্রুপ শ্রদ্ধা করেন।

এখন প্রশ্ন জাগে এইযে আমজনতা ধর্ম নিয়ে এত উন্মাদনার জম্মদেয় তাদের দেহ ও অন্তরে কি আধ্যাত্মিকতা আছে? লংগদুর একটি হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা তিন শতাধিক পাহাড়ি আদিবাসী পরিবারের বাড়ীঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে তারা অসুস্থ রাজনীতি দ্বারা অনুপ্রাণিত, ধর্ম যখন রাজনীতিকে গ্রাস করে রাজনীতি তখন আর সুস্থ থাকে না।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না ঐ পাহাড়ি আদিবাসী মানুষগুলোকেও সংবিধানে সমান অধিকার দিয়েছে। একটি সামাজিক মানব উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করার সুবাদে আমার ২২ বছর কর্ম জিবনে একবার সুযোগ হয়েছিল খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলায় পাহাড়ি জনগনের মাঝে কাজ করার।

২০০৪ সালে মহালছড়ি উপজেলায় ৭ টি গ্রামে মুসলিম সম্প্রদায়ের কিছু দুঃস্কৃতিকারীরা ২০০ আদিবাসী পরিবারের বাড়ী ঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয়।

ইউএনডিপি'র (UNDP) অর্থায়নে ঐ সকল ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি পরিবারদের গৃহনির্মাণ পূনর্বাসন প্রকল্পের দায়িত্ব পালনকরার সময়ে পাহারি আদিবাসী মানুষদের খুব কাছে থেকে দেখার এবং জানার সুযোগ হয়েছিল। খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটি জেলার আদিবাসী পাহাড়িদের অধিকাংশ হচ্ছে চাকমা ও মারমা সম্প্রদায়ের অল্প সংখ্যক হচ্ছে ত্রিপরা সম্প্রদায়ের।

চাকমা মারমারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী আর ত্রিপরা সম্প্রদায়ের লোকেরা পাহাড়ি হিন্দু বা মনিপুরী হিন্দু সম্প্রদায়ের। বাঙ্গালি হিন্দুদের ধর্মীয় সংস্কৃতির সাথে মনিপুরীদের কিছুটা পার্থক্য আছে। যাইহোক সবাই আদিবাসী পাহাড়ি নামে পরিচিত। পাহাড়ি মানুষগুলো খুবই সহজসরল, তাদের জীবনযাপন ও খুব সাধারণ, এরা মানুষকে খুব সহজেই বিশ্বাস করে।

এই বিশ্বাসের সুযোগ নিয়েই হিলট্রাক্সে বসতি সেটেলার বাঙ্গালিরা পাহাড়িদের অভ্যন্তরে দিনদিন জোরপূর্বক ঢুকে পড়ছে এটাকে পাহাড়ি মানুষেরা ভাল নজরে দেখছে না। পাহাড়িদের চোখে সেটেলার বাঙ্গালিরা হচ্ছে এক আতঙ্কের নাম। পাহাড়িরা সমাজবদ্ধ জাতি, প্রতিটি পাড়ায় তাদের পরিচালনা পরিষদ রয়েছে।

সমাজ বা পরিচালনা পরিষদের প্রধানকে হেডম্যান বলা হয়। হেডম্যান যে সিদ্ধান্ত দিবেন সবাই তা মথাপেতে মেনে নিবেন। বাংলাদেশে এই অল্প সংখ্যক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পাহাড়িদের কাছথেকে আমাদের অনেক কিছু শিক্ষণীয় ছিল বলে মনে করি। পাহাড়িদের গীতিনাট্য সংস্কৃতি অত্যন্ত সমৃদ্ধ যা বাংলাদেশের জাতিয় সংস্কৃতির অংশ বটে। এরা একদিকে যেমন কঠোর পরিশ্রমী অন্যদিকে সবাই বিনোদন প্রিয়।

পাহাড়্রিরা খুব ভোর থেকে কাজ আরম্ভ করে কিন্তু দুপুর একটার পরে কেহ কাজ করবে না, আবার বিকাল তিনটার পরে কেহ ঘরে থাকবে না।

ঘর তালাদিয়ে সবাই দূরে যেতে না পারলেও অন্তত আশেপাশে ঘুরে বেড়াবে, এটা তাদের জাতিয় ঐতিজ্য। খাগড়াছড়ি শহরে নিউজিল্যান্ড নামে একটা চমৎকার বিনোদনমুলক সবুজ জায়গা আছে, জায়গাটি তিনদিক থেকে পাহাড়ে ঘেড়া, প্রতিদিন বিকালে প্রচুর বাঙ্গালি পাহাড়ি সব বয়সের নারী পুরুষেরা সেখানে ঘুড়তে যাবেই।

আমরাও ছুটির দিনে যেতাম। তবে আমাদের সহকর্মী মিঃ অং সাউ মারমা আমাদেরকে বলে দিয়েছিল সন্ধ্যার পরে যেন সেখানে না থাকি। আমি কৌতহলবসত অং সাউ মারমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম এত সুন্দর জায়গা সন্ধ্যার পূর্বে কেন ফিরতে হবে। অং সাউ উত্তর দিয়েছিল এর জন্য আমরা বাঙ্গালিরাই নাকি দায়ী। আগে সন্ধ্যার পরেও নিউজিল্যান্ডে পাহাড়ি বাঙ্গালিরা একসাথে আড্ডা দিত, এর সুযোগে সেখান থেকে বেশ কয়েকটি পাহাড়ি মেয়েকে বাঙ্গালি ছেলেরা তুলে নিয়ে গেছ।

এখন এর প্রতিহিংসায় পাহাড়ি ছেলেরা সন্ধ্যার পরে অপরিচিত বাঙ্গালি কাউকে পেলেই অস্ত্রের মুখে কিডন্যাপ করে পরে মোটা অংকের মুক্তিপন দাবি করতো। পাহাড়ে প্রচুর কৃষি ও ফলের উৎপাদন হয়। পাহাড়ি জনগোষ্ঠী মুলত এই কৃষিজাত কর্মের উপরই নির্ভরশীল।

বাঙ্গালিরা বিভিন্ন সময়ে পাহাড়িদের ধোকাদিয়ে তাদের জমি ও সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছে। এ সমস্ত কারনেই পাহাড়ি লোকেরা এখন ক্ষুদ্ধ ও প্রতিবাদি হয়ে উঠছে। ২০০৪ সালে মহালছড়ি উপজেলার ৭টি পাহাড়ি গ্রাম পোড়ানোর সময় রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল বিএনপি, ক্ষতিগ্রস্ত পাহাড়ি লোকদের ধারনা ছিল ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের লোকদের ছত্রছায়ায় তাদের বাড়ীঘর পোড়ান হয়েছে তাই তারা বিচার পাবে না।

কিন্তু ২০১৭ সালে অনুরুপ ভাবে সরকারী দলের ছত্রছায়ায় তিন শতাধিক পাহাড়িদের বাড়ীঘর আগুনদিয়ে পোড়ানো হ'ল। এ ঘটনায় পাহাড়িদের বিশ্বাস ভেঙ্গে আরও প্রতিবাদি ও বিক্ষুদ্ধ করে তুলবে। ২০০৪ সালে মহালছড়ি পূনর্বাসন প্রকল্পে দায়িত্ব পালনের সময়ে প্রতিদিন সকালে প্রকল্প এলাকায় যাওয়ার সময়ে আর্মি ক্যান্টনমেন্ট ইনফরমেশন দিয়েযেতে হত।

কোন এলাকায় কতজন কর্মকর্তা যেতাম আবার ফেরার সময়ে ক্যান্টনমেন্ট গেটে ইনফরমেশন দিয়ে আসতে হত। দুর্গম এলাকায় যখন যেতাম তখন আর্মি ব্যাটেলিয়ন স্থল ও নৌপথে আমাদেরকে স্যডো স্কট দিত যাতে কিডন্যাপ এরমত দুর্ঘটনা না ঘটে। আমাকে কয়েকজন হেডম্যান প্রায়ই বলত আমি কেন আর্মি স্কট নিতাম, আমি বলতাম আমি কিছুই জানি না, আর্মি স্কট আমরা চেতাম না কিন্তু আর্মি আমাদেরকে সব সময় স্কট দিত।

পাহাড়িরা আমাকে বলত আমার চেহারার সাথে নাকি বঙ্গবন্ধুর চেহারার মিল রয়েছে, কাজেই কোন পাহাড়ি আমার ক্ষতি করবে না। ওদের তিনটি সংগঠনকে নাকি ওরা বলে দিয়েছিল যাতে আমাকে কখনো কেউ হল্ট না করে। ওদের কথা আমি বিশ্বাস করতাম না।

একদিন হেডম্যান সুধাংশু চাকমা ও নিবারন খিসাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম কেন আমাকে কেউ হল্ট করবেনা, উত্তরে বলেছিল বঙ্গবন্ধুর চেহারার সাথে আমার চেহারার মিল থাকায় পাহাড়ি লোকেরা নাকি আমাকে ভিষন ভাল বাসে, একারনেই আমার কোন ভয়ের নাকি কারন নাই। বঙ্গবন্ধুর প্রতি ওদের এত গভীর ভালবাসা।

সেই বঙ্গবন্ধুর দলের লোকেরা যখন তিনশতাধিক পাহাড়িদের বাড়ীঘরে আগুন দিল তখন পাহাড়িদের সেই বিশ্বাস এখন কোথায় গিয়ে দাড়াবে। মোটর সাইকেল বাহক যুবলীগ কর্মী যদি সত্যি সত্যিই কোন পাহাড়িদের দ্বারা খুন হয়ে থাকে তবে নিশ্চয় এর পেছনে হয়তো অন্য কোন কারন রয়েছে।

কাজেই যুবলীগ কর্মীকে যে বা যারাই হত্যা করে থাকুক না কেন তার সঠিক তদন্ত করে প্রকৃত খুনীকে শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমুলক শাস্তি দেয়া হোক, আর যে সমস্ত দুষ্কৃতিকারীরা নিরিহ পাহাড়িদের বাড়ীঘর আগুন দিয়ে পুড়িয়েছে তাদের ও আইনের আওতায় এনে শুধু গ্রেফতার নয় দৃষ্টান্তমুলক বিচার করে শাস্তি দেয়া হোক।

বহির্বিশ্ব ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো কোন প্রশ্ন তোলার আগেই সরকারি ভাবে দ্রুত গৃহ নির্মান পূনর্বাসনের ব্যবস্থাসহ ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে জরুরী ত্রান কার্যক্রমের প্রকল্প নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।

সরকারি ভাবে ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ১৪৪ ধারা জারিসহ নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে, এ জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানাই।

উভয় সম্প্রদায়ের স্থানীয় সকল নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গকে এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে আন্তসর্ম্পকিয় সকল ধরনের সংলাপ জোরদার করার আহবান জানিয়ে লেখাটি শেষ করছি। পরিশেষে মানবতার জয় হউক।

 

লেখক: শ্যামল রায়, প্রধান সমন্বয়কারী বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।

 

এইবেলাডটকম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71