বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
লুঙ্গির ইতিবৃত্তঃ বাঙালি সংস্কৃতিতে কীভবে ঘটলো এর আগমন?
প্রকাশ: ০৯:১৮ am ২১-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৯:৩২ am ২১-১২-২০১৬
 
 
 


লুঙ্গি! বাংলাদেশের মানুষের বহুল ব্যবহৃত এক আরামদায়ক পোষাক। বাঙ্গালির ঐতিহ্য! এমন আরামদায়ক পোষাক সারা বিশ্বে আর দ্বিতীয়টি খুঁজে পাওয়া যাবে কিনা তা সন্দেহ! বাংলাদেশে বাস করেন কিন্তু কখনও লুঙ্গি পড়েননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মনে হয় অসম্ভব। আর সেই লুঙ্গি নিয়েই আজকের এই আয়োজন!

cotton-lungi

উৎপত্তি

লুঙ্গি নামের পোশাকটি দেহের নিচের অংশে অতি সযত্নে পড়া হয়ে থাকে। ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং শ্রীলঙ্কায় এর প্রচলন সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ধারণা করা হয় লুঙ্গির সূচনা দক্ষিণ ভারতে। দক্ষিণভারতের তামিলনাড়ুকেই এর জন্মস্থান বলা হয়। দক্ষিণ ভারতের সংস্কৃতিতে লুঙ্গি এখনো এক বড় জায়গা দখল করে আছে। তবে এখন এই লুঙ্গি আমাদের উপমহাদেশের বহু সম্প্রদায়ই ব্যবহার করে থাকেন।

ভেস্তি নামের এক ধরনের পোষাককে লুঙ্গির উত্তরসূরি হিসেবে ধরা হয়। ইতিহাস বলে এক কালে মসলিন কাপড়ের তৈরি এই ভেস্তি তামিল থেকে ব্যবিলনে নিয়মিতভাবে রপ্তানী হতো। ব্যবিলনের যেসব প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া যায় তাতে “সিন্ধু” শব্দটি খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। তামিল ভাষায় সিন্ধু শব্দের অর্থ করলে দাঁড়ায় কাপড় বা পোষাক। তখন বারাদাভারগাল নামের তামিলনাড়ুর জেলেদের এক সম্প্রদায় ছিল। মূলত তারায় পশ্চিম আফ্রিকা, ইজিপ্ট (বর্তমান মিশর),মেসোপটেমিয়ায় লুঙ্গি রপ্তানি করতো।

যদিও এখনো অনেক বিদেশীদের কাছেই এই লুঙ্গি এক বেশ আশ্চর্যের বিষয়। বোতাম, দড়িতো দূরে থাক বেল্ট, ফিতা, চেইন, সেফটিপিন কোন কিছুই নেই এই লুঙ্গিতে! এর ব্যবহারকারিরা সাধারণত এক বা, দুই গেঁড়ো বাঁধনের মাধ্যমে কোমরে জড়িয়ে পায়ের দিকে ঝুলিয়ে এটি পড়ে থাকেন।

নকশা

Source: anuvaanexports.com

জনপ্রিয়তার কথা চিন্তা করলে এক রঙের বা, দুই রঙের চেক লুঙ্গিই বেশি জনপ্রিয়। চেক লুঙ্গিগুলো মূলত প্রবীণদের মাঝেই বেশি জনপ্রিয় হয়ে থাকে। তবে বিভিন্ন নকশা করা লুঙ্গিও বাজারে কিনতে পাওয়া যায়। লুঙ্গির সাথে অনেকটাই স্কার্টের মিল আছে। লুঙ্গি স্কার্টের মতো গোল করে সেলাই করা থাকে। কোন কোন সম্প্রদায়ে শুধু পুরুষেরাই লুঙ্গি পড়ে থাকে আবার কোন কোন সম্প্রদায়ে পুরুষ মহিলা উভয়েই এ পোষাকটি পড়ে থাকে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ে লুঙ্গি পড়ে শুধুমাত্র প্রতিদিনের কাজই করা হয় না, তার সাথে সাথে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও যাওয়া হয়ে থাকে।

যেসব অঞ্চলে লুঙ্গি জনপ্রিয়

ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার এবং শ্রীলঙ্কায় লুঙ্গির প্রচলন বেশি দেখা গেলেও মালদ্বীপ, আফ্রিকার অনেক দেশ, পলিনেশীয় দ্বীপপুঞ্জ, ক্যারিবীয় অঞ্চল এমনকি লাতিন আমেরিকার দেশগুলোতেও লুঙ্গি বেশ জনপ্রিয়। এছাড়াও মাদাগাস্কার, মালাউই, মোজাম্বিক, মরিশাস, জিম্বাবুয়ে কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকায় লুঙ্গি লাম্বা, চিতেঞ্জে, কাপুলানা, পারেওস, জাম্বিয়াস ও কিকোই নামে প্রচলিত রয়েছে।

গরম এলাকা এবং আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজ করে এমন এলাকায় ট্রাউজার পরিধান কিছুটা কষ্টসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। মূলত এ ধরণের এলাকাগুলোতেই লুঙ্গির বিস্তার ঘটেছে।

লুঙ্গি এবং বাংলাদেশ

বাংলাদেশে মূলত পুরুষরাই লুঙ্গি পড়ে থাকে। মেয়েদের মাঝে এ পোষাকের প্রচলন নেই। বেশিরভাগ পুরুষই তাদের দৈনন্দিন কাজে এ পোষাকটি পড়ে থাকে। সেদিক থেকে বলতে গেলে এটি বাঙ্গালির নিত্য ব্যবহার্য এবং অপরিহার্য এক পোষাক। বাংলাদেশের মজলুম জননেতা হিসেবে পরিচিত মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রিয় পোষাক ছিল এই লুঙ্গি। তার লুঙ্গি প্রীতির কথা কারোরই অজানা নয়।

বাংলাদেশের গ্রামের এক ছেলে যে এক গেঁড়ো দিয়ে লুঙ্গি পড়েছে। Source: bn.wikipedia.org

বাংলাদেশের গ্রামের এক ছেলে যে এক গেঁড়ো দিয়ে লুঙ্গি পড়েছে। 

যদিও বাংলাদেশে সাধারণত বিশেষ কোন অনুষ্ঠানে লুঙ্গি পরিধান করা হয় না, তবে নকশা করা, বাটিক বা, সিল্কের তৈরি লুঙ্গিগুলো অনেক সময় ঐতিহ্যগতভাবে বিয়ের সময় বরকে উপহার হিসেবে দেয়া হয়ে থাকে। বিশেষ বিশেষ দিনে কোন কোন অঞ্চলে এখনো শিক্ষকদের এবং ইমামদের লুঙ্গি উপহার দেয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে ।

যদিও বাঙালি মেয়েরা লুঙ্গি পড়ে না তবে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার উপজাতীয় মহিলারা লুঙ্গির মত দেখতে একই রকম পোষাক পরিধান করে থাকেন। উপজাতীয়রা এ পোষাককে থামি বলে অভিহিত করে থাকেন। দেশের হিন্দুদের মাঝে আগে ধুতি বেশ প্রচলিত থাকলেও এখন তার স্থান লুঙ্গিই দখল করে নিয়েছে।

Source: thedailystar.net

বাংলাদেশে লুঙ্গির সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারগুলো হলো নরসিংদীর বাবুরহাটে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে ও টাঙ্গাইলের করটিয়ার। এই বাজারগুলো থেকেই দেশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা লুঙ্গি কিনে থাকেন এবং পরবর্তিতে স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে থাকেন। নরসিংদীর লুঙ্গি এখন দেশের বাজার ছাড়িয়ে ২০০০ সাল থেকে বিদেশেও রপ্তানী হচ্ছে।

অন্যান্য সংস্কৃতিতে লুঙ্গি

ভারতে লুঙ্গি পড়ে ভাংরা নাচ (Source: en.wikipedia.org)

ভারতে লুঙ্গি পড়ে ভাংরা নাচ 

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে লুঙ্গির বেশ প্রচলন আছে। কেরালায় নারী পুরুষ উভয়েই লুঙ্গি পড়ে থাকেন। এখানে লুঙ্গিকে কিছুটা দরিদ্র পোষাক হিসেব বিবেচনা করা হয়। তামিলনাড়ুতে শুধু পুরুষরাই লুঙ্গি পড়ে থাকেন।

লোঙ্গাই পড়া বার্মিজ (Source: bn.wikipedia.org)

লোঙ্গাই পড়া বার্মিজ 

মায়ানমারে লুঙ্গিকে লোঙ্গাই বলে ডাকা হয়ে থাকে। এটি মায়ানমারের জাতীয় পোষাক। পুরুষেরা এটি ঘরে বাইরে সর্বত্রই পড়ে থাকেন। মহিলাদের লুঙ্গি এখানে তামাইন হিসেবে সুপরিচিত।

ইয়েমেনে লুঙ্গিকে ডাকা হয় মা’আউস নামে। ইয়েমেনে সকল বয়সের পুরুষরাই স্বাচ্ছন্দে এই মা’আউস পরিধান করে থাকেন। সোমালিয়াতেও লুঙ্গির মতো পোষাক পুরুষদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়। সোমালিয়ায় অফিসের সময় বাদে অন্য সময়ে প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ সবাই লুঙ্গি পড়ে থাকেন। সোমালিয়ায় লুঙ্গির সাথে আবার অতিরিক্ত হিসেবে বেল্টও পরিধান করা হয়ে থাকে।

জাপানেও লুঙ্গির প্রচলন আছে। সেখানে লুঙ্গি একটি উৎসবের পোষাক। ইন্দোনেশিয়া এবং মালয়েশিয়ায় লুঙ্গিকে সারং বলে অভিহিত করা হয়। এ দুই দেশের মানুষেরা লুঙ্গির ভেতর জামা ইন করে পড়েন। এই লুঙ্গির উপড়ে সোমালিয়ার মানুষের মতো তারা বেল্টও পড়ে থাকেন।

Source: bn.wikipedia.org

সবশেষে বলতে হয় লুঙ্গি আমাদের একটি ঐতিহ্যবাহী পোষাক। বেশ আরামদায়ক হওয়ার সুবাদে শুধু বাংলাদেশেই নয় সারা বিশ্বের বিভিন্ন স্থানেই এর কদর রয়েছে। তবে আধুনিক পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কবলে পড়ে দেশের তরুণদের মাঝে এর জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে কিছুটা হ্রাস পেয়েছে। তারপরও এই লুঙ্গি আমাদের সংস্কৃতিতে সমহিমায় টিকে ছিল, টিকে আছে এবং টিকে থাকবে এ কথা হলফ করেই বলা চলে।

এইবেলাডটকম/নীল

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71