শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
লেখক হেমচন্দ্র কানুনগোর ৬৬তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৬:২১ pm ০৮-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৬:২১ pm ০৮-০৪-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

বিপ্লবী স্বাধীনতা সংগ্রামী, চিত্রশিল্পী, লেখক হেমচন্দ্র কানুনগো (জন্মঃ- ১৮৭০ - মৃত্যুঃ- ৮ এপ্রিল, ১৯৫১)

তিনি ছিলেন বিপ্লবী রাজনৈতিক সংগঠনের একজন অগ্রগণ্য নেতা। মেদিনীপুরের রাধানগরে জন্মগ্রহণ করেন। বিপ্লবের টানে মেডিক্যাল কলেজের পড়াশোনা কিংবা সরকারি আর্ট স্কুলের শিক্ষাক্রম, কোনওটাই সম্পূর্ণ করেননি হেমচন্দ্র দাসকানুনগো, যিনি পরে স্বহস্তে নিজের নাম থেকে ‘চন্দ্র’ এবং ‘দাস’ দু’টি উপসর্গই ছেঁটে ফেলেছিলেন। তিনি সামরিক এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের জন্য বিদেশে গিয়েছিলেন। এজন্য তিনি পৈত্রিক সম্পত্তি বিক্রি করে প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করেন। তিনি প্যারিস থেকে প্রশিক্ষণ নেন। মাদাম কামার সাহায্যে তিনি প্যারিসের সোশ্যালিস্ট দলের গুপ্ত সংগঠনের কর্মিদের সাথে পরিচিত হন এবং আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেন। তিনি ১৯০৮ সালের জানুয়ারিতে দেশে ফিরে আসেন এবং কলকাতার নিকটে মুরারিপুকুরে অনুশীলন সমিতির এক অস্ত্র বানানোর কারখানা তৈরি করেন। এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো, অরবিন্দ ঘোষ এবং তাঁর ভাই বারীন্দ্রকুমার ঘোষ। মুরারিপুকুরে তাঁর তৈরি তিনটি বোমার প্রথমটি ফরাসি চন্দননগরের মেয়রকে হত্যার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হয় কিন্তু মেয়র অল্পের জন্য বেঁচে যান। দ্বিতীয়টি বইয়ের আকারের এবং তাতে স্প্রিং লাগানো ছিলো। যথা সময়ে বই না খোলাতে কিংসফোর্ড বেঁচে যান। তৃতীয় বোমাটি ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল চাকী মুজাফফরপুরে ব্যবহার করেছিলেন। ২৫ মে, ১৯০৮ তারিখে মুরারিপুকুরে পুলিশি খানাতল্লাশি হয়। কলকাতার মুরারিপুকুরের বাগানবাড়ি থেকে গ্রেফতার করা হল বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উপেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, উল্লাসকর দত্ত ও নলিনীকান্ত গুপ্তসহ ১৪ জনকে। ৪৮নং গ্রে স্ট্রিট থেকে শ্রীঅরবিন্দসহ তিনজনকে, ১৩৪নং হ্যারিসন রোড থেকে ৫ জনকে, রাজা নবকৃষ্ণ স্ট্রিট থেকে হেমচন্দ্র কানুনগোকে, গোপীমোহন দত্ত লেন থেকে কানাইলাল দত্তসহ দুইজনকে। ১৩৪নং হ্যারিসন রোডের বাড়ি থেকে পুলিশ প্রচুর পরিমাণে বোমা তৈরির মাল-মশলা ও সাজসরঞ্জামও উদ্ধার করতে সক্ষম হলো। এ ছাড়াও পুলিশ ৩২নং মুরারিপুকুরের বাগানবাড়ি থেকে মাটির তলায় পোঁতা কতিপয় ট্রাঙ্ক উদ্ধার করে। এই সব ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় বোমা ষড়যন্ত্রের ও রাজদ্রোহের অভিযোগে মামলা। এই মামলাটিরই নামকরণ হয়েছিল ‘আলিপুর বোমা ষড়যন্ত্র মামলা’। 
 আলিপুর জজ আদালতে জেলা ও দায়রা জজ মিঃ চার্লস পোর্টেন বিচক্রফট্-এর আদালতে মুরারিপুকুর বোমা মামলার সূচনা হয়েছিল ১৯০৮ সালের ১৯ শে অক্টোবর। মামলায় অরবিন্দ ঘোষ উপর রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ আনা হয়। এই মামলা একমাত্র চিত্তরঞ্জন দাশ বিনা টাকায় লড়েন। আসামীদের বিরুদ্ধে এই মামলা চলে ১২৬ দিন। দু’শর বেশী সাক্ষীকে জেরা করা হয়। ৪০০০ কাগজপত্র এবং ৫০০ জিনিসপত্র প্রমাণ হিসেবে হাজির করা হয়। চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁর সওয়াল জওয়াবের পরিসমাপ্তি বক্তব্য দেন ৯ দিন ধরে। আলীপুর মামলার শুনানী শেষ হয় ১৯০৯ সালের ১৩ এপ্রিল এবং মামলার রায় ঘোষণা হয় ৬ মে। মামলার রায়ে ৩৬ জন আসামীর মধ্যে বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ এবং বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তকে ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়। অন্য ১৭ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে দ্বীপান্তর ও কারাদণ্ড প্রদান করে।
আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ ও বিপ্লবী উল্লাসকর দত্ত ১৩ মে এবং অন্য ১৭ জন ১৭ মে হাইকোর্টে আপীল করেন। আপিল মামলার বিচারক ছিলেন কার্নডফ ও জেনিকসন। ১৯০৯ সালের ২৩ আগস্ট হাইকোর্ট রায় ঘোষণা করে। উক্ত রায়ে বিপ্লবী বারীন্দ্র কুমার ঘোষ এবং বিপ্লবী উল্লাসকর দত্তের ফাঁসির আদেশ রদ করে যাবজ্জীবন দ্বীপন্তর দেন। এ দুজন ছাড়া উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও হেমচন্দ্র কানুনগোর যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর বহাল রাখা হয়। বিভূতিভূষণসহ অন্যান্য কয়েকজনের যাবজ্জীবন দ্বীপন্তর রদ করে ১০ বছর দ্বীপান্তর দেয়া হয় আর সুধীর চন্দ্র সরকার, অবিনাশ চন্দ্র ভট্টাচার্য ও পরেশ চন্দ্র মৌলিকের রায় রদ করে ৭ বছরের দ্বীপান্তর দেয়া হয়। শিশির কুমার ঘোষ ও নিরাপদ রায়ের রায় রদ করে ৫ বছরের জন্য সশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হয়। একজন আসামীকে মুক্তি দেন এবং অন্য ৫ জন আসামীর রায় নিয়ে বিচারকদের মধ্যে দ্বিমত দেখা দেয়। যার জন্যে তৃতীয় জজ রিচার্ড হ্যারিংটন উক্ত ৫ জনের পুনঃ বিচার করেন। তিনি রায়ে ৩ জনের মুক্তি এবং ১ জনের ৭ বছর দ্বীপান্তর ও ১ জনের ৫ বছর সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করে। হেমচন্দ্রকে আন্দামানে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দেয়া হয়, কিন্তু ১৯২১ সালে মুক্তি পান।
প্রকাশিত গ্রন্থ
১৩২৯ (১৯২২) সালের আশ্বিন থেকে ১৩৩৪ (১৯২৭) সালের মাঘ পর্যন্ত ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকায় তাঁর বিপ্লবী জীবনের ধারাবাহিক কাহিনি লেখেন হেম। সেই প্রবন্ধগুলিকে একত্র করে ১৯২৮ সালে কমলা বুক ডিপো বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা নামে বই বার করে। জীবনের শেষ দিকে হেম এই কিংবদন্তিসম বইখানির একটি পরিবর্ধিত সংস্করণের পাণ্ডুলিপি তৈরি করে গিয়েছিলেন। এ ছাড়া লিখেছেন এডোয়ার্ড বেলামির সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা অবলম্বনে 'অনাগত সুদিনের তরে' বইটি। এখানে সমাজ, রাজনীতি, এমনকি নরনারীর যৌন সম্পর্ক বিষয়ে তাঁর স্বচ্ছ চিন্তার সাহসিকতা অবাক করে। তাঁর আর একটি বড় পরিচয় হল, তিনি এক জন চিত্রশিল্পী। লিখেছেন বেশ কিছু স্বরচিত কবিতা ও গান। তাঁর একটি রামপ্রসাদী প্যারডি -
‘দেশ বলে যারে বল মন
সে ত ত্রিশ কোটীর জেলখানা।
তফাত শুধু বুঝে দেখ মন, খাঁচায় আর চিড়িয়াখানা
(তার) এ ধারে যা ও ধারেও তা, মাঝখানেতে দেয়ালখানা।’

হেমচন্দ্র জানাচ্ছেন, ১৯০২ সালের মাঝামাঝি নাগাদ তিনি ‘সিক্রেট সোসাইটি’ গঠনের ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হন। লাঠি, তলোয়ার, কুস্তি, বক্সিং শেখানো হত সেখানে। ‘সভ্য শ্রেণিভুক্ত হতে হলে তলোয়ার সাক্ষ্য করে, গীতা ছুঁয়ে দীক্ষা নিতে হত।’ কিন্তু এর আগে ‘আমাদের কোনো মন্ত্র ছিল না, ধর্ম কিংবা ভগবানের সঙ্গে কোনো সম্বন্ধ ছিল না।’ এমনকি ১৯০৪ সালেও ‘যোগসাধনায় সিদ্ধ, বুদ্ধ, মুক্তপুরুষ না হলে যে সহকারী নেতা হওয়ার, আর সাধনারত না হলে যে চেলা হওয়ার অধিকারী হতে পারে না, এ বিধান তখনও প্রচলিত হয়নি। নিষ্কাম কর্মের বড়াই করবার ফ্যাশন তখনও প্রচলিত হয়নি।’ সে-‘ফ্যাশন’ চালু করবার জন্য অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ নেতাদের দায়ী করেছেন হেম: ‘অনেক চেষ্টা সত্ত্বেও লোকের মনে গুপ্ত সমিতির আদর্শ শেকড় গাড়তে পারছে না’ দেখে ‘নেতারা ভাব প্রচারের সময়, ধর্মের ফোড়ন আর ভগবান, কালী, দুর্গা ইত্যাদির দোহাই দিতে শুরু করেছিলেন।’
শেষ জীবন

১৯২১ সালে তিনি জেলজীবন থেকে মুক্তি পান। মুক্তি পেয়ে কিছুদিন ছবি এঁকে জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করেন। পরবর্তী জীবনে কিছুকাল মানবেন্দ্রনাথ রায়ের দলের সংগে কাজ করার চেষ্টা করেন। জীবনের শেষভাগে স্বগ্রামে নির্বিঘ্ন শান্তিতে কাটান। এসময় ছবি আঁকা ও ফটোগ্রাফি নিয়ে থাকতেন।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71