সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
শহীদ বিনয় কৃষ্ণ বসুর ৮৬তম মৃত্যূবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৮:১৭ am ১৩-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৮:১৭ am ১৩-১২-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং অগ্নিযুগের বিপ্লবী শহীদ বিনয় কৃষ্ণ বসু (জন্মঃ- ১১ সেপ্টেম্বর, ১৯০৮ - মৃত্যুঃ- ১৩ ডিসেম্বর, ১৯৩০ )

বিনয় বসু ও তাঁর সহযোদ্ধারা নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স দলে যোগ দেন ১৯২৮ সালে। অল্পদিনের মধ্যেই বিনয় এই সংগঠনের ঢাকা শাখা গড়ে তুলেন। অচিরেই রাজবন্দীদের উপর পুলিশী নির্যাতনের বিরূদ্ধে তাঁর সংগঠনটি রুখে দাঁড়ায়। ১৯৩০ সালে বিপ্লবীরা পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল লোম্যানকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেন। লোম্যানের মিটফোর্ড হাসপাতালে এক সহকর্মীকে দেখতে আসার কথা ছিল। ১৯৩০ সালের ২৯ আগস্ট বিনয় সাধারণ বেশভূষায় নিরাপত্তা গন্ডীকে ফাঁকি দিয়ে লোম্যানের খুব কাছে চলে এসে তাকে গুলি করেন। ঘটনাস্থলেই লোম্যানের মৃত্যু হয় এবং তাঁর সঙ্গে থাকা পুলিশের সুপারিন্টেন্ডেন্ট হডসন গুরুতর আহত হন। পুলিশ ঘিরে ফেলল এলাকা। কে খুন করল? কোথায় সে? একে একে সবাইকে জেরা করল পুলিশ। যে ঝাড়ুদার হাসপাতালের মেঝে ঝাড়ু দিচ্ছিল তাকেও জেরা কর হল। কিন্তু মুহুর্তের মধ্যে ঝাড়ুদার বনে যাওয়া বিনয়কে চিনতে পারল না পুলিশ। পালালেন বিনয়। প্রকাশ্য দিবালোকে বাংলার ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এফ জে লোম্যানকে হত্যা করার পর এক আততায়ীর নিরাপদে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঢাকা পুলিশের অকর্মণ্যতার পরিচায়ক। অকর্মণ্যতার গ্লানি দূর করার জন্য আসামীর সন্ধান করতে পুলিশ হন্যে হয়ে ছোটে শহরের ওলি-গলিতে। জনসাধারণকে মারধর শুরু করে। যুবকদের ধরে থানায় আটক রেখে নির্যাতন চালায়। এসময় ঢাকাবাসী পুলিশের অন্যায় অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে উঠে। পুলিশের অত্যাচারের ভয়ে অনেক স্কুল-কলেজের ছাত্ররা ঢাকা ছেড়ে গ্রামে চলে যায়। লোম্যান হত্যাকারী আততায়ীকে পুলিশ ধরতে সক্ষম না হলেও তাঁর সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে পেরেছিল। আততায়ী যুবকের নামঃ বিনয় বসু। তাঁর বাবার নামঃ রেবতী মোহন বসু। গ্রামঃ রাউথভোগ, বিক্রমপুর। পেশাঃ মেডিকেল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। বিনয় বসুকে গ্রেফতার করার জন্য পুলিশ সারা বাংলা তন্নতন্ন করে খোঁজে। সর্বত্র বিনয় বসুর ছবিযুক্ত পোস্টার লাগিয়ে দেওয়া হয়। ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মোটা অংকের টাকা, দশ সহস্র মুদ্রা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু কোথাও বিনয় বসুকে পাওয়া গেল না। কেউ ধরিয়েও দিল না।

পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে বিনয় কলকাতা শহরে পালিয়ে যান। পুলিশ তাঁকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য ৫০০০ রূপি পুরস্কার ঘোষণা করে।

রাইটার্স ভবনে হামলা
বিপ্লবীদের পরবর্তী লক্ষ্য ছিল কারা কর্তৃপক্ষের ইন্সপেক্টর জেনারেল কর্নেল এনএস সিম্পসন। রাজবন্দীদের উপর অত্যাচার চালানোর জন্য সিম্পসন বিপ্লবীদের কাছে কুখ্যাত ছিলেন। তাঁরা সিম্পসনকে হত্যার সাথে সাথে ব্রিটিশ সরকারের মধ্যে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য তদানিন্তন সচিবালয়ে - কলকাতা শহরের রাইটার্স ভবন (বর্তমানে বিবাদি বাগে অবস্থিত) - হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নেন।

১৯৩০ সালের ৮ ডিসেম্বর আক্রমণের জন্য তিন বিপ্লবী বিনয় বসু, বাদল গুপ্ত ও দিনেশ গুপ্ত সকল প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। খুব সতর্ক অবস্থায় তাঁদের প্রশিক্ষণের কাজও সমাপ্ত হল। ৮ ডিসেম্বর বেলা ১২টার সময় সামরিক পোশাক পরে তিনজন বাঙালী যুবক এসে কর্নেল সিম্পসনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। তাঁরা সিম্পসনের চাপরাশীকে (সহকারী) ঠেলে কামরার ভিতরে প্রবেশ করেন। হঠাৎ পদধ্বনী শুনে কর্নেল তাঁদের দিকে তাকান। বিস্ময়-বিমূঢ় চিত্তে দেখতে পান সম্মুখে মিলিটারী পোশাক পরে তিনজন বাঙালী যুবক রিভলবার হাতে দণ্ডায়মান। মুহূর্তের মধ্যে বিনয়ের কণ্ঠে ধ্বনিত হয় প্রে টু গড কর্নেল। ইওর লাষ্ট আওয়ার ইজ কামিং। কথাগুলি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনটি রিভলবার হতে ছয়টি গুলি সিম্পসনের দেহ ভেদ করে। সিম্পসন লুটিয়ে পড়ে মেঝের উপর। এরপরই গুলির আঘাতে আহত হন জুডিসিয়েল সেক্রেটারী মি. নেলসন। এলোপাথাড়ি গুলি বর্ষণ করতে করতে আততায়ীরা পরবর্তী লক্ষ্য হোম সেক্রেটারী আলবিয়ান মারের কক্ষের দিকে অগ্রসর হন। ততক্ষণে এই আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য ছুটে আসেন পুলিশ-ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. ক্র্যাগ ও সহকারী ইন্সপেক্টর জেনারেল মি. জোনস। তাঁরা কয়েক রাউণ্ড গুলিও ছোঁড়েন। কিন্তু বিনয়-বাদল-দীনেশের বেপরোয়া গুলির মুখে তাঁরা দাঁড়াতে পারলেন না। প্রাণ নিয়ে পালালেন। 'রাইটার্স বিল্ডিং' আক্রমণের সংবাদ পেয়ে পুলিশ কমিশনার টেগার্ট আসেন। ডেপুটি কমিশনার গার্ডন আসেন সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে। জুডিসিয়েল সেক্রেটারী মি. নেলসন, মি. টয়নয় প্রমুখ অনেক ইংরেজ রাজপুরুষ আহত হলেন। আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য ডেকে আনা হল গুর্খা বাহিনীকেও।

ব্রিটিশদের হাতে ধরা দেবেন না তারা এমন সংকল্প ছিল তাদের। যতক্ষন রিভলভারে গুলি ছিল তারা এই অসম যুদ্ধ করে গেলেন। সামনে যে ব্রিটিশকে পেলেন তাকেই গুলি করলেন তারা। তাদের গুলিতে আহত হলেন অপর দুইজন বৃটিশ সাহেব- নেলসন এবং টিয়ানম্যান। রাইটার্স বিল্ডিং থেকে বের হয়ে আসা সম্ভব ছিল না তা ভাল ভাবেই জানতেন তিন বিপ্লবী। তারা জানতেন মৃত্যুকেই তারা বরন করতে যাচ্ছেন। ফুরিয়ে এসেছে গুলি। আশ্রয় নিলেন সচিবালয়ের খালি পাসপোর্ট ঘরে। সেখানে চেয়ারে বসেই সায়ানাইডের ক্যাপসুল খেলেন বাদল। আর নিজেদের রিভলভার দিয়ে নিজেদেরকে গুলি করে আত্মহত্যার চেস্টা করলেন বিনয় এবং দীনেশ। বিনয় ছিলেন মেডিকেল স্কুলের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি জানতেন মৃত্যুর পথ। ১৯৩০ সালের ১৩ ডিসেম্বর রাতে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় আকাঙ্খিত মৃত্যুকে বরণ করার জন্য মস্তিষ্কের ব্যাণ্ডেজের ভিতর অঙ্গুল ঢুকিয়ে স্বীয় মস্তিষ্ক বের করে আনেন এবং মৃত্যুকে বরণ করে নেন বিনয় বসু। হাসপাতালে অজ্ঞান অবস্থায় বিনয় উচ্চারন করেছিলেন দুর্বোধ্য শব্দ লেফট রাইট লেফট।

হাসপাতালে ১৯৩০ সালের ১৩ই ডিসেম্বর বিনয়ের মৃত্যু হয়।

বিনয়-বাদল-দীনেশের এই আত্মত্যাগের স্মরণে কলকাতার ডালহৌসি চত্ত্বরের নাম করণ করা হয় বিবাদি বাগ।

জন্ম
বিনয় বসুর জন্ম হয় মুন্সিগঞ্জ জেলার রোহিতভোগ গ্রামে। তাঁর পিতা রেবতীমোহন বসু ছিলেন একজন প্রকৌশলী। ঢাকায় ম্যাট্রিক পরীক্ষা পাস করার পর বিনয় মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল এ ভর্তি হন। এসময় তিনি ঢাকার ব্রিটিশ বিরোধী বিপ্লবী হেমচন্দ্র ঘোষের সংস্পর্শে আসেন এবং যুগান্তর দল এর সাথে জড়িত মুক্তি সঙ্ঘে যোগ দেন। বিপ্লবী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার জন্য তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে তাঁর পড়ালেখা শেষ করতে পারেননি।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71