শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
শহীদ মনোরঞ্জন ঘোষের পরিবারের সান্ত্বনা শুধু বঙ্গবন্ধুর চিঠি
প্রকাশ: ১০:২১ am ২১-১২-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৪৬ am ২১-১২-২০১৭
 
বিয়ানীবাজার প্রতিনিধি
 
 
 
 


'প্রিয় ভাই,/ আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য পুত্র আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক-সন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি।/ এমন নিঃস্বার্থ মহান দেশপ্রেমিকের পিতা হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যি আপনি ধন্য হয়েছেন।' একটু নিচে আলাদা প্যারায় আবারও লেখা, 'আমার প্রাণভরা ভালবাসা ও শুভেচ্ছা নিন।' 

৪৫ বছরে চিঠিটি অনেকটাই বিবর্ণ হয়ে গেছে। তবু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাঠানো এই সান্ত্বনাপত্র সযত্নে আগলে রেখেছে শহীদ মনোরঞ্জন ঘোষের পরিবার। মুক্তিযুদ্ধে একদিনে, এক নিমিষে তাদের পরিবার ও আত্মীয়কুলের ১৪ জনের মধ্যে ১৩ জনই উৎসর্গ করেছেন তাদের জীবন। বিনিময়ে বঙ্গবন্ধুর পাঠানো এই চিঠিটিই একমাত্র সান্ত্বনা তাদের। এমনকি শহীদ পরিবারের স্বীকৃতিও পাননি তারা।

পরিবারের সবার শহীদানের এ ঘটনা ঘটে ১৯৭১ সালের ২১ জুলাই বিকেল ৪টার দিকে। সিলেটের বিয়ানীবাজার এলাকার শান্তি কমিটির সভাপতি ছিলেন তৎকালীন মুসলিম লীগ নেতা আবদুর রহিম (বচন আজি)। তার ডান হাত রাজাকার কুটুমনার প্ররোচনা ও সহযোগিতায় পাকিস্তানি বাহিনী সেদিন সুপাতলা গ্রামে সুধীর রঞ্জন ঘোষের ভাই মনোরঞ্জন ঘোষ ও উমানন্দ ঘোষের বাড়িতে হামলা চালায়। দুই পরিবারের ১৪ জন সদস্যকে ধরে নিয়ে যায় তারা। তার পর তাদের রাধা টিলা বধ্যভূমিতে দাঁড় করিয়ে নির্বিচারে গুলি চালায়। পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে সেদিন ১৩ জনই শহীদ হন। তবে মুহুর্মুহু গুলির মধ্যে মৃত্যুকে বরণ করে নিতে নিতেও হিরণ বালা ঘোষ তার কোলের মধ্যে আগলে রাখেন দুই বছরের শিশু মলয় ঘোষকে।

সন্ধ্যার পর বধ্যভূমিতে কান্নার শব্দ শুনে তৎকালীন পুলিশ কর্মকর্তা, গোলাপগঞ্জ থানার রায়গড় এলাকার বাসিন্দা আবদুল মতিন মলয়কে নিজ জিম্মায় নিয়ে যান। তবে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিউমোনিয়ায় মলয়েরও মৃত্যু ঘটে।

ঘোষ পরিবারের জীবিত একমাত্র সদস্য মনোরঞ্জন ঘোষের ছেলে মহেশ রঞ্জন ঘোষ বলেন, 'মুক্তিযুদ্ধে বাবা, মা, ঠাকুরমা, কাকা, ভাইবোনসহ সাতজনকে হারিয়েছি। কাকার পরিবারের সঙ্গে আমি ও বড় দুই বোন ভারতে পিসির বাড়ি চলে যাওয়ায় বেঁচে যাই। আমি তখন সাত বছরের শিশু।'

পাকিস্তানি সেনাদের গুলিতে সেদিন নিহত হন মহেশের বাবা মনোরঞ্জন ঘোষ (৫৩), মা হিরণ বালা ঘোষ (৩৭), ঠাকুরমা ক্ষেত্রময়ী ঘোষ (৬৮), কাকা নরেশ চন্দ্র ঘোষ (৫৮) এবং ভাই মুকুল রঞ্জন ঘোষ (১৬), বোন অমিতা ঘোষ (৯) ও সীতা (৫)। মহেশদের আপনজন ও প্রতিবেশী নন্দ ঘোষের পিতা বীরেন্দ্র ঘোষকেও গুলি করে হত্যা করা হয় ওইদিন। অন্য পাঁচজনও তাদের প্রতিবেশী উমানন্দ ঘোষ (৬৫), তার স্ত্রী চারুবালা ঘোষ (৫০), ভাই মহানন্দ ঘোষ (৫০) ও বীরেন্দ্র চন্দ্র ঘোষ (৪২), বীরেন্দ্র চন্দ্রের দুই শিশুসন্তান নিখিল চন্দ্র ঘোষ (১২) ও কৃষষ্ণ চন্দ্র ঘোষ (১০)।

১৯৭২ সালের ৬ এপ্রিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ মনোরঞ্জন ঘোষের ছোট ভাই সুধীর রঞ্জন ঘোষের কাছে সান্ত্বনাপত্র পাঠান। তার পরিবারকে তখন দুই হাজার টাকা অনুদানও দেওয়া হয়। ২০০২ সালে বিয়ানীবাজার পৌরসভার রাধা টিলা বধ্যভূমিতে স্থাপিত হয় স্মৃতি ফলক। এ স্মৃতি ফলকে উৎকীর্ণ হয় ১৩ শহীদের নাম।

মহেশ রঞ্জন বলেন, '২০০২ সালে শহীদ পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত করতে সরকারের নির্ধারিত ফরম পূরণ করলেও অজানা কারণে আমাদের পরিবারের নাম তালিকাভুক্ত হয়নি।' তিনি বলেন, 'স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে বেঁচে আছি। এ যন্ত্রণা সবার পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।' তিনি প্রশ্ন করেন, রাষ্ট্র কি তাদের শহীদ পরিবারের স্বীকৃতি দেবে না?

এ প্রসঙ্গে বিয়ানীবাজার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মু. আসাদুজ্জামান বলেন, 'বিষয়টি আমরা জানতে পেরেছি। তারা শহীদ পরিবারের তালিকাভুক্ত হতে আবেদন করেছিলেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে এ বিষয়ে জানানো হবে। বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখার জন্য মন্ত্রণালয়ে শিগগিরই একটি অনুরোধপত্র পাঠাব। আশা করি, দ্রুতই ঘোষ পরিবারের নাম শহীদ তালিকায় স্থান পাবে।' 


প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71