বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের উদ্যোগে
শুক্রবার অনুষ্ঠিত হবে বর্ণবাদ বিরোধী কনভেনশন-২০১৮
প্রকাশ: ০৯:৪৫ pm ০৯-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০৯:৪৫ pm ০৯-০৫-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের উদ্যোগে বর্ণবাদ বিরোধী কনভেনশন-২০১৮ অনুষ্ঠিত হবে। রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাবে শুক্রবার সকাল ৯ টায় অনুষ্ঠানটি অনুষ্ঠিত হবে।

মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশের ঘোষণাপত্রটি উল্লেখ করা হলো:

মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ ২০১৫ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর. সি. মজুমদার অডিটোরিয়ামে "জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ" বিষয়ে দিনব্যাপী এক মত বিনিময় সভার আয়োজন করেছিলো। সে মত বিনিময় সভায় আমরা ঘোষণা করেছিলাম পরবর্তীতে ফোরাম "বর্ণবাদ বিরোধী কনভেনশন"-এর আয়োজন করবে। দীর্ঘ দিন পরে হলেও সে কনভেনশন আজ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ তারিখের সভায় আমরা মূলত বর্ণের উদ্ভব ও বিকাশ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। কনভেনশনের মাধ্যমে আমরা ঠিক করতে চাই কিভাবে আমরা বর্ণবাদের বিরোধীতা করবো এবং পরবর্তী কার্যক্রমের উদ্দেশ্যে একটি ঘোষণাপত্র গ্রহন করাও এই কনভেনশনের অন্যতম লক্ষ।

আমরা এমন এক সময় এ কনভেনশনের আয়োজন করতে যাচ্ছি, যখন বাংলাদেশের হিন্দুদের অস্তিত্ব নিয়ে অনেকেই আশংকা প্রকাশ করেছেন। এর কিছু বাস্তবতাও আছে। ১৯৪৭ সালে এদেশে হিন্দুর শতকরা হার ছিলো ৩০ ভাগ, ২০১৮ সালে এসে তা শতকরা ১০ ভাগের নীচে নেমে গেছে। ক্রম রাশমান এ চিত্র শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষকে বিচলিত করে বৈকি!

মাইনরিটি রাইটস ফোরাম বাংলাদেশ মনে করে বাংলাদেশের হিন্দুদের ক্রমহ্রাসমান চিত্রের অনেক কারন আছে। তার মধ্যে দু'টি প্রধান কারণ-
১. রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন, নির্যাতন ও বঞ্চনা এবং ২. হিন্দুদের অভ্যন্তরীন ঐক্যের অভাব।

সংখ্যালঘুদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপিড়ন, নির্যাতন ও বঞ্চনা সব দেশে কম বেশী আছে। সংখ্যালঘুদের সে সবের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করেই টিকে থাকতে হয়। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে মুসলমানরা সংখ্যালঘু এবং তারাও বঞ্চিত। অথচ ১৯৪৭ সালের তুলনায় ভারতে মুসলমানের সংখ্যা কমেনি, বরং বেড়েছে। কারন তারা প্রতিরোধ করে টিকে আছে। তাহলে বাংলাদেশের হিন্দুরা প্রতিরোধ করে টিকে থাকতে পারছে না কেনো? হিন্দুদের কি প্রতিরোধের শক্তি দূর্বল? সে দূর্বলতার কারন কি?

প্রথমত এ দূর্বলতার কারন অভ্যন্তরিন ঐক্যের অভাব বলে আমরা মনে করেছি। সে বিচারে অভ্যন্তরিন ঐক্যকে সুদৃঢ় করে হিন্দুদের বাংলাদেশে টিকে থাকতে হবে।

হিন্দুদের অভ্যন্তরিন ঐক্যের পক্ষে বাধা নানাবিধ। তবে সর্ব প্রধান বাধা জাতপাত-বর্ণবাদ। সে বাধা কিভাবে অতিক্রম করা যায় সেটাই আজকের কনভেনশনের আলোচ্য বিষয়।

আনুমানিক তিন হাজার বছর বা তারও কিছু আগে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ ব্যবস্থায় বর্ণ প্রথার উদ্ভব ঘটে। কায়িক শ্রম ও বৃত্তির প্রতি অবজ্ঞার মনোভাব এবং পরবর্তীতে শ্রমজীবী মানুষের সাথে অভিজাতদের সাংস্কৃতিক ব্যবধান বর্ণ প্রথার কারন হয়ে থাকতে পারে। সমাজের বৃহত্তর অংশ শ্রমজীবী, তাদের সবাইকে একটি নীচু বর্ণে ফেলে দিলে, সবাই মিলে বিদ্রোহ করতে পারে; সে চিন্তা থেকে বর্ণব্যবস্থাকে সাজানো হলো স্তরীভূত শীলার মতো করে। সবার উপরে ব্রাহ্মণ, তার নীচে ক্ষত্রিয়, তার নীচে বৈশ্য, তার নীচে শূদ্র। আমরা এ চতুর্বর্ণ ব্যবস্থার কথা সাধারণত জানি। তবে বাস্তবত এ চতুর্বর্ণের বাইরে বিরাট অংশের মানুষকে রাখা হয়; যাদের বলা হতো ব্রাত্য (ব্রতহীন) বা অন্ত্যজ (অন্তে বাসী) বা পঞ্চমবর্ণ। এদের প্রতি অবজ্ঞার মনোভাব ঘৃণায় পর্যবশিত হয় এবং সমাজে তাদের অস্পৃশ্য করে রাখা হয়। অস্পৃশ্যতা বর্ণবাদের নিকৃষ্টতম রূপ।

পৃথিবীর সব অঞ্চলেই কোনো না কোনো আকারে শ্রেনী বিভাজন দেখা দিয়েছিলো। তবে সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শ্রেনীরও রূপান্তর হতে থাকে। ইউরোপে প্রাচীন কালের শ্রেনী বিভাজন সামন্ততান্ত্রিক সমাজে এসে থাকেনি। আবার সামন্ততান্ত্রিক সমাজের শ্রেনী বিভাজন পুঁজিবাদী সমাজে এসে রূপান্তরিত হতে বাধ্য হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষত হিন্দু সমাজ ব্যবস্থা তার ব্যাতিক্রম। শ্রেনীতত্ত্বকে শাস্ত্রের প্রক্ষিপ্ত অংশের সাথে জুড়ে দিয়ে এমন ভাবে প্রচার চালানো হয়েছে যেনো বর্ণ প্রথা ধর্মের অনুসঙ্গ। ফলে প্রাচীন ভারতের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ বর্ণ প্রথা সব সমাজ ব্যবস্থাকে অতিক্রম করে আজো টিকে আছ। আদিম যুগের এরকম অবশেষ হিন্দুদের মতো আর কোনো সমাজ বহন করে না।

হিন্দু দর্শনে কিছু উদার মতবাদ আছে - যা বিশ্ব মানবতার কথা বলে। কিন্তু দুঃখ জনক হলেও সত্য, সে দর্শনে এক বিষবৃক্ষ আছে, যা হিন্দুদের গভীর থেকে দূর্বল করে দেয়, বেকুফ বানায়, মাদকাশক্ত করে, বিভক্ত করে রাখে এবং অবশেষে নিঃশেষ করে দেবার জন্য যথেষ্ট। আর সে বিষবৃক্ষের নাম বর্ণবাদ।

সাধারণ মানুষের চিন্তার মধ্যে ধর্মবোধ কাজ করে। বর্ণ ব্যবস্থাকে ধর্মের অনুসঙ্গ করায় সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করতে শুরু করলো বর্ণ ঈশ্বর নির্নয় করেছে। ফলে এর বিরোধীতা করা হয়ে দাড়ালো এক কঠিন কাজ। প্রাচীন ভারতে অনেকেই বর্ণ প্রথার বিরুদ্ধে কথা বলতে শুরু করেন। কিন্তু তাদের বক্তব্যকে জনমানসে স্থায়ী করা সম্ভব হলো না। উপনিষদের ঋষিরা তাদের অন্যতম। এছাড়া গৌতম বুদ্ধ, মহাবীর, মকখলি গোসাল - এর মতো অনেকেই বর্ণের ক্রমচ্চ বিন্যাসের বিরুদ্ধে প্রচার চালান। এর মধ্যে গৌতম বুদ্ধের মতবাদ জনমানসে প্রভাব ফেললেও, অন্য মতবাদ প্রান্তিক থেকে যায়। বর্ণবাদীরা গৌতম বুদ্ধকেও পরবর্তীতে আত্মীকরণ করে নেয় এবং তাকে হিন্দুদের অন্যতম অবতার হিসাবে প্রচার করে।

শাস্ত্রে বর্ণ প্রথা সম্পর্কিত প্রথম ভাষ্যে যা বলা হয়েছিলো তাতে জন্মের ভিত্তিতেই বর্ণ নির্নয় হবার কথা। সে ভাষ্যকে অবিকৃত রেখে নোতুন ভাষ্য এলো। সেখানে জন্ম নয়, গুণ ও কর্ম বর্ণ নির্নয়ের মানদণ্ড এবং দু'টো ভাষ্যই আজো অবিকৃত আছে। এই পরস্পর বিরোধী ভাষ্য থেকেও বর্ণবাদকে নেতিবাচক বলা যেতে পারে। আসলে ঈশ্বর বা ভগবানের নাম করে কিছু বিকৃত মানুষের ঔদ্ধত্য ও স্বার্থপরতার মূর্ত প্রকাশ হচ্ছে বর্ণবাদ। একে তারা চিরস্থায়ী করতে শাস্ত্রকে অবলম্বন করেছে। মুক্ত চিন্তা প্রয়োগ করতে পারলে আমরা বুঝতে পারবো বর্ণ সম্পর্কিত পরস্পর বিরোধী ভাষ্য দু'টি সৃষ্টিকর্তার হতে পারে না।

বর্ণ প্রথার পক্ষে অনেকেই দার্শনিকতা করেছেন। এর মধ্যে মনুর দার্শনিকতা সবাইকে ছাড়িয়ে গেছে। তার রচিত গ্রন্থের নাম মনুস্মৃতি বা মনুসংহিতা। মনুর হাতে এক একটি বর্ণ আবার বহু জাতপাতে বিভক্ত হয়েছে; তিনি জাতপাত সমূহকে ক্রমোচ্চ মর্যাদায় বিন্যস্ত করেছেন। তিনি সমগ্র নারীদের টেনে নামিয়েছেন শূদ্রের কাতারে। মনু শূদ্রের চাইতে নারীর প্রতি নির্মম ছিলেন। মনসংহিতা অনুযায়ী,"নারী শৈশবে অবশ্যই তার পিতার অধীন, যৌবনে পতির, পতি বিয়োগে পুত্রের; নারী কখনও স্বাধীন হতে পারে না।" মনু নারীদের জ্ঞান অর্জন ও নারীদের সম্পত্তির অর্জন নিষিদ্ধ করেছেন এবং তাকে গৃহে আবদ্ধ করেছেন। বর্ণবাদের এ উত্থান পর্বে পুরুষতন্ত্র আর বর্ণ প্রথা একাকার হয়ে গেছে। যে নারী কৃষি ব্যবস্থার উদ্ভাবন করলো বলে পুরুষের যাযাবর জীবনের অবসান হলো, বর্ণবাদে বলিয়ান হয়ে পুরুষতন্ত্র সে নারীকে প্রথমে গৃহিনী, শেষত রমণী করে রেখে দিলো। কোনো সমাজের মানুষ কতখানি স্বাধীন, তার বিশ্বজনীন মানদণ্ড হচ্ছে সে সমাজের নারীরা কতখানি শোষণমুক্ত ও স্বাধীন। এই চিন্তার ভিত্তিতে হিন্দু সমাজ পুণর্গঠনের ক্ষেত্রে নারী একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। নারীদেরও মনে রাখতে হবে বর্ণবাদ ও পুরুষতন্ত্র, একে অপরের পরিপূরক এবং একটি রেখে অন্যটিকে নির্মূল করা যাবে না। বর্ণবাদের বিরুদ্ধে নারীই হয়ে উঠতে পারে সব চাইতে বড় শক্তি। তাদের নিজেদের স্বার্থে এ শৃঙ্খল ভাঙ্গা জরুরী।

মনুসংহিতা কোনো ধর্মগ্রন্থ নয়; একে নিয়ম-নীতি, আইন-কানুন সম্বলিত গ্রন্থ বলা যেতে পারে। এর প্রভাব সমাজে অবশ্যই ছিলো, কিন্তু ধর্মগ্রন্থের মতো প্রভাব বিস্তার করেছিলো বলে মনে হয় না। অথচ সে গ্রন্থকে ঔপনেবেশিক শাসক ইংরেজরা ব্যবহার করলো হিন্দুদের মধ্যে বিভেদ তৈরীর আকর গ্রন্থ হিসেবে। মনুস্মৃতির ইংরেজী অনুবাদ (১৭৯৪) করেছিলেন স্যার ইউলিয়াম জোনস। তিনি ভূমিকায় লিখেছিলেন,"এই নীতি অনুসরণ করা হলে লক্ষ লক্ষ হিন্দু প্রজার সুপরিচালিত শ্রমের দ্বারা বৃটেনের সম্পদ বৃদ্ধি পাবে।" অন্যদিকে 'আ কোড অব জেন্টু লজ'-এর ভূমিকায় বলা হয়েছে,"দেশের যে সমস্ত প্রথা-প্রতিষ্ঠানের সাথে বিজেতাদের আইন বা স্বার্থের ঘোরতর সংঘাত হচ্ছে না, একমাত্র সেগুলি গ্রহন করলেই ভারতে বাণিজ্যের গুরুত্ব এবং বাংলায় আঞ্চলিক দখলদারির সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখা যেতে পারে।"

মনুসংহিতাকে হিন্দু আইনের মূল উৎস হিসাবে সামনে নিয়ে আসার আসল কারন ইংরেজরা যথার্থই চিহ্নিত করেছিলো। যে বাংলায় তারা প্রথম দখলদারি কায়েম করতে চেয়েছিলো বর্ণবাদের প্রভাব তুলনামূলক ভাবে সেখানে কম ছিলো। অথচ আধুনিক যুগে এসে অদ্ভুত ভাবে জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য সে বাংলাকে গ্রাস করতে লাগলো।

বাংলায় সেন আমলকে বর্ণবাদের যুগ বলা হয়। সেনদের পতনের পর একদিকে মুসলিম শাসকগোষ্ঠীর ভীতি এবং পরবর্তীকালে শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্যের প্রেম ধর্ম বর্ণবাদের সে প্রভাব কমিয়ে আনে। অথচ সে বর্ণবাদকে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী বাংলায় সুকৌশলে প্রতিস্থাপিত করলো হিন্দু আইন চালুর নামে। অনেকেই দাবী করবেন ইংরেজদের সাহায্য নিয়েইতো রাজা রামমোহন রায় সতীদাহ নিবারণ ও বিদ্যাসাগর বিধবা বিবাহ প্রবর্তন করেন। আপনারা যদি একটু লক্ষ করেন তাহলে বুঝতে পারবেন এ দু'টো আইন হিন্দু পরিবারকে সংস্কার করেছিলো, কিন্তু আধুনিক হিন্দু সমাজ গঠনের প্রধান বাধা জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য ইংরেজরা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছিলো।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে উনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় পঞ্চাশটিরও বেশী লোকধর্ম বা গণধর্মের উদ্ভব ঘটে। জাতপাত-বর্ণবাদকে অস্বীকার করে সমাজ পুণর্গঠন ছিলো এই সব ধর্ম আন্দোলনের অভিষ্ট লক্ষ। আদর্শগত বিবর্তনের ফলে এ সময় বাংলায় সমাজ পরিবর্তনের যে সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিলো তা বিপথগামী হলো ইংরেজ শাসকদের বিভেদ নীতি কারনে। এই অভিযোগ প্রমান করার জন্য মতুয়া ধর্মের উদ্ভব ও বিকাশের উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে।

মতুয়া আন্দোলনের মূল লক্ষ ছিলো জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে সনাতন ধর্মের পুণর্গঠন। সে কারনে মতুয়া ধর্মের আরেক নাম "সুক্ষ্ম সনাতন ধর্ম"। সে আন্দোলন দক্ষিণ বাংলায় যথেষ্ট সাফল্য লাভ করেছিলো। দক্ষিণ বাংলার বিভিন্ন জাতপাত, এমনকি ব্রাহ্মণরাও মতুয়া আন্দোলনে যোগদান করতে শুরু করে। এ সময় বাধা হয়ে দাড়ালো ইংরেজদের বিভেদ নীতি। ১৮৭২ সালের লোকগননায় মতুয়া ধর্মের প্রবর্তক শ্রীশ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের সমাজ নমঃশূদ্রদের মনুসংহিতায় বর্ণিত "চণ্ডাল" বলে চিহ্নিত করা হলো এবং বর্ণব্যবস্থার সর্বনিম্নে স্থান দিয়ে অস্পৃশ্যদের সাথে তালিকাভুক্ত করা হলো। নমঃশূদ্রের ইতিহাস ও ঐতিয্যের সাথে এ ঘটনার কোনো মিল ছিলো না। ফলে নমঃশূদ্র সমাজ নেতাদের মধ্যে বিরুপ প্রতিক্রয়া দেখা দিলো। তারা জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপের পরিবর্তে জাত পরিচয়ের উচ্চ মর্যাদার জন্য আন্দোলন শুরু করলো। একই রকম ঘটনার প্রতিক্রিয়া হিসেবে কৈবর্ত, রাজবংশী, পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়, বাগদী, ডোম, হাড়িসহ প্রায় সকলেই জাত-ব্যবস্থায় উচ্চ মর্যাদার জন্য আন্দোলনে নামলো। ১৯১১ সালের লোকগননার আগে এই সমস্ত জাতের কাছ থেকে যত দরখাস্ত জমা পড়েছিলো তার ওজন হয়েছিলো দেড় মন। যে আদর্শবাদী আন্দোলন জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে সমাজ পরিবর্তন করার কথা শাসকের বাস্তব অভিঘাতে তার গতিমূখ পাল্টে বিপরীত কাজ করলো।

বর্ণবাদী সংস্কৃতির খেলটা এখানেই। যারা বর্ণবাদের বিরোধীতা করে তারাও বুঝে উঠতে পারে না কোন মোচড়ে তারা নিজেরাই বর্ণবাদকে শক্তি যোগাচ্ছে। জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ সহজ বিষয় হতো, যদি সাধারণ হিন্দুদের চিন্তার মধ্যে বর্ণব্যবস্থায় উচ্চ মর্যাদা পাবার চিন্তা জাকিয়ে বসে না থাকতো। বর্ণবাদী চিন্তা মৌলিক সমস্যা, আচরনটা সে চিন্তার বাহিক্য প্রকাশ। চিন্তার ক্ষেত্রে এটা মেনে নেওয়া যে, সমাজ জাতপাত-বর্ণে বিভক্ত থাকবে এবং সেটা হবে স্তরীভূত শীলার মতো। লড়াইটা আসলে এই চিন্তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে করতে হবে। সাধারণ হিন্দুরা চেতনে বা অবচেতনে বর্ণবাদী চিন্তা-ভাবনাকে বয়ে নিয়ে বেড়ান। সাধারণ হিন্দুদের চিন্তার জগত থেকে বর্ণবাদী ভাবনা জেটিয়ে বিদায় করার জন্য দরকার "বর্ণবাদ বিরোধী সংস্কৃতি আন্দোলন।"

ইংরেজ শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার জাতি সমূহের স্বাধীনতা সংগ্রামের সমান্তরালে সমাজ পরিবর্তনের কাজেও এগিয়ে এসেছিলেন অনেকে। "জাতপাত তোড়ক মণ্ডল" সে ধারার একটি সংগঠন। ১৯৩৬ সালে "জাতপাত তোড়ক মণ্ডল"-এর লাহোর অধিবেশনে তারা বর্ণবাদ বিরোধী মহান চিন্তক ডঃ আম্বেদকরকে সভাপতি নির্বাচিত করেন এবং "বর্ণ বিলয়" শিরোনামে বক্তৃতা প্রস্তুত করতে বলেন। ডঃ আম্বেদকর বক্তৃতা প্রস্তুত করে আয়োজকদের কাছে পাঠালে আয়োজক সংস্থার সাথে বক্তৃতার বিষয় বস্তু নিয়ে মতবিরোধ দেখা দেয়। শেষ পর্যন্ত সে অধিবেশন বাতিল হয়। এভাবে অধিবেশন বাতিল না হলে দক্ষিণ এশিয়ার সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন ভিন্ন মাত্রা পেতো।

অধিবেশন না হলেও ডঃ আম্বেদকরের বক্তব্য পুস্তিকা আকারে প্রকাশিত হয়। বিষয়টি নিয়ে ডঃ আম্বেদকরের সাথে কংগ্রেসের একছত্র নেতা মোহন দাস করম চান্দ গান্ধীর বিতর্ক দেখা দেয়। ডঃ আম্বেদকর জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে হিন্দু সমাজ পুণর্গঠনের প্রস্তাব রাখেন। গান্ধীজী সে প্রস্তাবের বিরোধীতা করে জাতপাত বিলুপ্ত করে চতুর্বর্ণে হিন্দু সমাজের স্থিতির কথা বলেন। ডঃ আম্বেদকর বলেন বর্ণ টিকে থাকলে জাতপাত থাকবে: কারন বর্ণ হচ্ছে জাতপাতের পিতামাতা। কিন্তু গান্ধীজী তার সিদ্ধান্তে অবিচল ছিলেন এবং গান্ধীজীর অবস্থানকে ডঃ আম্বেদকর হিন্দু প্রগতিশীলতার সর্বোচ্চ পরিণতি মনে করে বর্ণ বিলয়ের চিন্তা স্থগিত রাখেন। গান্ধীজীর এ মনোভাব চতুর্বর্ণ ব্যবস্থাকে যে ভিত্তির উপর দাড় করিয়েছে তার ভ্রান্তি মোচন আমাদের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সাথে সাথে বাংলাও বিভক্ত হয়। পূর্ববাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশের মর্যাদা পায়। পূর্ববাংলার জনসংখ্যার ৩০ শতাংশই ছিলো হিন্দু। একদিকে পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর নির্যাতন, নিপিড়ন, বঞ্চনা অন্যদিকে হিন্দুদের জাতপাত-বর্ণে বিভক্ত সমাজ। জাতপাত-বর্ণে বিভক্ত একটি সমাজ একই সঙ্গে একটি রাষ্ট্রে সংখ্যালঘু হয়ে পড়লে তাকে তো তার অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনে হলেও জাতপাত-বর্ণ বিভাজনের উপরে উঠে আসতে হবে। সে ধরনের কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় হিন্দুদের অবস্থা ক্রমাগত শোচনীয় হয়ে উঠছে। পূর্ববাংলা ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করলেও হিন্দুদের অবস্থার কোনো হেরফের হয়নি। বাংলাদেশ একটি সাম্যবাদী রাষ্ট্র হবার পরেও এখানকার হিন্দুদের ভাগ্যের বদল হবে না, যদি না তারা জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে হিন্দু সমাজ পুণর্গঠন না করেন। এ কথা বার বার বলার দরকার বর্ণবাদ সমগ্র হিন্দু সমাজকে মাদকাশক্ত করে রেখেছে, বেকুফ বানিয়েছে, বিভক্ত করে রেখেছে, গভীর থেকে দূর্বল করে দিচ্ছে এবং শেষ পর্যন্ত হিন্দুদের নিঃশেষ করে দেয়।

বিরুদ্ধ পরিবেশে হিন্দুদের ভিতরকার অনৈক্য, অসাম্য, ভেদাভেদ, ঘৃনা কিভাবে তাদের ছিন্ন ভিন্ন করে দিতে পারে , তার উদাহরণ বাংলাদেশের ক্রম রাশমান হিন্দু সমাজ। পৃথিবীতে কোনো সমাজ ব্যবস্থাই অনড় নয়, শ্বাশত নয়। পরিবর্তনই জগতের রীতি। পরিবর্তীত পরিস্থিতিতে একটি সমাজের পরিবর্তনের সুযোগ না থাকলে সে সমাজকে রক্ষা করা যায় না। পরিবর্তনশীল সনাজে পুরাতন মূল্যবোধের পুণর্বিবেচনা করা আবশ্যক। সামাজিক পরিবর্তনের অর্থ হচ্ছে অতীতকে বর্তমানের উপযোগী করে তোলা এবং বর্তমানকে অতীতের অর্থহীন অনুকরণ থেকে বিরত রাখা। বাংলাদেশের হিন্দু সমাজকে রক্ষা করার জন্য তাই জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে হিন্দু সমাজ পুণর্গঠন একান্ত জরুরী হয়ে পড়েছে।

জাতপাত-বর্ণবাদ বিষয়ে কথা উঠলেই অনেকে বলেন বাংলাদেশে জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য নেই। এ কথা বলে তারা আসলে বুঝাতে চান ভারতে বর্ণের কারনে যে নির্যাতন হয়, বাংলাদেশে তা হয় না। এটা তো স্বাভাবিক। কারন ভারতে বর্ণ হিন্দু শাসকগোষ্ঠী হিসাবে নিম্নবর্ণের হিন্দুদের উপর নির্যাতন করে। বাংলাদেশে বর্ণ হিন্দুরাও এখানকার শাসকগোষ্ঠীরর কাছে নির্যাতীত, তারা আবার নিম্নবর্ণের হিন্দুদের নির্যাতন করবে কিভাবে! বাংলাদেশে জাতপাত-বর্ণ বৈষম্যের মানদণ্ড তাই বর্ণবাদী নির্যাতনের মাত্রা দিয়ে হবে না; তার মানদণ্ড নিয়ে আমাদের সমাজের গভীরে প্রবেশ করতে হবে।

বাংলাদেশে জাতপাত কি আকারে আছে তা বোঝার জন্য বগুড়ার সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে। মনীষা বাশফোড় ও বিশাল ডোম পরস্পরকে ভালবাসতো। বিগত ১১ মার্চ ২০১৮ তারিখে অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া তারা বিয়ে করে। কিন্তু এ বিয়ে বাশফোড় সমাজ মেনে নেয় না। বাশফোড়দের ধারনা তারা ডোমদের থেকে কুলীন। তারা জোর করে শাখা ভেঙ্গে শিদূর মুছে তাদের সমাজের মেয়েকে ঘরে তোলে। পরবর্তীতে একটি শালিশ অনুষ্ঠিত হয়। শালিশে বিশাল ডোমের দুই লক্ষ টাকা জরিমানা হয়। অথচ মনীষা বিশালকে এতটাই ভালবাসে যে আবার বাড়ি ছেড়ে চলে আসে। বাশফোড় সমাজ আবার তাকে জোর করে ঘরে নিয়ে যায় এবং দ্রুত বিয়ের ব্যবস্থা করে। দলিত ও হরিজন সমাজের অনেক অলোকপ্রাপ্ত যুবক-যুবতী চাইছিলো মনীষা ও বিশালের প্রণয় স্থায়ী হোক। অথচ সে সমাজের বর্ণবাদী সংগঠনের কাছে ভালবাসাকে পরাজিত হতে হয়েছে।

বাংলাদেশে এভাবেই প্রতিটি জাত-সম্প্রদায় তাদের যুবক-যুবতীদের নিজ জাতের মধ্যে বিয়ে দিয়ে থাকে। তাই বাংলাদেশে একজন হিন্দু সমাজ নেতার পক্ষে একথা বলাই যথেষ্ট নয় যে, তিনি জাতপাত মানেন না। তার আরো দায়িত্ব থেকে যায়। আর তাহলো জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করা।

আমাদের এই উদ্যোগ নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন। অনেক বড় বড় উদাহরণ টেনে বলতে পারেন সে সমস্ত উদ্যোগের ফলে জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ না হলে এখন হবে কেনো?

আসলে অনেক আদর্শবাদী আন্দোলন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে সফল নাও হতে পারে। আবার বাস্তব অভিঘাতে তার কতক সফলতা আসতেও পারে। আমরা অস্পৃশ্যতা বিরোধী আন্দোলনের কথা স্মরণ করতে পারি। অনেক দীর্ঘ আন্দোলনে তেমন সফলতা আসেনি। কিন্তু ভারতে রেলপথ চালু হলে অস্পৃশ্যতার চিন্তা ত্যাগ করে সব জাতপাতের মানুষকে ট্রেনে উঠতে হয়েছে, তিন-চার দিন পাশাপাশি থেকে খাবার খাওয়া, একই শৌচালয় ব্যবহার করা, এমনকি একই ট্যাপের পানি ব্যবহার করেছে।

আমরা ভেবে দেখতে পারি বাংলাদেশের বাস্তবতায় সে রকম অভিঘাতে মুখে এসে হিন্দু সমাজ দাড়িয়েছে কিনা? ৭১ বছরে কেনো আমরা ৩০% থেকে ১০% ভাগের নীচে চলে এসেছি? রাষ্ট্রীয় নির্যাতন, নিপিড়ন, বঞ্চনা এর জন্য অবশ্যই দায়ী। কিন্তু আমরা যথাযথ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারছি না কেনো? এর উত্তরে সবাই স্বীকার করবেন জাতপাত-বর্ণ বৈষম্যের কথা। তাহলে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আমরা প্রতিরোধ না করে বাংলাদেশ থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবো, নাকি প্রতিরোধ করে এখানে অস্তিত্ব বজায় রাখবো। প্রতিরোধ করতে হলে জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে হিন্দু সমাজ পুণর্গঠন করতে হবে।

বর্ণবাদের ফলে আমাদের সমাজের বিরাট মানব সম্পদ জরাগ্রস্থ হয়ে আছে। তারা অধ্যাত্ম দাস হয়ে গেছে। তাদের মধ্যে মানবিক চেতনা জাগিয়ে তুলতে হলে জাতপাত-বর্ণ বিলোপ ছাড়া গত্যন্তর নাই। এভাবে চিন্তার দাসত্ব থেকে নারী ও নিম্নবর্ণে মানুষকে বের করে আনতে পারলে এক বিরাট মানব সম্পদ প্রতিরোধ চেতনায় উদ্বুদ্ধ হবে এবং যে কোনো সময়ের তুলনায় আগামীতে বড় আকারের প্রতিরোধ আমরা করতে পারবো।

আদর্শগত বিষয়ের পাশাপাশি বাস্তব শর্তগুলির কথা আমরা বিবেচনায় নিতে পারি। শতাধিক জাতি-সম্প্রদায়ে বিভক্ত বাংলাদেশের হিন্দু সমাজের মধ্যে এমন অনেক জাতি-সম্প্রদায় আছে যার জনসংখ্যা পাচ হাজার থেকে এক লক্ষ হবে। একই সময়ে এই সব সম্প্রদায়ে বিবাহ যোগ্য পাত্র-পাত্রী সমান ভাবে বেড়ে ওঠে না। তাছাড়া বড় সম্প্রদায়গুলো - যাদের জনসংখ্যা কয়েক লক্ষ থেকে কোটির কাছাকাছি, অভিবাসনের কারনে এ সম্প্রদায়গুলিতে বিবাহযোগ্য পাত্র-পাত্রী সংখ্যা সমান সমান নয়। কারন হিন্দু সমাজে পুত্র সন্তান বেশী অভিবাসিত হয়। এই বাস্তব সমস্যা মোকাবেলা করা যেতে পারে কেবলমাত্র আন্ত-জাতি, আন্ত-বর্ণের বিবাহের মাধ্যমে।

বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন মানে বর্ণহিন্দুর বিরুদ্ধে আন্দোলন নয়। একজন বর্ণহিন্দু বর্ণবাদী নাও হতে পারে। আবার সাধারণ হিন্দু বর্ণবাদী হতে পারে। চিন্তার ক্ষেত্রে তিনি কি নীতি অনুসরণ করেন সেটাই আসল বিষয়। তাই বর্ণবাদী আন্দোলনে কে বা কারা নেতৃত্ব দেবেন সেটা নির্ভর করে, তিনি বা তাদের আদর্শের উপর। আমরা মনীষা বাশফোড় ও বিশাল ডোমের ঘটনায় লক্ষ করেছি, অবর্ণ হিন্দু সংগঠন জাতপাত-বর্ণবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। সে দিক থেকে এ কথা বলা যায় জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ চান এমন ব্যক্তি বা গোষ্ঠী বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন।

ভারতে বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রাম আর বাংলাদেশে বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামের মধ্যে মোটা দাগে একটি পার্থক্য আছে। ভারতের শাসন ক্ষমতায় বর্ণহিন্দুরা, সে কারনে সেখানকার বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রাম অনায়াসে রাজনৈতিক চরিত্র অর্জন করে। বাংলাদেশে বর্ণহিন্দুরা ক্ষমতায় নয়, বরং তারাও সাধারণ হিন্দুদের মতো কমবেশী নির্যাতীত, তাই বাংলাদেশে বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রাম সামাজিক-সাংস্কৃতিক চৌহদ্দির মধ্যে সীমাবদ্ধ।
বাংলাদেশের বাস্তবতায় অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বর্ণ হিন্দুদের উচিৎ বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলনে ব্যাপকভাবে অংশ গ্রহন করা।

আমরা জানি বর্ণবাদ উদ্ভব ও বিকাশে নানা জটিল গ্রন্থি আছে। একদিনের কনভেনশনের ফলে সব জটিল গ্রন্থি উন্মোচন করা সম্ভব না। তবে বস্তুগত জীবনের বিকাশের যে পর্যায়ে এসে বাংলাদেশের হিন্দুরা দাড়িয়ে আছে, তাতে জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করা ছাড়া আমাদের সামনে বিকল্প কোনো পথ খোলা নেই।

জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপ করে আমরা হিন্দু সমাজ পুণর্গঠনের কথা বলছি তার ভিত্তি কি হবে?

আমরা মনে করি তার ভিত্তি হবে সমতা, একতা ও সৌভাতৃত্ব। ধর্মীয় ও সামাজিক রীতিনীতি পালনের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য থাকবে না। ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব হতে হবে এমন সার্বজনীন, যাতে সবাই তাতে অংশগ্রহন করতে পারে, ফলে সকলের মধ্যে একই বোধ জেগে ওঠে। যৌথ ক্রিয়া-কলাপে সবাইকে যুক্ত করা, যাতে সকলের সাফল্য ও পরাজয়কে নিজের বলে অনুভব করে। এভাবে একতা বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে সমরূপ সমাজ গড়ে তুলতে হবে।

জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপের জন্য আমাদের ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করতে হবে। সে কর্মসূচি কি কি হতে পারে, সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব করার আহবান জানাচ্ছি। আপনাদের বক্তব্য ও প্রস্তাবের ভিত্তিতে এ ঘোষণাপত্র চুড়ান্ত করা হবে। সকলের বিবেচনার জন্য আমরা কিছু প্রস্তাব পেশ করছিঃ

১. বাংলাদেশের শতাধিক জাত-সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহন।

২. জাতপাত-বর্ণের ধারনা ভুল এ সম্পর্কিত লিফলেট-পুস্তিকা প্রকাশ ও প্রচার।

৩. যেখানে সম্ভব আন্ত-জাত, আন্ত-বর্ণের বিবাহে উৎসাহ দান।

৪. আন্ত-জাত, আন্ত-বর্ণের মধ্যে একত্র ভোজনের উৎসব আয়োজন।

৫. বর্ণ হিন্দুদের সম-পর্যায়ে না আসা পর্যন্ত দলিতদের জন্য রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে কোটা প্রবর্তন।

৬. ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পৌরহিত্য করার জন্য যে কোনো জাতের সনদ প্রাপ্ত নারী/পুরুষ যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।

৭. ধর্মীয় উপসম্প্রদায় সমূহের মত পার্থক্য দূর করার জন্য সম্প্রীতি সভার আয়োজন।

জাতপাত-বর্ণ বৈষম্য বিলোপের জন্য আমাদের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। সে জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আজকের কনভেনশন থেকে সে সম্মিলিত উদ্যোগ শুরু হোক।


বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71