শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
শ্যামল কান্তি ঘুষ খেয়েছেন!
প্রকাশ: ০৮:১০ pm ৩০-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ০৮:১০ pm ৩০-০৫-২০১৭
 
 
 


আমীন আল রশীদ: আমরা শিক্ষক শ্যামল কান্তি ভক্তর কথা বলছি, তথাকথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে যাকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য সেলিম ওসমান; সেই শ্যামল কান্তি এখন কারাগারে, ঘুষ গ্রহণের মামলায়।

যে মামলা করেছিলেন তারই এক সহকর্মী শিক্ষক। মনে রাখা দরকার, ঘুষ নেওয়ার মামলায় শ্যামল কান্তির জামিন নামঞ্জুর করে যেদিন তাকে জেলে পাঠানো হয়, তার ঠিক আগের দিন শ্যামল কান্তিতে কান ধরে ওঠবস করানোর মামলায় আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন সেলিম ওসমান।


আমরা আইনের শাসনের কথা বলি। বলি যে, আইন সবার জন্য সমান। কথাগুলো শুনতে খুবই ভালো। কিন্তু বাস্তবতা যে কত নির্মম, তা আমরা আমাদের জীবন দিয়ে উপলব্ধি করি। বিশেষ করে কোনও ক্ষমতাবানের সাথে যদি ক্ষমতাহীনের আইনি ঝামেলা তৈরি হয়, তখন আইনের শাসন কী ভয়াবহ চেহারা ধারণ করে, তার হাজারো উদাহরণ আমাদের চোখে সামনে রয়েছে।


সুতরাং যে ওসমান পরিবারের কথায় নারায়ণগঞ্জে বাঘেমোষে জল খায়, সেই পরিবারের রোষানলে পড়ে শ্যামল কান্তির মতো একজন ‘সংখ্যালঘু’ আপাত নিরীহ স্কুলমাস্টার যে এখনও বেঁচে আছেন, সেটাই বরং তার সাতপুরুষের ভাগ্য। ফেসবুক আর গণমাধ্যম তার পক্ষে না থাকলে এতদিনে তার যে কী হাল হতো, তা সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন।


গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, গত বছরের ২৭ জুলাই শ্যামল কান্তি ভক্তের বিরুদ্ধে মামলা করেন তার স্কুলের ইংরেজি শিক্ষক মোর্শেদা বেগম। যেখানে অভিযোগ করা হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে তার কাছ থেকে ঘুষ নিয়েছিলেন প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তি। কেন ঘুষ দিয়েছিলেন? শ্যামল কান্তি নাকি বলেছিলেন যে, ওই শিক্ষকের চাকরি এমপিওভুক্ত করে দেবেন। মজার ব্যাপার হলো, মোর্শেদা বেগম এই মামলাটি করেছেন গত বছরের ২৭ জুলাই।

যার দুই মাস আগে, ২০১৬ সালের ১৩ মে শ্যামল কান্তিকে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করানো হয় এবং যে ঘটনা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় শুরু হয়। দুই বছর আগের ঘটনা নিয়ে শিক্ষক মোর্শেদা বেগম এমন একটি সময়ে মামলা করলেন যখন শ্যামল কান্তি ইস্যুতে সারা দেশের মানুষ একপক্ষে, অন্যপক্ষে ওসমান পরিবার এবং নারায়ণগঞ্জের হেফাজতে ইসলাম। মামলাটি কী শিক্ষক মোর্শেদা বেগম স্বপ্রণোদিত হয়ে করেছিলেন নাকি করতে বাধ্য হয়েছিলেন, তা আমরা জানি না।


শ্যামল কান্তি অবশ্য বারবারই বলার চেষ্টা করেছেন, তাকে চাপে রাখতেই প্রভাবশালী এক ব্যক্তির নির্দেশে ষড়যন্ত্রমূলক এই ঘুষ গ্রহণের মামলাটি করা হয়েছে। এমনকি যে সময় ঘুষ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, তখন স্কুলে শীতকালীন বন্ধ ছিল বলেও দাবি করেছেন শ্যামল কান্তি ভক্ত।


যদিও পুলিশ বলছে, ঘুষ নেওয়ার ঘটনা সঠিক। নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার ওসি (তদন্ত) হারুন অর রশিদ ঘটনা তদন্ত করে ১৮ এপ্রিল আদালতে যে প্রতিবেদন দিয়েছেন, সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে, শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের সত্যতা পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে ৩ জনকে সাক্ষী এবং একজনকে নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে।

যদিও শ্যামল কান্তিকে কান ধরে ওঠবস করানোর ওই ন্যক্কারজনক ঘটনার পরে পুলিশ আদালতে যে প্রতিবেদন দিয়েছিল সেখানে তারা এমপি সেলিম ওসমানের কোনও সম্পৃক্ততা ছিল না বলে উল্লেখ করে। অথচ কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও কোটি কোটি মানুষ দেখেছে। পুলিশের এমন হাস্যকর রিপোর্ট আদালত গ্রহণ করেননি এমনকি এ জাতীয় রিপোর্ট দেওয়ায় উচ্চ আদালতও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান।

সেই পুলিশ শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে বলে রিপোর্ট দেয় এবং সেই রিপোর্টের আলোকে আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন এবং এই ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মাথায় আদালতে গিয়ে জামিন চাইলেও সোজা কারাগারে পাঠানো হয় তাকে। এখানে আইনের শাসনের কোনও ব্যত্যয় হয়েছে কিনা, সে প্রশ্ন আমরা তুলতে পারবো না।


তবে একটা প্রশ্ন তুলতে পারি, যদি শ্যামল কান্তি সত্যিই ঘুষ নিয়ে থাকেন এবং সেই অপরাধে যদি তাকে জেলে যেতে হয়, তাহলে যিনি ঘুষ দিলেন, সেটি কি অপরাধ নয়? ঘুষ নেওয়ার অপরাধে কারাগারে যেতে হলে ঘুষ দেওয়ার অপরাধে তাকে কেন গ্রেফতার করা হবে না? তিনি যে ঘুষ দিয়েছেন, সে কথা তো মামলার এজাহারেই স্পষ্ট। আর এমপিওভুক্ত হওয়ার জন্য যে শিক্ষক এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ দেন, তিনি তার ছাত্র-ছাত্রীদের কী পড়াবেন? কী আদর্শ শেখাবেন?


সুতরাং শ্যামল কান্তি ভক্ত আসলেই ঘুষ নিয়েছেন কিনা, সেটি এখন আদালতে প্রমাণের বিষয়। কিন্তু অভিযোগটা গুরুতর। যিনি মামলা করেছেন তিনিও শিক্ষক। অর্থাৎ শিক্ষক ঘুষ দিয়েছেন শিক্ষককে। এটি জাতি হিসেবে আমাদের জন্য লজ্জার। একজন শিক্ষককে কান ধরে ওঠবস করানোর ভিডিও দেখে আমরা যেমন সবাই কান ধরে ছবি তুলে সেগুলো ফেসবুকে দিয়েছিলাম, এখন সত্যি সত্যিই সেই শিক্ষক ঘুষ নিয়ে থাকেন বলে প্রমাণিত হয়, তাহলে আমাদের উচিত হবে দ্বিতীয়বার কান ধরে সেই পাপের প্রায়াশ্চিত্ত করা।


তবে শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে মামলা এবং এই মামলায় জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর পুরো প্রক্রিয়াটি দেখে মনে হচ্ছে, দেশে এই প্রথমবারের মতো কেউ ঘুষ খেয়েছেন। শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে কত টাকা ঘুষ খাওয়ার অভিযোগ? এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই টাকা দিয়ে শ্যামল কান্তি কী করেছেন বা কী করতে পারেন?

নারায়ণগঞ্জ শহরে একটি ফ্ল্যাট কিনতে পারেন, সাদা রঙের একটি প্রাইভেট কার কিনতে পারেন, পরিবারসহ একমাসের ছুটিতে ইউরোপ ঘুরতে যেতে পারেন, তাই না?

কিন্তু প্রতিদিন যে পুলিশ, আমলা, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিরা লজ্জাশরমের মাথা খেয়ে ঘুষ খান, উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকা মেরে দেন, কাজ পাওয়ার আগে এবং বিল পাস হওয়ার আগে নির্দিষ্ট অংকের টাকা জনপ্রতিনিধি, চিফ ইঞ্জিনিয়ার, প্রকল্প পরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট দফতরে দিয়ে আসতে হয়, সেই অপরাধে এ যাবত কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে? কতজন গ্রেফতার হয়েছেন বা জেলে গেছেন?

শিক্ষক শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ। কিন্তু শিক্ষা ভবনের যে কর্মকর্তা-কর্মচারিরা তার মতো শিক্ষকদের জিম্মি করে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকার ঘুষ নেয়, তাদের বিরুদ্ধে কে মামলা করবেন? অবসরে যাওয়ার পর যে শিক্ষকরা অবসর ভাতার জন্য ব্যানবেইস নামের প্রতিষ্ঠানে বছরের পর বছর অসহায়ের মতো ঘোরেন, সেই দুর্ভোগের জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কেউ মামলা করবেন?

এসব কথা বলে নিশ্চয়ই আমরা শ্যামল কান্তির বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ আড়াল করছি না। কিন্তু এটা বুঝতে খুব বড় কোনও পণ্ডিত হওয়ার প্রয়োজন নেই যে, তার বিরুদ্ধে এই মামলাটি ক্ষমতাবানদের বড় ষড়যন্ত্রেরই অংশ। যে সামান্য শিক্ষকের কারণে নারায়ণগঞ্জের সবচেয়ে প্রভাবশালী পরিবারের লোককে আদালত পর্যন্ত যেতে হয়েছে, যার কারণে সারা দেশের মানুষের সামনে সেলিম ওসমানদের মুখোশ খুলে গেছে, সেই শিক্ষক শান্তিতে থাকবেন, এটা ভাবার কারণ নেই।

তবে আমরা চাইব এর আগেও উচ্চ আদালত যেমন শ্যামল কান্তির পক্ষে ছিলেন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব সংবেদনশীল মানুষেরা যেভাবে শ্যামল কান্তিকে সাহস আর ভরসা জুগিয়েছিলেন, সেটি অব্যাহত থাকবে এবং শ্যামল কান্তি ন্যায়বিচার পাবেন। কারণ আমরা একজন শিক্ষকের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা অলিক কল্পনা হয়েই থাকবে।

লেখক: সাংবাদিক ও লেখক।

 

এইবেলাডটকম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71