বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
শ্রীশ্রী গীতায় মানবপ্রেম ও জগতের কল্যাণ
প্রকাশ: ০৫:৫৩ pm ০২-০৫-২০১৮ হালনাগাদ: ০৫:৫৩ pm ০২-০৫-২০১৮
 
নয়ন লাল দেব
 
 
 
 


‘বিশ্ব ধর্ম বিশ্বপ্রেম বিশ্ব মানবতা,
কে শিখালো জগতেরে ভারতের গীতা”॥

প্রবন্ধের প্রারম্ভেই প্রণতি নিবেদন করি সেই বাসুদেবকে, যিনি সর্বভূতে বিরাজমান, সর্বভূতের কর্তা, সৃষ্টি-স্থিতি ও লয়ের কারণ। যে চির কল্যানকামী জনার্দনের কৃপাসিন্দু আবাগহন করে জগতে আবির্ভূত হল ভক্তি মুক্তি-জ্ঞান-কর্ম ইত্যাদির দিব্যবাণী সমন্বিত শ্রীমদ্ভগবত গীতা। জগতের বুকে জানান দিল নতুন আলোর বার্তা। বিশ্ব দেখল এক চির শান্তির পথ। অন্তরে লুকিয়ে থাকা সৃষ্টি রহস্যের সকল জিজ্ঞাসার উত্তর জানলো জীব জগৎ। জানলো কর্মের কথা, ভক্তির কথা, মুক্তির কথা, আত্মতত্ত্ব, যোগ, যজ্ঞ, তপোঃ, দিব্য বিভূতি সহ প্রভৃতির কথা। 

কুরুক্ষেত্রের এক অর্জুনের মাধ্যমে এই মহাবিশ্বের সকল অর্জুনকে জানিয়ে দেওয়া হলো জীবের মূল স্বরূপের বার্তা। সর্বভূতে অবস্থিত সেই পরমেশ্বরের পরমপদ লাভের উপায় বারংবার উচ্চারিত হলো এই মহাগ্রন্থের কণ্ঠে। জগৎকে চির সুন্দরের পথে জীবনের মূল লক্ষ্য পরমপুরুষে যুক্ত হওয়ার শিক্ষায় প্রকাশিত হলো পরমাত্মা রূপে সকল জীবে অবস্থিত নিত্যপুরুষকে দর্শন করে সমদর্শী হওয়ার বাণী। আর এই সমদর্শী হওয়ার মন্ত্রতেই আমরা পেলাম ঐক্য, শান্তি, সমতা আর প্রেমের বার্তা। কখনো আত্মদর্শী, কখনো ব্রাহ্মভাব, কখনো স্থিতপ্রজ্ঞ আবার কখনো সমদর্শী শব্দে বার বার উৎসাহিত করা হয়েছে সমত্ত্ববুদ্ধি সম্পন্ন প্রেমময় স্তরে উন্নিত হওয়ার। 

যোগযুক্তো বিশুদ্ধাত্মা বিজিতাত্মা জিতেন্দ্রিয়ঃ,
সর্বভূতাত্মভূতাত্মা কুর্বন্নপি ন লিপ্যতে ॥                        (শ্রীশ্রীগীতা ০৫/০৭)

অর্থাৎঃ কর্মযোগযুক্ত, বিশুদ্ধচিত্ত, সংযতদেহ, জিতেন্দ্রিয় এবং সর্বভূতের আত্মাই যার আত্মা স্বরূপ, এরূপ সম্যগৃদর্শী পুরুষ কর্ম করেও কর্মে আবদ্ধ হন না।‘‘সর্বভূতের আত্মাই যার আত্মা স্বরূপ” এর চেয়ে সুন্দর সমতার বার্তা আর কি হতে পারে।

বিশ্ব শান্তির লক্ষ্যে, সাম্যতা আর ভ্রাতৃত্বের ঐক্যগড়ার প্রত্যয়ে এই অপূর্ব দর্শনের বিকল্প অপরিলক্ষিত। গীতার দর্শনে ভগবান সর্বজীবে পরমাত্মাকে প্রত্যক্ষ করে সমদয়ার নির্দেশ প্রদান করলেন।  ব্রহ্মপ্রাপ্তির অনন্য উপায় হিসাবে ভগবান সর্বভূতের হিতে রত হওয়ার পথ দেখালেন। 

লভন্তে ব্রহ্মনির্বাণমৃষয়ঃ ক্ষীণকল্মাষাঃ,
ছিন্নদ্বৈধা যতাত্মনঃ সর্বভূতহিতে রত।
(শ্রীশ্রীগীতা ০৫/২৫)
অর্থাৎঃ যাঁরা নিষ্পাপ, সংশয়শূণ্য, সংযতচিত্ত, সর্বভূতহিতে রত, সেই ঋষিগণ ব্রহ্মনির্বান প্রাপ্ত হন।‘‘সর্বভূতে হিতে রত”,
এখানে ব্রহ্মনির্বান লাভের অন্যতম দ্বার হিসাবে ভগবান সর্বজীবের কল্যানে রত হওয়ার উপদেশ দিচ্ছেন। সকল অশান্তির মূলে মানবের যে অসৎ গুণাবলি মানবে মানবে যুদ্ধ রচনা করে অস্তিত্বকে সংকটের সম্মুখীন করে তা হলো আত্মদম্ভ। যা মানবের ভেদ বুদ্ধি জাগ্রত করে, ফলশ্র“তিতে মানব হিংসায় প্রবৃত্ত হয়, পরিনয়ে ঘটে বিনাশ। এখানে গীতায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ প্রথমেই মানবের উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবগত করে মূল অভিষ্ট পূরনার্থে আত্মদম্ভ নামক আমিত্ত্বের দোষ পরিহার পূর্বক সর্বভূতে আত্ম দর্শন করে জগতের কল্যানে নিজেকে যুক্ত করতে দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করছেন।
                        
সুহৃন্মিত্রার্য্যুদাসীনমধ্যস্থদ্বেষ্যবন্ধুষু,
সাধুষ্বপি চ পাপেষু সমবুদ্ধির্বিশিষ্যতে॥
(শ্রীশ্রীগীতা ০৬/০৯)

অর্থাৎঃ যিনি সুহৃৎ, মিত্র, শত্র“, উদাসীন, মধ্যস্থ, দ্বেষ্য, বন্ধু, সাধু ও অসাধু সকলের প্রতি রাগদ্বেষশুণ্য তিনিই শ্রেষ্ট যোগী। 
ভগবান সকলের প্রতি সমভাপন্ন হয়ে হিংসা ত্যাগ করার নির্দেশ দিচ্ছেন।

সর্বভূতস্থমাত্মানং সর্বভূতানি চাত্মনি।
ঈক্ষতে যোগযুক্তাত্মা সর্বত্র সমদর্শন ॥
(শ্রীশ্রীগীতা, ০৬/২৯)

অর্থাৎ এভাবে যোগযুক্ত পুরুষ সর্বত্র সমদর্শী হয়ে আত্মাকে সর্বভূতে এবং সর্বভূতকে আত্মাতে দর্শন করেন।

আমাদের মূল স্বত্বা হচ্ছে আত্মা, এই জগতের সকলের সম্পর্কটাও আত্মার সাথে আত্মার। আর যখন এই স্বত্ত্বা আমাদের উপলব্ধি হয়, তখন আর বিভেদ, হিংসা, দ্বেষ, শত্র“তা, ক্রোধ আদি দোষগুলো মানবের ভাবনাকে রুদ্ধ করতে পারে না।
কেননা তখন আর সর্ম্পকটা জাগতিক বন্ধনে সীমাবদ্ধ থাকে না, তখন তৈরী হয় আত্মদর্শন যার ফলে আমরা আবিষ্কার করতে পারি আত্মার সাথে আত্মার সম্পর্কের। বিশ্বমানবপ্রেমের বার্তায় গীতার এই তত্ত্ব এক অতুলনীয় দর্শন। এই জড় জগতের সকল ভেদাভেদ দূর করে অশান্তি আর হিংসার ভেড়াজাল থেকে বের করে সকল প্রান এক সুথোঁয় গাঁথার শ্রেষ্ট সোপান হিসেবে গীতার এই দর্শন সর্বোত্তম। 

সর্বভূতস্থিতং যো মাং ভজত্যেকত্বমাস্থিতঃ,
সর্বনা বর্তমানোহপি স যোগী ময়িবর্ততে ॥
(শ্রীশ্রীগীতা, ০৬/৩১)

অর্থাৎ যে যোগী সমত্ববুদ্ধি  অবলম্বন পূর্বক সর্বভূতে ভেদজ্ঞান ত্যাগ করে সর্বভূতস্থিত আমাকে ভজনা করেন, তিনি যে অবস্থায়ই থাকুন না কেন, আমাতেই অবস্থান করেন। সকল জীবের কল্যানে ঈশ্বর প্রেমের যে মহামন্ত্র উচ্চারিত হলো গীতায়, তা মানব প্রেমের শ্রেষ্ট উপাদান। এই মহা বাণী প্রত্যেক নিরাশায় পতিত মানবের শান্তির পথে আশার আলো।

এই আলোকবার্তিকা দূরিভূত করুক সকল তমশাছন্ন অন্ধকার। সকল অন্তর জাগুক প্রেমময় সুন্দরের বার্তায়, গড়ে উঠুক ঐক্য, প্রীতি আর সুবন্ধনে।

একটি নমস্কারে, প্রভু, একটি নমস্কারে,
সকল দেহ লুটিয়ে পরুক তোমার এ সংসারে।
(গীতবিতান)
জয় গৌর, জয় নিতাই।

লেখকঃ সহ বার্তা সম্পাদক, শ্রীগৌরবাণী পত্রিকা, মৌলভীবাজার।
 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71