শনিবার, ১৭ নভেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৩রা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা আর কতকাল?
প্রকাশ: ১১:০১ am ২৬-১১-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:০১ am ২৬-১১-২০১৭
 
আহমদ রফিক
 
 
 
 


কোনো একটা উপলক্ষ তৈরি করে বা বিনা উপলক্ষেই এলাকা-বিশেষে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা যেন বাংলাদেশি সমাজে অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। এই তো কিছুদিন আগে এসব হামলা ঘটল নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জ ও অভয়নগরে যথাক্রমে দরিদ্র হিন্দু পাড়ায়, সাঁওতাল বসতিতে এবং মালো (জেলে) পাড়ায়। কারণ দর্শানো ভিন্ন হলেও লক্ষ্য জায়গা-জমি-বাস্তুভিটা এবং সামান্য কিছু সম্পদ-সম্বল দখল। 

লক্ষ্য করার বিষয় যে, আগুন জ্বালানোর আগে তার কিছু আলামত প্রকাশ পেলেও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী বা প্রশাসন দ্রুত তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজনবোধ করে না। ঘটনার পর সংবাদপত্রের লেখালেখির প্রতিক্রিয়ায় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু, তাও কখনও লক্ষ্যে পৌঁছেছে বলে জানা যায় না। মাঝপথে সবকিছু ঝুলে থাকে। ততদিনে প্রতিবাদ শেষ হয়ে যায়। মানুষ সব ভুলে যায়। শুধু ভুলতে পারে না ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন। পোড়া গন্ধ নাকে লেগে থাকে। 

পূর্বোক্ত অঘটনগুলোর পরিণতি দেখে এমন কথাই বলতে হয়। রামুর বৌদ্ধপল্লীতে হামলার তদন্তে সুস্পষ্টভাবে কিছুসংখ্যক ব্যক্তি ও দু-তিনটি দলের নাম উঠে এসেছিল। তার মধ্যে জামায়াত ছিল। ছিল কিছুসংখ্যক দুর্বৃত্ত রোহিঙ্গা। ছিল স্থানীয় প্রশাসনের মদদ বা উদাসীনতা। শেষোক্ত তথ্যটি স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে নাসিরনগর, গোবিন্দগঞ্জের ঘটনায়। তাদের কী শাস্তি হয়েছে, আদৌ হয়েছে কি-না আমাদের জানা নেই। তবে এর নেতিবাচক দিকটিরই আশঙ্কা অধিক। 

দুই.

এ ট্র্যাডিশন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলছে। চলছে এই উপমহাদেশের অন্যত্র। অবিভক্ত ভারতের এবং পরবর্তীকালের দূষিত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিষক্রিয়ার ফল এখন লালিত-পালিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে মোদির ভারত এখন এক নম্বরে। সম্প্রতি ইতিহাসখ্যাত তাজমহল ওই সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের শিকার। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে হয়, পরের বিচারটা থাক, আগে নিজেরটাই দেখি। 

তাই বলতে হয়, নাসিরনগরের স্মৃতি মুছে যাওয়ার আগে আবারও ঘটল রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা। এবার ঘটনার সূত্র ভিন্ন। তবে একেবারে ভিন্ন নয়। এর আগে ঘটেছে এ ধরনের সূত্র উপলক্ষে হামলা। আর তা হলো ফেসবুকের স্ট্যাটাস নিয়ে। চিররঞ্জন সরকার তার কলামে ঠিকই লিখেছেন, 'সেই একই স্ট্ক্রিপ্ট, একই স্টাইল, পুরনো কাহিনী। শুধু স্থান আর কালটা বদলে গেছে।' 

তার ক্ষোভ-অভিযোগের বাস্তবতার সঙ্গে যোগ করতে হয় কিছু বিচার ব্যাখ্যা এবং মন্তব্য। আর তা হলো এ সত্য যে, সমাজ ও রাজনীতি থেকে ১৯৪৭-উত্তর এবং ১৯৭১-উত্তর সময়পর্বে সাম্প্রদায়িকতার দূষণ শেষ হয়নি। হয়নি একুশ শতকের কথিত আধুনিকতায় পৌঁছেও। বরং আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন ফেসবুক, আলোকচিত্রের সংস্থাপন) দুর্বৃত্তদের উদ্দেশ্য সিদ্ধিতে সাহায্য করছে। 

ধর্ম ও ইসলামের প্রবর্তক মহানবীকে (সা.) কেন্দ্র করে গুজব ও রটনার মাধ্যমে ধর্মপ্রাণ মানুষকে উত্তেজিত করা সহজ। সহজ ধর্মের নামে যে কোনো ধর্ম-সম্প্রদায়ের মানুষের ক্ষেত্রে। তবে এর অগ্রগামী অংশ দুর্বৃত্ত দল এবং কিছুসংখ্যক শিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত ধর্মোন্মাদ ব্যক্তির কায়েমি স্বার্থপরতা বা সম্প্রদায়বাদী চেতনা। তাদের পেছনে জোট বাঁধে উত্তেজনাপ্রবণ মানুষ, যারা যুক্তি ও বিচার-বুদ্ধির ধার ধারে না। গুজব তাদের চেতনায় আগুন ধরায়। 

এ ধারাটা দীর্ঘকালীন ট্র্যাডিশন উপমহাদেশে। স্মৃতিধর অনেকেরই মনে থাকতে পারে, কাশ্মীরের হজরতবাল মসজিদ থেকে চুল চুরির রটনা নিয়ে কী রক্তাক্ত কাণ্ডই না ঘটে গেল সেই কবে! পরে তো গোটা ঘটনাই রটনা প্রমাণিত হলো। ইদানীং বাংলাদেশে শুরু হয়েছে একই ধরনের ঘটনা; আধুনিক স্টাইলে, ফেসবুকে ধর্ম অবমাননাকর উক্তি উপস্থাপন করে এবং তা অবশ্যই সম্প্রদায়-বিশেষের কোনো যুবকের নামে। 

এরপর প্রচারের ঢাকে বাদ্যি বাজানো, মানুষের ধর্মবোধে উত্তেজনা সৃষ্টি করে, রড-লাঠি-ধারালো হাতিয়ার নিয়ে হামলা। এ প্রক্রিয়ায় বেশ কিছুটা সময় পার হয়। কখনও অপেক্ষা করা হয় শুক্রবার জুমার নামাজের পর নামাজিদের উত্তেজিত করে পথে নামাতে, অভিযান চালাতে। এটাও পাকিস্তান আমলের ট্র্যাডিশন, যা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশি সমাজ বহন করছে। অবশ্য সমাজের একাংশ। 

কিন্তু ওই যে বলে, স্ম্ফুলিঙ্গ থেকে দাবানল। এ সত্যটাই এসব ক্ষেত্রে বাস্তব রূপ নেয়। ঘটে আগুন ও রক্তপাতের অবাঞ্ছিত খেলা। আর এ বিলম্বিত প্রক্রিয়ায়ও সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিঃশব্দে সময় গোনে; প্রতিকারের, প্রতিরোধের ব্যবস্থা গ্রহণ করে না (অবশ্য বিরল ব্যতিক্রম বাদে)। ব্যবস্থা নিলে অঘটন ঘটতে পারে না।

এখানেই আমাদের বড় অভিযোগ, বড় আপত্তি। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার গুরুত্ব বিবেচনা করেই কথাগুলো বলা। কারণ সামাজিক দূষণ দূর তথা সংশোধন তো দীর্ঘস্থায়ী প্রক্রিয়া। তা সমাজের সুস্থ অংশ এবং মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মুশকিল হলো, রাজনীতি ও রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়শ চলে তাদের কায়েমি স্বার্থপরতার পথ ধরে। সে ক্ষেত্রে সুশাসন, নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব, আদর্শবাদী শব্দাবলি অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। 

রংপুরের গঙ্গাচড়া গ্রামে হামলার ঘটনা অর্থাৎ ফেসবুকভিত্তিক প্রচারণার প্রতিক্রিয়া ও হামলা এবং এর প্রতিরোধহীনতা পূর্বেকার একাধিক ঘটনার মতো এবং প্রশাসনের ভূমিকাও একই ধরনের। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তি যথাযথভাবে ধারণের পরিবেশ এতটা অপরিণত যে, বাংলাদেশে এর অপব্যবহার অনায়াসে ঘটে, ঘটতে পারে এবং ঘটেছে কয়েকটি ক্ষেত্রে। এটা প্রযুক্তির বিরূপ সীমাবদ্ধতাও বটে। 

ফেসবুক ব্যবহার করে নিরীহ মানুষকে, এমনকি অশিক্ষিত ব্যক্তিকে ফাঁসানো মোটেই কঠিন কাজ নয়। তা ঘটে যেমন ব্যক্তিক বা পারিবারিক ঘটনায়, তেমনি ঘটতে পারে সামাজিক ও রাজনৈতিক খাতে। ডিজিটাল জালিয়াতির সাহায্যে কথা বা ছবির ব্যবহার আগুন জ্বালাতে, উত্তেজনা সৃষ্টি করতে যথেষ্ট করিতকর্মা অবস্থান নিতে পারে। 

এদিকটা নিয়ে না ভাবে ফেসবুক ব্যবহারকারী শিক্ষিত মন, না প্রশাসন। প্রশাসন যে এসব ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হতে পারে, পূর্ববর্তী কোনো কোনো ঘটনা তার প্রমাণ। সেসব ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যায়। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, হোক তা সঠিক বা বেঠিক উৎসে, প্রশাসন বিশেষ গুরুত্ব গ্রহণ করে থাকে সামাজিক বিশৃঙ্খলা থেকে মুক্তি পেতে। তাতে চক্রান্তকারীর উদ্দেশ্য সিদ্ধ হয়; কিন্তু নির্দোষের সুবিচার মেলে না। 

রামুর উত্তম, নাসিরনগরের রসরাজ বা আলোচ্য ঘটনার টিটুও যে ফেসবুক জালিয়াতির উদ্দেশ্যমূলক শিকার হতে পারে, প্রশাসনকে সে সমস্যার বিচার-বিশ্নেষণ করতে বড় একটা দেখা যায় না। রংপুরের ঘটনা রামু ও নাসিরনগরের ঘটনার ধারাবাহিকতায় সংঘটিত। একটি দৈনিকের খবরে প্রকাশ : 'টিটু রায় নিরক্ষর/এলাকায় নেই ৭ বছর'।

এ প্রসঙ্গে ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, 'যার বিরুদ্ধে এই স্ট্যাটাস দেওয়ার অভিযোগ সেই টিটু রায় ফেসবুক ব্যবহার দূরে থাক, কোনো লেখাপড়াই জানে না। একাধিক দৈনিকের প্রতিবেদনে একই তথ্যের, এমন মতামতের প্রকাশ ঘটেছে যে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে অঘটন ঘটাতে কে বা কারা ফেসবুকে স্ট্যাটাস জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছে। এবং ঠিকই ঘটানো হয়েছে অবাঞ্ছিত সাম্প্রদায়িক হামলা। এসব কি উন্নত প্রযুক্তির অভিশাপ হিসেবে ধরে নিতে হবে?

কারও কারও মতে, দেশ ও সমাজকে অস্থিতিশীল করতে, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে সাম্প্রদায়িক শক্তির কুচক্রান্তে এসব ঘটনা ঘটছে। স্বভাবতই আঙুল উঠছে জামায়াত-শিবিরের দিকে, কট্টর ধর্মবাদী রক্ষণশীল সংগঠনের সদস্যদের দিকে। আমরা মনে করি, এসব ঘটনার ব্যাপক ও গভীর অনুসন্ধানমূলক তদন্ত হওয়া উচিত, যাতে সঠিক তথ্য তথা সত্য বেরিয়ে আসে। যাতে মিথ্যা অভিযোগে নিরীহ মানুষ হামলা ও ক্ষয়ক্ষতির শিকার না হয়। এ ব্যাপারে প্রশাসনকে সচেতন হতে হবে। ধর্মীয় উত্তেজনার প্রভাবে অন্ধ হলে চলবে না। 

এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংবাদ হচ্ছে, সংশ্নিষ্ট প্রশাসনের কয়েকজন পদস্থ কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে, হামলায় সংশ্নিষ্ট অনেককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই জামায়াত কর্মী। তাদের প্রাথমিক ধারণা, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে জামায়াত-শিবির হামলা ঘটিয়ে থাকতে পারে। আর স্ট্যাটাসটি টিটু রায়ের দেওয়া কি-না তা নিয়ে তদন্ত চলছে। ঘটনার পর্যালোচনায় আমাদের প্রশ্ন ও বক্তব্য, বাংলাদেশে কি পাকিস্তানি আমলের ধারাবাহিকতায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এ ধরনের হামলা চলতেই থাকবে, শান্ত গ্রামগুলোকে পর্যন্ত অশান্ত করে তোলা হবে, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পরিবেশ দূষিত করে তোলা হবে? 

এসব দুর্বৃত্তপনা বন্ধ করতে দরকার অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিসাপেক্ষে দ্রুত বিচার। বিচার প্রক্রিয়া যেন দীর্ঘস্থায়ী না হয়। সেইসঙ্গে তদন্ত প্রক্রিয়া যেন স্বচ্ছ, নির্মোহ, পক্ষপাতহীন ও ত্রুটিমুক্ত হয়। দরকার ক্ষতিগ্রস্তদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং প্রয়োজনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা। জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের পক্ষপাতহীন আচরণ এসব ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। ধর্মীয় চেতনা বা ধর্মবিশ্বাস যেন সঠিক তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণে প্রভাব না ফেলে।

কারণ শর্ষের মধ্যে ভূতের অবস্থান থাকলে সুবিচার নিয়ে যেমন প্রশ্ন উঠতে পারে, তেমনি দেশ ও সমাজে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষার কাজ সহজ হবে না। আরও একটি প্রাসঙ্গিক বিবেচনা মাথায় রাখতে হবে যে, স্ট্যাটাস জালিয়াতির রহস্য উদ্ঘাটন বেশ কিছুটা জটিল বটে; সে ক্ষেত্রে নিরপেক্ষতার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতার প্রয়োজনও কম নয়। তা না হলে হয়তোবা নিরীহ বা নিরপরাধের কপালে অহেতুক, অযৌক্তিক শাস্তি জুটে যেতে পারে।

সবশেষে একটিই কথা, বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজের সেক্যুলার চরিত্র নিশ্চিত করতে হলে প্রশাসনের দায়িত্ব ও কাজ হবে, যাতে রামু, নাসিরনগর ও রংপুরের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে তা দেখা। আকাশে দুর্বৃত্তপনার মেঘ দেখতে পেলেই যেন প্রতিরোধ ও প্রতিকারের সুব্যবস্থা নেওয়া হয়। পোড়া গন্ধ যেন আর আমাদের আতঙ্কিত করতে না পারে।

ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, কবি ও প্রাবন্ধিক


প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71