বৃহস্পতিবার, ১৫ নভেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
সংখ্যালঘুদের পক্ষে আসলে কে বা কারা?
প্রকাশ: ১২:১৮ pm ২৬-১১-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:১৮ pm ২৬-১১-২০১৭
 
বিভুরঞ্জন সরকার
 
 
 
 


নিজে সংখ্যালঘু হওয়ায় সংখ্যালঘুদের সমস্যা নিয়ে লিখতে মন সায় দেয় না। এরশাদ জামানার শেষদিকে কিংবা খালেদা জিয়ার প্রথম শাসন আমলে হিন্দুদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। একজন প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় সাংবাদিক টেলিফোন করে কিছুটা ব্যঙ্গ করে বলেছিলেন, ‘বিভু বাবু, হিন্দুদের সমস্যা দেখলেন। মুসলমানদের কি কোনো সমস্যা নেই?’ এই প্রশ্ন শুনে আমি তো থ। হিন্দুদের সমস্যা এবং মুসলমানদের সমস্যা যে এক নয়, সেটা যাদের উপলব্ধিতে নেই তাদের সঙ্গে বিতর্কে জড়িয়ে লাভ নেই। পৃথিবীর সব দেশেই সংখ্যালঘুদের কিছু বিশেষ সমস্যা থাকে। তারা নানাভাবে বৈষম্যের এবং ক্ষেত্রবিশেষে বিদ্বেষের শিকার হয়। বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মুক্তিযুদ্ধের পর আশা করা হয়েছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ যেহেতু রাষ্ট্রীয় নীতি, সেহেতু এখানে আর ধর্ম পরিচয়ের কারণে কেউ ভেদ-বৈষম্যের শিকার হবে না। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, ক্ষুদ্র নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠী- সবাই নাগরিক অধিকার ভোগ করবে সমানভাবে। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে আমরা সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পরাজয় বলে ধরে নিয়েছিলাম। ওটা ছিল আমাদের ভুল ধারণা। মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনতে হয়েছিল সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে। অস্ত্র শক্তিতে সাম্প্রদায়িকতা দূর করা যায় না।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় মানে পাকিস্তানি সাম্প্রদায়িক ধারার রাজনীতির পরাজয় ছিল না। হিন্দুরাই মুসলমানদের সব দুর্গতির জন্য দায়ী, হিন্দু আর মুসলমান একদেশে, একসঙ্গে বসবাস করতে পারে না- এই আওয়াজ তুলেই পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রদায়িক রাজনীতিরই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তখন গণতান্ত্রিক আন্দোলন বিকশিত হওয়ার কারণে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির একটি ধারাও বলবান হয়ে উঠছিল। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যেহেতু পাকিস্তানের অপরাজনীতির বিরোধিতা করেই জন্মলাভ করেছিল সেহেতু পাকিস্তানের খারাপ উত্তরাধিকার দেশটি বহন করবে না- স্বাভাবিকভাবে সেটাই ছিল প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। বিশেষ করে পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতির উল্টোযাত্রা শুরু হয়।
বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বলে পরিচিত। শাসক মহলসহ আরো অনেকেই এই বাক্যটি উচ্চারণ করে এক ধরনের তৃপ্তি বোধ করেন। এটা ঠিক যে বাংলাদেশে বড় কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পরও কেন বাংলাদেশ থেকে ১ কোটি ৪০ লাখ হিন্দু দেশছাড়া হয়েছে, সে প্রশ্ন কি কখনো আমরা আমাদের বিবেকের কাছে করেছি? কেউ হয়তো বলবেন, এটা হিন্দুদের সমস্যা। তারা সব সময় ভারতমুখী। তারা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলে। সুযোগ পেলেই ওদিকে চলে যায়।

যারা এমন সরল হিসাবের কথা বলেন তারা আসলে সমস্যার গভীরে যেতে চান না। তারা ওপরেরটাই দেখেন, ভেতরেরটা দেখেন না। হিন্দুদের কেউ কেউ ভারতমুখী হতে পারে, কিন্তু সবাই নয়। কী মানসিক যন্ত্রণা হিন্দুদের দেশ ত্যাগে বাধ্য করে তা বুঝতে হলে যে উদার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকা দরকার তা না থাকায় আমরা বিষয়টিকে প্রায়ই হালকা করে দেখে থাকি।

দুই.
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে হিন্দু নির্যাতনের একটি বিশেষ কৌশল লক্ষ করা যাচ্ছে। হিন্দুদের দেশ ছাড়া করার একটি সুদূরপ্রসারী নীল নকশা অনুযায়ী ঘটনাগুলো ঘটছে বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ আছে। একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটছে। মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার অভিযোগ উঠিয়ে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ চালানো হচ্ছে। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কক্সবাজারের রামুতে বৌদ্ধদের ঐতিহ্যবাহী মন্দির এবং বসতবাড়ি তছনছ করে দেয়া হলো। অভিযোগ- উত্তম বড়ুয়া নামের এক বৌদ্ধ যুবক ফেসবুকে উসকানিমূলক স্ট্যাটাস দিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হেনেছে। ঘটনা সত্যি হলে উত্তম বড়ুয়ার বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ছিল বাঞ্ছনীয়। কিন্তু না। আক্রমণ হলো গোটা সম্প্রদায়ের ওপর। ধ্বংসলীলা শেষ হওয়ার পর জানা গেল, উত্তম বড়ুয়ার বিষয়টি ভুয়া। এরপর গত বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরেও হিন্দুদের ওপর হামলা হলো ফেসবুকে রসরাজ দাস নামের একজনের স্ট্যাটাসের সূত্র ধরে। পরে জানা গেছে, এই অভিযোগও মিথ্যা। রসরাজ কোনো স্ট্যাটাস দেননি। নারায়ণগঞ্জের স্কুল শিক্ষক শ্যামল কান্তির বিষয়টিও নিশ্চয়ই আমরা ভুলে যাইনি। ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অভিযোগ এনে ওই শিক্ষককে প্রকাশ্যে কান ধরে ওঠবস করান স্থানীয় সংসদ সদস্য। এ ধরনের সর্বশেষ বড় ঘটনাটি ঘটল রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার ঠাকুরপাড়া গ্রামে। টিটু রায় নামের ওই গ্রামের এক বাসিন্দা নাকি ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে ধর্ম অবমাননা করেছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা আর চুপ থাকে কী করে? কয়েকদিন ধরে প্রস্তুতি নিয়ে কয়েক হাজার মানুষ জমায়েত হয়ে ঠাকুরপাড়া গ্রামে হিন্দুদের ঘরবাড়িতে আগুন দেয়া হলো। লুটপাটও করা হলো। কারা করল এই হামলা? ঘটনাটি আকস্মিকভাবে কিংবা রাতের অন্ধকারে ঘটেনি। যা হয়েছে তা প্রস্তুতি নিয়ে প্রকাশ্য দিবালোকে হয়েছে। প্রশাসন কী করেছে? আগুন দেয়ার পর প্রশাসনের কর্তাদের হুঁশ হয় এবং গুলি চালিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে। এতে একজনের মৃত্যু হয়েছে। যার মৃত্যু হয়েছে তিনি ছিলেন হামলাকারী অথচ তার প্রতিও দরদ দেখানো মানুষের অভাব নেই। সরকারি দলের এবং নাগরিক সমাজের একাংশের এখন অভ্যাস হয়ে দাঁড়িয়েছে কোথাও কিছু অঘটন ঘটলে তার দায় বিএনপি-জামায়াতের ওপর চাপানো। বিএনপি-জামায়াত সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পক্ষে, তারা সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার মতো খারাপ কাজ করতেই পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগসহ অসাম্প্রদায়িক চেতনার ধারক-বাহকরা কী করেন? কাউকে তো আক্রান্তদের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে দেখা যায় না।

তিন.
লেখক-গবেষক মোরশেদ শফিউল হাসান তার ফেসবুকে একটি যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ধরে নিলাম, হিন্দু বাড়িতে আগুন দেয়া কিংবা প্রতিমা ভাঙার মতো কাজগুলো আসলে জামায়াত-বিএনপি সমর্থকরাই করে। কিন্তু ঘটনা ঘটার সময় সেখানকার আওয়ামী লীগ সমর্থকরা কী করে? বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম বা মহল্লা আছে যেখানে আওয়ামী লীগের লোকজন নেই? কিংবা পুরো এলাকাটা বিএনপি-জামায়াতীদের দখলে? এ পর্যন্ত এমন একটি ঘটনা কি পাওয়া গেছে যে হিন্দুদের ওপর হামলা ঠেকাতে গিয়ে কোথাও আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের একজন নেতাকর্মী আগত হয়েছেন? এ প্রশ্ন কেউ তোলেন না কেন? ঘটনা ঘটে যাওয়ার কয়েকদিন পর ঢাকা থেকে চেতনাবাদী বুদ্ধিজীবী, সংস্কৃতিজন আর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সেখানে ফটোসেশন করে আসেন। ফিরে এসে তারা ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করেন। সাম্প্রদায়িক হামলার নিন্দা করে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে প্রেসক্লাবের সামনে কিংবা শাহবাগে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা করা হয়। কিন্তু সেখান থেকেও কেউ তখনো এ প্রশ্নটা তুলেছেন কি? ঢাকায় বসে কর্মসূচি পালন করে কি পীরগঞ্জের (এটা হবে গঙ্গাচড়া) হামলার শিকার মানুষদের আতঙ্ক ও নিরাপত্তার বোধ দূর করা যাবে?’

ঢাকায় কর্মসূচি পালনের বিষয়টি আমি খাটো করে দেখি না। যার যার অবস্থান থেকে প্রতিবাদ করার একটা গুরুত্ব আছে বৈকি! তবে আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগের ব্যাপারে যা বলা হয়েছে তার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। আমার ধারণা, হামলা ঠেকাতে গিয়ে আওয়ামী লীগ আর ‘হিন্দুদরদী’ হতে চায় না। কারণ তাতে ভোটের বাজারে অসুবিধাই হওয়ার কথা। বিএনপি যদি হিন্দুবিরোধী হয়ে জনপ্রিয় থাকতে পারে তাহলে আওয়ামী লীগ কেন অন্য পথে হাঁটবে? আওয়ামী লীগের প্রতিযোগিতা তো এখন বিএনপির সঙ্গে। তাছাড়া হিন্দুরা সম্ভবত এখন আর ভোটের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর নয়। দলীয় স্বার্থ ও ভোটের রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে মানবিকতা ও বিবেকবোধ দ্বারা এখন আর কেউ চালিত হয় বলে মনে হচ্ছে না।

চার.
১৮ নভেম্বর ভোরের কাগজের প্রথম পৃষ্ঠায় একটি খবরের শিরোনাম : বিএনপি-আওয়ামী লীগসহ সব দলের মাঠ পর্যায়ের নেতারা জড়িত। বিস্তারিত খবরে বলা হয়েছে : বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীরা রংপুরের ঠাকুরপাড়ায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে। রিপোর্টে জড়িত সবার নাম-পরিচয়ও দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এদের কি শাস্তি হবে? নাকি এদের রাজনৈতিক পরিচয় তাদের দায়মুক্তি দেবে? এখন পর্যন্ত সাম্প্রদায়িক সহিংসতার যতগুলো ঘটনা ঘটেছে তার একটিরও অপরাধীদের বিচার হয়নি, শাস্তি হয়নি। অপরাধীরা ছাড় পায় বলেই কি একের পর এক পরিকল্পিত অঘটন ঘটে চলেছে? হিন্দুদের দেশছাড়া করার এই অপকৌশলে এখন যারা আমোদ বোধ করছেন তারা সম্ভবত এই রাজনীতির পরিণতিটা বুঝতে পারছেন না। আজ অন্যের ঘর পুড়ছে, কাল নিজের ঘর পুড়বে না- সে নিশ্চয়তা কে দিচ্ছে? আগুন নিয়ে খেলার পরিণাম ভালো হয় না।

পাদটীকা : তিন দিনব্যাপী ডাকা ‘লিট ফেস্ট ২০১৭’ হয়ে গেল। এই উৎসবে এসেছিলেন সিরীয় কবি আলী আমাদ সা’ইদ এসবার, যিনি অ্যাডোনিস নামেই পরিচিত। কয়েকবার নোবেল পুরস্কারের মনোনয়নের ছোট তালিকায় এসেছেন এই কবি। তিনি উৎসবের এক আয়োজনে আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেছেন, তিনি আজীবন রাষ্ট্রীয় জীবনে ধর্মকে রাজনীতি থেকে আলাদা রাখতে চেয়েছেন। ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত ব্যাপার। ধর্ম ও রাজনীতি একসঙ্গে মিলিয়ে দিলে দুটোই দূষিত হয়। ধর্মগ্রন্থগুলো আবার নতুন করে নানা দিক থেকে পাঠ করার প্রয়োজন আছে।

আমাদের দেশেও রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ক্রমাগত বাড়ছে। ফলাফল তো দেখাই যাচ্ছে। গত শতকের ষাটের দশকেও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা রোধে ‘পূর্ব বাংলা রুখিয়া দাঁড়াও’ বলে সম্মিলিত যে প্রতিরোধ দেখা গিয়েছিল, আজ আর তা দেখা যাচ্ছে না। কিছু মানুষ নিশ্চয়ই এখনো দৃঢ়ভাবে সম্প্রীতির পক্ষে কিন্তু তাদের অবস্থান দুর্বল, তারাও আসলে সংখ্যালঘু। অর্থাৎ সংখ্যালঘুরাই এখন সংখ্যালঘুদের পক্ষে।

বিভুরঞ্জন সরকার : কলাম লেখক।

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71