বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
সংখ্যালঘু তত্ত্ব ও বিভ্রান্ত রাজনীতি
প্রকাশ: ০৯:২২ pm ২০-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ০৯:২২ pm ২০-০৬-২০১৫
 
 
 




সানাউল হক সানী : 
দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর চড়াও হচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। তবে বিভিন্ন স্থানের এ হামলা লুটপাটের ঘটনায় সরকারদলীয় নেতাদের নামও এসেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে ইন্ধন আবার কোন ক্ষেত্রে হিন্দুদের ভোট ব্যাংককে পুঁজি করে ঘৃন্য রাজনীতির খেলা খেলছে এসব স্বার্থবাদী নেতারা। 



অন্যদিকে প্রতিদিন টকশো আর মিছিল মিটিংয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে সংখ্যালঘু বলে স্বীকৃতি দিয়ে প্রকারান্তে তাদের অধিকারকেই খাটো করছে একশ্রেণীর বুদ্ধিজীবী ও প্রগতিশীল নামধারীরা। ১৯৯২ সালের ১৮ ডিসেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৭/১৩৫ সিদ্ধান্ত মোতাবেক গৃহীত জাতিসংঘ সংখ্যালঘু ঘোষণাপত্রের ধারা ১ অনুযায়ী জাতিগত, নৃতাত্ত্বিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং ভাষাগত ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীদের সংখ্যালঘু হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। একই সাথে তারা তাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম সংরক্ষণ করে। কিন্তু বাংলাদেশে হিন্দুদের সাথে ধর্মের বাইরে আর কোন বিভেদতো দেশের মানুষের সাথে নেই। মনে প্রাণে এ দেশর হিন্দুরা আমাদের সবকিছুই লালন করে। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুর“ করে দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে হিন্দু সম্প্রদায়ের গৌরবোজ্জল ভূমিকা রয়েছে। পহেলা বৈশাখ, বিজয় দিবস এমনকি বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানও হিন্দু মুসলিম একিভূত হয়ে আমরা পালন করি। তাহলে শুধুমাত্র ধর্মের উপর ভিত্তি করে একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আমরা সংখ্যালঘু হিসেবে চিহ্নিত করতে পারিনা। সংখ্যালঘু অধিকার বিষয়ক জাতিসংঘ ঘোষণাপত্রে সংখ্যালঘুর অধিকার সংক্রান্ত কিছু মানদণ্ড নির্ণয় করেছে এবং সংশিষ্ট রাষ্ট্রকে সংখ্যালঘুর অধিকার নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন ও পদক্ষেপ গ্রহণের গাইডলাইন প্রদান করছে। কিন্তু আমাদের রাষ্ট্রতো হিন্দুদের সেই অধিকারও দিচ্ছেনা। তাহলে কেন তাদের সংখ্যালঘু বলে দূরে ঠেলে দিচ্ছি। দেশের স্বার্থবাদী শ্রেণীর স্বার্থ উদ্ধারে জন্য কেন হাজারো হিন্দুদের স্বপ্ন সাধকে বিসর্জন দিতে হবে।

অতীতের ধারাবাহিকতায় ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনের পরেও হিন্দুরা আবারো আক্রমণের শিকার হলেন। এবার আর বিচারের কথা বলবনা। প্রমাণ হয়ে গেছে বিচার চেয়ে কোন লাভ নেই। সরকার ও বিরোধীদল উভয়ই এটা নিয়ে নগ্ন রাজনীতি করবে। রামুর বৌদ্ধ বিহার ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ওপর পৈশাচিক হামলার ঘটনার বিচার প্রক্রিয়া থমকে আছে। দেশের মিডিয়া ও সরকার বেশ কয়েকদিন উঠেপরে লেগেছিল। কিন্তু আবার সেই আগের মতই। বিশ্বাস ভালবাসা আর ভিটেবাড়ি সবকিছু হাড়িয়ে নিদার“ন ব্যাথা নিয়ে বেঁচে আছে ক্ষতিগ্রস্থ বৌদ্ধ সম্প্রদায়। কিন্তু সমাজ ও দলের মোড়লরা এ ঘটনার পিছনে থাকায় এই বিচার হয়নি। হয়ত আর কোনদিনও হবেনা। একই ভাবে ২০১৩ সালের পাবনার সাঁথিয়ার সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর পুড়িয়ে দেয়ার পরেও সরকারদলের কর্মীদের নাম এসেছে। বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, সিপিবি, বাসদ, সুজন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র, নারী সংগঠন, গণফোরামসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোও এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের লোকজনকেই দায়ী করেছেন। তেমনি যশোরের হামলার ঘটনায়ও নাম উঠেছে সাবেক হুইপ ওহাবের নাম। এসব ক্ষেত্রে সরকার তারা অবস্থান এখনও পরিস্কার করেনি। অন্যদিকে প্রতিটি ঘটনায় জামায়াত-শিবিরের নাম আসলেও স্বাধীনতার পরবর্তিতে এ ঘটনায় জড়িত হিসেবে কোন জামায়াত-শিবির কর্মীকে বিচারের আওতায় আনা হয়নি।
ডিজিটাল যুগে আসার আগে সরকারপক্ষ আমাদেরকে বোঝাত, হিন্দুদেরকে শুধু বিরোধীদলই মারে। কিন্তু গত পাঁচ বছরে ডিজিটালটাইজডের কল্যাণে আমরা বুঝে গেছি আসলে তাদেরকে সরকারীদলও মারে।

আমাদের দেশে সরকারী দলের লোকজনের অপরাধের সাধারণত বিচার হয়না। এমনকি বিরোধী দলের লোকদের যে অপরাধের বিচার করলে সেই একই অপরাধে সরকারী দলের লোকদেরও বিচারের দাবি জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা থাকে তেমন অপরাধে সাধারণত বিরোধী দলকেও ছাড় দেয়া হয়।

তাই এসব রাজনীতির খোলসে বন্দী গরীব হিন্দুদের ভাগ্যর কোন পরিবর্তন হবেনা। আমরা মিডিয়ায় দেখেছি সরকার বা বিরোধীদলের কোন হিন্দু নেতাই এ ঘটনায় এগিয়ে আসেনি। আর হয়ত আসবেও না। আসলে যে তাদের আসল ঘটনা প্রকাশ পেয়ে যাবে। মূল কথা হচ্ছে সরকার হিন্দুদের ওপর কোন আক্রমণেরই বিচার করবে না। আর বিরোধীদলও চাইবেনা এ ঘটনার সুষ্ঠ বিচার হোক। কারণ এ দুটি শক্তির রাজনীতির তুরুপের তাস হচ্ছে এই হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন। এধরণের অপরাধে বিচার করার সংস্কৃতিই কেউ তৈরি করবেনা। বরং, যাদের হাতে শক্তি ও ক্ষমতা আছে তারা এখন নতুন করে হিন্দুদের পরিত্যাক্ত জমি-জমা দখলের উৎসব করবে।

বর্তমান অসাম্প্রদায়ীক ইমেজ দাবিদার সরকারকে প্রতিবেশী ভারত ক্ষমতার স্বার্থে সবরকম সাহায্য করলেও তাদের ধর্মের ভাইদের জন্য কিছুই বলবে না। পাছে যদি সরকার আবার এই কাণ্ডে বিপদে পরে। সর্বক্ষেত্রেই রাজনীতি। আর আমাদের মত তাদের দেশী ভাই-বন্ধুরা তাদের জন্য অকাজের সমবেদনা বোধ করা ছাড়া কিছু করার ক্ষমতা ও রাখিনা।

ইতিমধ্যেই আমরা মিডিয়ার কল্যাণে দেখেছি ভিটেছাড়া হিন্দুদের ছবি ফ্রেমবন্দী হয়েছে। এদের অনেকেই নিশ্চিতভাবে দেশছাড়া উদ্বাস্তুদের মিছিলে যোগ দেবেন। নিজ জন্মভিটা ছেড়ে হয়ত এ বছরও অনেক হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক পা বাড়াবে অজানার উদ্দেশ্য। আমাদের এ নষ্ট সমাজ তার দায়ভারও হয়ত নিবে না। এর বাইরে রাজনৈতিক কারণে গত কয়েক বছরে অসংখ্য মানুষ দেশ ছাড়ার আয়োজন শুরু করেছেন। নিরাপত্তাহীনতা ও কার্যত দেশের উপর রাজনৈতিক অধিকার না থাকার অনুভূতি তাদের মধ্যে যে উদ্বাস্তু হওয়ার বিশাল অথচ বিক্ষিপ্ত এক নীরব মিছিল তৈরি করেছে সে মিছিলের ছবি ফ্রেমবন্দী করা সম্ভব হবে না। সেটা নিয়ে কোন গুরত্ববহ সংবাদও হয়ত প্রকাশিত হবেনা।

হামলার শিকার এসব গরীব হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের আর্তনাদ আমাদের চোখ ভিজিয়ে দেবে, আমরা রাস্তায় নেমে হয়ত অনেকেই তাদের জন্য মায়াকান্না করব। মিডিয়ায় চেহারা দেখানোর জন্য উদগ্রীব হব। বিরোধীমতের উপর দোষ চাপানোর সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। কেননা অনেক ঘটনার পিছনেই সরকারদলীয় লোকদের নাম এসেছে। নির্বাচনের আগে এক প্রভাবশালী সাবেক হুইপ ভোট না দিলে হিন্দুদের ক্ষতি করার হুমকী দিয়েছন। সরকারের যদি সৎ সাহস থাকে এসব কুলাঙ্গারদের ধরে আইনের আওতায় নিয়ে আসুক। এর বাইরে প্রায় প্রতিটি ঘটনাই জামায়াত-শিবির আবার কোন ঘটনায় বিএনপি'র কর্মীদের নাম এসেছে। সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এই ঘটনার আসল রহস্য উদঘাটনের জন্য বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠন করতে পারে। সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠতে পারে সামাজিক আন্দোলনও। কেননা দেশের কিছু মানুষের মধ্য ধর্মীয় গোরামী রয়েছে। আবার অনেকে ভিন্ন ধর্মের মানুষদের প্রতিবেশী বা বন্ধু না ভেবে সম্পত্তি দখলের মোাক্ষম সুযোগ হিসেবে দেখে।

সরকার যদি সকল স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে অতি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপে গ্রহণ না করে তাহলে হয়ত আর কিছুদিন পরে হিন্দুদের যাদুঘরেই খুজতে হবে। ছোটবেলায় শুনতাম আমার নিজ জেলা মাদারীপুরে অনেক হিন্দু ছিল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কয়েকটি উপন্যাসেও পরেছি সাত চলি­শের দেশভাগের আগে আমার এলাকায় হিন্দু প্রধান ছিল। এরপরেও দীর্ঘদিন ধরে অনেকই তারা নিদারুণ যাতনা সহেও জন্মভিটায় অবস্থান করেছিল। তবে সেই অতীত আর নেই। দশগ্রাম খুজলেও এখন আর হিন্দু বাড়ি মেলে না। এক সময় হয়ত এ দেশে যে ভিন্ন ধর্মের মানুষ ছিল তা নতুন প্রজন্মের কাছে রূপ কথা হয়েই থাকেব।

লেখক: 
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক ও সাধারণ সম্পাদক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি 

এইবেলা ডটকম/এসএম/এসবিএস
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71