মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২০
মঙ্গলবার, ২৭শে শ্রাবণ ১৪২৭
সর্বশেষ
 
 
সংস্কারে সৌন্দর্যে একজন হিন্দু
প্রকাশ: ১১:০১ pm ০৩-০৭-২০২০ হালনাগাদ: ১০:২১ pm ০৭-০৭-২০২০
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


৩৮ তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে উন্নীত ডাঃ নিলয় আর্যের বিসিএস ভাইবার প্রশ্নের উত্তরে কি বলেছিলেন। নমস্কার ভ্রাতা ও ভগিনীদের। সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা গতকালের সকল শুভেচ্ছার জন্য।আপনাদের এই আশীর্বাদ আমার শিরোধার্য,সৌভাগ্যও বটে। সেই সুত্রেই আপনারা হয়তো জানেন যে আমি গতকাল ৩৮ তম বিসিএস এ হেলথ ক্যাডার এ বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন কর্তৃক সহকারী সার্জন হিসেবে সুপারিশকৃত হয়েছি। কিন্তু আজ আমি এসব নিয়ে কথা বলতে আসিনি, আজ এসেছি গত ৩ বছরের এই বিসিএস পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া এক অদ্ভুত ধর্মসংকটের কথা বলতে।

আপনারা সবাই জানেন বিসিএস তথা সিভিল সার্ভিস পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বশেষ একটি ধাপ ভাইবা তথা মৌখিক পরীক্ষা যেখানে প্রতিটি ভাইভা বোর্ডে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের একজন বিজ্ঞ সদস্য থাকেন চেয়ারম্যান হিসেবে, সাথে থাকেন বিভিন্ন বিষয়ের আরও ৩-৪ জন এক্সপার্ট। আর এই ভাইভা বোর্ডে সনাতনী পরিক্ষার্থীরা প্রতিবছর ই একটি অদ্ভুত দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েন আর তা হল ভাইভা রুমে প্রবেশ করে সালাম দিব নাকি নমস্কার!
অধিকাংশ সনাতনীরাই সেফ থাকার জন্য সালাম দিয়ে থাকেন, ভাবেন যদি নমস্কার দিলে কিছু মনে করে! এ নিয়ে এক্সামের আগে তারা বিসিএস গ্রুপগুলোতে পোস্ট দিয়ে জানতেও চান যে ভাইভা বোর্ডে তারা নমস্কার দেবেন না সালাম দেবেন। কোচিং সেন্টারের স্যারদেরকেও হিন্দু দাদা দিদিরা এই প্রশ্নটা সবসময় করে থাকেন। অনেক হিন্দু আবার অবচেতন মনেই সালাম দেন, আর যদি নমস্কার দেনও কেউ কেউ, সেক্ষেত্রে একদম হাতজোড় করে প্রণাম মুদ্রায় দেন না, এমনিতে মুখে নমস্কার বলেন। হাতজোড় করে প্রণাম মুদ্রায় একদম সনাতনী সংস্কৃতি অনুযায়ী নমস্কার দেন এমন হিন্দু পরিক্ষার্থী বেশ বিরল। সবচেয়ে মজার বিষয় হল আমারই অতি নিকট এক বন্ধু এর আগের বিসিএস এ নমস্কার দেয়ায় স্যার বিরক্ত হয়ে বলেছিলেন 
"এখানে এত নমস্কার দিচ্ছ বাইরে গিয়ে তো গালি দিবা!" আর সেই বন্ধুর বিসিএস হয়ওনি। তাই এই ব্যাপারটি শুরু থেকেই আমার মাথায় ছিল।

সেদিন ২০২০ সালের ১২ ই জানুয়ারি, ৩৮ তম বিসিএস এর ভাইভা দিতে গেলাম আমি। যথারীতি ভাইভা বোর্ডে ঢুকে হাতজোড় করে সবাইকে প্রণাম মূদ্রায় নমস্কার জানালাম। 
শ্রদ্ধেয় চেয়ারম্যান স্যার জিজ্ঞেস করলেন -
"নমস্কার অর্থ কি?"
উল্লেখ্য যে এটি স্যার কিন্তু প্রশ্ন করেননি।উনি আসলেই জানতেন না নমস্কার অর্থ কি। উনি আগ্রহ নিয়েই জানার জন্য জিজ্ঞেস করলেন।

আমি স্যারকে সুন্দর করে শাস্ত্র অনুযায়ী বুঝালাম কিভাবে এর মাধ্যমে অন্তস্থিত পরমাত্মাকে প্রণাম করা হয়, ঈশোপনিষদ থেকে পবিত্র বেদমন্ত্র কোট করে বললাম কিভাবে নারী-পুরুষ, ধনী-দরিদ্র, বড়-ছোট সকলের মধ্যেই ঈশ্বর সমানভাবে বিরাজিত হয়ে আছেন আর সেই অন্তস্থিত পরমাত্মাকে প্রণাম করে ব্যাক্তিকে সম্মানিত করার পদ্ধতিই হল আমাদের "নমস্কার"।

স্যার শুনে মুগ্ধ হয়ে গেলেন। বললেন নমস্কার অর্থ এত সুন্দর আগে জানতাম না! "হিন্দু ছেলেমেয়েগুলো এত সুন্দর নমস্কার রেখে আমাদেরকে সালাম দেয় কেন কে জানে" এই কথা বলাবলি করতে লাগলেন বোর্ডে থাকা অন্যান্য স্যারদের সাথে। এরপর আমার উত্তর দেবার সময় বলা দুইটি শব্দ নিয়ে তিনি আগ্রহ করে জানতে চাইলেন আত্মা আর পরমাত্মা আসলে কি জিনিস।
আমি উত্তর দিলাম- স্যার পবিত্র ঋগ্বেদে বলা আছে

ওঁ দ্বা সুপর্ণা সযুজা সখায় সমানং বৃক্ষং পরিষস্বজাতে।
তয়োরন্যঃ পিপ্পলং স্বাদ্বত্তি-অনশ্নন্নন্যো অভি চাকশীতি।।

অর্থাৎ আত্মা ও পরমাত্মা হল স্যার মনোরম সুন্দর স্বর্ণময় একে অপরের সখার ন্যায় দুইটি পাখির ন্যায় যারা একটি বৃক্ষের ডালে বসে আছে। তাদের মধ্যে একটি বৃক্ষের ফলকে স্বাদের জন্য ভক্ষণ করে কিন্তু অন্যটি ফলকে ভক্ষণ না করিয়া পর্যবেক্ষণ ই কেবল করে থাকে। সেই ফল ভক্ষণ করে জাগতিক স্বাদ গ্রহণকারী পাখিটিই হল আত্মা, আর পর্যবেক্ষণ করে যাওয়া তার মিত্র পাখিটি হল পরমাত্মা তথা ঈশ্বর।

এই কথা শুনে একজন অন্য ধর্মালম্বী হয়েও স্যারের মুখে পবিত্র বেদবাণীর প্রতি প্রশংসার যে মুগ্ধ দৃষ্টি ও হাসি আমি দেখেছি সেই দৃশ্য মনে করে আজীবন আমি তৃপ্তি লাভ করতে পারব, এই তৃপ্তির মূল্য হাজার কোটি টাকা দিয়েও পরিমাপ করা যাবে না।
সবচেয়ে মজার বিষয় হল আমি টেকনিকাল ক্যাডারের ভাইভা শুরুর প্রথমদিনের প্রার্থী ছিলাম। এরপরের দিন থেকে যত হিন্দু পরীক্ষা দিতে গেছেন এবং গিয়ে নমস্কার না দিয়ে ভয়ে সালাম দিয়েছেন সবাইকেই স্যার ধরেছেন বলেছেন তুমি তোমাদের এত সুন্দর নমস্কার বাদ দিয়ে সালাম দিচ্ছ কেন? এবং তারপরেই তিনি নমস্কার শব্দের অর্থ জিজ্ঞেস করেছেন তাদের। যেখানে আগের বিসিএস গুলোতে হিন্দু ভাই-বোনরা ভয়ে নমস্কারই দিতে  পারতনা সেখানে এবার স্যারেরাই তাদেরকে বলছেন সালাম নয়, নমস্কার দাও। আর এই প্রাপ্তির আনন্দ আমার হৃদয়ে সর্বদা ই অনুভূত হবে। এই ঘটনা থেকে আমরা কি শিখলাম?

ধর্ম এব হত হন্তি
ধর্ম রক্ষতি রক্ষিত
ধর্মকে রক্ষা করুন, ভয় পাবেন না, ধর্মকে ধারণ করুন দৃঢ়ভাবে, দেখবেন সেই ধর্মই আপনাকে রক্ষা করবে। যে ধর্মকে ধারণ করে, তাকে ধর্মই রক্ষা করে।
আমি বিসিএস পরীক্ষার মত এত গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার ভাইভাতে এই কারণে বাদ পড়তে পারি এই ভয় থাকলেও নিজের পবিত্র সনাতন ধর্মকে ত্যাগ করিনি। হয়তো সেজন্যেই সেই ধর্ম আমাকে রক্ষা করেছে!
 
তাই পবিত্র উপনিষদ বলছে-
ধর্মান্ন প্রমদিতব্যম্
কখনো ধর্ম থেকে বিচ্যুত হবেনা। আর এই ধর্মই সেই চিরন্তন সনাতন ধর্ম।

নি এম/নিলয় আর্য

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 

 

E-mail: info.eibela@gmail.com

a concern of Eibela Ltd.

Request Mobile Site

Copyright © 2020 Eibela.Com
Developed by: coder71