বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৪ঠা আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ১০৪তম জন্মবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৭:১০ am ১৪-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ০৭:১০ am ১৪-১২-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্ত্র সাহা ||

স্বাধীনতা সংগ্রামী, সঙ্গীতশিল্পী এবং সুরকার হেমাঙ্গ বিশ্বাস (জন্মঃ- ১৪ ডিসেম্বর, ১৯১২ - মৃত্যূঃ- ২২ নভেম্বর, ১৯৮৭)

মূলত লোকসঙ্গীতকে কেন্দ্র করে গণসঙ্গীত সৃষ্টির ক্ষেত্রে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অবদান উল্লেখযোগ্য। তাঁর সংগৃহীত অসংখ্য লোকগান বহু অঞ্চল, রাজ্য এবং দেশ জুড়ে বিস্তৃত। এই সংগ্রহ হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর্কাইভকে একটা স্বতন্ত্র মাত্রা দিয়েছে। এর অনেকগুলিই ‘গানের বাহিরানা’য় তিনি উদ্ধৃত করেছেন। কিন্তু তার বাইরেও বহু গান রয়েছে - ভারতবর্ষব্যাপী তো অবশ্যই, এমনকি চীন, মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশ, তদানীন্তন রাশিয়ার লোকগান সে সংগ্রহের অন্তর্ভুক্ত। নেপাল থেকে আসতেন কালু সিং। অপূর্ব গলা ছিল তাঁর। নেপালী ঝাউরে এবং অন্যান্য বহু গান কালু সিং এর থেকে সংগ্রহ করেছিলেন তিনি। একসময় উৎপল দত্তের তীর নাটকের জন্য বীরপ্রধান বলে একটি গান রচনা করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। কালু সিং গানটির সুরারোপে তাঁর অংশীদার ছিলেন। গানটি নেপালী লোকগানের প্রভাবসমৃদ্ধ।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটের মিরাশিতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করার পর তিনি শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে ভর্তি হন। সেখানে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। তিনি ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে কারাবন্দী থাকাকালে তিনি যক্ষারোগে আক্রান্ত হন। তারপর যাদবপুর হাসপাতালে কিছুকাল চিকিৎসাধীন থাকেন এবং সেই কারণে তিনি মুক্তি পান। ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে তেলেঙ্গানা আন্দোলনের সময়ে তিনি গ্রেফতার হন এবং তিন বছর বন্দী থাকেন।

১৯৩৮-৩৯ খ্রিস্টাব্দে বিনয় রায়, নিরঞ্জন সেন, দেবব্রত বিশ্বাস প্রমুখের সাথে ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা আই.পি.টি.এ গঠন করেন। পঞ্চাশের দশকে এই সংঘের শেষ অবধি তিনি এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলেন।

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে বাংলার প্রগতিশীল লেখক শিল্পীদের আমন্ত্রনে তিনি প্রথম কলকাতায় আসেন সঙ্গীত পরিবেশন করতে। ১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে তাঁর উদ্যোগে এবং জ্যোতিপ্রকাশ আগরওয়ালের সহযোগিতায় সিলেট গণনাট্য সংঘ তৈরি হয়। স্বাধীনতার আগে ভারতীয় গণনাট্য সংঘের গানের সুরকারদের মধ্যে তিনিই ছিলেন প্রধান। সেই সময়ে তাঁর গান তোমার কাস্তেটারে দিও জোরে শান, কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে প্রভৃতি আসাম ও বাংলায় সাড়া ফেলেছিল। আসামে তাঁর সহযোগি ছিলেন বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, সাহিত্যিক অশোকবিজয় রাহা, সেতারবাদক কুমুদ গোস্বামী প্রভৃতি। ১৯৫৬ সালে চিনে যান চিকিৎসার জন্য। আড়াই বছর থাকেন এবং খুব কাছ থেকে দেখেন চিনের সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ১৯৬১ সালে স্থায়ীভাবে চলে আসেন কোলকাতা এবং সেই সময়েই চাকরিনেন সোভিয়েত কনস্যুলেটের সোভিয়েত দেশ পত্রিকার সম্পাদকীয় দপ্তরে। কাজ করার সময় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে মতপার্থক্য হলে তিনি কাজ ত্যাগ করেন। চিন - ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল। দুবার তিনি চিনে গিয়েছিলেন। চিনা ভাষায় তাঁর অনেক গান আছে।

যে পরিবারে তিনি জন্মেছিলেন, সেখানে গান-বাজনার কোনো চর্চা ছিল না। তাঁর মায়ের পরিবার অবশ্য ছিলো ভিন্নতর। নানা ছিলেন সে সময়ের নামকরা তবলা বাদক। মা সরোজিনী বিশ্বাসও গান কিছুটা জানতেন। মায়ের আগ্রহেই তাঁর কবিতা লেখার সুত্রপাত ঘটে। শৈশবে স্কুলে যাবার পথে গান গেয়ে গেয়ে স্কুলে যেতেন। কিন্তু, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গান শেখার সৌভাগ্য তাঁর হয় নি।
জ্যোতিপ্রকাশ আগারওয়ালের কাছ থেকে গানের কিছুটা তালিম নিয়েছিলেন এক সময়। সেটাই ছিল তাঁর একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। এর বাইরে বলা যেতে পারে যে, গানের ক্ষেত্রে তিনি মূলত স্বশিক্ষিতই ছিলেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস নিজেই এ সম্পর্কে বলেন যে, “গানের প্রতি আমার এই আকর্ষণ কিন্তু বাবার মোটেও মনঃপূত ছিল না। তাই ইস্কুল যাওয়ার পথে মাঠ ঘাট ছিল আমার গাইবার ক্ষেত্র। খেতের কৃষকরা আমার গান শুনতে খুব ভালবাসতো। এমনি করে মাঠের সঙ্গে হাওয়ার সঙ্গে আমার গানের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেলো।“
শৈশব থেকেই লোকসঙ্গীত গাইতেন এবং তা নিয়েই ভাবতেন আর চর্চা করতেন বলেই লোকসঙ্গীতে অসামান্য দখল ছিল তাঁর। লোকসঙ্গীতের সরল আবহ দিয়ে সহজ-সরল সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায়, এটা শুরুতেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন তিনি। সে কারণে লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকেই মূলত গণসঙ্গীত গেয়েছেন তিনি।
কলেজে থাকা অবস্থায় হেমাঙ্গ বিশ্বাস জড়িয়ে পড়েন স্বদেশী আন্দোলনে। আন্দোলন করতে গিয়ে আটক হন। বিচারে ছয় মাসের জেল হয় তাঁর। কলেজ থেকে বহিস্কৃতও হতে হয় তাঁকে এজন্য। তাঁর কারাভোগের এখানেই শেষ না। স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ততার কারণে ১৯৩২ সালে আবারও গ্রেফতার হন তিনি। প্রায় তিন বছর কারাভোগ করতে হয় সে সময়। জেলে থাকা অবস্থাতেই আক্রান্ত হন সেই সময়কার মরণব্যাধি যক্ষ্মাতে।
জেলে থাকা অবস্থাতেই ইংরেজরা বেশ কয়েকবার প্রস্তাব নিয়ে এসেছে তাঁর কাছে। আর কখনো স্বদেশী আন্দোলনে যুক্ত হবেন না, এটা লিখিত দিলে মুক্তি পাবেন তিনি। এরকম অবমাননাকর প্রস্তাবগুলোকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখান করেন তিনি। যক্ষ্ণায় তাঁর মৃত্যু নিশ্চিত জেনে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে মুক্তি দেয়। মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে জেলে রাখা বড্ড বেশি ঝামেলার কাজ।
জেল থেকে বের হয়ে এসে পরপারে যাবার বদলে সুস্থ হয়ে উঠেন তিনি। তবে, এর জন্য তাঁকে যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে থাকতে হয় দীর্ঘ তিনবছর। জেলে থাকা সময়ে কংগ্রেসের অহিংস নীতির প্রতি আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। এবারে ঝুঁকে পড়লেন মার্কসবাদী রাজনীতির প্রতি। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি সুভাষ বসু হবিগঞ্জে এলে তাঁকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনাপত্র পাঠ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।
চা বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং ডিকবয় তেল কোম্পানির শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। ১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্কে সাংস্কৃতিক স্কোয়াড ‘সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড’ গঠন করেন। সিলেট তখন বাংলার অংশ ছিল না, ছিল আসামের অংশ। গানের স্কোয়াড নিয়ে চষে বেড়িয়েছেন তিনি সারা আসাম জুড়ে।

তিনি যে বামপন্থী মতাদর্শী এবং এর স্বপক্ষে নানা আন্দোলন করে যাচ্ছেন, এটা একেবারেই পছন্দ হয় নি তাঁর জমিদার পিতার। ছেলে বখে গিয়েছে এই চিন্তা থেকে তিনি তাঁকে বাড়ি থেকে বিতাড়ন করেন। বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে হেমাঙ্গ বিশ্বাস চলে যান শিলং এ। এই যে বাড়ি ছাড়া হলেন তিনি, আমৃত্যু আর ফিরে যান নি তাঁর পরিবারের কাছে। আপন ঘরকে পর করে বাহিরকে আপন করে নিয়েছিলেন তিনি। মানবমুক্তির লক্ষ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়েছেন। সিলেটের কমিউনিস্ট পার্টি তাঁর ঘাড়ে সম্পূর্ণ দায়িত্ব দিয়ে গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ার কাজে তাঁকে পাঠায়। এই সময়ে তিনি রচনা করেন তাঁর বিখ্যাত গান ‘কাস্তেটারে দিও জোরে শানরে’ প্রচলিত একটা গানকেই পালটে দিয়ে নতুনরূপে হাজির করেছিলেন তিনি। একদিন তিনি হঠাৎ করেই একটা সারি গান শোনেন। সে গানটা ছিলো এরকম।
সাবধানে গুরুজীর নাম লইওরে সাধুভাই
সাবধানে গুরুজীর নাম লইও।
এটাকেই পাল্টে দিয়ে, এর গঠনসূত্র অনুসরণ করে তিনি লিখলেন,
কাস্তেটারে দিও জোরে শান কিষাণ ভাই রে
কাস্তেটারে দিও জোরে শান।
ফসল কাটার সময় এলে কাটবে সোনার ধানরে
দস্যু যদি লুটতে আসে কাটবে তাহার জান রে।
১৯৪৬ সালে আসামে গণনাট্য সংঘ গঠিত হয়। তিনি এর সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পর-পর তিনবার ঐ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। ভারত ভাগের গণনাট্য সংঘের এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরাও বিভাজিত হয়ে যায়। এই সময় তিনি লেখেন তাঁর বিখ্যাত ব্যাঙ্গাত্মক গান – মাউন্ট ব্যাটন মঙ্গলকাব্য এই গান দেশজুড়ে সাড়া ফেলে দিয়েছিল তখন।
১৯৪৮ সালে তেলেঙ্গানা ও তেভাগা কৃষক বিদ্রোহ দমনে স্বাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। হাজার হাজার কমিউনিস্ট নেতা-কর্মীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন-পীড়ন এবং গ্রেফতার করা হয়। ১৯৫১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গ্রেফতার হন। কিন্তু, এবারও অসুস্থতার কারণে ছাড়া পেয়ে যান তিনি। ১৯৫৭ সালে চিকিৎসার জন্য তাঁকে চিনে পাঠায় কমুনিস্ট পার্টি। চিনে তিন বছর ছিলেন তিনি। এই তিন বছরে চিনা ভাষাটা শিখে ফেলেন তিনি।
চিন থেকে ফিরে আসার পর ১৯৫৯ সালে রাণু দত্তকে বিয়ে করেন। এরপর আরো কয়েকবার তিনি চিনে গিয়েছেন। কমরেড মুজাফ্‌ফর আহ্‌মদের সুপারিশে কলকাতার সোভিয়েত কনস্যুলেটে ১৯৬১ সালে চাকরি হয় তাঁর। কিন্তু, বেশিদিন এই চাকরিটাকে টিকিয়ে রাখতে পারেন নি তিনি। চীন-সোভিয়েত মতাদর্শগত বিভাজনে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনও তখন চরমভাবে বিভক্ত। যার বিরূপ প্রভাব এই উপমহাদেশেও পড়েছিল। চিনের প্রতি তাঁর অতি আকর্ষণ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে সোভিয়েত পার্টির সমালোচনার কারণে ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত কনস্যুলেটের চাকরি ত্যাগ করতে হয় তাঁকে।
১৯৭১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গঠন করেন ‘মাস সিঙ্গার’ নামে গানের এক দল। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই দল নিয়েই তিনি ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশ-বিদেশ। এই অনন্য সাধারণ মানুষটি, এই অসাধারণ গণসঙ্গীত শিল্পীটি মারা যান সাতাশি সালে।
সঙ্গীত পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাঁর চিন্তা সবসময়ই কেন্দ্রীভূত থেকেছে সংগ্রামী জনতার প্রতি। এদেরকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে তাঁর সাঙ্গীতিক জগত। তাঁর সৃষ্টিশীলতা তাই কখনও অন্যদিকে বাঁক নেয় নি। চল্লিশের দশকে ‘কাস্তেটারে দিয়ো জোরে শান’ এ যাঁর সঙ্গীত জীবন শুরু, তেভাগা সংগ্রামের পথ বেয়ে তেলেঙ্গানার পথে ‘মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্যে’ তার সঙ্গীত জীবনের সফল পরিণতি।
পঞ্চাশের দশকে তাঁর গানে যেমন দেশবিভাগের যন্ত্রণা অনুভব করা যায়, ঠিক তেমনই সংগ্রামের কঠিন শপথে উদ্দীপিত হয়ে উঠা যায়। পঞ্চাশ দশকের শেষভাগে তিনি দীর্ঘদিন চিন দেশে কাটিয়ে এসেছেন। গীতিকার হিসেবে তাঁর ওপর এর প্রভাব ছিল অপরিসীম।
ষাটের দশকে কল্লোল, তীর, লাল লণ্ঠন এরকম কিছু বিপ্লবী নাটকে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আমরা তাঁকে নতুনভাবে পাই। লাল লণ্ঠন নাটকের সঙ্গীতে বিভিন্ন চিনা সুর ব্যবহার করেন তিনি। এটা তাঁর শিল্পী জীবনের এক উজ্জ্বল বিবর্তন। গান নিয়ে নানা পরীক্ষা-নীরিক্ষায় মেতে উঠেন তিনি এই সময়টাতেই। এই সময় তাঁর পরীক্ষা নিরীক্ষার একটি অসাধারণ ফসল হলো ‘শঙ্খচিলের গান’।
সত্তর দশকে আমরা তাঁকে পাই আন্তর্জাতিক শ্রমিকশ্রেণী ও প্রগতিশীল মানুষের বিশ্ববিখ্যাত সংগ্রামী গানের সুর অক্ষুণ্ণ রেখে বাংলার সার্থক অনুবাদকরূপে। মূল চিনা ভাষা থেকে বাংলা ও অসমীয়া ভাষায় সঙ্গীত রূপান্তরের তিনিই সম্ভবত পথিকৃত।
হেমাঙ্গ বিশ্বাস তাঁর গানগুলোর কোনটি নিজে রচনা ও সুরারোপ করেছিলেন, কোনটি সংগ্রহ করেছিলেন লোকসঙ্গীতের ভাণ্ডার থেকে, কোনটি কিছুটা পাল্টে নিয়ে চলতি লড়াই-এর সাথে যুক্ত করেছিলেন। গণসঙ্গীত একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে রচিত হয় নিশ্চয়ই, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে একটি গণসঙ্গীত যদি মানুষ ও তার লড়াইয়ের প্রাণ ধারণ করতে পারে তাহলে তা দীর্ঘদিন অন্যান্য লড়াইকেও উজ্জীবিত করতে সক্ষম হয়। কারণ শোষণ পীড়ন, বৈষম্য আর নিষ্পেষণ, অপমান বঞ্চনার বিরুদ্ধে কান্না ক্রোধ ও প্রতিবাদ, কিংবা মানুষের স্বপ্ন, সাহস এবং আরও অসংখ্য মানুষের সাথে মৈত্রী সংহতির গান মানুষকে স্পর্শ করবেই।
আমেরিকার ভিয়েতনাম আক্রমণের প্রতিবাদে ১৯৬৪ সালে তিনি সৃষ্টি করেন এক অনন্যসাধারণ গান, শঙ্খচিলের গান। এটি বাংলা ভাষার অন্যতম সেরা একটি গান। যদিও প্রচারের অভাবে প্রায় হারিয়ে গিয়েছে এই গান। এই গানের গীতিকা অনন্য, প্রচলিত অন্য যে কোনো বাংলা গানের তুলনায় সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমধর্মী। এর সুরের বিচিত্র উঠা-নামা শ্রোতার শ্রুতিরাজ্যে এক অদ্ভুত মায়াজগত তৈরি করে। গান নয়, যেনো কোনো কল্পলোক তৈরি হচ্ছে চোখের সামনে। অপ্রত্যাশিত পালাবদলে মাঝে মাঝেই চমকে উঠতে হয় বিপুল বিস্ময়ে। ক্ষণে ক্ষণে গায়ে কাঁটাও দিয়ে যায় রক্তনালীতে রোমাঞ্চের ছোঁয়ায়। যুদ্ধবিরোধী এমন মানবিক গান, যুদ্ধের বিরুদ্ধে এমন শক্তিশালী অস্ত্র খুব কমই আছে।
শঙ্খচিলের গানটি অনেক বড় একটি গান। এর শুরু আর শেষের কিছু অংশ।
সুদূর সমুদ্দুর
প্রশান্তের বুকে, হিরোশিমা দ্বীপে
আমি শঙ্খচিল৷
আমার দুডানা ঢেউয়ের দোলা
আমার দুচোখে
নীল, শুধু নীল৷
আমার শান্তিগানে বিদ্রোহ বাণ হানে
আফ্রো-এশিয়া-আমেরিকায় আমার ডানায় তোলে আঁধিয়া আকাশতলে
ঝনক ঝনন মরুঝঞ্ঝা, সাহারার৷
নদনদী বন্দরে অরণ্য প্রান্তরে পাহাড়ে গহ্বরে
রক্তে আদায় করি রক্তের ঋণ
আমি ভিয়েতমিন, আমি ভিয়েতমিন, আমি ভিয়েতমিন।

আজাদী হয়নি আজো তোর, / নব-বন্ধনও শৃঙ্খলডোর, / দুঃখরাত্রি হয়নি ভোর, / আগে কদম কদম চলো জোর।। শত শহীদের আত্মদান / একি তারই প্রতিদান / দেশদ্রোহীর এ বিধান / চূর্ণ কর কর অবসান।। সাম্রাজশাহীর পাতা ফাঁদ, / খুনি ধনীকের এ-বনিয়াদ / ভাঙ রে ভাঙ শোষণের বাঁধ, / শোন মহাচীনের সংবাদ।। ওরে ও কিষাণ মজুর / আর মনজিল নয় নয় দূর / ওরে তবু তো পথ বন্ধুর / ডাকে উত্তাল জলসমুদ্দুর।।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71