মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
সন্ন্যাসী সাহিত্যিক দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ৩৯তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১০:৩০ pm ১৩-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৩১ pm ১৩-০৪-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

সন্ন্যাসী সাহিত্যিক অবধূত - দুলালচন্দ্র মুখোপাধ্যায় (জন্মঃ- ১৯১০ - মৃত্যুঃ- ১৩ এপ্রিল, ১৯৭৮)

অবধূত লিখতে শুরু করেছেন প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছে। প্রথম বই ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ প্রকাশিত হচ্ছে ১৯৫৫ সালে। লেখক অবধূত আত্মপ্রকাশ করছেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। লেখার জন্য সময় পেয়েছেন তেইশ বছর। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ মিলিয়ে লিখেছেন প্রায় তেইশ-চব্বিশটি গ্রন্থ। অবধূত ছদ্মনামে তিনি একাধিক গ্রন্থ রচনা করেছিলেন । ১৯৫৪ সালে মরুতীর্থ হিংলাজ নামক উপন্যাস রচনা করে খ্যাতি অর্জন করেন । এই উপন্যাসটি অবলম্বনে একটি জনপ্রিয় চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়। তাঁর অপর বিখ্যাত গ্রন্থ উদ্ধারণপুরের ঘাট (১৯৬০)।
তিনি কলকাতার ভবানীপুরে এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম অনাথনাথ মুখোপাধ্যায়। পুত্র অমল মুখোপাধ্যায়ের জন্মের পর স্ত্রীর মৃত্যু হয়। কিন্তু সংসার শেষ অবধি এঁকে ধরে রাখতে পারল না। অজানা কোনো এক রহস্যলোক এঁকে টানতে লাগলো প্রবলবেগে। শিগগিরই সে টানে ইনি ঘর ছাড়লেন। তখন তাঁর সাতাশ-আঠাশ বছর মাত্র বয়স। উজ্জ্বয়িনীর মহাকাল মন্দিরে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সন্ন্যাসজীবনে তাঁর নামকরণ কালিকানন্দ অবধূত। তারপর প্রায় কুড়ি বছর ধরে তাঁকে সেই আকর্ষণেই টেনে নিয়ে বেরিয়েছে ভারতবর্ষের এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে, এমন কি বৃহত্তরভারতেও। হিমালয় থেকে কুমারিকার ভেতর কোনো তীর্থ নেই-যা ইনি ঘোরেন নি। সেই সময়ই ইনি বেলুচিস্তানের পশ্চিমপ্রান্তে অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থ 'হিংলাজ' ভ্রমন করেন। সে পথ অতি দুর্গম, মরুভূমি অতিক্রম করে যেতে হয়েছে। পথ যেমন বিঘ্নসঙ্কুল, সে দেশের মানুষগুলোও তেমন অপরিচিত। হুগলি জেলার চুঁচুড়ায় স্বপ্রতিষ্ঠিত রুদ্রচণ্ডী মঠে তাঁর মৃত্যু হয়।

হংসনারায়ণ ভট্টাচার্য তাঁর সম্পর্কে লিখেছেন, "উদ্ভট কাহিনী-কল্পনা, বীভৎস রস, তান্ত্রিক ধর্মসাধনার গুহ্য রহস্য ও উৎকট আচার অবধূতের রচনার বৈশিষ্ট্য।" শিশিরকুমার দাশের মতে, "তাঁর রচনার বৈশিষ্ট্য ভয়াবহ ও বীভৎস রসের আধিক্য । প্রবল জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও কোনো কোনো সমালোচক তাঁর বিষয়নির্বাচন ও প্রয়োগরীতির প্রতি সংশয়ী ছিলেন ।"

রচিত উপন্যাসগুলি হল: 
মরুতীর্থ হিংলাজ (জুলাই, ১৯৫৪)
বশীকরণ
তাহার দুই তারা (১৯৫৯)
উদ্ধারণপুরের ঘাট (১৯৬০)
ক্রীম (১৯৬০)
পিয়ারী (জুলাই, ১৯৬১)
বহুব্রীহি
ভোরের গোধূলি
টপ্পা ঠুংরী (১৩৭৬ বঙ্গাব্দ)
ভূমিকা লিপি পূর্ববৎ
কান পেতে রই
তুমি ভুল করেছিলে
অনাহত আহুতি
স্বামীঘাতিনী
ফক্করতন্ত্রম্‌ (১ম, ২য় ও ৩য় পর্ব)
দুর্গম পন্থা (১৩৬৮ বঙ্গাব্দ)
নীলকণ্ঠ হিমালয়
মন মানে না
সাচ্চা দরবার
উত্তর রাম চরিত
সুমেরু কুমেরু
একটি মেয়ের আত্মকাহিনী

হিংলাজ মাতা মন্দির, পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের মাকরান মরুভূমিতে অবস্থিত ৫১ শক্তিপীঠের এক পীঠ। মন্দিরের নামেই গ্রামটির নাম হিংলাজ । বাংলা, হিন্দী, অসমীয়া ও সিন্ধি ভাষায় দেবীর নাম হিংলাজ হলেও মূল সংস্কৃত শব্দটি হল "হিঙ্গুলা"। 
হিংলাজের তীর্থযাত্রীরা সেকালে যেতেন উটের পিঠে চড়ে। যাত্রা শুরু হত করাচী শহরের কাছে হাব নদীর ধারে। সঙ্গে থাকত এক মাসের রসদ, যেমন শুকনো খাবার, মরুদস্যুদের প্রতিরোধ করার জন্য অস্ত্র, পানীয় জল ইত্যাদি। এছাড়া সঙ্গে থাকত হিংলাজ মাতার প্রসাদের জন্য শুকনো নারকেল, মিছরি, বাতাসা ইত্যাদি। এক মাসের অত্যন্ত কঠোর যাত্রার পর শ্রান্ত তীর্থযাত্রীরা পৌঁছতেন হিংলাজে। অঘোর নদীতে স্নান সেরে তাঁরা দর্শন করতে যেতেন হিংলাজ মাতাকে। এই মন্দির স্থানীয় বালুচ মুসলমানদের কাছেও পরম আদরণীয়। তাদের কাছে এটি "নানী কী হজ" নামে পরিচিত।
হিংলাজের মন্দিরটি একটি গুহার মধ্যে অবস্থিত। এটি আসলে একটি প্রাকৃতিক গ্যাসের অগ্নিকুণ্ড। অগ্নিজ্যোতিকেই হিংলাজদেবীর রূপ বলে মানা হয়।

কালিকানন্দ অবধূত-রচিত 'মরুতীর্থ হিংলাজ' এবং 'হিংলাজের পরে' উপন্যাস-দুটিতে হিংলাজ ও কোটেশ্বর তীর্থদ্বয়ের বিস্তৃত ও অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে। 
বাংলা সন ১৩৫৩, আষাঢ় মাস। খ্রিস্টাব্দ ১৯৪৬, জুনের শেষার্ধ কিংবা জুলাইয়ের প্রথমার্ধ। স্বাধীনতা তথা দেশভাগের এক বছর আগের কথা। করাচি তখনও অখণ্ড ভারতবর্ষের অঙ্গ। হিংলাজ তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত স্বশাসিত লাসবেলা প্রিন্সলি স্টেট বা রিয়াসতের মধ্যে একটি স্থান। পাকিস্তান গড়ে ওঠার পর তা হয়ে যায় সেই দেশের বালুচিস্তান প্রদেশের অঙ্গ। এখন হিংলাজ যেতে হলে পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশির বেশে যেতে হবে। তখন হত না। তৎকালীন করাচি শহরের অনভিজাত পল্লীর এক প্রান্তে নাগনাথের প্রাচীন আখড়ায় জড়ো হয়েছে একদল হিংলাজ গমনেচ্ছু তীর্থযাত্রী। - তীর্থযাত্রা। যিনি কাহিনীটি বলছেন, যিনি নিজেও কাহিনীর এক চরিত্র, তাঁকেই শুধু দেখব।
“ঐ যে দূরে আকাশের পশ্চিম দিকে আস্তে আস্তে সন্ধ্যাতারাটা চলে যাচ্ছে, ঐ দিকেই কোথাও হিংলাজ। আজও জানি না ঐখানে পৌঁছনো আমার কপালে ঘটে উঠবে কি না! আর এই সুদীর্ঘ ধৈর্যপরীক্ষার শেষ ফল যখন মিলবে তখন কৌতূহল নিবৃত্তির আফসোস ছাড়া আর কী জমার ঘরে পড়বে তাই বা কে জানে!”
বারে বারেই হতাশা, প্রতিবারই আকুল আর্তি ‘হেথা নয়, হেথা নয়, অন্য কোথাও, অন্য কোনওখানে’।
“দীর্ঘনিঃশ্বাস আপন হতেই বুক থেকে বেরিয়ে আসে। ছুটে চলেছি যেখানে সতীর ব্রহ্মরন্ধ্র পড়েছিল, সেই মহাপিঠ হিংলাজে। ভগবান রামচন্দ্র রাবণ-বধ করে ব্রহ্মহত্যার পাপভাগী হয়েছিলেন, তাঁর সেই পাপস্খালন হয় এই মহাতীর্থ দর্শনে। অতবড় পাপ অবশ্য আমার হিসাবের ঘরে জমা থাকা সম্ভব নয়। এ যুগে ব্রাহ্মণ কোথায় যে, ব্রহ্মহত্যার পাপ ঘটবে আমার। তবে অন্তত এইটুকু আমার কপালে নিশ্চয়ই জুটবে যাতে আমার এই জীবন-নাটকের অনাগত অজানা অঙ্কগুলিতে ছুটোছুটির পালা আর থাকবে না, আকুলি-বিকুলির যবনিকা-পাত হবে। এই আশাটুকুই মনের কোণে চেপে আগামী কালের অপেক্ষায় পাশ ফিরে শুই।”
উট নিয়ে এসে পৌঁছয় মালবাহক তথা পথপ্রদর্শক দুটি মানুষ – গুল মহম্মদ ও তার পুত্র দিল মহম্মদ। তারা লাসবেলা স্টেটের নাগরিক, হিংলাজের কাছেই তাদের বাড়ি। হিংলাজের দেবীকে তারাও মান্য করে। সেখানে মোমবাতি, ধূপ আর শির্‌নির ভেট চড়ায়। দেবী-দর্শনার্থ হিংলাজ-যাত্রাকে তারা বলে নানী-কি-হজ। যাত্রাপথে শোণবেণী বাজারে কতিপয় মারওয়াড়ি ব্যবসাদার ছাড়া কোথাও হিন্দুর বসতি নেই। দূরে দূরে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে যা কিছু বসতি সবই মুসলমানের। তাতে মুসলমানের মহল্লায় হিন্দুর তীর্থযাত্রা আটকায়নি। বরং, গুল মহম্মদের ধারণা, এতজন মানুষের তীর্থযাত্রার পথপ্রদর্শক হওয়ার দরুন তার বেহেস্তে ঠাঁই পাওয়া একরকম নিশ্চিত।
মরুভূমির মধ্যে এক থেকে দেড়-দুই দিনের যাত্রাপথের দূরত্বে অবস্থিত এক-একটি জলের কূপ। সেগুলির রক্ষণাবেক্ষণ করে যে কূপওয়ালারা, তারা টাকাপয়সা নেয় না। চায় শুধু রুটি। ক্রোশের পর ক্রোশ দূরত্বে দোকানপাটের অস্তিত্ব নেই। ক্ষুধার জ্বালা টাকায় মেটে না। তাই তারা চায় রুটি। তারা কী কারণে করাচি বা শোণবেণী গিয়ে আর কোনও কামধান্দার চেষ্টা না করে ওই তপ্ত বালুর সমুদ্রে কাঁটাগাছের ছাউনিতে সারাটা জীবন বাস করে তা বুঝে ওঠা যায় না। তারা প্রতিদিন ঘণ্টায় ঘণ্টায় বালি খুঁড়ে কুয়োগুলি জাগিয়ে রাখে বলেই সে-পথের যাত্রীরা জল পায়, জীবন পায়। জীবন পেয়ে আবার শুরু করে পথ চলা। ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ কতটা ভ্রমণকাহিনী তা বলতে এই পাঠক অপারগ। এটুকু বলা চলে, এই উপন্যাস জীবনের কাহিনী। জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি পথচলাকে ভ্রমণের মান্যতা দিলে, ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ তারই এক খণ্ডচিত্র।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71