মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ১০ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সরস্বতী পূজা না ছোটগল্প!
প্রকাশ: ০৮:৫৭ pm ১২-০২-২০১৭ হালনাগাদ: ০৮:৫৭ pm ১২-০২-২০১৭
 
 
 


ধর্ম ডেস্ক:: বিদ্যা ও ললিত কলার দেবী সরস্বতী। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি পর্ব। এ অনুষ্ঠানের নাম পূজা। মাঘ মাসের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী তিথিতে এই আয়োজন। শুধু দেশে নয় বিদেশের মাটিতেও এই পূজা সংগঠিত হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সনাতন পল্লির মানুষেরা এ জন্য ছিলেন সরব। আবুধাবি, দুবাই, আল আইনে এলাকা ভিত্তিতে তারা বাণী অর্চনায় সমবেত হন।

রাজহংস সরস্বতী দেবীর বাহন। হংস জল ও দুগ্ধের পার্থক্য করতে পারে। জল ও দুধের মিশ্রণ থেকে হাঁস কেবল দুগ্ধ ও ক্ষীরটুকুই গ্রহণ করে। জ্ঞান সাধনার ক্ষেত্রেও তাই। নির্মাণটুকুই কেবল গ্রহণ করা হয়। হাঁস জলে বিচরণ করে কিন্তু দেহে তার জল লাগে না। মহাবিদ্যার বেলায়ও একই কথা। ক্ষীরটুকু রয়ে যায় অনুশীলনকারীর মধ্যে। সময় ও সভ্যতা এগিয়ে যায়। সহস্র বিস্তৃত রাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি, তারই দু’চারটি অশ্রুজল। এও কি রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্প! বিদ্যা দেবীর অনুষ্ঠান সরস্বতী পূজাও হয়তোবা তাই।
মণ্ডপে মণ্ডপে পূজার আনুষ্ঠানিকতা ছাড়াও প্রসাদ বিতরণ, সন্ধ্যারতি সবাইকে বেশ আকর্ষণ করে। একটি পূজাস্থলে বাণী অর্চনায় সমবেত হয় রুচিপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য পোশাকে সজ্জিত শিশু-কিশোরেরা। আবহমান বাঙালির অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্য ধারণ করে অন্য ধর্মাবলম্বী মানুষও উৎসবে যোগ দিয়েছেন। আনন্দ উপভোগ করেছেন পুরো অনুষ্ঠান।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন পরিষদের আবুধাবি শাখার সাধারণ সম্পাদক আজিম ফজলুল কাদের। তিনি তার ছোটবেলার নূপুর দিদিমণির প্রসঙ্গ তোলেন। চট্টগ্রামে পাহাড়ের অন্যপ্রান্তের কলেজ পড়ুয়া প্রিয় এই দিদিটি তাকে পড়াতেন। তিনি বলেন, বিদ্যা সর্বজনীন ও বাণী অর্চনার অনুষ্ঠানও তাই। শ্রী পঞ্চমী তিথির আয়োজনকে অসাম্প্রদায়িক বলে উল্লেখ করে তিনি।

বাণী অর্চনায় কিশোরীরা

ছোটদের স্কুল বন্ধ ছিল না। সে কারণে তারা সকালে পূজায় শামিল হতে পারেনি। অন্যদিকে অফিস খোলা থাকার কারণে বড়রাও একেবারে সন্ধ্যায়। সেই অর্থে পূজাটা রাতেই হয়েছে। ছোটরা অঞ্জলি ভরে ফুলের পাপড়ি নিয়েছে। মন্ত্র পড়েছে—সরস্বতৈ নম নিত্যং ... ... নম বিষ্ণু নব বিষ্ণু। তারপর সে অর্ঘ্য অর্পণ করেছে দেবীর পাদদেশে।
রানা মুখার্জি। নাট্যকার। বঙ্গীয় সমাজের একজন শীর্ষস্থানীয় সংগঠক। কথা হয় তার সঙ্গে। তিনি বলেন, বাঙালির সংস্কৃতিকে ধারণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই আমাদের লক্ষ্য। নৃত্য, নাটক, সংগীতের চর্চায় সেই প্রয়াসটিই আমরা সরস্বতী পূজার মতো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে চালিয়ে যাচ্ছি।
সরস্বতী দেবী শ্বেতশুভ্র বসনা। তার এক হাতে বেদ অন্য হাতে বীণা। এ জন্য তিনি বীণাপাণি। সরস্বতী বাগদেবী। সরস্বতী নদীর তীরে দেবীর মন্ত্রে ও প্রার্থনার মাধ্যমে বেদ ধ্বনি হতো বলে এই নদী বাগদেবীর বাসস্থান বলে অভিহিত।

গান গাইছেন ভক্তরা

জ্ঞান বিকাশমান, সরস্বতীর মতোই এর প্রবাহ। সে জন্য সরস্বতী আরাধ্য। আবার নদী হচ্ছে প্রকৃতির একটি শক্তিশালী অনুষঙ্গ। সেই অর্থে দেবী নিসর্গের মতো সংগীতময়। বাগদেবী অর্থে তিনি ললিতকলার মধ্য দিয়ে মানব হৃদয়কে পবিত্র করেন।
নৃত্যাঙ্গন রসমঞ্জরীর গুরু কুন্দন মুখার্জি তার বাড়িতে বাণী অর্চনার আয়োজন করেছেন। তিনি বলেন, যারা সংগীত নৃত্যের চর্চা করেন তাদের কাছে শ্রী পঞ্চমীর সামাজিক গুরুত্বটিও কম নয়। বলেন, দিনটির জন্যই প্রাণের মানুষগুলোর সঙ্গে এক জায়গায় বসলাম, কথা হলো। কী মোহনীয় এক অনুভব! তার চোখ দুটো চিক চিক করে ওঠে।
প্রকৌশলী সুব্রত কুমার হালদার। বাণী অর্চনাকে তিনি শিক্ষার্থীদের জন্য তাৎপর্যময় বলে বর্ণনা করেন। তার প্রার্থনা, পরবর্তী প্রজন্ম যেন লেখাপড়ার মাধ্যমে মানুষের মতো মানুষ হয়ে দেশ সেবা করতে পারে।

 

ভক্তরা

আনন্দধারা সাংস্কৃতিক মঞ্চ দুবাইয়ের সদস্যরা বাণী অর্চনায় এক জায়গায় সমবেত হয়েছিলেন। যোগাযোগ হয় আনন্দধারার প্রতিনিধি বিজয় মণ্ডলের সঙ্গে। তিনি জানান, এবারের পূজার আয়োজন করা হয় বিশ্বনাথ দে-সুমনা দাস দম্পতির বাড়িতে। সেখানে তারা গানের আসরও বসিয়েছিলেন।
মিতা সাহা আয়োজনের শক্তিশালী এক স্বেচ্ছাকর্মী। তিনি বলেন, দুই দিন আগে থেকেই পূজার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান সংগ্রহ করা হয়। তার মন্তব্য, প্রস্তুতিটা ভালো ছিল বলেই পর্বটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। পলি পোদ্দার, শিবানী রায়ও আনুষঙ্গিক কাজে আগের মতোই ভূমিকা রেখেছেন। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত ছিল তাদের ব্যস্ততা। এ পূজায় পৌরোহিত্য করেন অসীম ভট্টাচার্য।

ভক্তরা

বিদ্যাদেবী সরস্বতী পূজা নিয়ে কথা হলো ইতি রায় চৌধুরীর সঙ্গে। শুরুতে তিনি তরতাজা তথ্য দিলেন। তার কন্যা দিশা এখন যুক্তরাষ্ট্রের আরিজোনা ইউনিভার্সিটিতে ইলেকট্রিক্যালে তৃতীয় বর্ষে পড়ছেন। অভিনন্দন জানালাম মেধাবী সন্তানের এই তরুণী মাকে। তার কন্যার জন্য বিশেষ প্রার্থনা করেছেন, বললেন ইতি। 
মুক্তি সাহা বলেন, এবারের পূজার অঞ্জলিতে আনন্দধারা বৃত্তের ও লেভেল এবং এ লেভেলের পাঁচ শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। তার কন্যা জ্যোতি একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। আরও দুজন এবার এই দলে যুক্ত থাকতে পারেনি, সে তথ্যও দিলেন। এই প্রজন্মের পূজা তালুকদার ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং শেষে দুবাই ইলেকট্রিসিটিতে একটি চাকরিও নিয়েছেন। কয়েক দিন আগেই দেশের মাটিতে তার বিয়ে হলো। মুক্তি জানান, সেই বিয়েতেই শামিল হয়েছে ওই দুই শিক্ষার্থী।
আবুধাবির এক পূজায় অঞ্জলি দিতে এসেছেন রুমকি দত্ত। সঙ্গে ওডিশি কন্যা অনংশা। একই দলে আছে ঈশিতা-নীতিক্ষা। তারাও ব্যস্ত পুষ্পাঞ্জলিতে। পূর্বা-দুর্বাও অনুষ্ঠানে সমুপস্থিত। ফুল তুলসী বিল্বপত্র ধরিয়ে দিচ্ছেন লাকী হালদার উল্কা।
মনোজ চট্টোপাধ্যায়। বঙ্গীয় সমাজের আহ্বানে তিনি পূজার মন্ত্র পড়ানোর জন্য কলকাতা থেকে এসেছেন। তিনি এই পূজাও পৌরোহিত্য করেন। পুরোহিতকে অনুসরণ করছেন শিক্ষার্থীরা। জয় জয় দেবী চরাচর সারে কুচ যুগ শোভিত মুক্তাহারে, বীণা রঞ্জিত পুস্তক হস্তে ভগবতী ভারতী দেবী নমোহস্তকে। মাঝখানে বসল আনন্দ আসর। সুচেতা দের গালভরা হাসি আর মিঠু দের বলার মাধুর্য সময়টিকে অনুপম করে তোলে। পূজা শেষে প্রসাদ বিতরণের পালা। ধীরা মুখার্জি পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ন্ত্রণ করেন।
বঙ্গীয় সমাজের আয়োজন। শুভাশিষ চট্টোপাধ্যায় সেখানকার শিরোভাগে। ছোটদের ব্যাপারে তার খুব আগ্রহ। তিনি বলেন, নতুনদের হাতেখড়ি এই পূজার চমৎকার এক অধ্যায়। বাচ্চার বাবা-মা স্লেট চকখড়ি নিয়ে আসেন। হাতেখড়ির মধ্য দিয়ে এই দিন থেকেই শুরু হয় তার শিক্ষাজীবন। বলেন, এখানে এবার ১৮ জন শিশু হাতেখড়ি দিয়েছে।
নিবেদিত এক প্রাণ। বুদ্ধিশ্বর তার নাম। বার্তা দিলেন, পূজা কমিটির নির্বাচন হলো আজ। তারা তখন ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নিয়ে আলোচনা করছিলেন। নতুন নেতৃত্বকে অভিনন্দন জানালাম।পূজাস্থলে আনন্দধারার সদস্যরা
আবার দুবাই প্রসঙ্গ। কথা হয় সুমনা দাসের সঙ্গে। তিনি জানান, শ্যামল বিশ্বাসের পরিচালনায় আনন্দধারার সদস্যরা গান পরিবেশন করেন। দেশাত্মবোধক, ভক্তিমূলক এবং পুরোনো দিনের গানের আবহে তারা একটা সংগীতময় সময় কাটান। ছোটদের মধ্যে গান করে নিঝু ও সিমি। 
রঞ্জন সারা এবার পূজাকে বেশ উপভোগ্য বলে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, নারীরা নতুন শাড়ি পরেছেন, পুরুষেরা পাঞ্জাবি, ছোটরাও সেজেছে সুন্দর পোশাকে। শংখধ্বনি, ঝাঁজ কাসরের বাজনা, উলুধ্বনি সত্যিই আলাদা একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে। সময়টি কাটল ভালো। দারুণ দারুণ বলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে তিনি। 
পূজা আয়োজনে পাগলপারা করে দেয় সবজি ব্যঞ্জনাসমেত খিচুড়ির মৌ মৌ গন্ধ। দেবীর শ্বেতশুভ্র পোশাক। সেই সঙ্গে ভক্তদের নতুন শাড়ি নতুন পাঞ্জাবি, নতুন জামা। মনের ভেতর আলাদা রকম দোলা দেয়। দ্যোতনা তোলে চরাচরে।
দুর্বা, গাদাফুল, বিল্বপত্র নিয়ে অঞ্জলি। পুরোহিত মন্ত্র পড়েন। ভক্তরা সে স্তোত্র কোরাস কণ্ঠে উচ্চারণ করেন। প্রকৃতি মিলে যায় ছন্দে লয়ে তালে। ঝাঁঝ, ঘণ্টা আর শংখধ্বনি আনে আলাদা আমেজ, অনন্য অনুভূতি।
এবারকার পূজায় অনেক সময় নেয়। অতিথি আপ্যায়ন ইত্যাদি ধরে এর রেশ দীর্ঘায়িত হয় গভীর রাত পর্যন্ত। ছোটগল্পের কথাই আসে। পূজার এ অনুষ্ঠান শেষ হয়েও যেন হয় না শেষ।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71