মঙ্গলবার, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
সাতশো কোটি বছর পূর্বে আলোয় গোচরীভূত হয়েছিল মা কালী 
প্রকাশ: ০৪:৪৭ pm ০৬-১১-২০১৮ হালনাগাদ: ০৪:৪৭ pm ০৬-১১-২০১৮
 
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি
 
 
 
 


দশমহাবিদ্যার প্রথম ও আদি রূপ হল কালী। দেবীর সৃষ্টি, প্রাচীনত্ব ও বিশালতার উল্লেখ পাওয়া যায় বেদ, রাত্রিসূক্ত, ঐতরেয় উপনিষদ, মহাভারত, রামায়ণ, হরিবংশ, মার্কন্ডেয় পুরাণ, শ্রীশ্রীচন্ডী, কালিকা পুরাণ, শতপথ ব্রাহ্মণ প্রভৃতি গ্রন্থে।

ঋগ্বেদের রাত্রিসূক্তে দেবীর বর্ণনা -“রাত্রি ব্যাখ্যাদায়ত্রী পুরুত্রা দেব্যক্ষোভি বিশ্ব অধিস্ত্রিযোহধিতঃ”- অর্থাৎ রাত্রিদেবী স্বয়ং নিজেকে বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের নক্ষত্রমালায় বিভূষিতা হয়ে প্রকাশ করেছেন কালী রূপে। ঋগবেদেই দেবী তাঁর আত্ম পরিচয় দিচ্ছেন-“অহম্ রূদ্রেভির্বসুভিশ্চ রামাম্মোহম হিতৈরুতো বিশ্বদেবৈ, অহম্ মিত্রা বরুণোভা বিভর্ম্যহমিন্দ্রানী অহমশ্রিনোভা”। অর্থাৎ আমি রুদ্র, সূর্য, বসু, আদিত্য, বরুণ, ইন্দ্র প্রভৃতি সর্বদেবের পূজিতা। উপনিষদে মহাকালীর উল্লেখে পাওয়া যায় -“যং কাময়ে তনুমুদ্রং কৃণোমি তং ব্রহ্মনং তং ঋষিং সুমেধাম্”-অর্থাৎ আমি ইচ্ছা করলে শক্তিমান করি, ভক্ত করি, ঋষি করি, জ্ঞানী করি।

মুন্ডক উপনিষদে দেবীর বর্ণনা-“কালী করালী চ মনোজবা চ সুলোহিতা যা চ সুধুম্রবর্ণা, স্ফুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচি চ দেবী লোলায়মানা ইতি সপ্তজিহ্বার”। দেবী ব্রহ্মান্ডের সগুণ ও নির্গুণ প্রকৃতির ওপর সপ্তজিহ্বা দ্বারা নিয়ন্ত্রণকারিণী। রামায়ণে পাওয়া যায়, বশিষ্ঠ মুনি ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন “দক্ষিণাকালী' রূপে দেবীকে আরাধনা করে।”
আদ্যাশক্তি মহামায়ার আটটি রূপ-দক্ষিণাকালী, সিদ্ধকালী, উগ্রকালী, গুহ্যকালী, ভদ্রকালী, শ্মশানকালী এবং চামুন্ডাকালী। দেবী করালবদনা, মুক্তকেশী, চতুর্ভুজা, নৃমুন্ডমালা বিভূষিতা। তিনি ঘোর কৃষ্ণবর্ণা বা শ্যামাঙ্গী। দেবীর রূপ দিগম্বরী। তিনি ত্রিনেত্রা, উন্নতদন্তা এবং শবরূপী মহাদেবের হৃদয়োপরি অধিষ্ঠিতা। “কাল” অর্থাৎ সময়ের জন্মদাত্রী, পালনকর্ত্রী এবং প্রলয়কারিণী নিয়ন্ত্রক বলেই দেবীর নাম “কাল” যুক্ত “ঈ”-“কালী”। “ঈ” কারের সৃষ্টি ও শব্দোচ্চারণ হয়েছে “ঈশ্বরী” বা সগুণ ও নির্গুণ ব্রহ্মকে উপলব্ধি করার জন্য। এ সব অত্যন্ত গুরু তত্ত্ব। মহাবিশ্বের কৃষ্ণ গহ্বরকে-এর কেন্দ্রকে বলে সিংগুলারিটি-একমেব অদ্বিতীয়-যা মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রচন্ড চাপে এবং প্রচন্ড তাপে বিস্ফারিত হয় এবং বৃত্তাকারে ব্রহ্মান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। সৃষ্টি হয় অণু-পরমাণু দ্বারা গঠিত মহাবিশ্ব। আজকের এই পৃথিবী এক সময় ছিল না। প্রায় দেড় হাজার কোটি বছর আগে মহাজাগতিক মহা বিস্ফোরণ ঘটেছিল। বিজ্ঞানীদের মতে, তার পর ধীরে ধীরে বিভিন্ন পর্যায়ে কোটি কোটি বছরের ব্যবধানে বিবর্তিত হল ব্রহ্মান্ড ও প্রকৃতি। শেষে হল চেতনা প্রকাশ। শ্রীশ্রী চন্ডিতে আছে -“যা দেবী সর্বভূতেষু চেতনেত্যাভিধীয়তে। নমস্তসৈ, নমস্তসৈ, নমস্তসৈ নমো নমোহঃ॥”

তার পর সৃষ্টির পর্যায়ে এসেছে “জীবন”। জীবনের অন্তঃস্থ সৃষ্টি হল “মন”। মনের মধ্যে সৃষ্টি হল “আনন্দ”। আনন্দের বিকাশ হল “জ্ঞান”- জ্ঞানই হল সত্ত্ব। আর সেই সত্ত্বজ্ঞানের অধিষ্ঠান হল “চিত্”- মনের সূক্ষ্মদেহ। এক কথায় “সচ্চিদানন্দ”-তিনিই শিব-মহাজ্ঞান-শ্বেতবর্ণধারী। আদি আদ্যাক্ষরী মা কালীর পদতলে সেই দেবাদিদেব।

আজ থেকে সাতশো কোটি বছর আগে আলোর গোচরীভূত প্রকাশ হয়। সেই আলোর বর্ণচ্ছটা হল একান্নটি-সাত রঙের লঘুতা ও তীব্রতায় প্রত্যেকটিতে সাতটি ভাগ অর্থাৎ মোট ঊনপঞ্চাশ। তার সঙ্গে যুক্ত হল সত্ত্বগুণবর্ণ শ্বেতবর্ণ এবং তমোগুণবর্ণ কৃষ্ণবর্ণ অর্থাৎ সর্ব মোট একান্নটি। মা কালীর গলায় ঝুলছে পঞ্চাশটি মুন্ডমালা এবং বাঁ হাতে একটি মুন্ডমালা। মায়ের দক্ষিণ হস্তে বরাভয়। নৃমুন্ড হল চেতনশক্তির আধার। সৃষ্টির তরঙ্গের প্রতীক। মায়ের আলুলায়িত কেশ তাঁর প্রচন্ড তেজ ও শক্তির প্রতীক। তিনি বিবসনা, কারণ অনন্ত অসীমকে বসন দিয়ে আবৃত করে সীমার সঙ্গে অসীমকে সীমায়িত করা কখনই যায় না। মা কালীর প্রসারিত জিহ্বা হল “খেচরিমুদ্রা”র প্রতীক, যা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের ভারসাম্য রক্ষা করে। আদ্যাশক্তি স্বয়ং জীব ও জড়ের কেন্দ্রীভূত লীলার লীলাময়ী।

কথিত আছে, প্রায় এগারশো বছর আগে এই বাংলায় (তখন নাম ছিল গৌড় বা বঙ্গ) ভারতবর্ষের নদিয়া জেলার (ফুলিয়া) তন্ত্রমহাযোগী সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ স্বপ্নাদেশে এক দৈববাণী পেয়ে মা কালীর আরাধনায় ব্রতী হন। তিনি স্বপ্নাদেশ পান -“কাল প্রাতঃকালে নিদ্রাভঙ্গের পর আমার রূপ দেখতে পাবে, জাগতিক ঐহিক রূপে, সেই রূপেই আমাকে পূজা করবে”। যথাবিহিত কৃষ্ণানন্দ পরদিন কাকভোরে ঘুম থেকে উঠে ঘরের দরজায় এসে এক জন কৃষ্ণবর্ণা, এলোকেশী, অর্ধবসনা অপরিচিতা নারীকে দেখতে পেলেন, যিনি যোগীপুরুষ কৃষ্ণানন্দকে দেখেই তদানীন্তন সামাজিক সম্ভ্রমের রীতি অনুযায়ী জিভ কাটলেন খানিক স্ব-স্বব্যস্ত হয়ে। কৃষ্ণানন্দ মাটি দিয়ে সেই নারীরূপের সদৃশ্য মূর্তি গড়লেন। এ ভাবেই মা ভক্তসাধকদের কাছে চিন্ময়ী ও মৃন্ময়ী রূপে ধরা দিলেন, স্মিতহাস্যবদনা অথচ ভয়ংকরী।

প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় এক কৃষ্ণবর্ণা মাতৃদেবীর পূজার উল্লেখযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে দেবী সুরক্ষা, শক্তি ও বিজয়, সব কিছুরই প্রতীক। এই বিষয়ে গবেষক জোসেফ ভার্মাসেরেন বলেছেন, “এশিয়া মাইনরে দেবী কালীর মতো এক দেবীর সন্ধান পাওয়া যায়। এঁর নাম “কাইবেল”। তাঁর নামে একটি শহর ছিল, নাম “কালিপোলিস”, পরবর্তী কালে যার নাম হয় “ক্যালিপোলি”। বাইবেলের “বুক অব হিব্র“তেও  এক কৃষ্ণবর্ণা দেবীর পূজার উল্লেখ পাওয়া যায়। ইউরোপের জিপসিরা হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের মা কালীর মতো এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণা দেবীর আরাধনা করে আসছে, যাঁর নাম “ক্যালিয়াস”। কতকটা আমাদের রক্ষাকালীর মতো। প্রাচীন ফিনল্যান্ডেও “কাল্মা” নামে এক কৃষ্ণাঙ্গী দেবী পূজিতা হতেন। মিশরীয় সভ্যতায় ফারাওদের সময় থেকে এক কৃষ্ণবর্ণা মাতৃদেবীর পূজা হত। নাম ছিল “কালিম্রাত্স্”। রোমে যুদ্ধের দেবী “বেলোনা”র মিল পাওয়া যায় আমাদের মা কালীর সঙ্গে। মহাভারতেও শবর, পুলিন্দা, যাদব-সহ আদি ভারতের অধিবাসীদের সমাজেও কৃষ্ণবর্ণা এক দেবীর পূজার উল্লেখ রয়েছে। 

হরপ্পা-মহেঞ্জোদারোর সভ্যতায়ও সিংহবাহিনী দুর্গা এবং চতুর্ভুজা কালো পাথরের এক দেবী মূর্তি পাওয়া গিয়েছে। রামায়ণেও মহীরাবণকে বধের মুহূর্তে এক ঘোরদর্শনা দেবীর উল্লেখ পাই, যিনি দক্ষিণ ভারতে, সিংহলে (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) “কৃষ্ণাম্মাকলি” দেবী নামে পূজিতা ছিলেন। এখনও তাঁর পূজা হয়।

কালী-মাহাত্ম্য কথা বলতে গিয়ে প্রাসঙ্গিক ভাবে এসে পড়ে আমাদের দেশের বা বাইরের অনেক সাধক-যোগীর কীর্তি সংবলিত লীলাকাহিনি, যা চিরদিন স্মরণীয়। যেমন সাধক রাম প্রসাদ, সাধক বামাক্ষ্যাপা, সাধক কমলাকান্ত, সাধক ব্রহ্মানন্দ, সাধক আত্মারাম, সাধক নিগমানন্দ, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস, সাধক কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ,শ্রীশ্রী সারদা মা প্রমুখ।

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71