বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮
বুধবার, ৩০শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি না নীরব সাম্প্রদায়িকতা: প্রেক্ষাপট বাংলাদেশ
প্রকাশ: ১২:২০ pm ২৪-১২-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:২০ pm ২৪-১২-২০১৭
 
সাঈদ ইফতেখার আহমেদ
 
 
 
 


এক.
বেশ কয়েক বছর আগের কথা। এখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সেখানে একজন হিন্দু ভদ্রলোকের সাথে পরিচয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এক পর্যায়ে গল্প জমে উঠল।

কথায় কথায় জানালেন তিনি বড় হয়েছেন একটি জেলা শহরে (ইচ্ছা করেই শহরটির নাম উল্লেখ করা হল না)। কিন্তু, আজ বহু বছর হল, সেখানে তিনি যেতে পারেন না। একটু অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন?

উত্তরে তিনি জানালেন তার বাবা ছিলেন সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত একজন ডাক্তার। জেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে তাদের একটা চমৎকার বাড়ি ছিল। তারা দুই ভাই এক সময় পড়াশোনা করতে দেশের বাইরে চলে আসেন। বাবা মারা যান। মা একলা বাড়িতে থাকতেন।

একদিন জেলা শহরের এক বিশাল প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতা দলবল নিয়ে এসে উনার মাকে বললেন, “মাসীমা আসেন, আপনাকে বর্ডার পার করে দেই।”

তারা সবাই ধরে নিয়ে ভদ্রলোকের মাকে সীমানার ওপারে নিয়ে যান। তারপর, বাড়িটা সেই নেতা নিজের দখলে নিয়ে নেন আর তার মাকে বলে দেন তিনি বা তার ছেলেদের যদি জীবনের মায়া থাকে তাহলে ভুলেও যাতে বাংলাদেশে না আসেন। সেই থেকে ভদ্রলোক আর বাংলাদেশে যান না, যেতে ভয় পান। মাকে দেখতে মাঝে মাঝে কোলকাতা যান।

এটা একটা বিছিন্ন গল্প হতে পারত। এরকম হলে ব্যক্তি অধ্যাপকের পরিবার একজন মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত ব্যক্তি দ্বারা মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এ ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক বলা যেত না, কেননা তারা দ্বারা আরো অনেক মুসলমান পরিবারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা।

‘Deprivation of Hindu Minority in Bangladesh: Living with Vested Property’-শিরোনামে একটি বই পাঠক সমাবেশ থেকে বের হয়েছিল ২০০৮ সালে। বইটি যৌথভাবে লিখেছেন, অর্থনীতিবিদ আবুল বারাকাত এবং অন্যরা। গবেষণামূলক এ বইটিতে লেখকবৃন্দ দেখিয়েছেন শত্রু সম্পত্তি আইনের ফলে ১৯৬৫-২০০৬ সময়কালে ১২ লক্ষ পরিবারের ৬০ লাখ হিন্দু জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ওই সময়কালে হিন্দু সম্প্রদায় ২৬ লাখ একর ভূমি হারিয়েছে এবং অনেক পরিবার সব হারিয়ে সর্বশ্রান্ত হয়েছেন।

পরিসংখ্যানটি যদি সঠিক হয় তাহলে আজকের হিসাবে বলা চলে বাংলাদেশের প্রায় অর্ধেক হিন্দু জনসংখ্যাই সাম্প্রদায়িক,অমানবিক এ আইনটির ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। লেখকবৃন্দ যেটা বলতে চেয়েছেন তাহল তথাকথিত সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতিষ্ঠিত ধারণার বিপরীতে এ আইনটি সাম্প্রদায়িক বিভাজনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।

হঠাৎ করে ভাবলে মনে হবে হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে বিএনপি, জামায়েতের নেতা কর্মীরা বোধহয় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করেছেন। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগকে অনেক হিন্দু তাদের স্বার্থরক্ষাকারী দল হিসাবে ভাবেন। অর্থাৎ, ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে থেকে দলটি হিন্দুসহ, অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের স্বার্থ রক্ষা করবে। জন্ম থেকে ধর্ম নিরপেক্ষ আদর্শের জন্য বিভিন্ন অমুসলিম সম্প্রদায় মুসলিম লীগ, বিএনপি, জামায়াতের চেয়ে আওয়ামী লীগের উপর সব সময়ই বেশি ভরসা করেছে। তারা মনে করে এসেছে আর যাই হোক আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীদের দ্বারা তাদের জমি, সম্পত্তি দখল হবে না।

কিন্তু বিভিন্ন রিপোর্ট এবং গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। সনাতন ধর্মালম্বীদের জমি বা সম্পত্তি দখলের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা জামায়াত কেউই পিছিয়ে নেই। কেন্দ্রীয়ভাবে ধর্ম নিরপেক্ষতার কথা বললেও মাঠ পর্যায়ের আওয়ামী লীগের অনেক নেতা কর্মীই সুযোগ পেলে হিন্দুদের জমি সম্পত্তি দখলে পিছপা হন নাই। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে যে বিষয়টি উঠে এসেছে সেটি হল ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবীদার এ দলটির নেতাকর্মীরা রাজনীতিতে যারা ধর্মের মিশ্রণ ঘটাতে চান অর্থাৎ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি বা জামায়াতের চেয়ে বেশি সম্পত্তি দখল করেছেন।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, আওয়ামী লীগ নিজেও এখন আগের ধর্ম নিরপেক্ষতার জায়গা থেকে সরে এসে তথাকথিত বাস্তবতার ধুঁয়া তুলে বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং জামায়াতের সাথে ধর্মীয় শ্লোগান, প্রতীক এবং রেটোরিক ব্যবহারের প্রতিযোগিতায় নেমেছে।

আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বাম রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা, যারা নিজেদের প্রকৃত সেক্যুলার বলে দাবি করেন তারাও এ দখল প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত হয়েছেন, যদিও আনুপাতিক হারে উপরে উল্লেখিত দলগুলোর চেয়ে অনেক কম। যেহেতু এ দলগুলোর সমাজ এবং রাষ্ট্রে তেমন প্রভাব নেই, তাই তাদের দখল করবার ক্ষমতাও তুলনামূলক ভাবে অনেক কম।

দুই.

১৯৯৮-৯৯ সালের কথা। আমি তখন কাজ করছি প্রভাষক হিসাবে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে। একদিন অন্য একটি বিভাগে (ইচ্ছা করে বিভাগের নাম উল্লেখ করা হল না) শিক্ষকদের সভায় তুমুল গোলমাল হল। একজন সহকর্মী আমাকে খবরটি জানালেন। রাজনৈতিক বিশ্বাসের দিক থেকে তিনি আওয়ামী লীগ রাজনীতির একনিষ্ঠ সমর্থক। ছাত্রজীবনে তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী পন্থী হিসাবে পরিচিত শিক্ষকদের সংগঠন “রবীন্দ্র” গ্রুপের একজন সক্রিয় নেতা। তিনি আমাকে ঘটনা বর্ণনা দিতে যেয়ে ওই বিভাগের একমাত্র হিন্দু শিক্ষকের নাম উল্লেখ করে বললেন, “বাংলাদেশে হিন্দুদের এত সাহস হয় কি করে যে টেবিল চাপড়ে কথা বলে।” শিক্ষক ভদ্রলোকটি যদি মুসলমান হতেন তাহলে ধর্মীয় পরিচয়টি উহ্য রেখে শুধু নাম উল্লেখ করে হয়ত বলতেন, উনি এত সাহস পান কি করে।

এই যে কোন সাম্প্রদায়িক হামলা বা দাঙ্গা ছাড়া দৈনন্দিন জীবনে সাম্প্রদায়িকতার যে চর্চা এটাকেই অনেকে ‘নীরব সাম্প্রদায়িকতা’ বলে অভিহিত করে থাকেন। এ ধরণের সাম্প্রদায়িকতার চর্চা যে এককভাবে শুধু মুসলমান জনগোষ্ঠী করেন তা নয়। হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝেও মুসলমানদেরকে নিয়ে রয়েছে অবিশ্বাস এবং সন্দেহ। বহু শতাব্দী পাশাপাশি বাস করেও এ অঞ্চলের রাজনৈতিক এবং সামাজিক ইতিহাসের জন্য দূর হয়নি এ সন্দেহ এবং অবিশ্বাস।

 

তিন.

একজন ভদ্রলোক, তিনি সিপিবির খুব নিবেদিতপ্রাণ কর্মী ছিলেন। শেষ বয়সে মণি সিংহ যখন অসুস্থ ছিলেন তখন তার সেবাযত্ন করেছেন আন্তরিকভাবে। সিপিবির ভাঙ্গনের পর তিনি অবশ্য সিপিবির সাথে আর থাকেননি। সিপিবিতে থাকাকালীন সময়ে তিনি একদিন আমাকে বললেন, ‘মালাউনদের’ কখনই বিশ্বাস করা যায় না। তাদের কাছে ভারতের স্বার্থটাই বড়, দেশ নয়। সিপিবির এরকম নিবেদিত কর্মীর মুখে আমি ছাত্র থাকার সময়ে এ ধরণের কথা শুনে এতটাই হতচকিত হয়ে গিয়েছিলাম যে কি বলব সেটাই বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায় নিয়ে আরেকটি কথা খুব প্রচলিত আর তাহল সব হিন্দু খারাপ নয়। একটু খেয়াল করলেই এ ধরনের কথা হরহামেশাই শোনা যাবে। কিন্তু এ আমরা এ ধরনের কথা শুনতে শুনতে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছি যে, এসব আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হয়। এর মাঝে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মনোবৃত্তি আছে এটা আমদের অনেকেরই মাথায় আসে না। অনেক ‘প্রগতিশীল’ রাজনৈতিক কর্মী বা সিভিল সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যাক্তিদেরকেও আমি নিজেই হিন্দু সম্প্রদায় না বলে সাধারণ কথাবার্তায় ‘মালাউন’ বা ‘মালাউনরা’ এভাবে বলতে শুনেছি।

বাংলাদেশের মসজিদ (সব মসজিদে নয়) এবং ওয়াজ মাহফিলগুলোতে (সব ওয়াজে নয়) অমুসলিম, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে প্রায়ই কটাক্ষ বা হেয় করে কথা বলা হয়। এ সমস্ত কথা ক্রমাগত শুনতে শুনতে আমাদের কাছে এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে যে, এসব কথা শুনে কোন ধর্মের মানুষ যে কষ্ট পেতে পারেন, সেটা আমরা অনেকেই বুঝে উঠতে পারি না। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমের কিছু ব্যক্তির (হিন্দু-মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের) মন্তব্যগুলো দেখলে বুঝা যায় কিভাবে আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সংস্কৃতির ক্রম উৎপাদন এবং পুনঃউৎপাদন হয়ে চলছে।

চার

একটি জুটির কথা কল্পনা করুন। ধরুন এদের নাম রাম এবং রহিমা। এরা একে অন্যকে ভালবাসে। ভালবাসা থেকে তারা বিয়ে করবার সিদ্ধান্ত নিলেন। রাম তার নাম পরিবর্তন করে রহিম রেখে রহিমাকে বিয়ে করল। অনেকে বিয়ের জন্য ধর্ম পরিবর্তন কতটা যুক্তিসঙ্গত এ প্রশ্ন তুলতেই পারেন। তবে আমি মনে করি ভালবেসে যে কেউ স্বামী বা স্ত্রীর ধর্ম গ্রহণ করতেই পারেন। এর মাঝে অন্যায় বা অযৌক্তিক কিছু আছে বলে মনে হয় না। পাশ্চাত্যেও এ ধরনের ঘটনা অহরহ হচ্ছে। খৃস্টান স্ত্রী ভালবেসে স্বামীর বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করছেন।

কিন্তু, বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রত্যাশা অমুসলিম কাউকে বিয়ে করলে সে ব্যক্তিই ধর্ম পরিবর্তন করবেন, যেহেতু কোন মুসলমানের পক্ষে ধর্ম পরিবর্তনের কোন সুযোগ নেই। তাই তারা আশা করেন ব্যক্তি জীবনে না পারলেও অন্তত কাগজে কলমে হলেও অমুসলিম ব্যক্তিটি ধর্ম পরিবর্তন করেই বিয়ে করবেন। ফলে সিভিল ম্যারেজের সুযোগ থাকলেও সামান্য কিছু ব্যতিক্রম বাদে প্রায় সব ক্ষেত্রেই কাগজে কলমে হলেও অমুসলিম ব্যক্তিটিকেই ধর্ম পরিবর্তন করে বিয়ে করতে হচ্ছে। আর এ একতরফা ধর্ম পরিবর্তনের ফলে অমুসলিম, বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে এক ধরনের বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

পাঁচ

১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর শতকরা ৪০ ভাগ ছিল হিন্দু। কিন্তু দেশ ভাগের পরপরই উচ্চ বর্ণ এবং উচ্চ শ্রেণীর (কিছু ব্যতিক্রম বাদে উচ্চ বর্ণের হিন্দুরাই তখন উচ্চ শ্রেণীর হতেন) হিন্দুরা পূর্ব পাকিস্তানে থাকাটা নানাবিধ কারণে নিরাপদ মনে করলেন না। তাঁদের অনেকেই সহায় সম্পত্তি ফেলে পাড়ি জমালেন পশ্চিমবঙ্গে। কেউ কেউ পশ্চিমবঙ্গ থেকে আসা ধনী মুসলমানদের সাথে সম্পত্তির বিনিময় করলেন। তবে, তাদের সংখ্যা ছিল খুবই কম।

যুক্ত পাকিস্তানের পুরো সময়টা জুড়ে চলল দেশ ত্যাগ। পাকিস্তানসহ পৃথিবীর কোথাও মনোপুত কিছু না হলে তার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দুরাই দায়ী এ ধরণের একটা মানসিকতা জন্ম লাভ করল। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সংস্কৃতির ব্যাপক বিস্তার ঘটে এ সময়কালে। এর ফলে নানা উছিলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর হামলার ঘটনা ঘটতেই থাকে। যার ফলশ্রুতি হল ব্যাপক হারে দেশত্যাগ। ফলে, ১৯৭১ সালে যখন দেশ স্বাধীন হল তখন দেখা গেল ৪০ শতাংশ হিন্দু জনসংখ্যা নেমে এসেছে ২১ শতাংশে।

পাকিস্তান সময়টিতে জনমানসের একটা অংশের মাঝে এ ধারণা প্রোথিত করতে পাকিস্তানী শাসকগোষ্ঠী এবং মুসলিম লীগ সমর্থ হল যে হিন্দুরা যেহেতু পাকিস্তান চায়নি, তাই তারা দেশ ভেঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানকে আবার ভারতের সাথে যুক্ত করতে চাচ্ছে। ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হল পাকিস্তান সরকার এটাকে হিন্দু এবং ‘মস্কোপন্থী’ কমিউনিস্টদের ষড়যন্ত্র মনে করে আর ভারতকে এর পিছনে প্রধান ইন্ধনদাতা মনে করল। তাই যখন যুদ্ধ শুরু হল, সেনাবাহিনী এবং রাজাকারদের প্রধান টার্গেট হয়ে উঠল হিন্দু জনগোষ্ঠী, তারপর কমিউনিস্ট এবং আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা।

এ টার্গেটের ফলে ১৯৭১ সালে যেমন ব্যাপক ভাবে হিন্দু জনগোষ্ঠীকে নিধন করা হয় তেমনি পাশাপাশি, পাকিস্তানী সরকারের ‘মুসলমান সন্তান’ জন্ম দেবার প্রকল্প হিসাবে হিন্দু নারীদের করা হয় ব্যাপক হারে ধর্ষণ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যে ন্যারেটিভ, সেখানে চার লক্ষ বীরাঙ্গনার কথা বলা হয়, কিন্তু সে ন্যারেটিভে যেটা উহ্য রয়ে গেছে সেটা হল এ চার লাখের বড় অংশটিই ছিল হিন্দু নারী।

সার্বিকভাবে বাঙালি জনগোষ্ঠী ওসময় সেনাবাহিনী এবং রাজাকারদের আক্রমণের লক্ষ্য হলেও শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যেখানে হিন্দুরা আক্রমণের শিকার হতেন সেখানে মুসলমানদের আক্রমণ করবার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচয়টা ছিল মূখ্য। ধর্মীয় পরিচয় ধরে আক্রমণের ফলে ১৯৭১ সালে যে এক কোটি মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিল তাদের ৭০ শতাংশই ছিল হিন্দু, যা প্রয়াত রাজনীতিবিদ নির্মল সেনসহ বিভিন্ন জনের লেখায় উঠে এসেছে।

 

সংখ্যানুপাতে বিপুল পরিমাণে আত্মত্যাগের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মাঝে এ প্রত্যয় জন্মেছিল যে স্বাধীন দেশে তাদেরকে হয়ত আর সাম্প্রদায়িক বৈষম্য এবং নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হবে না। কিন্তু দেশ শত্রু মুক্ত হবার অল্প কিছু দিনের মাঝেই তারা নিজেদেরকে সেই পুরোনো পাকিস্তানী আমলের মত অবস্থায় দেখতে পায়। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের ট্র্যাজেডি হল ধর্মীয় বৈষম্য এবং নিপীড়ন মুক্ত বাংলাদেশে গড়বার প্রত্যয় নিয়ে দেশ স্বাধীন হলেও, স্বাধীনতার অব্যাবহিত থেকেই সে বৈষম্য এবং নিপীড়ন একই মাত্রায় বজায় থাকে। সব ধরণের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীই সেই একই ধরণের অনিশ্চয়তা এবং শঙ্কা স্বাধীন দেশে অনুভব করতে থেকে যা তারা পাকিস্তান আমলে অনুভব করত।

আর এ অনিশ্চয়তা এবং শঙ্কা অব্যাহত থাকবার ফল হল দেশ স্বাধীন হবার পর হিন্দু জনসংখ্যা কমতে কমতে আজ সাত শতাংশে এসে ঠেকেছে।আর এ সাত শতাংশ জনগোষ্ঠীরও সংখ্যানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব নেই সংসদে, মন্ত্রীসভায়, ঢাকা সিটি কর্পোরেশনসহ উপজেলা, ইউনিয়ন পরিষদসহ জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত কোন স্থানীয় সরকারে বা কোন রাজনৈতিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে। এর পাশাপাশি, সেনাবাহিনী, বিসিএস ক্যাডার সার্ভিস থেকে শুরু করে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের উপাচার্য বা কলেজের অধ্যক্ষ/উপাধাক্ষ্য থেকে শুরু করে সব জায়গায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব তাদের সংখ্যানুপাতে অনেক কম।

কিন্তু, তারপরেও নির্বাচিত বা প্রশাসনিক কোন পদে অমুসলিম বিশেষত হিন্দু ধর্মালম্বি কাউকে দেখলে অনেক সেক্যুলার দাবীদার “প্রগতিশীলও” অবচেতনভাবে ভাবতে শুরু করেন, দেশটা বোধহয় হিন্দুদের দখলে চলে যাচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ভারতের মুসলমানদের সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাগত অবস্থা পরিমাপ করবার জন্য বিচারপতি রাজেন্দ্র সাচারকে প্রধান করে গঠন করেছিলেন সাচার কমিটি। কিন্তু দুঃখজনক হল বাংলাদেশে আজ পর্যন্ত কোন সরকার হিন্দুসহ অন্যান্য ধর্মীয় সম্প্রদায় এবং আদিবাসীদের প্রকৃত অবস্থা বুঝবার জন্য সাচার কমিটির মত কোন কমিটি বা কমিশন গঠন করে নাই। এ থেকে একটি বিষয় পরিস্কার যে “নীরব” সাম্প্রদায়িকতার ক্রমাগত উপস্থিতি রাষ্ট্র এবং সমাজে অমুসলিম সম্প্রদায়কে কতটা কোণঠাসা করে ফেলেছে এটি অফিশিয়াল ভাবে প্রকাশ করবার সৎসাহস স্বাধীন বাংলাদেশে কোন সরকারই দেখাতে পারে নাই।

ছয়

মনোজগতে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের সংস্কৃতির ক্রমাগত বিস্তারের ফলে বাংলাদেশের বেশিরভাগ মুসলিম জনগোষ্ঠীর কাছে উপরে উল্লিখিত বিষয়গুলি সাম্প্রদায়িক নয়। বাংলাদেশে যেহেতু কখনই কোন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি তাই অনেকে একথা বিশ্বাস করতে ভালবাসেন যে এদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।

হ্যাঁ এটি সত্য বাংলাদেশে কখনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হয়নি। যেটি হয়েছে নানা সময়ে সেটি হল সাম্প্রদায়িক হামলা। অর্থাৎ, এক পক্ষ ক্রমাগত হামলা করে গেছে এবং অপর পক্ষ সব সময়ই হামলার শিকার হয়েছে। বাবরি মসজিদ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে নানা উছিলায় আক্রান্ত হয়েছে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, মন্দির। এ ধরণের নানা হামলাতে হিন্দু সমাজ কখনই প্রতিরোধ গড়ে তোলা তো দুরের কথা, এর চেষ্টা পর্যন্ত করেনি। তাঁরা ধরেই নিয়েছেন মার খাওয়া অথবা দেশ ত্যাগই হচ্ছে তাঁদের নিয়তি। যেসমস্ত নানাবিধ কারণে হিন্দু সমাজ এদেশে বিনা প্রতিরোধে মার খেয়েছে তার অন্যতম মূল কারণ হল সমস্যা হলে দেশত্যাগ করবার মানসিকতা, যার সূত্রপাতটা হয়েছিল ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের সময়।

এক সময় বাংলাদেশে যত শতাংশ হিন্দু বাস করতেন অর্থাৎ ১২-১৩ শতাংশ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠী সে পরিমাণ। কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর উপর বর্বর নীপিড়ন,নির্যাতন ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়েরই দিক নির্দেশ করে। এখনো মার্কিন সমাজে কৃষ্ণাঙ্গরা নানাবিধ বৈষম্য এবং কখনো কখনো পুলিশি নির্যাতনের শিকার। এ জনগোষ্ঠীর নির্যাতন থেকে পালিয়ে কানাডা বা মেক্সিকোতে যাবার কোন অপশন না থাকবার ফলে, তাদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া আর কোন বিকল্প ছিল না। আর এ বিকল্পের অভাবই তাদেরকে শ্বেতাঙ্গদের নীপিড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে যা ক্রমানন্বে সরকারী ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে বর্ণ বৈষম্যবাদের অবসান ঘটায়।

এর বিপরীতে বাংলাদেশ চার দিক থেকেই ভারত পরিবেষ্টিত এবং হিন্দু প্রধান দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে হিন্দুরা যখন নিপীড়নের মুখোমুখি হয় তখন মনস্তাত্ত্বিক ভাবে ভারতকে তাদের নির্ভরতার জায়গা হিসাবে ভাবতে থাকে। এর ভাবনার পিছনে আর যে দুটি উপাদান কাজ করে তার একটি হল বাংলাদেশ সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে মূলত বাংলা ভাষাভাষী হিন্দু জনগোষ্ঠীর বসবাস এবং সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে উপমহাদেশে ভারতের শক্তিশালী অবস্থান। এটি অনেকটাই সমাজতন্ত্রের আমলে বামপন্থীদের সোভিয়েত ইউনিয়নকে তাদের মনস্তাত্ত্বিক নির্ভরতার জায়গা হিসাবে চিন্তা করবার মত।

আর এ কাল্পনিক নির্ভরতার জায়গা তৈরি হবার ফলে প্রতিরোধ গড়ে তোলবার চেয়ে আক্রমণের মুখে নিজেকে এবং পরিবারকে রক্ষা করবার চিন্তাটাই সবচেয়ে বড় হয়ে দেখা দেয়। আর এ ক্রমাগত প্রতিরোধহীনতা এবং ক্ষেত্র বিশেষে রাষ্ট্রযন্ত্রের উদাসীনতা বা মদদ মুসলমান জনসমাজের কারো কারো মাঝে এ প্রত্যয় গড়ে তুলেছে যে, চাইলেই হিন্দুদের বাড়িঘর, দোকানপাট বা উপাসনালয়ে হামলা করা যায়।

এর বিপরীতে ভারতের মুসলমানরা ভারতের চেয়ে দুর্বল রাষ্ট্র হওয়ায় পাকিস্তান এবং বাংলাদেশকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাদের নির্ভরতার বা আশ্রয়ের জায়গা হিসাবে ভাবেন না। এ মনোজাগতিক নির্ভরতার জায়গা না থাকবার ফলেই সাম্প্রদায়িক হামলার সময়ে ভারতের মুসলমানদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলা ছাড়া অন্য কোন বিকল্প হাজির করে নাই। যার ফলশ্রুতিতে ভারতে সাম্প্রদায়িক হামলার সময় আমরা বাংলাদেশের মত এক তরফা হামলার শিকার হবার বিপরীতে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখি। এমনকি কখনো কখনো মুসলমান সমাজকে অগ্রনী হয়ে হামলাকারী হতেও দেখি। অবশ্য এ কথা বলার অর্থ এই নয় যে ভারতে মুসলমান এবং অন্য ধর্মালম্বীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের মত “নীরব সাম্প্রদায়িকতার” অস্তিত্ব নেই। ভারতে বাংলাদেশের মতই ‘নীরব’ এবং সরব দু’ধরনের সাম্প্রদায়িকতাই রয়েছে; তবে, এর পাশাপাশি রয়েছে দাঙ্গা এবং এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলবার বিষয়টিও।

সাত.

কিছু ব্যতিক্রম বাদে মানব মনুষ্যত্ব হচ্ছে চূড়ান্ত সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে না পারা। অসস্তিকর চরম সত্যকে এড়াবার জন্য মানুষ নানা মিথ তৈরি করে। এমনই একটি মিথ হল বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ, যেখানে হিন্দুসহ ধর্মীয় এবং জাতিগত সংখ্যালঘুরা ঐতিহাসিকভাবেই ভাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে। এখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনা অত্যন্ত বিছিন্ন ঘটনা এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সমস্ত ধর্মের মানুষ সৌহার্দপূর্ন পরিবেশে বাস করে। এ মিথ যে সঠিক সেটি প্রমাণ করবার জন্য যে বিষয়টার উপর জোর দেয়া হয় তাহল ভারতের মুসলমানরা যে পরিমাণে নির্যাতিত হয় তার তুলনায় বাংলাদেশের ধর্মীয় সংখ্যালঘু বা হিন্দুরা অনেক ভাল জীবন যাপন করেন।

বিস্ময়কর ব্যাপার হল এ মিথটি প্রমাণ করবার জন্য ভারতের মুসলমানদের উদাহারণ টানা হয়। কিন্তু, কোন এক অদ্ভুত কারণে পাকিস্তানে হিন্দু, খৃস্টান,আহমেদিয়া জামাতসহ (কাদিয়ানীরা) ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কেমন আছেন সে বিষয়টি বলা হয় না। বরং এ তুলনাটি করলে বাংলাদেশে হিন্দুরা পাকিস্তানের হিন্দুদের চেয়ে যে ভাল আছেন সেটি বলা সহজ হত। সেখানে হিন্দুসহ ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা শুধু সামাজিক ভাবে নীপিড়নের শিকার হচ্ছেন তা নয়, বরং ইসলামকে রাষ্ট্র ধর্ম করবার পাশাপাশি আইন পাশ করে নেয়া হয়েছে যাতে কোন ধর্মীয় সংখ্যালঘু দেশটির প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন। এ আইনের কারণেই পাকিস্তান ভেঙ্গে যাবার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো যখন রাজা ত্রিদিব রায়কে দেশটির প্রেসিডেন্ট করতে চান, করতে পারেননি।

ভারতে যখন মুসলিম নিপীড়নের কোন ঘটনা ঘটে তা বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সম্পন্ন মুসলমানদের এক ধরনের স্বস্তি দেয়। এ ধরনের ঘটনা উদাহারণ হিসাবে টেনে তারা নিজ নিজ দেশে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়নকে বৈধতা দেবার চেষ্টা করে।

অপরদিকে, এ ধরনের স্বস্তি ভারতের সাম্প্রদায়িক মানসিকতা সম্পন্ন হিন্দুদের মাঝেও দেখা যায় যখন বাংলাদেশ বা পাকিস্তানে ধর্মীয় কারণে নিপীড়নের ঘটনা ঘটে। তখন, তারাও জোর গলায় বলতে থাকে ভারতের মুসলমানরা বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের হিন্দুদের চেয়ে শুধু ভালই নয় বরং দাপটের সাথে বাস করছে। এ কথা বলে তারা নিজেদের দেশে মুসলমানসহ অন্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়নকে বৈধতা দেবার চেষ্টা করে।

চরম বাস্তবতা হল বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়সহ ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীরা, ভারতে মুসলমানসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীরা, পাকিস্তানে হিন্দু, খৃস্টান এবং কাদিয়ানীরা (ক্ষেত্র বিশেষে শিয়ারা) সাম্প্রদায়িক বৈষম্য এবং সময় সময় নিপীড়নের শিকার। যারা এ বিষয়টি বুঝতে অক্ষম বা স্বীকার করতে চান না, তারা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা/হামলায় অংশগ্রহণ না করলেও, দাঙ্গা/হামলাকারীদের মানসিক সমর্থনের ক্ষেত্রটি তৈরি করেন।


প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71