মঙ্গলবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ২৯শে কার্তিক ১৪২৫
 
 
জন্মঃ- ২৩ অক্টোবর, ১৮৮৬ - মৃত্যুঃ- ৯ জুলাই, ১৯৬৯
সাহিত্যিক, সমাজসেবিকা সুখলতা রায় রাও
প্রকাশ: ০৮:৫৫ pm ২৩-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ০৮:৫৫ pm ২৩-১০-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা:

মেয়ের পর যখন ছেলে হল, উপেন্দ্রকিশোর-বিধুমুখীর তখন তাদের ডাকনাম নিয়ে একটা সমস্যা নিশ্চয়ই পরিবারে দেখা গিয়েছিল। বড় মেয়ের একটা পোশাকী নাম অবশ্য আগেই দেখা হয়েছিল― সুখলতা, কিন্তু সুকুমারের জন্মের পর ডাকনাম নিয়ে সমস্যার মুশকিল আসান করে দিলেন রবীন্দ্রনাথ। না, রবীন্দ্রনাথ যদিও বহুজনের নামকরণ করেছিলেন, এক্ষেত্রে তা অবশ্যই করেননি। ঠিক এই বছরেই (১৮৮৭) তাঁর কিশোর-উপন্যাস ‘রাজর্ষি’ প্রকাশিত হয়েছিল। তার দুই চরিত্র হাসি আর তাতা-র কথা কে না জানেন! সেই যে তাতা ― যে মন্দিরকে ‘লদন্দ’ বলত আর দিদিকে খুব ভালবাসত। সুখলতা তাই ‘হাসি’ হয়ে গেলেন আর সুকুমার রায় হয়ে গেলেন ‘তাতা’ নামে সুপরিচিত।

হাসি― কিন্তু উচ্ছল হাসি নয়, মৃদু ― একটু বুঝি সলজ্জ, একটু বুঝি অন্তর- ঘেঁষা। তবে অজস্র সরল আর গাম্ভীর্যের আড়ালে ফল্গুধারার মত প্রবাহমান। বড়দিদি বলে কথা― তার কি চটুল হলে চলে? পাঁচ ভাইবোনের বড়দিদি সুখলতা। ব্রাহ্মপাড়ায় জন্ম। ১৮৮৬ খ্রিস্টাব্দে বিধুমুখিকে বিয়ে করলেন উপেন্দ্রকিশোর। তারপর সংসার পাততে উঠে এলেন এখনকার সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের ঠিক উল্টোদিকে লাহাদের লাল রঙের বাড়ি― ১৩ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের দোতলার কয়েকখানি ঘর ভাড়া নিয়ে। শ্বশুর-জামাই একই বাড়ির দুই ভাড়া। শ্বশুর হলেন সেকালের বিখ্যাত সমাজসেবক এবং নারীহিতৈষী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর প্রথম পক্ষের স্ত্রীর কন্যা বিধুমুখির সঙ্গেই উপেন্দ্রকিশোরের বিয়ে হয়েছে। এই ১৩ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রিটের বাড়িতেই বছর খানেক পর রায়চৌধুরী পরিবারের মুখে নিরাবিল হাসি ফুটিয়ে জন্ম নিয়েছিলেন হাসি ওরফে সুখলতা। সুখলতা, পুণ্যলতা, শান্তিলতা। তিন ভারী মিষ্টি নাম। তিনজনেরই কলম ছিল ভারি মিষ্টি। পুণ্যলতার ‘ছেলেবেলার দিনগুলি’ পড়া একটা মস্ত অভিজ্ঞতা। শান্তিলতার সরস কবিতাগুলির কথা অনেকে জানেন না। কিন্তু তিনিও সুলেখিকা ছিলেন।

উপেন্দ্রকিশোর মেয়েদের যত্ন নিয়ে লেখাপড়া শিখিয়ে ছিলেন। না শিখিয়ে উপায়ই বা কি! পাশের ঘরেই থাকেন ডাকসাইটে নারী-হিতৈষী শ্বশুরমশাই। আর থাকেন ভারতের প্রথম মহিলা এন্ট্রান্স-পাশ ও মহিলা চিকিৎসক― তাঁর স্ত্রী কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। কাদম্বিনীর প্রভাব অবশ্যই উপেন্দ্রকিশোরের মেয়েদের উপর পড়েছিল। সুখলতাকে তিনি ভর্তি করে দিলেন ব্রাহ্মবালিকা বিদ্যালয়ে। এখান থেকেই এন্ট্রান্স পাশ করলেন সুখলতা। তারপর ভর্তি হলেন বি এ ক্লাসে পড়ার জন্যে বেথুন কলেজে। ছোট থেকেই পড়াশুনোয় মগ্ন থাকতেন। পড়াশুনা নিয়েই কেটেছে তার ছোটবেলা। সঙ্গে পড়তেন দু বছরের বড় মাসী― রামকুমার বিদ্যারত্নের মেয়ে সুরমা (সাহিত্যিক লীলা মজুমদারের মা) ভট্টাচার্য।কলেজের পড়া শেষ করে কিছুদিন শিক্ষকতাও করে নিলেন সুখলতা। তারপর তাঁর যখন একুশ বছর বয়স― বিয়ে হয়ে গেল উড়িষ্যার ‘ভক্তকবি’ মধুসূদন রাওয়ের প্রথম সন্তান ডঃ জয়ন্ত রাও (জন্ম ১৮৭৮) এর সঙ্গে। জয়ন্ত রাও উড়িষ্যা চিকিত্সা বিভাগের সঙ্গে সংযুক্ত থেকে প্রখ্যাত সিভিল সার্জেন হিসেবে সুপরিচিত হন। সুখলতা― রায় থেকে হলেন সুখলতা রাও। কলকাতা জীবন থেকে কিছুকালের জন্য তাঁর জীবনের পটভূমি হল উড়িষ্যা।

কিন্তু সে তো তাঁর শারীরিক পুনর্বাসন। মনে পড়ে থাকত কলকাতাতেই। কারণ সুখলতা উপেন্দ্রকিশোরের কন্যা― যে উপেন্দ্রকিশোর পরিচিত হয়েছিলেন স্বনামখ্যাত লেখক এবং চিত্রকর হিসেবেও। ফটোগ্রাফ সম্পর্কে গবেষণায় যিনি ছিলেন বাঙালিদের অগ্রগণ্য, ভারতে হাফটোন ব্লকের যিনি প্রথম নির্মাতা। এবং যে বাবার কাছে বসে সুখলতা পাঠ নিয়েছিলেন সাহিত্যের এবং চিত্রের। অন্য ভাইবোনেরা সবাই লেখেন, সুখলতা লেখেন আবার ছবিও আঁকেন। আগে তাঁর ছবি আঁকার কথাই বলি।

স্কুলে পড়ার সময় নিয়মিত ছবি আঁকা শিখতে হত। শান্তশিষ্ট মেয়ে, চেঁচামেচি-হুড়োহুড়িতে একটুও তাঁর উত্সাহ নেই, কেমন যেন একটা অন্তর্মুখী স্বভাব। তাই দেখে উপেন্দ্রকিশোর তাঁকে (অন্যদেরও অবশ্যই) এনে দিতেন আঁকার নানা সরঞ্জাম। সুখলতার ঝোঁক ছিল ফুলপাতা, পাখি, গাছপালা আর সুন্দর জিনিসের ছবি আঁকায়। কলকাতার মেয়ে― প্রকৃতিকে কাছে পাওয়া যেতো না বলেই হয়ত এমন করে প্রকৃতি-প্রীতি জেগে উঠেছিল ছোটবেলা থেকেই। অবশ্য মানুষের প্রতিকৃতি আঁকাতেও তাঁর উত্সাহ কিছুমাত্র কম ছিল না।

বাড়িতে একটা ছবি আঁকার পরিবেশ গড়েই উঠেছিল। বাবা ছবি আঁকতেন, বড়ভাই এবং বোনেরাও। প্রসিদ্ধ চিত্রকর শশিকুমার হেস ফ্রান্স থেকে ফিরে এসে তাঁদের পাশের বাড়িতেই থাকতেন। তাঁর অয়েলকালারে পোট্রেট দেখে সেদিকেও গেছিল তাঁর ইচ্ছে। শশিকুমার তাঁর আঁকার প্রশংসাও করেছিলেন। তবে ওয়াটার কালারে ছবি আঁকাতেই ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। এর মধ্যে ‘পূজারিনী’ ছবি তাঁর জীবনে উল্লেখযোগ্য স্মৃতি বয়ে চলেছিল দীর্ঘকাল ধরে। কারণ এই ছবিটিই ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রথম ছাপা হলে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সাগ্রহে তাঁর বাংলা ও ইংরেজি মাসিক পত্রিকা ‘প্রবাসী’ আর ‘মডার্নরিভিউ’য়ে কয়েক ছবি ছাপিয়ে দিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরও তাঁকে করতেন উত্সাহিত।

এ প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথের কথা না বললেই নয়। কারন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে একটা সস্নেহ-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক ছিল তাঁর। মনসা-মঙ্গলের সুখ্যাত বেহুলা-লক্ষীন্দর-উপখ্যান নিয়ে ইংরেজিতে ১২ গল্প লিখে ১২ রঙিন ছবি নিজে হাতে এঁকে সুখলতা BEHULA নাম দিয়ে ঢাউস আকারের একটা বই প্রকাশ করেছিলেন (BEHULA/An Indian Myth/WRITTEN AND ILLUSTRATED BY SUKHALATA RAO/U.RAY & SONS/117 Bowbazar St., Calcutta)। প্রায় চল্লিশ পৃষ্ঠার এই বইটির জন্যে রবীন্দ্রনাথ এক চমত্কার ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন। দুষ্প্রাপ্য এই বইটি থেকে সেই ভূমিকা তুলে দেওয়া নিশ্চয়ই অপ্রাসঙ্গিক হবে না। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘Introduction’-এ লিখেছেন―

Mrs. Sukhalata Rao has caught in the web of her story the spirit of the village epic of Bengal, Behula, which has sprung from the heart of our people and has lived in oral traditions and folk-lore, sung and performed by the local operatic troupes of this province. It gives us the picture of the ideal wife, her heroic sacrifice and conjures the atmosphere of home life in its humble majesty, touching simple hearts with the beauty and depth of its sentiments.
I feel sure that this English version of the story will find a large and appreciative audience.
Rabindranath Tagore

আসলে রবীন্দ্রনাথের ভাল লেগেছিল বেহুলার ছবি। অনেকেই জানেন না, সুখলতা লিখেছেন, ‘তিনি ইচ্ছা করাতে ‘সন্দেশ’ কাগজে প্রকাশিত তাঁর একটি কবিতার ছবি এঁকে দিয়েছিলাম। মর্ডান রিভিউয়ে সাবিত্রী-সত্যবান-এর গল্পকে ভিত্তি করে আঁকা সুখলতার একটি ছবি ‘In Quest of the Beloved’ ছাপা হয়েছিল। সে দেখে জনৈক উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মচারী রবীন্দ্রনাথকে ছবি ভাললাগার ও কেনার কথা জানান। রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখে সুখলতাকে একথা জানান এবং ছবিখানি তাঁকে পাঠিয়ে দেন।’

এ প্রসঙ্গে আরও এক তথ্য নিবেদন করা যেতে পারে। রবীন্দ্ররচনার বহু অনুবাদকের তালিকায় সুখলতারও একটি সম্মানযোগ্য স্থান আছে। রবীন্দ্রনাথের ‘রাজা ও রানী’ নাটক এবং ‘জাপান যাত্রী’ ভ্রমণ পত্রাবলীর অনুবাদ করেছিলেন তিনি যথাক্রমে ‘Devouring Love’ এবং ‘A Visit to japan’ নামে। অনুবাদ দুটি প্রকাশিত হয়েছিল রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকীর (১৯৬১) লগ্নে এবং ‘East -West Institute Series’-এর বই হিসেবে ‘New York’ থেকে প্রকাশিত হয়। দুটি বই-ই অবশ্য সম্পাদনা করেছিলেন ‘Walter Donald Kring.’

লেখক - বারিদবরণ ঘোষ ( আনন্দবাজার )

সুখলতা কলকাতার ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয় এবং বেথুন কলেজে পড়াশোনা করেন। ১৯০৩ সালে তিনি বৃত্তি নিয়ে এফএ এবং পরে বিএ পাস করেন। স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর সুখলতা কিছুদিন স্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯০৭ সালে উড়িষ্যার ডাক্তার জয়ন্ত রাওয়ের সঙ্গে বিবাহ হলে তিনি স্বামীর সঙ্গে কটক চলে যান। সেখানে স্বামীর সহযোগিতায় সুখলতা সমাজসেবায় আত্মনিয়োগ করেন এবং কটকে ‘শিশু ও মাতৃমঙ্গল কেন্দ্র’, ‘উড়িষ্যা নারী সেবা সংঘ’ প্রভৃতি সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। সমাজসেবার পাশাপাশি তিনি বাংলা ও ইংরেজিতে আলোক নামে একটি পত্রিকাও সম্পাদনা করেন।
সুখলতা বাংলা ও ইংরেজি উভয় ভাষায় সাহিত্যচর্চা করেন এবং কুড়িটির মতো গ্রন্থ রচনা করেন। তাঁর শিশুতোষ গ্রন্থগুলি বিপুল প্রশংসা লাভ করে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গ্রন্থ হলো: লালিভুলির দেশে, নিজে পড়, নিজে শেখ, গল্প আর গল্প (১৯১২), খোকা এলো বেড়িয়ে (১৯১৬), নতুন পড়া (১৯২২), সোনার ময়ূর, নতুন ছড়া (১৯৫২), বিদেশী ছড়া (১৯৬২), নানান দেশের রূপকথা, পথের আলো, ঈশপের গল্প, হিতোপদেশের গল্প, New Steps, Living Lights প্রভৃতি।

সুখলতা রাওয়ের নিজে পড় গ্রন্থটি শিশুসাহিত্য সংসদ কর্তৃক প্রকাশিত হয় এবং এর জন্য তিনি ‘লেখিকা’ পুরস্কার ও ভারত সরকারের ‘সাহিত্য পুরস্কার’ (১৯৫৬) লাভ করেন। এছাড়া তাঁর আরও কয়েকটি গ্রন্থ পুরস্কৃত হয়। সমাজসেবায় অবদান রাখার জন্য তিনি স্বামীর সঙ্গে যৌথভাবে ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ পদক লাভ করেন। চিত্রশিল্পী হিসেবেও তাঁর খ্যাতি ছিল।

পড়া যাক তাঁর একটি কবিতা:

বড়োলোক 

ধনির ছেলে টুনু অভাব নাহি তার,
খেলনা আছে কত বাগান বাড়ি আর;
তবুও কানু বিনা কাটে না দিন তার
খুশি মনে।
মালির ছেলে কানু, থাকে সে চালা ঘরে
মা রাঁধে শাক-ভাত তা' দিয়ে পেট ভরে,
পুরানো ছেঁড়া ধুতি সবল দেহে পরে
সযতনে।
'টুনুরা বড়ো লোক, এত কী মেশামেশি?
কানুর সাথে তার, এত কী ঘেঁষাঘেঁশি?
ভালো না বাড়াবাড়ি মজাবে শেষাশেষি'
সব বলে।
কথাটা ক্রমে ক্রমে ধনীর কানে যায়।
দু'জনে হাসি-খেলা বারণ হ'ল হায়;
মনের দুখে টুনু ভাসিল নিরালায়
আঁখি জলে।
সময় চ'লে যায় ব'সে তো থাকে না সে;
নতুন সাথি জোটে, টুনুর আশেপাশে,
সমান বড়োলোক, সমানে খেলে হাসে,
সবি সাজে।

এইবেলাডটকম/এমআর

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71