শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সাহিত্যিক এবং সমাজ সংস্কারক প্যারীচাঁদ মিত্রের ১৩৩তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০১:৩৪ pm ২৩-১১-২০১৬ হালনাগাদ: ০১:৩৪ pm ২৩-১১-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

সাহিত্যিক এবং সমাজ সংস্কারক প্যারীচাঁদ মিত্র ( জন্মঃ- ২২ জুলাই, ১৮১৪ - মৃত্যুঃ- ২৩ নভেম্বর, ১৮৮৩ )

তিনি বাংলার নবজাগরনের অন্যতম নেতা ছিলেন। তিনি ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরির লাইব্রেরিয়ান ছিলেন এবং ফার্সি, বাংলা ও ইংরেজি ভালো জানতেন। বিশেষ করে বাংলা ও ইংরেজি ভাষায় বহু গ্রন্থ রচনা করে তিনি খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি মহিলাদের জন্য একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন। তাঁর সহযোগী ছিলো রাধানাথ শিকদার। তিনি এছাড়াও জনকল্যাণ মূলক কাজও করতেন। তিনি কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটের সদস্য ছিলেন। তিনি পশু-ক্লেশ নিবারণী সভারও সদস্য ছিলেন। বেথুন সোসাইটি ও ব্রিটিশ ইন্ডিয়া সোসাইটির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন প্যারীচাঁদ মিত্র। জ্ঞানান্বেষণ সভার সদস্য হন তিনি ১৮৩৮ সালে। তাঁর ইংরেজি ভাষায় রচিত লেখাসমূহ ছাপা হত ইংলিশম্যান, ইন্ডিয়ান ফিল্ড, ক্যালকাটা রিভিউ, হিন্দু প্যাট্রিয়ট, ফ্রেন্ড অফ ইন্ডিয়া প্রভৃতি পত্রিকায়। তিনি পুলিশি অত্যাচারিতার বিরুদ্ধে লড়েছিলেন এবং সফলকামও হয়েছিলেন। তিনি স্ত্রী শিক্ষা প্রচারে যথেষ্ট সক্রিয়তার পরিচয় দেন। তিনি বিধবাবিবাহ সমর্থন করতেন। তিনি বাল্যবিবাহ এবং বহুবিবাহের বিরোধিতা করেন।

প্যারীচাঁদ মিত্র ছিলেন হিন্দু কলেজের লেখক গোষ্ঠীর প্রধান এবং হিন্দু কলেজের ছাত্র হিসেবে ইয়ংবেঙ্গলের পরামর্শদাতা ডিরোজিওর আদর্শ ও প্রত্যক্ষ প্রভাবে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ। শিক্ষা, সংস্কৃতি,সাংবাদিকতাসহ বিভিন্ন বিষয়ের সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত থেকে প্যারীচাঁদ মিত্র তৎকালীন কলকাতার সুধীজনের কাছে স্থান করে নিয়েছিলেন একজন মর্যাদাবান ও বিশিষ্ট ব্যক্তি হিসেবে। সাহিত্য ক্ষেত্রেও প্যারীচাঁদ মিত্রের অবদান বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। সাহিত্যরস যোগান দেয়ার উদ্দেশ্যে শিক্ষাচ্ছলে অন্তঃপুরবাসিনী মহিলাদের জন্যে রাধানাথ শিকদারের সহযোগিতায় তিনি ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশ করেন ক্ষুদ্রাকৃতির ‘মাসিক পত্রিকা’। ওই পত্রিকার শীর্ষে ছাপা থাকতো সম্পাদকীয় মন্তব্য। যাতে লেখা থাকতোঃ ‘এই পত্রিকা সাধারণের বিশেষত স্ত্রীলোকের জন্য ছাপা হইতেছে, যে ভাষায় আমাদিগের সচরাচর কথাবার্তা হয়, তাহাতেই প্রস্তাব সকল রচনা হইবেক। বিজ্ঞ পণ্ডিতেরাও পড়িতে চান, পড়িবেন, কিন্তু তাঁহাদিগের নিমিত্তে এই পত্রিকা লিখিত হয় নাই।’ তা সত্ত্বেও চলতি ভাষা শিক্ষার্থীদের কাছে এই পত্রিকার আবেদন ছিল অনেক বেশি। কারণ এর প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল কথ্য ভাষার রীতিতে বাক্য রচনা। এছাড়া সাধু ও কথ্য ভাষার মিশ্র ক্রিয়াপদ এবং তদ্ভব ও ফারসি শব্দের প্রচুর ব্যবহার। প্যারীচাঁদ মিত্রের সাহিত্যিক জীবন শুরুর রচনাগুলো এই পত্রিকার মাধ্যমেই প্রকাশিত হয়। বাংলা গদ্যে কথ্যরীতির বর্তমান যে গৌরবজনক স্থান, মূলত এই মাসিক পত্রিকাকে কেন্দ্র করে প্যারীচাঁদ মিত্রের হাতেই রচিত হয়েছিল তার ভিত্তি।

আলালের ঘরের দুলাল (তাঁর শ্রেষ্ঠ এবং বাংলা সাহিত্যের প্রথম উপন্যাস)। উল্লেখ্য যে এখানে তিনি যে কথ্য ভাষা ব্যবহার করেছিলেন তা আলালী ভাষা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। এই গ্রন্থটি ইংরেজিতেও অনুবাদ করা হয়েছিলো The spoiled child নামে। গ্রন্থটি সম্পূর্ণ সামাজিক পটভূমিকায় রচিত। নব্য শিক্ষিত ইয়ংবেঙ্গলদের কার্যকলাপ ও পরিণতি গ্রন্থটির মূল প্রতিপাদ্য বিষয়। প্যারীচাঁদ মিত্র এই নবলব্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ্য করলেন যে, ধর্ম ও নীতিহীনতাই উচ্ছৃঙ্খলতার মূল কারণ। সুতরাং জীবনযাত্রা প্রণালীর মধ্যেই রয়েছে এ থেকে মুক্তির পথ। এ কথা প্রতিপন্ন করার জন্যেই তিনি আলালের ঘরের দুলালের কাহিনী নির্মাণ করেন। আবাল্য অতি আদরের ধনীর পুত্র মতিলাল কখনও ধর্ম ও নীতির শিক্ষা পায়নি, উপরন্ত অসৎ সঙ্গে সে অবনতির শেষ ধাপে এসে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে মতিলালেরই অনুজ রামলাল আদর্শ চরিত্র। বরদাবাবুর একান্ত স্নেহছায়ায় বড় হয়ে সে তার সকল নির্দেশ মান্য করে সর্বজনের প্রশংসা অর্জন করেছে। মতিলালের চৈতন্যেদয় এবং আদর্শ জীবনের প্রতি আকর্ষণে সমাপ্তি। গ্রন্থের এই দুই প্রধান ঘটনাস্রোত বিচিত্র খণ্ড ক্ষুদ্র ঘটনায় পল্লবিত হয়ে প্রবাহিত হয়েছে। মূল ঘটনা অপেক্ষা এ বিচিত্র খণ্ড ক্ষুদ্র পল্লবিত ঘটনাই গ্রন্থটির আশ্চর্য সফলতার কারণ। বস্তুতঃ বরদাবাবুর মত মূর্তিমান নীতিপাঠ, বেনী বাবুর মত সজ্জন অথবা আদর্শ যুবক রামলাল এরা কেউই আলালের মত মূল আকর্ষণীয় নয়। এদের মধ্যে সুশিক্ষা থাকতে পারে কিন্তু উপন্যাসের যা প্রধানতম উপকরণ জীবনের স্পর্শ স্বাদ, তা এই চরিত্রগুলোতে কোথাও নেই। আলালের অবিস্মরণীয় সাফল্য এনে দিয়েছে মতিলাল স্বয়ং এবং তার সাঙ্গপাঙ্গ হলধর গদাধর ইত্যাদি। ধরিবাজ মুৎসুদ্দি বাহোরাম, শিক্ষক বক্রেশ্বর বাবু ও সর্বোপরি একটি অপরূপ সৃষ্টি ঠকচাচা।
আলালী ভাষা সম্পর্কে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের পক্ষপাতহীন একটি মন্তব্য এখানে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্যঃ ‘আমি এমন বলিতেছিনা যে আলালের ঘরের দুলালের ভাষা আদর্শ ভাষা। উহাতে গাম্ভীর্যের এবং বিশুদ্ধির অভাব আছে এবং ঊহাতে অতি উন্নত ভাবসকল,সকল সময়ে পরিস্ফুট করা যায় কিনা সন্দেহ । কিন্তু, উহাতেই প্রথম এ বাংলাদেশে প্রচারিত হইল যে, যে বাংলা সর্বজনমধ্যে কথিত এবং প্রচলিত তাহাতে গ্রন্থ রচনা সুন্দরও হয় এবং যে সর্বজন হৃদয় গ্রাহিতা সংস্কৃতানুযায়ী ভাষার পক্ষে দুর্লভ এ ভাষার তাহা সহজ গুণ।’

বাস্তব জীবনে রম্য লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র বেশ রসিক হিসেবে সর্বজন পরিচিত ছিলেন।তার রসবোধের নমুনা এমন,একবার এক এলাকার অন্যতম ধনী দেব নারায়ন দে'র বাড়িতে একটা বড়সড় অনুষ্ঠানের আয়োজন চলছিল। লেখা হচ্ছিল দেনাপাওনা ও খরচাপাতির ফর্দ। সেখানে উপস্তিত ছিলেন রসিক লেখক প্যারীচাঁদ মিত্র। খরচের ফর্দ দেখে প্যারীচাঁদ মিত্র বললেন-'একি মিস্টান্নের জন্য এতো কম টাকা? ব্রাম্মনকেও তো তেমন দেয়া হচ্ছেনা। এসব খরচ কিছু বাড়িয়ে দিন।'
দেবনারায়ন বললেন-' প্যারীচাঁদ বাবু,আপনি শুধু খরচ বাড়াতে বলছেন। টাকাটা কে দেবে শুনি?' প্যারীচাঁদ মিত্রের তড়িৎ জবাব-'কেন, আপনি দেবেন। আপনার নামের আগে দে, নামের পরেও দে। দিতে আপনাকে হবেই।

মদ খাওয়া বড় দায়, জাত থাকার কি উপায়(১৮৫৯) উদ্ভট কল্পনা তাঁর এ গ্রন্থে লক্ষ করা যায়।
অভেদী(১৮৭১)
আধ্যাত্মিকা(১৮৮০)
The Zemindar and Ryots. এই গ্রন্থটি তখনকার সময়ে অনেক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলো। কারণ এটি রচিত হয়েছিলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে।

জন্ম
তিনি কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন। তার ছদ্মনাম 'টেকচাঁদ ঠাকুর'। পিতার নাম রামনারায়ণ মিত্র যিনি প্রথম জীবনে হুগলি জেলা থেকে কলকাতা এসেছিলেন। তৎকালে ইউরোপীয় বণিকদের সঙ্গে সখ্যতা তার ভাগ্য ফিরিয়েছিল।

প্যারীচাঁদ মিত্রের শিক্ষাজীবন শুরু হয় পারিবারিক পরিমণ্ডলে। তিনি একজন পণ্ডিত ও মুনশির কাছে যথাক্রমে বাংলা ও ফারসি শিখেছিলেন। পাশাপাশি তিনি শিখেছিলেন ইংরেজি ভাষাও। তিনি হিন্দু কলেজে ভর্তি হন ১৮২৭ সালে। সেখানে হেনরি ডিরোজিও নামের একজন অসাধারণ শিক্ষকের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। এ-কলেজেই তিনি তার শিক্ষাজীবন শেষ করেন। তিনি বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন।

মৃত্যু
১৮৮৩ সালের ২৩শে নভেম্বর তিনি মারা যান।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71