বৃহস্পতিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বৃহঃস্পতিবার, ৫ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সাহিত্যিক প্রবোধ কুমার সান্যালের ৩৪তম ‍মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৭:১২ pm ১৭-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৭:১২ pm ১৭-০৪-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

সাহিত্যিক, সাংবাদিক এবং পরিব্রাজক প্রবোধ কুমার সান্যাল ( জন্মঃ- ৭ জুলাই, ১৯০৫ - মৃত্যুঃ- ১৭ এপ্রিল, ১৯৮৩ )

১৯৩২ থেকে দীর্ঘ পাঁচ বছর হিমালয় সন্নিহিত নানা স্থান ভ্রমণ করেন, সেই ভ্রমণ অভিজ্ঞতা, হিমালয়ের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষের জীবনপ্রণালী আর নানান মানুষের সংস্পর্শে আসার অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখলেন তাঁর অনন্য সৃষ্টি ‘দেবতাত্মা হিমালয়’। এই শীর্ষকটি তিনি গ্রহণ করেছিলেন কালিদাসের কুমারসম্ভবের বিখ্যাত শ্লোক থেকে, “অস্ত্যুত্তরস্যাং দিশি দেবতাত্মা হিমালয়ো নাম নগাধিরাজঃ | পূর্বাপরৌ তোয়নিধী বিগাহ্য স্থিতঃ পৃথিব্যা ইব মানদণ্ডঃ ||” হিমালয় আমাদের কাছে চির দুর্জ্ঞেয় রহস্য, দুর্নিবার তার আকর্ষণ। বুঝি বা সেই রহস্যের টানেই পর্যটকরা বারবার ছুটে যান। এই প্রসঙ্গে আমাদের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর মন্তব্য অপ্রাসঙ্গিক হবে না। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থের মুখবন্ধে জওহরলাল মন্তব্য করেছিলেন - ‘হিমালয় যে শুধু ভারতের বিস্তীর্ণ ভূভাগের শীর্ষে নগাধিরাজ রূপেই বিরাজমান তাই নয়, প্রত্যেক ভারতবাসীর অন্তরে তার একটি গভীর বাণীও মন্দ্রিত। ইতিহাসের ঊষাকাল থেকে হিমালয় আমাদের জাতির জীবনের সঙ্গে গ্রথিত; এবং শুধু যে আমাদের রাষ্ট্রনীতিকেই হিমালয় প্রভাবিত করে এসেছে তাই নয়, আমাদের শিল্পকলা,আমাদের পুরাণ এবং ধর্মের সঙ্গেও এই পর্বতমালা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হয়ে আছে। সুদূর অতীতকাল থেকে হাজার হাজার বছর ধরে আমাদের জাতীয় জীবনের বিকাশে হিমালয় যে অংশগ্রহণ করেছে, আমার মনে হয় পৃথিবীর অন্য কোথাও অপর কোন পাহাড়-পর্বত বা গিরিশ্রেণী তা করতে সক্ষম হয়নি”। কালিদাসের ‘নগাধিরাজ’ বিশেষণের যাথার্থ্য আমরা বুঝতেই পারি।
হিমালয় কেন বারবার তাঁকে টেনে এনেছিল, সেই প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছেন ‘উত্তর হিমালয় চরিত’ গ্রন্থের মুখবন্ধে। লিখেছেন – “এই ভ্রমণের পিছনে ছিল জানা ও অজানা পার্বত্যলোকের প্রতি আমার অন্ধ আসক্তির টান। আমার প্রকৃতিগত অস্থিরতা একমাত্র নিভৃত হিমালয়ের মধ্যেই স্থৈর্য লাভ করে। আমার পঞ্জরাস্থিমালা হিমালয়ের সঙ্গে মেলানো”।
নিতান্ত শৈশবে মাত্র চার বছর বয়সে পিতৃহীন প্রবোধকুমার জননী বিশ্বেশ্বরী দেবীর হরিদ্বার-হৃষিকেশ তীর্থভ্রমণে সঙ্গী হয়েছিলেন ১৯২৩ এর অক্টবরে, প্রবোধকুমার তখন ১৮ বছরের কিশোর। জননীই তাঁকে প্রথম হিমালয় চিনিয়েছিলেন। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থের ভুমিকায় প্রবোধকুমার লিখেছেন, “সাধারণত যে জগতে ও যে সমাজে আমার চলাফেরা ছিল, হিমালয় তার থেকে সম্পূর্ণ পৃথক সুতরাং, সেদিনকার সেই তরুণ বয়সের একটি বিশেষ সন্ধিক্ষণে সমগ্র হিমালয় আমার চোখে এক বিচিত্র অভিনব আবিষ্কার মনে হয়েছিল। নূতনের আকস্মিক আবির্ভাবে চমক লেগেছিল আমার জীবনে। যিনি আমাকে প্রথম হিমালয় চিনিয়েছিলেন, সেই জননীর অজ্ঞাতসারেও আমাকে বারকয়েক হিমালয়ের কয়েকটি অঞ্চলে যেতে হয়েছিল। কারণ তিনি জেনেছিলেন এ নেশা আমাকে পেয়ে বসেছে”।
হিমালয়ের টানেই প্রবোধকুমার সেনা বিভাগে চাকরি নিয়ে দেড় বৎসরকাল পীরপাঞ্জাল পর্বতশ্রেণির ‘কো-মারি’ অঞ্চলে বসবাস করেছিলেন। এখন এই অঞ্চলটি পাকিস্তানের অন্তর্গত। 
জননীর তীর্থভ্রমণের সঙ্গী হয়ে প্রথম হিমালয় চেনা ও তার দূর্বার আকর্ষণ বোধ করলেও তার বারংবার হিমালয় ভ্রমণ তীর্থ-ভ্রমণের টানে ছিল না। ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ ও ‘উত্তর হিমালয় চরিত’এ অসংখ্য দেবালয় ও তীর্থস্থানের বিবরণ দিয়েছেন, সেগুলির প্রতিষ্ঠার পেছনে ইতিহাস ও পৌরাণিক পৃষ্ঠভূমির বিশ্বাসযোগ্য বৃত্তান্ত শুনিয়েছেন। তবু প্রবোধকুমারের ‘হিমালয় ভ্রমণ-কথা’ কখনোই ‘তীর্থ-ভ্রমণ-কথা’ হয়ে ওঠেনি। তাঁর নিজের কথায়, 
“হিমালয় পর্যটক বলেই যে আমি তীর্থযাত্রী – একথা সত্য নয়। লক্ষ্যটা আনন্দের উপলক্ষ্যটা তীর্থের। হিমালয়ের রঙ মেখেছি আমি সর্ব দেহে মনে, রস পেয়েছি সর্বত্র। কেবলমাত্র তীর্থযাত্রা করাই যদি মূল উদ্দেশ্যই হত তাহলে যেদিন বদ্রীনাথ মন্দিরে ঢুকে বিষ্ণুমূর্তি দর্শন করলুম, সেদিনই আমার গাড়োয়াল দেখা শেষ হয়ে যেত। ... হিমালয়ের সকল তীর্থদেবতা দর্শন মোটামুটি দশ বছরেই শেষ হয়, কিন্তু বত্রিশ বছরেও আমার কাছে হিমালয় শেষ হয়নি”।

প্রবোধ কুমার কলকাতার চরবাগানে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। আদিনিবাস ফরিদপুরে। তার সাহিত্যিক ছদ্মনাম ‘কীর্তনীয়া’। নিতান্ত শৈশবে পিতৃহারা প্রবোধকুমার প্রতিপালিত হন কলকাতায় মাতুলালয়ে। স্কটশচার্চ কলেজিয়েট স্কুল ও সিটি কলেজে অধ্যয়ন করেন। ডাক বিভাগ ও পরে হিমালয়ের টানে সামরিক বিভাগেও কয়েক বছর কর্মরত ছিলেন। ১৯৩৭ থেকে ১৯৪১ অধুনা লুপ্ত ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় রবিবাসরীয় সাহিত্য বিভাগের সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৩০ পরবর্তী বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন যারা তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বহু পাঠকবন্দিত উপন্যাস ও গল্পের স্রষ্টা প্রবোধকুমার। তাঁর কাহিনী অবলম্বনে বহু সফল চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছে, কাঁচ কাটা হীরে, পুষ্পধনু, প্রিয় বান্ধবী ইত্যাদি। মূলত কল্লোল যুগের সাহিত্যিক হিসেবেই পরিচিত প্রবোধ কুমার। তিনি একাধিক পুরস্কার লাভ করেন সাহিত্য প্রতিভার স্বীকৃতিস্বরূপ। বন্ধু রূপে পেয়েছিলেন সেকালের বহু নামী দামী সাহিত্যিককেও।

প্রবোধ কুমার সান্যালের ‘দেবতাত্মা হিমালয়’এর রচনাকাল ১৯৫৪। তারও অনেক আগে ১৯৩৭এ প্রবোধ কুমারে অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ প্রকাশিত হয়। কৈলাশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা অসাধারণ ভ্রমণোপন্যাস। ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ পাঠ করার পর রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘তোমার ভাষা পাঠকের মনকে রাস্তায় বের করে আনে’।
১৯৩২ এ কেদারবদ্রী ভ্রমণ ও তারপর হৃষিকেশ থেকে পার্বত্য শহর রাণীক্ষেত পর্যন্ত প্রায় ৪০০ মাইল পথ পায়ে হেঁটে পরিক্রমণ করেছিলেন ৩৮ দিনে। সেই অভিজ্ঞতার কাহিনী নিয়েই লিখেছিলেন ‘মহাপ্রস্থানের পথে’।

হিমালয়ের মূল মেরুদন্ড দক্ষিণ-পূর্ব থেকে উত্তর-পশ্চিমে কাশ্মিরের শেষপ্রান্তে হিন্দুকুশের সঙ্গে মিলেছে। হিমালয়ের সেই মেরুদন্ডের দুই পার ছিল তাঁর ভ্রমণের পথ। সাতটি পার্বত্য ভূভাগে দুর্গম অঞ্চল সহ বিস্তীর্ণ পথ পরিক্রমণের বৃত্তান্ত লিখেছেন উত্তর ‘হিমালয় চরিত’ গ্রন্থে। সেই ভ্রমণ-কথায় মিশে আছে সেইসব অঞ্চলের সামাজিক ইতিহাস, পৌরানিক কথা, নানান জাতি ও সমাজের স্তরবিন্যাস, শ্রেণী, বর্ণ ও ভাষার কথা, তাদের লোকাচার ও দৈনন্দিন যাপনের বিশ্বস্ত ছবি।

প্রবোধকুমারের বত্রিশ বছরের বারংবার হিমালয় পরিক্রমণের সেরা ফসল তার দুই খন্ডের গ্রন্থ ‘দেবতাত্মা হিমালয়’। হিন্দুকুশ উপত্যকা থেকে পার্বত্য আসাম পর্যন্ত হিমালয়ের যে বিস্তৃত ভৌগোলিক উত্তর-প্রাচীর তার প্রত্যেকটি ভূভাগই তাঁর ভ্রমণের মধ্যে এসেছে। চব্বিশটি পর্যায় ভাগ করে তাঁর ভ্রমণবৃত্তান্ত সন্নিবেশিত করেছেন ‘দেবতাত্মা হিমালয়’ গ্রন্থে। অভ্রভেদী সুবিস্তৃত হিমালয় – আর সেই পর্বতমালা থেকে হাজার হাজার বছর ধরে সমতলে নেমে আসা স্রোতধারা সৃষ্ট খরতোয়া নদীর দুপাশে গড়ে ওঠা উপত্যকার সংস্কৃতি ও সভ্যতাকে পর্যবেক্ষণ করেছে শিল্পীর জিজ্ঞাসু মন ও দৃষ্টিতে। আমাদের শুনিয়েছেন সেই বিবরণ। তার পরেও শুনিয়েছেন এক সারসত্য, 
“মানুষের এক জন্মে সমগ্র হিমালয় আনুপূর্বিকভাবে ভ্রমণ ও পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। এ কাজ আয়ুষ্কালের একশো বছরেও কুলায় না”।

 

 এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71