শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সাহিত্যিক বিপিন চন্দ্র পালের ৮৪তম মৃত্যুবার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ১০:৪৮ am ০৭-১১-২০১৬ হালনাগাদ: ১২:১৮ pm ০৭-১১-২০১৬
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

স্বাধীনতা সংগ্রামী, সাহিত্যিক, সমাজ সংস্কারক এবং সুবক্তা
বিপিন চন্দ্র পাল (জন্মঃ- ৭ নভেম্বর, ১৮৫৮ - মৃত্যুঃ- ২০ মে, ১৯৩২)(সংসদ বাঙালি চরিতাভিধান অনুযায়ী)

১৮৮৫ সালে বোম্বে সম্মেলনের ভিতর দিয়ে ‘জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়। বালগঙ্গাধর তিলক, লালা লাজপত রায়, বিপিন চন্দ্র পাল ও অরবিন্দ ঘোষ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ দেশবাসীর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও আত্মনির্ভরতা গড়িয়া তুলিতে সাহায্য করেন এবং আত্মত্যাগের মহান আদর্শে উদ্বুদ্ধ হইয়া সংগ্রামে অবতীর্ণ হইতে আহ্বান জানান।” অল্পদিনের মধ্যে বিপিন চন্দ্র পাল সর্বভারতীয় পর্যায়ের নেতা হিসাবে পরিচিত হয়ে উঠেন। বিপিন চন্দ্র পাল অসাধারণ বক্তা হওয়ার কারণে বিভিন্ন সভা-সমাবেশের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে জনগণকে জাগ্রত করেন। কিন্তু গান্ধীজী জাতীয় কংগ্রেসের নেতৃত্ব গ্রহণের পর থেকে কংগ্রেসের অভ্যন্তরে মধ্যপন্থি ও চরমপন্থি অংশের মধ্যে এক সাময়িক ভাঙ্গন সৃষ্টি হয়। নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বিপিন চন্দ্র পাল মতাদর্শগতভাবে গান্ধীবাদী ধারার বিরুদ্ধে অবস্থান নিলেন এবং চরমপন্থি অংশের নেতৃত্বে চলে আসেন। এসময় তিনি গান্ধী নেহেরুর রাজনৈতিক প্রভুত্বের বিরুদ্ধে এক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ান। ব্রিটিশ শাসন থেকে দেশকে মুক্ত করতে তিনি প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামে যুক্ত হন।

১৮৯০-৯২ সালে বিপিন চন্দ্র পাল কলকাতায় পাবলিক লাইব্রেরি ও পৌরকর্পোরেশনে কিছুদিন কাজ করেন। ১৮৯২-৯৩ তিনি কলকাতা কর্পোরেশনের লাইসেন্স ইনসপেকটার হন। ১৮৯৯ সালে তিনি সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের বৃত্তি নিয়ে গবেষণার জন্য অক্সফোর্ডের ম্যাঞ্চেষ্টার কলেজে যোগদান করেন। সেখানকার পাঠক্রম শেষ করে সারা ইংল্যাণ্ড ও আমেরিকা ভ্রমণ করে হিন্দুধর্ম, ভারতীয় রাজনীতি ও মাদকদ্রব্য নিবারণ সম্বন্ধে বক্তৃতা করেন।

বিপিন চন্দ্র পাল প্রাণশক্তি দিয়ে জাগিয়ে তোলেন ঘুমন্ত জাতিকে। তিনি আহ্বান জানান পরাধীনতার শিকল ভাঙ্গতে। ক্রমেই লালা লাজ-পতরায়, বাল গঙ্গাধর তিলকের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেন। তিনি শুধু কলাকতায় বসে থাকেননি, সারা ভারতবর্ষের প্রতিটি অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে পরাধীন ভারতবর্ষের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন। সমগ্র দেশে অল্পদিনের মধ্যে আলোড়ন সৃষ্টি করে ঘুমন্ত ভারতকে স্বাধীনতার মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ করেন। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ তাঁহাকে গুরুদেব বলে সম্বোধন করতেন। লালা লাজপতরায়, বাল গঙ্গাধর তিলক ও বিপিন চন্দ্র পাল তখনকার ভারতে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিন দিক পাল ছিলেন।

বিপিন চন্দ্র পাল ১৯০৪ সালে বোম্বাইতে কংগ্রেসের সভাপতিত্ব করেন। ১৯০৬ সালে শ্রীহট্ট সুরমা উপত্যকার প্রথম রাষ্ট্রীয় সম্মেলনে বক্তৃতা দেন। ১৯০৮ করিমগঞ্জে সুরমা উপত্যকার দ্বিতীয় সম্মেলনে বক্তৃতা করেন। তাছাড়া ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ প্রতিরোধের আন্দোলনে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করনে।

১৯০৫-১৯০৮ সালে তার জ্বালাময়ী বক্তৃতায় ব্রিটিশের ভিত নড়ে যায়। ১৯০৭ সালে মাদ্রাজে যে বক্তৃতা প্রধান করেন তাতে সারাদেশে এক জাগরণ সৃষ্টি হয়। সেক্রেটারী অব স্টেট ও বড়লাট বিপিন চন্দ্রকে শৃঙ্খলিত করার জন্য ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেন।

১৯০৬ সালে তিনি বন্দেমাতরম পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯০৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর বিপিনচন্দ্র পাল ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকায় এক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন। তিনি লিখলেন “আমরা যদি সরকারকে কোনরূপে সাহায্য করতে অস্বীকৃত হই তাহলে একদিনেই শাসনতন্ত্র অচল হয়ে পড়বে”।

বিপিন চন্দ্র পাল বিভিন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি-সংগঠনের সাথেও জড়িত ছিলেন। তিনি তাঁর পত্রিকার লেখার জন্য তরুণ সাহিত্যসেবীদের অনুপ্রেরণা যোগাতেন। তিনি সাহিত্য বিষয়ে মত বিনিময়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে যেমন এসেছিলেন, তেমনি পত্রিকা সম্পাদনা সূত্রে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠাতা গড়ে তোলেন। আবার দর্শন চিন্তার জন্য ব্রজেন্দ্রনাথ শীলের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠে।

বিখ্যাত জননেতা শ্রীনিবাস শাস্ত্রী বলিয়াছিলেন ‘বন্দেমাতরম’ পত্রিকার সম্পাদকরূপে তাহাকে শ্রী অরবিন্দের বিরুদ্ধে আনিত মোকদ্দমায় সাক্ষ্য দিতে বলা হয়। তিনি সাক্ষ্য দিলে ও সত্য কথা বলিলে অরবিন্দের জেল নিশ্চিত, তাই বিপিন চন্দ্র পাল সাক্ষ্য দিতে অস্বীকার করেন। এবার কোর্ট অবমাননার দায়ে বিপিন চন্দ্র পালকে ৬ (ছয়) মাস সাধারণ কারাদণ্ড দেওয়া হয়। অরবিন্দকে রক্ষা করতে গিয়ে তিনি নিজে কারাদণ্ড বরণ করেন। জেল হতে ছাড়া পেয়ে বিপিনচন্দ্র ১৯০৮ সালে ইংল্যাণ্ডে যান এবং সেখানে ‘স্বরাজ’ নামে একটি জার্নাল প্রকাশ করেন। এ সময়ে ইনি ভারতীয় রাজনীতি, ধর্ম ও দর্শন সম্বন্ধে বহু বক্তৃতা প্রধান করেন। কিন্তু ১৯১১ সালে বোম্বাই পদার্পণ করামাত্র তাকে রাজদ্রোহের অপরাধে আবার জেলে নিক্ষেপ করা হয়’।

১৯১২ সালে বিপিন চন্দ্র পাল জেল থেকে মুক্তি পান। জেল খেটে তিনি যখন বের হয়ে এলেন তখন বিপিনচন্দ্র পালকে সর্বস্তরের জনগণের পক্ষ থেকে কলকাতায় এক অভ্যর্থনা প্রদান করা হয়। অভ্যর্থনা সঙ্গীত রচনা করলেন দ্বিজেন্দ্রলাল। ‘বঙ্গ আমার জননী আমার ধাত্রী আমার দেশ’- বাংলার লক্ষ লক্ষ নর-নারী কণ্ঠে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হোতে লাগলো আবার ‘আমরা মা তোর ঘুচাব কালিমা-মানুষ আমরা নহিতো মেষ’।

১৮৮০ সালে তিনি প্রকাশ করেন সিলেটের প্রথম বাংলা সংবাদপত্র পরিদর্শন। এছাড়া তিনি বেঙ্গল পাবলিক অপিনিয়ন (১৮৮৩), নিউ ইন্ডিয়া (১৯০১), বন্দেমাতরম (১৯০৬), স্বরাজ (১৯০৮), হিন্দু রিভিউ (১৯১২), আলোচনা (১৯১৩), ট্রিবিউন, সোনার বাংলা (১৩৩১ বাংল), ইনডিপেনডেন্ট, ডেমোক্রেট, ফ্রিডম ফেলোশিপ, ট্রিবুনি, জনশক্তিসহ (১৯১৯) অনেক পত্রিকায় সাংবাদিক ও সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

যৌবনের প্রথমদিকে কথাসাহিত্যের ভেতর দিয়ে তার সাহিত্য জীবনে সূচনা হয়েছিল। তার সৃষ্টির মধ্যে প্রবন্ধের সংখ্যা বেশি। তাছাড়া তিনি উপন্যাস, জীবনী, আত্মজীবনী, ইতিহাস রচনা করেছেন। তার ‘সত্তর বছর’ বইটি সেকালের সামাজিক-রাজনৈতিক ইতিহাসের দলিল হিসেবে স্বীকৃত।

বিপিন চন্দ্র পালের প্রথম উপন্যাস 'শোভনা' প্রকাশিত হয় ১৮৮৪ সালে। ঠিক এসময় বঙ্কিমচন্দ্রের বঙ্গদর্শনের দ্বিতীয় সংস্করণ বেরোয়। 'শোভনা' উপন্যাসে তিনি ছদ্মনাম হরিদাস ভারতী ব্যবহার করেন। 'শোভনা' নারীসমাজের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টির উদ্দেশ্য লিখিত একটি উপন্যাস।

পূর্ববাংলার নাগরিকদের মধ্যে মীর মশাররফ হোসেন প্রথম উপন্যাস লিখেছেন 'রত্নবতী'। সেই হিসেবে রত্নবতী (১৮৬৯) আমাদের প্রথম উপন্যাস। বিপিন চন্দ্র পালের 'শোভনা' (১৮৮৪ বাংলা) উপন্যাসের দ্বিতীয় উপন্যাস।

বিপিন চন্দ্র পালের বাংলায় ১৫ টি এবং ইংরেজিতে ১৭টির বেশী বই লিখেছেন। বাংলা গ্রন্হের মধ্যে শোভনা (১৮৮৪), ভারত সীমান্তে রুশ (১৮৮৫), মহারানী ভিক্টোরিয়া (১৮৮৯), জেলের খাতা (১৯০৮), চরিত কথা (১৯১৬), সত্য ও মিথ্যা (১৯১৭), প্রবর্তক বিজয় কৃষ্ণ (১৯৩৩), সুবোধিনী, সত্তর বছর (১৯৫৪), নবযুগের বাংলা (১৯৫৫), মার্কিনে চার মাস (১৯৫৫), রাষ্ট্রনীতি (১৯৫৬), চরিত্রচিত্র (১৯৫৪), শতবর্ষের বাংলা, সাহিত্য সাধনা, কৃষ্ণতত্ত্ব প্রকাশিত হয়। 
ইংরেজি গ্রন্হের মধ্যে The New Spirit, The Soul of India, The Battle of Swaraj, Memories of My Life and Times, Beginning of Freedom, Movement in India ইত্যাদিসহ ১৮/১৯ টি বই প্রকাশিত হয়। বাংলা ও ইংরেজী ভাষায় লিখিত তাঁর ২৫ টিরও বেশী বই বিশ্বের প্রধান প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়।

অসহযোগ আন্দোলনের প্রাগমুহুর্তে গান্ধীজী্র দেশময় অ-সহযোগ আন্দোলন চালাবার প্রস্তাব জাতীয় মহা সমিতিতে পাশ হয়েছে- বাংলায় তখনও এই প্রস্তাবে মত দেয় নি। সমগ্র ভারত বাংলার নেতা দেশ-বন্ধুর মহিগতির উপর নিবদ্ধ দৃষ্টি। এমন সময় বরিশাল প্রাদেশিক সম্মিলনীতে দেশবন্ধু অসহযোগের স্বপক্ষে মত ব্যক্ত করেন। সেই সম্মিলনীর সভাপতিত্ব করার সময় বিপিনচন্দ্র এর বিরোধিতা করলেন। তিনি প্রস্তাব করেছিলেন বিলাতে এক দল লোক পাঠিয়ে এক চরমপত্র ব্রিটিশ পালিয়ামেন্টের নিকট উপস্থিত করা হোক।

১৯২১ সালে অসহযোগ আন্দোলনের কর্মসূচীতে মহাত্মা গান্ধীর সাথে মতের মিল না হলে তিনি গান্ধীর মতাদর্শের বিরোধীতা করে বলেছিলেন, “You wanted magic, I tried to give you logic. But logic is in bad odour when the popular mind is excited. I have never spoken a half-true when I know the true … … … I have never tried to lead people in faith blindfolded.”
গান্ধীজীর নেতৃত্বে সংগ্রামের কৌশল নিয়ে হতাশ হয়ে কংগ্রেসের নেতা দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, মতিলাল নেহরু, বিপিনচন্দ্র পাল প্রমুখ নেতৃবর্গ এক নতুন কর্মসূচি নিয়ে স্বরাজ্যদল বা স্বরাজ পার্টি নামে এক নতুন রাজনৈতিক দল গঠন করেন।

স্বরাজ দলের প্রধান কর্মসূচি ছিলো।
১.আইন সভায় প্রবেশ করিয়া সরকারের কার্যের বিরোধিতা করা।
২.সরকারি রাজেট প্রত্যাখ্যান করা।
৩.নানাবিধ ও প্রস্তাব উত্থাপন করিয়া জাতীয়তাবাদের অগ্রগতিতে সহায়তা করা।
৪.সুনির্দিষ্ট অর্থণৈতিক গ্রহণ করিয়া বিদেশী শোষণ বন্ধ করা।

বৃটিশ সরকার ভারতের শাসন সংস্কারের জন্য ১৯২৭ সালে সাইমন কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনে কোন ভারতয়িকে গ্রহণ না করায় সাইমন কমিশন ‘বর্জ্জন’ করার দাবিতে দেশ উত্তাল হয়ে উঠে। বিপিন চন্দ্র পাল সাইমন কমিশন বর্জ্জনের জন্য জ্বালাময়ী ভাষায় বিভিন্ন জনসভায় বক্তব্য রাখেন। শ্রীহট্টের সুনামগঞ্জে সাইমন কমিশন বয়কটের দাবীতে অনুষ্ঠিত জনসভায় তিনি সাইমন কমিশন বয়কট অন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে আহ্বান জানান।

১৯২৮ সালে ‘সুরমা উপত্যকা রাজনৈতিক সম্মেলন’ এবং ‘সুরমা উপত্যকা যুব সম্মেলন’ একসঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনের সভাপতি ছিলেন ডা. সুন্দরীমোহন দাস। সম্মেলনের অতিথি ছিলেন নিপিন পাল ও গদর পার্টির নেতা বাবা গুরুদিং সিং। বিপিন চন্দ্র পালের ভাষণে ত্রিশ দশকে শ্রীহট্টবাসীর স্বাধীনতা আন্দোলনের ঐতিহাসিক ভূমিকা রাখে। বিপ্লবী ছাত্র-যুবক-শ্রমিক-কৃষকের আন্দোলনে শ্রীহট্টে আইন অমান্য আন্দোলন তুঙ্গে উঠেছিল। বিপিন চন্দ্র পাল সুরমা উপত্যকার প্রতিটি রাজনৈতিক সংগ্রামে নিজেকে ছায়ার মত জড়িত রেখেছিলেন। চা শ্রমিক ও শিল্প-শ্রমিকদের বিভিন্ন আন্দোলনে ভারতবর্ষের জাতীয় নেতাদের মধ্য যারা সোচ্চার হয়ে উঠেন তাঁদের মধ্য বিপিনচন্দ্র পাল অন্যতম।

১৯২৯ সালে সুরমা ও বরাক উপত্যকা ভয়াবহ বন্যায় আক্রান্ত হলে শ্রীহট্ট সম্মেলনীর পক্ষ থেকে তিনি ও ডা. সুন্দরীমোহন দাস বন্যা পীড়িত জনগণের সেবার জন্য শ্রীহট্ট কাছাড়ে আসেন। শ্রীহট্ট সম্মিলনীর ষোড়শ বার্ষিক কার্যবিবরণ (১২৯৮-৯৯) থেকে জানা যায় ১৩০৮-১৩০৯ বাংলা সাল পর্যন্ত শ্রীহট্ট সম্মিলনীর সম্মেলনে বিপিন চন্দ্র পাল সভাপতি নির্বাচিত হন।

জন্ম ও কর্ম
বিপিন চন্দ্র পাল জন্মেছিলেন হবিগঞ্জ জেলার সদর থানার পইল গ্রামে। তার পিতা রামচন্দ্র পাল। তিনি ছিলেন পাইল গ্রামের এক মাঝারি জমিদার। জমিদার হওয়া সত্বেও তিনি ছিলেন সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব। কর্মজীবনে রামচন্দ্র পাল ঢাকার সাব-জজ কোর্টের পেশকারের চাকুরি করেন।
রামচন্দ্র পাল কোর্টে কয়েক বছর চাকুরি করে নিজ জেলা সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ চলে আসেন। তারপর সিলেট বারে আইনজীবী হিসেবে যুক্ত হন। একসময় তিনি সিলেটের একজন খ্যাতনামা উকিল হিসেবে সম্মান ও সুনাম অর্জন করতে সক্ষম হন। তিনি ছিলেন শিক্ষানুরাগী। তাঁর বাসায় মফঃস্বলের বহু ছাত্র দীর্ঘদিন থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে। বিপিন চন্দ্র পালের মাও ছিলেন উদার ও মানবিক গুণের অধিকারী। তাঁর বাসায় থেকে যেসব ছাত্ররা পড়াশোনা করতো তিনি তাদেরকে স্নেহ করতেন, ভালবাসতেন। পারিবারিকভাবেই বিপিন চন্দ্র পালের মধ্যে সাম্য ও মানবতা বোধের দৃষ্টিভঙ্গী গড়ে উঠে।

১৮৬৬ বিপিন চন্দ্র পালকে তার বাবা নয়া সড়ক স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। তারপর ১৮৬৯ সালে তাকে সিলেট গভর্নমেন্ট স্কুলে ভর্তি করানো হয়। এই স্কুল থেকে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষায় রেকর্ড নম্বর পেয়ে পাশ করেন। ১৮৭৪ সালের ডিসেম্বর মাসে উচ্চশিক্ষার জন্য কলকাতায় যান। ১৮৭৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। এই কলেজ থেকে এফ.এ কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা দেয়ার কিছুদিন আগে তিনি জল বসন্তে আক্রান্ত হওয়ার কারণে ফাইনাল পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। এরপর তিনি ক্যাথিড্রাল মিশন কলেজে ভর্তি হন। এখান থেকে ১৮৭৭ সালে পুনরায় এফ.এ পরীক্ষা দেন।
১৮৮১ সালে ডিসেম্বর মাসে তিনি শ্রীমতী নৃত্যকালীকে বিয়ে করেন। নৃত্যকালী ছিলেন পণ্ডিত শিবনাথ শাস্ত্রীর এক পালিতা বিধবা কন্যা। তাদের সংসারে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জন্ম হয়।

সংসার জীবনের পূর্বেই বিপিনচন্দ্র পাল রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৭৭ সালে তিনি সেকালের উদারপন্থি সমাজ সংস্কারক দার্শনিক শিবনাথ শাস্ত্রী দ্বারা প্রভাবিত হন। আচার্য শিবনাথ শাস্ত্রীর আদর্শে ও প্রেরণায় স্বাধীনতার সাধকদলের সদস্য হিসেবে বিপিনচন্দ্র পাল দীক্ষা গ্রহণ করেন। এসময় থেকে তিনি স্বদেশ-স্বজাতির মুক্তির লক্ষ্যে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তোলার ব্রতে নিজেকে সম্পূর্ণ নিবেদন করেন। “প্রথমদিনে শরতচন্দ্র রায়, আনন্দচন্দ্র মিত্র, কালীশঙ্কর-সুকুল, তারাকিশোর চৌধুরী, সুন্দরীমোহন দাস আর আমি, আমরা ছয়জনে এই দীক্ষা গ্রহণ করি।” 
ততকালীন ভারতীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ জনগণের মধ্যে জাতীয়তাবোধ ও রাজনৈতিক চেতনা জাগ্রত করার উদ্দেশ্য সিলেটে ন্যাশনাল ইন্সটিউট স্থাপন করেন। ‘শ্রীহট্ট শহরের এই প্রতিষ্ঠানটি ১৮৭৯ সালে পরিচালনার অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। এই সংবাদে কলিকাতাস্থ শ্রীহট্ট সম্মেলনীর সদস্যগণ অত্যন্ত উদ্বিগ্ন হয়ে বিপিন চন্দ্র পাল ও রাজেন্দ্র চৌধুরীকে শ্রীহট্টে প্রেরণ করেন। বিপিন চন্দ্র পাল ১৮৮০ সালের ৫ জানুয়ারি এই স্কুলকে ‘শ্রীহট্ট জাতীয় বিদ্যালয়’ হিসেবে রূপান্তর করেন। ইহাই ভারতের প্রথম জাতীয় প্রতিষ্ঠান। তখনও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের জন্ম হয়নি। বিপিন চন্দ্র পাল এই জাতীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, ব্রজেন্দ্রনাথ দ্বিতীয় শিক্ষক এবং রাজেন্দ্র চৌধুরী তৃতীয় শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেন। এই জাতীয় বিদ্যালয়ে ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত শিক্ষা নীতিমালাকে অগ্রাহ্য করে নিজস্ব ধারায় চলে।

বিপিন চন্দ্র পাল জীবনের প্রথম ১৮৭৯ উড়িষ্যার কটক একাডেমীতে প্রথমে সাধারণ শিক্ষক পরে প্রধান শিক্ষক শিক্ষকতা করেন। তবে খুব বেশিদিন তিনি কটক থাকেন নি। বিপিনচন্দ্র পাল ১৮৮০ সালের জুলাই মাসের শেষে কলকাতায় ফিরে যান। ১৮৮১ সালের আগস্ট মাসে রায়বাহাদুর নারায়ণ স্বামী মুদালিয়ারের প্রতিষ্ঠিত উচ্চ ইংরাজি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হন।

এরপর তিনি বাঙ্গালোরে কিছুদিন একটি হাইস্কুলে প্রধান শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা করেন। বিপিন চন্দ্র পাল ১৮৮০ দশকের কোনো এক সময় নিজ জেলা সিলেটের হবিগঞ্জের বর্তমান সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়েও কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন। 
বিপিন চন্দ্র পাল বেশিদিন কোথাও স্থির হওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। আত্মমর্যাদা বোধ, স্বাধীন চিন্তা যখন দেখেছেন একটু ব্যঘাত ঘটতে তখনই সে কাজ ছেড়ে দিয়েছেন। প্রথম জীবনে নিজ জেলা সিলেটে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে কিছুদিন এই বিদ্যালয়টি পরিচালনা করেন।

বিপিন চন্দ্র পাল স্বাধীন-সুন্দর-মুক্ত সমাজে স্বপ্ন দেখেছিলেন। এ কারণে ধৈর্য সাহস ও দৃঢ়তা নিয়ে তার সুদীর্ঘ জীবনের রাজনৈতিক সংগ্রামে অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমে অনুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, তা স্মরণাতীতকালের ইতিহাসে দুর্লভ।
ভারতবর্ষের স্বাধীনতার প্রশ্নে মোতিলাল নেহেরু, দেশবন্ধু চিন্তরঞ্জন দাস, গান্ধীর সাথে ভিন্নমত পোষণ করে বিপিনচন্দ্র পাল শেষ জীবনে রাজনীতি থেকে দূরে সরে চলে আসেন। জীবনের শেষাংশে সাহিত্য সৃষ্টিতে তিনি আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৩২ সালের ২০ মে মারা যান।

নারী মুক্তির অগ্রদূত বিপিন চন্দ্র পাল
বিপিন চন্দ্র পাল রচিত 'শোভনা' উপন্যাস-এর আখ্যাপত্রে লেখা আছে:
জীবন সংগ্রামে ভারতের নামে
যত রক্তবিন্দু গড়িবে এবার,
শতপুত্র হবে বীর অবতার;
ভারত আধার ভারতের ভাব
ঘুচাই তারা
না জাগিলে সব ভারত ললনা।
এ ভারত আর জাগে জাগে না।

সত্যিকার অর্থে বিপিন চন্দ্র পাল ছিলেন নারীমুক্তির স্বপ্নদ্রষ্টা। ছাত্রাবস্থায় তিনি ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করে তরুণ বয়স থেকেই বিধবা বিবাহের পক্ষে ছিলেন। তার বলিষ্ঠ অঙ্গীকার ছিলো বিধবা-বিবাহ প্রচলন করা। বাল্য বিবাহ ও বহু বিবাহরোধ এবং নারীশিক্ষার প্রচলনে ভারতীয় সমাজে ব্যাপক জাগরণ সৃষ্টি করা। এ ধরনের নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে বিপিন চন্দ্র পাল আমৃত্যু লড়েছেন। রাজা রামমোহন প্রবর্তিত বিধবা বিবাহ তিনি মনে প্রাণে সমর্থন করতেন। ব্রাহ্মসমাজে যোগদান করেছেন যে সমস্ত বক্তব্যের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয় তাঁর মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিলো নারী জাগরণের প্রসঙ্গটি। এ জন্য ব্রাহ্মসমাজে দ্বারা পরিচালিত হয়ে নিজে একজন বিধবাকে-বিবাহ করেন। ফলে সমাজচ্যুত হয়ে নিজ বাড়ি থেকে বিতাড়িত হন। নারীর অধিকার বাস্তবায়নে ব্যক্তিজীবনে একাধিক উদাহরণ রেখে গেছেন। বিপিন চন্দ্র পাল তার এক বিধবা মেয়েকে বিয়ে দিয়েছিলেন অগ্নিযুগের বিপ্লবী উল্লাস কর দত্তের কাছে। বিপিনচন্দ্র পালের উদ্যোগে ও প্রচেষ্টা শুধুমাত্র বিধবা বিবাহ প্রবর্তনের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। বহু বিবাহ প্রভৃতি কুসংস্কারের বিরুদ্ধে লেখা-লেখি, সভা-সমিতিতে বক্তব্যের মাধ্যমে জনমত গঠন করেন। নারীশিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে তাঁহার যথেষ্ট অবদান ছিল।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71