বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সাহিত্যিক লীলা রায় মজুমদারের ১০তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৬:১২ pm ০৫-০৪-২০১৭ হালনাগাদ: ০৬:১২ pm ০৫-০৪-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

সাহিত্যিক, কবি এবং সম্পাদক লীলা রায় মজুমদার (জন্মঃ- ২৬ ফেব্রুয়ারি, ১৯০৮ - মৃত্যুঃ- ৫ এপ্রিল, ২০০৭ )

তাঁর প্রথম গল্প লক্ষ্মীছাড়া ১৯২২ সালে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে সত্যজিৎ রায় সন্দেশ পত্রিকা পুনর্জীবিত করলে তিনি ১৯৬৩ থেকে ১৯৯৪ অবধি সাম্মানিক সহ-সম্পাদক হিসাবে পত্রিকাটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, ১৯৯৪-এ তাঁর স্বাস্থের অবনতির জন্য অবসর নেন। ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গেও তার পরিচয়টা ছিল গভীর। তার গদ্যে জ্যাঠামশাই উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর প্রভাব রয়েছে। শুধু তাই নয়, সুকুমার রায় শিশু সাহিত্যের পট পরিবর্তনের যে পথ দেখিয়েছেন, লীলা মজুমদার তাকে নিয়ে গেছেন ভিন্নমাত্রায়। লীলা মজুমদারের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক।

পদী পিসির বর্মী বাক্স, পাকদণ্ডী, টং লিং, নতুন ছেলে নটবর, সব ভুতুড়ে, আর কোনখানে, খেরোর খাতা, বদ্যিনাথের বাড়ি, দিনদুপুরে, বাতাসবাড়ি, কিশোরসাথী, হলদে পাখির পালক তার উল্লেখ যোগ্য রচনাবলী। লীলা মজুমদারের পাকদণ্ডী নামে লেখা আত্মজীবনীতে তাঁর শিলঙে ছেলেবেলা, শান্তিনিকেতন ও অল ইন্ডিয়া রেডিওর সঙ্গে তাঁর কাজকর্ম, রায়চৌধুরী পরিবারের নানা মজার ঘটনাবলী ও বাংলা সাহিত্যের মালঞ্চে তাঁর দীর্ঘ পরিভ্রমণের কথা বর্ণিত হয়েছে। এ ছাড়াও তিনি অনেক শিক্ষামূলক রচনা ও রম্যরচনা ইংরাজী থেকে বাংলায় অনুবাদও করেন। তিনি অনেক শিক্ষামূলক রচনা ও রম্যরচনা ইংরাজী থেকে বাংলায় অনুবাদও করেন।

সাহিত্যে বিশেষ অবদানের জন্য লীলা মজুমদার বহু পুরুস্কারে সম্মানিত হয়েছেন, যার মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্র পুরুস্কার, আনন্দ পুরুস্কার, লীলা পুরুস্কার, ভারতীয় শিশুসাহিত্যের রাষ্টীয় পুরুস্কার প্রভৃতি।
জন্ম, পরিবার ও শিক্ষা
তিনি কলকাতার রায় পরিবারের প্রমদারঞ্জন রায় ও সুরমাদেবীর সন্তান। তাঁর জন্ম রায় পরিবারের গড়পাড় রোডের বাড়িতে। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী ছিলেন প্রমদারঞ্জনের ভাই এবং লীলার কাকা। সেইসূত্রে লীলা হলেন সুকুমার রায়ের খুড়তুতো বোন এবং সত্যজিৎ রায়ের পিসি।

রায় পরিবারের সদস্য হয়েও লীলা মজুমদার ছিলেন অনেক স্বতন্ত্র। লীলার বাল্যজীবন কাটে শিলঙে যেখানকার লরেটো কনভেন্টে তিনি পড়াশোনা করেন। শৈশবে ডানপিটে ছিলেন লীলা মজুমদার। গাছে চড়া, পাহাড় বাওয়া, অবাধ্যতা, মারামারি, ঝগড়া আর জেদের কোনো কমতি ছিল না তার। জীবনের সব দস্যিপনাগুলো তার সাহিত্যকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। তবে লেখাপড়ায় অত্যান্ত মেধাবী লীলা মজুমদার বি-এ এবং এম-এ দুই পরীক্ষাতেই ইংরেজিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজী পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে ইংরেজিতে স্বর্ণপদক লাভ করেন।

স্বর্ণপদক নিয়ে এমএ পাস করা কালজয়ী এ শিশু-কিশোর সাহিত্যিকের কর্মজীবনও ছিল কালজয়ী বটে। বিশ্বভারতী, আশুতোষ কলেজে শিক্ষকতা, আকাশবাণীর প্রযোজকের চাকরি, শান্তিনিকেতনের ইংরেজি শিক্ষিকা, আর নিজের লেখালেখি তো আছেই।

কিছু ঘটনা “ পাকদণ্ডী” অনুযায়ী
তখনকার নাম করা ডাক্তার সুধীন কুমার মজুমদার, পারিবারিক মেলামেশায় গোড়া থেকেই তাঁকে মনে ধরেছিল যুবতী লীলার। পছন্দ অবশ্য উভয় দিকেই ছিল। কিন্তু পাত্র হিন্দু। বেঁকে বসলেন গোঁড়া ব্রাক্ষ্ম প্রমদারঞ্জন। সম্ভবত তিনি বোঝেননি, তাঁর মেধাবী, গৃহকর্মনিপুণা, সুলেখনীর অধিকারী কন্যাসন্তানটি তাঁরই মতো জেদি। হয়তো-বা তাঁর চেয়েও কিছু বেশি।
বিয়ে হল সই করে, সেদিনকার লীলা রায় হয়ে উঠলেন সকলের লীলা মজুমদার আর সেইসঙ্গে বন্ধ হল বাবার মনে যাতায়াত করার রাস্তা।
লীলা লিখছেন, ‘বাবা আমাকে ত্যাগ করলেন। পরদিন সকালে সব কথা ভুলে দুজনে গেলাম বাবাকে প্রণাম করতে। তিনি আমাদের দেখেই ঘর থেকে উঠে চলে গেলেন। শুধু ঘর থেকেই নয়, আমার জীবন থেকেই সরে পড়লেন। তারপর আঠারো বছর বেঁচে ছিলেন, কখনো আমার বা আমার ছেলে-মেয়ের দিকে ফিরে চাননি।... আঠারো বছর পরে যখন তিনি চোখ বুজলেন, আমি এতটুকু ব্যক্তিগত অভাব বোধ করিনি। যে অভাব, যে বেদনা ছিল, ঐ সময়ের মধ্যে তার মৃত্যু হয়েছে টের পেলাম।’
এই ছিলেন আদত মানুষ লীলা। নীতিবোধ আর আত্মমর্যাদার প্রশ্নে যিনি কখনও কোন আপস করেননি। কোনও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও নয়, এমনকী, যেমন দেখা গেল, নিজের বাবার সঙ্গেও নয়।

শিলং-এর আরও একটি বিকেলবেলা তাঁর মনে দাগ কেটেছিল। আর সেই বিকেলে যে সম্পর্কের সূত্রপাত, তার চিহ্ন তিনি বহন করেছিলেন আমৃত্যু।
সেই মানুষটি সম্বন্ধে লীলা এক কথায় লিখেছেন, ‘আমার মনে হয় এমন সুন্দর মানুষ পৃথিবীতে কম জন্মেছে।’ তিনি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কবি সপরিবার শিলং বেড়াতে গিয়েছিলেন যখন, বাবার হাত ধরে ছোট্ট লীলাও গিয়েছিল কবিকে দেখবে বলে।
সেই তাঁর রবীন্দ্র-সংসর্গের শুরু। পরবর্তীতে খোদ কবিই তাঁকে ডেকে নিয়েছিলেন শান্তিনিকেতনে, সে কাহিনি সকলেরই জানা।
শান্তিনিকেতনের কাজে মেতে থাকা, পরে মন-না-লাগায় সে-কাজ ছেড়ে চলে আসা, ফের শান্তিনিকেতনেই পাকাপাকি থাকার জন্য বসতবাটি তৈরি করা... মোট কথা, রবীন্দ্রনাথ আর শান্তিনিকেতনের তৎকালীন নির্ঝ়ঞ্ঝাট প্রাকৃতিক আশ্রয়ের ছায়া তাঁকে বার বার টেনেছিল।
রবীন্দ্রনাথের বিশালতার সঙ্গে সারল্যের যে-অভাবনীয় মিশ্রণ, তা লীলার ভাল লাগত প্রথম দিন থেকেই। আর টেনেছিল নীতির পথে অবিচল থাকবার পণ। লীলার ভিত তৈরিতে সেও কিছু কম কাজে লাগেনি।

লীলার শৈশবে মা’র চিকিৎসা করাতে বাবা সকলকে নিয়ে এসে উঠেছিলেন গড়পাড়ের বিখ্যাত বাড়িটিতে। একতলায় প্রেস, দিনরাত লোকজনের যাওয়া আসা। গম্ভীর অথচ সুরসিক মেজ জ্যাঠামশায়ের কাগজ নিয়ে মেতে ওঠা, যে-কাগজের নাম ‘সন্দেশ’।
লীলা মজুমদারের কথায়, ‘নিচে প্রেস চলত, তার একটানা ঝমঝম শব্দ কানে আসত, মনে হত বাড়িটা বুঝি দুলছে, যে কোন সময় পাখির মতো ডানা মেলে উড়ে যাবে। সে বাড়ির রোমাঞ্চের কথা মুখে বলার সাধ্যি নেই আমার’।
শেষমেশ লেখা হল সন্দেশ-এ। বড়দা সুকুমারের নির্দেশে একখানা ছোট গল্প লিখে দিলেন, ছাপাও হল। নিজে নাম দিয়েছিলেন ‘লক্ষ্মীছাড়া’, বড়দা বদলে রাখলেন ‘লক্ষ্মী ছেলে’। ব্যস, শিশুদের জন্য ছাপার হরফে নতুন এক ভালবাসার মানুষের আবির্ভাব হল, যার নাম তখন ছিল লীলা রায়।
সন্দেশে লেখা বেরনোর পরপরই এ-কাগজ সে-পত্রিকা থেকে ছোটদের জন্য গল্প লিখে দেওয়ার আর্জি আসতে লাগল লীলার কাছে, তিনিও হাসিমুখে লেখার কাজে লেগে পড়লেন রীতিমতো। তৈরি হতে লাগল একের পর এক অবাক-করা সমস্ত চরিত্র, যাদের নানান কীর্তিকলাপ চিরকালীন হয়ে থাকার দাবি নিয়েই এল।

লীলা মজুমদার লিখছেন, ‘সেদিন আমার পনের বছর বয়স, স্কুলে পড়ি। শুধু এটুকু বুঝতে পারছিলাম বড়দা যে পথ দেখিয়ে দিয়েছেন, সেই আমার পথ। আমাকে দিয়ে অন্য কোনো কাজ হবে না।’ নিজের হাতের মশলাটা এভাবেই যোগ্য হাতে ধরিয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন সুকুমার রায়।

লীলাদির কথা ভাবলে মনটা আজও ভাল হয়ে যায়। অবসাদ থেকে বেরিয়ে আসার সেরা উপায় হল লীলাদির গল্প পড়া।... নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

লীলা মজুমদার নামটা শুনলেই মন আনন্দে ভরে ওঠে। সাহিত্য থেকে জীবনে একজন মানুষ আনন্দকে এতখানি মূল্য দিয়েছেন, এর উদাহরণ কমই আছে। ছোটদের মনটা উনি খুব ভাল বুঝতেন।... বাণী বসু

তোরা ঝগড়াঝাঁটি কর
আহার নিদ্রা মাটি কর।
ওরে নারদ নারদ বল। 
সুখশান্তি লণ্ডভণ্ড
বন্দোবস্ত হচ্ছে পণ্ড
ওরে নারদ নারদ বল।
আমরা খেটে মরি ঘুরে,
তোমরা খাসা পেটটি পুরে,
ঘুম লাগাও হে দিন-দুপুরে।
ওরে নারদ নারদ বল।
বের কচ্ছি মজা মারা,
দিবানিদ্রা কচ্ছি সারা,
কুঁড়ের বাদশার দল
ওরে নারদ নারদ বল।

 

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71