সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৩রা পৌষ ১৪২৫
 
 
সুধীন দাশের মৃত্যু নেই
প্রকাশ: ০২:৪৪ pm ২৯-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০২:৫৮ pm ২৯-০৬-২০১৭
 
 
 


সৈয়দ আবুল মকসুদ: সুধীন দাশ চলে গেলেন। তিনি একজন ব্যক্তি। মৃত্যুর স্পর্শ তাঁকে পেতেই হবে। কিন্তু যে সুধীন দাশ শিল্পী, তাঁর মৃত্যু নেই।

শিল্পী সুধীন দাশের মূল্যায়ন করার কিছুমাত্র যোগ্যতা আমার নেই। মনের দিক থেকে তিনি আমার কাছের মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর চলে যাওয়াতে শূন্যতা অনুভব করছি। একজন ব্যক্তির মৃত্যুতে আরেকজন মানুষের শূন্যতা বোধ করায় অন্য কারও কিছুই আসে-যায় না। কিন্তু শিল্পী সুধীন দাশের মৃত্যুতে বাঙালির সংগীতজগতে যে শূন্যতার সৃষ্টি হলো, তা আর কোনো দিন পূরণ হবে না। তাঁর মৃত্যুতে একটি প্রজন্মের অবসান হলো, যে প্রজন্মের কাছে জাতির ঋণ অপরিমেয় ও অপরিশোধ্য।

ষাটের দশকে পরিচয়, স্বাধীনতার পর তা ঘনিষ্ঠ হয়। ঢাকার ধানমন্ডিতে আমার বাড়ির সঙ্গেই নজরুল ইনস্টিটিউট হওয়ায় মাঝেমধ্যেই তাঁর সঙ্গে দেখা হতো। তাঁর গানের ক্লাসের এক কোনায় বসে তাঁর শিক্ষাদান দেখেছি। একান্তে বসে গল্প করেও কেটেছে অনেক সময়। অনেক বিকেল, অনেক সন্ধ্যা। তাঁর মধ্যে কৃত্রিমতা বা ভেজালের লেশমাত্র দেখিনি। তিনি ছিলেন একজন খাঁটি মানুষ। তিনি তাঁর জন্মভূমি কুমিল্লার যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেছেন শৈশবে, মৃত্যুর আগেও ঠিক একই উচ্চারণে কথা বলেছেন। শহরের ভদ্রলোকদের বিশুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলার প্রয়োজন বোধ করেননি। তাতেই লক্ষ করেছি তাঁর ব্যক্তিত্বের প্রকাশ।

ঈদের এক দিন পরে নগরী যখন কিছুটা যানজটমুক্ত থাকবে, তখন সুধীনদার সঙ্গে দেখা করতে যাব ভেবে রেখেছি। এমন সময় জানলাম, তিনি নীরবে তাঁর বৈশিষ্ট্যমতো সাংস্কৃতিক জগতে হইচই না বাধিয়ে চলে গেছেন। চলে যাওয়াতে তাঁর নিজের কোনো আফসোস ছিল না। বছর দুই আগে যখন তাঁর মিরপুরের বাসায় দেখা করতে যাই, তিনি ঘরে ঢুকেই বললেন, ‘কষ্ট কইরা আইছেন। পারলে এই মুহূর্তে চইলা যাই। দোয়া করেন যত তাড়াতাড়ি যাইতে পারি। আত্মঘাতী হইতে ইচ্ছা করে। কিন্তু উপরঅলা একজন আছেন। তাঁর কাছে জবাব দেওয়া লাগতে পারে, তার জন্যেই আত্মঘাতী হই না!’

অসুস্থতার কারণে বলেছিলেন এসব কথা। তিনি পাইলসের সমস্যায় শয্যাগত ছিলেন অনেক দিন, অনেক কষ্ট পেয়েছেন।

কুমিল্লার এক সংগীতশিল্পী পরিবারে তাঁর জন্ম এবং বেড়ে ওঠাও নির্মল সাংগীতিক পরিবেশে। বলছিলেন, ‘১৯৩০ সালে দুনিয়াতে আসি। ১৯৪৮ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস কইরা ঢাকা রেডিওতে গান গাওয়া শুরু করি। ১৯৫৩ হইতে কুমিল্লাছাড়া। ১৯৫৫-তে বিবাহ করি।’ বলেই তিনি আঙুল দিয়ে সামনে বসা নীলিমা বউদিকে দেখালেন। তখন থেকেই দুজন বেতারের নিয়মিত সংগীতশিল্পী। বললেন, ‘পঞ্চাশের দশকে রেডিওতে সারা দিন গান দিতাম। সন্ধ্যার পর পাইতাম ১০ টাকা। কুমিল্লা থেকে ট্রেনে আসা-যাওয়ার ট্রাভেলিং অ্যালাউন্স ছিল ১০ টাকা।’

সংগীত ও সুধীন দাশ অবিচ্ছেদ্য। বিভিন্নভাবে নজরুলসংগীতের রক্ষণাবেক্ষণ এবং শুদ্ধ সুরে প্রচারের জন্য তিনি গত ৭০ বছরে যে ভূমিকা পালন করেছেন, তার তুলনা বিরল। নজরুলের স্নেহধন্য সংগীতজ্ঞ কমল দাশগুপ্তের সঙ্গে ছিল তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠতা।

ষাটের দশকে ঢাকার কলাবাগানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সংগীতশিক্ষার বিদ্যালয় ‘অগ্নিবীণা’। সেখান থেকে বেরিয়েছেন অনেক শিল্পী।

শুধু শারীরিক অসুখের অসুবিধা নয়, নানা রকম মানসিক যন্ত্রণায়ও পীড়িত ছিলেন সুধীন দাশ। বলছিলেন, ‘বুঝি না ভাই, দেশটা কোন জায়গায় গেছে। কোন শিল্পী কেমন গায়, ঠিক গায়, না ভুলভাল গায়, তার ঠিক নাই। সে কোন দল করে, সেইটাই তার বড় পরিচয়। আর এই কালের কথা কী কমু! এককালে ভারতে ফিরোজা বেগমের পরিচয় ছিল মুসলমান মেয়ে, কমল দাশগুপ্তের পাকিস্তানে আইসা পরিচয় হিন্দু। হিন্দু, তাই নাগরিকত্ব পায় না। তালিম হোসেনের সঙ্গে পাকিস্তান সরকারের সম্পর্ক ভালো ছিল। তিনি গেলেন রাওয়ালপিন্ডি কমলদার জন্যে তদবির করতে। কোনো কাজ হয় নাই। খালি হাতে ফিরা আসেন। হোম মিনিস্ট্রির অফিসাররা কইয়া দিল, সিটিজেনশিপ নিয়া কাম কী, তারে থাকতে কন। আমরা কোনো ডিস্টার্ব করুম না।’

পুরোনো দিনের কথায় সুধীনদার গলা ভারী হয়ে আসে। বলেন, ‘ডিসটার্ব পুলিশে করে নাই, কিন্তু কী যে কষ্ট! কষ্ট মানে কী? ফিরোজা বেগম ও তিনটা ছেলে নিয়া কী কষ্ট! পাঞ্জাবি পইরা ঘুরত। আমার মোটরসাইকেলের পিছনে বসাইয়া মগবাজারে নজরুল একাডেমীতে নিয়া যাইতাম। ওইখানে গান শিখাইয়া আবার আমার মোটরসাইকেলেই আসত। হাতিরপুলে তাঁর বাসার কাছে না নাইমা নামত গ্রিন রোডে। আমেনা বেগম এমপির ওষুধের দোকান ছিল। সেখান থেকে ইনজেকশন কিনত। আমার হাতের মধ্যে পিজিতে মারা যায়। কী মানুষের কী পরিণতি?’ বলতে থাকেন, ‘তালিম হোসেন ফিরোজা বেগমকে নজরুল একাডেমীর প্রিন্সিপাল বানাইয়া দিলেন। তাঁর বেতন ৩৫০ টাকা। তখন সেটা অনেক টাকা। কমল দাশগুপ্তকে দায়িত্ব দিল নজরুলের গানের কম্পাইলেশনের। তাঁর বেতন ১৫০ টাকা। মোট ৫০০ টাকা দুইজনের মাইনা। একটা স্বরলিপির জন্য পাইত ১৫ টাকা। কাজের পরিবেশে শান্তি ছিল না।’ পরে অবশ্য পাকিস্তান সরকার কমল দাশগুপ্তকে নাগরিকত্ব িদয়েছিল।

১৯৯০ থেকে আমৃত্যু সুধীন দাশ নজরুল ইনস্টিটিউটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সেখানকার অভিজ্ঞতাও অম্লমধুর। বললেন, ‘মোহাম্মদ মাহফুজুল্লাহ ভালো লোক ছিল। হানড্রেড পারসেন্ট খাঁটি লোক। এক পয়সা খায় নাই। কিন্তু সমাজে খাঁটি লোকের দাম নাই।’

নিজে খাঁটি ছিলেন বলে যাঁর মধ্যেই ভালোত্ব দেখেছেন, তাঁর প্রশংসা করেছেন। তিনি চাইতেন নজরুল ইনস্টিটিউট সত্যিকারের একটি মর্যাদাসম্পন্ন জাতীয় প্রতিষ্ঠান হোক। বললেন, ‘শেখ সাহেব নজরুলকে আইনা একটা বড় কাজ কইরা গেছেন। জিয়াউর রহমান তাঁরে এইখানে শোয়াইয়া কাজের কাজ কইরা গেছেন, তাঁর লাশ নিয়া ব্যবসা করার পথ বন্ধ করেছেন। একদিন এরশাদ সাহেব ধানমন্ডির চিপার মধ্যে আসলেন। তাঁরও কিছু ভালো কাজ করার ইচ্ছা ছিল। আমাদের বললেন, নজরুল ইসলামের মতো একজন মানুষের জন্য বড় কিছু করা দরকার। তাঁর নামের প্রতিষ্ঠানের জন্য আমি আগারগাঁওয়ে জমির ব্যবস্থা করব। সেখানে হবে নজরুল মিউজিয়াম। কবি এখানে উঠেছিলেন, এ বাড়িও থাকবে।’

সুধীনদা বললেন, ‘কী বলব ভাই! শেষ পর্যন্ত কিছুই হইব না। লাখ লাখ কোটি কোটি টাকা খরচের ফলাফল শূন্য। নানা রকম তামাশা চলতেছে। স্বজনপ্রীতি আমাদের জাতীয় বৈশিষ্ট্য।’

সুধীনদা বললেন, ‘নজরুলের রাগপ্রধান গানের সংগ্রহই বেশি। তিন-চার হাজার গানের মধ্যে ষোলো শর মতো রেকর্ড করা।’

নব্বইয়ের দশকেই সুধীনদা প্রস্তাব দিয়েছিলেন একটি বোর্ড গঠন করে নজরুলের গানের শুদ্ধ স্বরলিপি প্রকাশের ব্যবস্থা করতে। কিন্তু বোর্ড আর গঠিত হয়নি। তবে নজরুলের গানের ব্যাপারে লায়লা আর্জুমান্দ বানু, সোহরাব হোসেন, বেদারউদ্দিন আহমদ, শেখ লুৎফর রহমান, সুধীন দাশ প্রচুর কাজ করে গেছেন। আজ তিনিও চলে গেলেন। সেই প্রজন্ম শেষ।

সুধীন দাশের জীবনটা ছিল ব্যক্তিগত দুঃখেরও। ঘণ্টা দুই গল্পগুজব করে আসার আগে স্বগতোক্তির মতো বললেন, ‘পাইলস তো আমার জীবন শেষ করছেই। গেছিলাম চোখের ডাক্তারের কাছে। চোখে কম দেখতাম। দিছে বাম চোখ পুরাপুরি কানা কইরা। আমি বড়ই ভাগ্যবান। একটা ছেলে ছিল। আমারে রাইখা চইলা গেছে। ভালো গিটার বাজাইত। আমার জন্যে ভালো কইরা দোয়া করেন, সম্ভব হইলে উপরঅলা যেন আজই নিয়া যায়।’

বিধাতা তাঁকে আরও ১০টা বছর আমাদের মধ্য থেকে যেন না নিয়ে যান, সেই প্রার্থনাই করেছি। কাজ হয়নি।

সুধীনদা চলে গেলেন, তবে শিল্পী-সংগীতজ্ঞ সুধীন দাশ আমাদের মধ্যে চিরকাল থাকবেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক।

এইবেলাডটকম/নি এম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71