মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ১০ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সুধীন দাশ ও রাগ পুরবী
প্রকাশ: ১১:৩৭ am ০৫-০৭-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:৩৭ am ০৫-০৭-২০১৭
 
 
 


খান মোঃ শাহনেওয়াজ :  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ছাত্র কেন্দ্রের (টিএসসি) দ্বিতীয় তলায় বড় হলরুমে আয়োজন করা হয়েছে ঢাকা জেলা রবীন্দ্রসংগীত প্রতিযোগিতা।

রুমের পূর্ব দিকের দেয়ালের মাঝামাঝি জায়গায় স্থাপন করা হয়েছে মঞ্চ। এই মঞ্চের সরাসরি সামনে পশ্চিম পাশে বিচারকদের আসন। বিচারকদের একজন দেশের খ্যাতনামা রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী ও সংগীত গুণীজন ডঃ সনজিদা খাতুন।

১৯৯২ সালের আগস্ট মাসে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানস্থলে প্রতিযোগী ও তাদের স্বজনরা ছাড়াও সংগীত প্রেমী ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শ্রোতা-দর্শকদের বেশ সমাগম ঘটেছে। একটু ভিড় ভিড় অবস্থা। রাজধানী ঢাকা নগরীর বেশির ভাগ গানের স্কুল থেকে শিক্ষার্থীরা এসেছে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে। ঢাকার বিভিন্ন উপজেলা পর্যায় থেকেও প্রতিযোগীরা এসেছে। প্রতিযোগীকে নির্ধারিত কয়েকটি গানের তালিকা থেকে একটি এবং নিজের পছন্দ অনুযায়ী একটি গান গাইতে হবে।

সকাল ১০ টায় নির্ধারিত সময়ে শুরু হয়ে গেল প্রতিযোগিতা। একেকজনের অসাধারণ পরিবেশনা। গান শুরু হওয়া মাত্র পিনপতন নিরবতা। অনুষ্ঠানস্থলে দেখা গেল অনেক গুণী শিল্পীকে। এলেন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী অজিত রায়। তাকে দেখে গানের ফাকে ডঃ সনজিদা খাতুন জোরে নাম ধরে ডাকলেন, ‘অজিত, এখানে আয়।’

আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো বিস্ময়। ছাই রঙের খদ্দরের পাঞ্জাবী আর সাদা সুতির পাজামা পড়া একজন এলেন, পরিচ্ছন্ন চেহারা। গানের ফাঁকে একজন গিয়ে ডঃ সনজিদা খাতুনের কানের কাছে কিছু বললেন। ডঃ সনজিদা খাতুন ও অজিত রায় উঠে দাঁড়ালেন এবং এগিয়ে এসে তাকে নমস্কার জানিয়ে একেবারে হাত ধরে নিয়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বিচারকদের চেয়ারের কাছে বসালেন। উপস্থিত সংগীত গুণীজন সবাই দাঁড়িয়ে তাঁকে সম্মান জানালেন। আমি আমার সংগীত বিদ্যায়তন ছায়ানটের সহশিক্ষার্থী একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ইনি কে? তিনি বললেন, ইনি সংগীত গুরু সুধীন দাস।

এই প্রথম আমি সুধীন দাসকে (জন্ম ৩০ এপ্রিল ১৯৩০ - মৃত্যু ২৭ জুন, ২০১৭) সামনে থেকে দেখলাম, আমি এক কিংবদন্তীকে দেখলাম।

তার নামের সাথে আমি পরিচিত ছিলাম। রেডিওতে তার কণ্ঠে কবি কাজী নজরুল ইসলামের গান শুনেছি। আমার খুব আগ্রহ হলো তার সাথে একবার কথা বলার। অনুষ্ঠান শেষে সে সুযোগ এসে গেল। টিএসসি ভবনের বাইরে তাকে পেয়ে এগিয়ে গেলাম। একজন দারুন মানুষ, বিনয়ী এবং বৎসল। তিনি হয়ে গেলেন সুধীন দা।

এরপর তার সাথে অনেকবার দেখা হয়েছে। বাংলাদেশ বেতারের আগারগাঁও অফিসের সামনে, করিডরে। তিনি যেতেন গানের রেকর্ডিংয়ে আর আমি যেতাম অনুষ্ঠানের কথিকা রেকর্ডিংয়ে। এই করেই একবার সুযোগ হলো একেবারে তার সামনে বসে তার কণ্ঠে গান শোনার। নজরুল সংগীত শিল্পী ও খিলগাঁওয়ে আলতাফ হোসেন সংগীত একাডেমির শিক্ষক সাধন দাসের নিজের পরিচালিত গানের স্কুলে। সাধন দাস টিএন্ডটিতে চাকরি করতেন, রাজধানীর দক্ষিণ বাড্ডায় থাকতেন এবং বা্ড্ডায় নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় একটা গানের স্কুল চালাতেন। সাধন দাসের গানের স্কুলটি ভাড়া বাসা থেকে এক পর্ায়ে বাড্ডা আলাতুননেসা স্কুল ভবনে স্থান পায়। সাধন দাসের মোটর সাইকেলের পেছনে বসে সুধীন দা গিয়েছিলেন বাড্ডা আলাতুননেসা স্কুলে।

সেদিন সন্ধ্যার পর সুধীন দা হারমোনিয়াম বাজিয়ে কণ্ঠে ধরেছিলেন পুরবী রাগে খেয়াল। পোক্ত কণ্ঠ, পরিচ্ছন্ন গায়কী। বসে যাওয়া সন্ধ্যায় তার কণ্ঠে রাগ পূরবী পুরো পরিবেশকে আবিষ্ট করে ফেললো। ত্রিতাল মধ্যলয়ে তিনি গাইছিলেন বাংলা খেয়াল-  পার কর মোপে আব তুম নিজামী / পীরানে ফির তুম রহমত কামী / সারি জাহান মে পীর তুমি হো / বকশানেওয়ালা তুঁহি সবনকো / কুতুব আউলিয়া চহুঁ চোক মে তুহারী ধুমী।।

আলম-পিয়া রচিত এই বন্দেশটি আমার পূর্ব পরিচিত হওয়ার কারণে সুধীন দা’র সুর অনেক বেশি অন্তর ছুঁয়ে গেছে, যা আজও আমার কানে লেগে আছে। সেদিন সুধীন দার সাথে তবলায় সঙ্গত করেছিলেন সেই সময়ের উদীয়মান তবলাবাদক সমর সেন। সিরাজগঞ্জ শিল্পকলা একাডেমিতে শিক্ষা নেওয়া এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া ঘরানায় তালিম পাওয়া সমর সেনের হাত সেদিন বায়া-তবলায় নৃত্য করেছে। ঠেকা-তেহাই সুস্পষ্ট বোল তুলেছে। তবলার বোলের সাথে সুধীন দার বোলতান, গমক, বিস্তার অসাধারণ প্রকাশ ঘটিয়েছে।

পূর্ব্বী বা পূরবী ঠাটের আশ্রিত রাগ পূরবী হচ্ছে সন্ধিপ্রকাশ রাগ বা সন্ধ্যাকালের রাগ। সময়ের সাথে সামঞ্জস্য রেখে খেয়াল ধরেছিলেন সুধীন দা। সেদিন সুন্দর সন্ধ্যার মেজাজ অনুযায়ী তিনি ঢেলে দিয়েছেন সুর। নজরুলগীতি গাইলেও তিনি ছিলেন মূলত উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পী। রাগের চলনে তার ছিলো সাবলীল প্রকাশ। পূর্বাঙ্গ-প্রবল সম্পূর্ণ জাতীয় এই রাগ সম্পর্কে দুটি কথা বলে তিনি শুরু করেছিলেন আলাপ।

এই গুণী কণ্ঠশিল্পী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন যা দেশের সঙ্গীতাঙ্গনের জন্য অপুরণীয় ক্ষতি। তার সান্নিধ্য যতটুকুই পেয়েছি ততে একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা গেছে যে, দেশের সঙ্গীতাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করার ব্যাপারে তার প্রবল আগ্রহ ছিলো, চিন্তা ছিলো এবং প্রচেষ্টা ছিলো। ২০০১ সালের জানুয়ারিতে আগারগাঁও রেডিও অফিসে এক আড্ডায় তিনি বলেছিলেন, বাউল শিল্পী শাহ আব্দুল করিমের গানগুলো এলোমোলো হয়ে যাচ্ছে। সেগুলোকে একটা ফ্রেমে নিয়ে আসা দরকার। তিনি ভাবতেন শুদ্ধ সংগীতের কথা।

তিনি সংগীতের জন্য যা করেছেন তা অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। কিন্তু তার আরও অনেকদিন বাঁচার প্রয়োজন ছিলো, দেশের অনেক অরক্ষিত গান ও সুরকে সুরক্ষা দেয়ার জন্যই তাকে প্রয়োজন ছিলো। তিনি চলে গেছেন, তার কাজ অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। তার সহচর্ যারা পেয়েছেন সেই স্নেহধন্য সংগীত গুণীজনরা তার অসমাপ্ত কাজকে সম্পূর্ণ করার জন্য এগিয়ে আসবেন- এটাই প্রত্যাশা।

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71