শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় : জীবনই যার আস্ত উপন্যাস
প্রকাশ: ১২:৫১ pm ০৭-১০-২০১৭ হালনাগাদ: ১২:৫১ pm ০৭-১০-২০১৭
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


 সাব্বির জাদিদ

কৈশোরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এক কিশোরী মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। মেয়েটা কবিতা পছন্দ করত। তখন তো ডাক-পিয়নের যুগ। পিয়ন যে-সব পত্রিকা কিশোরীর বাড়িতে দিয়ে যেত, সুনীল বেছে বেছে সেই কাগজে কবিতা পাঠাতেন। সুনীল তার অত্মজীবনীতে বলেছেন— মেয়েটা কবিতা ভালো না বেসে যদি ক্রিকেট ভালোবাসত, তবে তিনি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় না হয়ে সুনীল গাভাস্কার হওয়ার চেষ্টা করতেন। নারী কি তবে ভূমিকম্পের মতো! ভূমিকম্প যেভাবে নদীর গতিপথ বদলে দিতে পারে, নারীও কি পারে পুরুষের জীবনের গতিপথ বদলে দিতে! সেই কিশোরীর কাছে বাংলাভাষার পাঠকরা অবশ্যই ঋণী। তার কারণেই বাংলাসাহিত্যের মুকুটে অসংখ্য উজ্জ্বল পালকের সংযুক্তি ঘটেছে

সুনীল জন্মেছিলেন অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরে ১৯৩৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। দেশভাগের কারণে জন্মভূমিতে তার বসবাস করা হয়নি। এ তার সারাজীবনের কষ্ট। ভারতবর্ষের স্বাধীনতা তার দেশকে বিদেশ করে দিয়েছে।

কী ছিলেন না সুনীল? প্রাবন্ধিক, কবি, গল্পকার, ঔপন্যাসিক, সমালোচক— সাহিত্যের প্রতিটি লকবই তার নামের সাথে জুড়ে দেয়া যায় চোখ বুজে। তার বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’ বাংলাভাষাভাষীর কাছে এক প্রবাদতুল্য বাণী। যৌবনের শুরুতে পেটের দাবিতে নামে-বেনামে অজস্র ফিচার লেখতে হয়েছে তাকে। তবে সেসময় তার আরাধনার কেন্দ্রে ছিল শুধুই কবিতা। ফিচার লেখতেন পেটের দাবিতে। কবিতা লেখতেন আত্মার খোরাক দিতে। তিনি বলেছেন, ‘কবিতার জন্য আমি অমরত্বকে অস্বীকার করেছি।’ সমসাময়িক কবিবন্ধুদের নিয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন এক কবিতা-প্রতিষ্ঠান, ‘কৃত্তিবাস’ পত্রিকা। প্রচণ্ড অভাব আর সামাজিক প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি কৃত্তিবাসকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন বুকের অক্সিজেন দিয়ে। কৃত্তিবাসের ঝোঁক ছিল ভাঙচুরের দিকে। প্রথা ভাঙ্গা, ছন্দ ভাঙ্গা, নৈতিকতা ভাঙ্গা, মূল্যবোধ ভাঙ্গা। শব্দ নির্বাচনে বেপরোয়া। কৃত্তিবাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, ওগুলো সব চেঁচামেচির কবিতা। ভাঙচুর চালিয়ে কবিতার নতুন দিক উন্মোচন ছিল সুনীলের উদ্দেশ্য। সেই উদ্দেশ্যে সুনীল কতটা সফল হয়েছেন তা বলবার ভার আমার কাঁধে নিচ্ছি না। শুধু এইটুকু বলতে পারি কৃত্তিবাস প্রতিষ্ঠা করে সুনীল ইতিহাস তৈরি করেছেন। কৃত্তিবাস এখন ইতিহাসের দলিল। এই দলিল থেকে নতুন প্রজন্মের কবিযোদ্ধারা প্রয়োজনীয় উপাদান পেতে পারে।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আগে কবি পরে কথাকার। তিনি রক্তের ভেতর কবিতা নিয়ে জন্মেছিলেন। কবিতাই ছিল তার ধ্যান তার সাধনা। কবিতায় যখন খ্যাতির শীর্ষে তখন আসেন গদ্যসাহিত্যে। তখন পত্রিকায় কবিতা লেখে পাঁচ টাকা পাওয়া যেত। আর গল্প লেখে পাওয়া যেত পনের টাকা। এই পনের টাকার জন্য তিনি গল্প লেখা শুরু করেন। একবার বসুমতী পত্রিকায় তার গল্প ছাপা হল। তখনো গোঁফ দাড়ি কামান না। তিনি বসুমতী অফিসে গেলেন সম্মানীর জন্য। অফিসের সাধারণ ডিসিপ্লিন তার অজানা। একাউন্টসে না গিয়ে সরাসরি ঢুকে গেলেন সম্পাদকের দপ্তরে। সুনীলের আগমনের উদ্দেশ্য জানতে পেরে সম্পাদক বিরক্ত হলেন। চোখমুখ কুঁচকে বললেন, কিসের টাকা! যাও যাও বেরোও।

সাব্বির জাদিদ

সুনীলকে জড়িয়ে ধরেছিলেন হুমায়ূন

সুনীল বললেন, লেখা ছেপেছেন তো টাকা দেবেন না কেন? সম্পাদক বললেন, তোমার নাম ক’জন জানে? তোমার নাম ছাপা হয়েছে এই তো যথেষ্ট। সুনীল ‘নেহি ছাড়েঙ্গা’ পাত্র। তিনি তেজের সঙ্গে বললেন, নতুন-পুরনোয় কী আসে যায়! পত্রিকার এক পৃষ্ঠাজুড়ে গল্প ছাপা হয়েছে সেই পৃষ্ঠার দাম দেবেন না! আর দেবেন না যখন তখন ছাপতে গেলেন কেন? সম্পাদক মানিব্যাগ থেকে পাঁচ টাকার নোট বার করে সুনীলের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, যাও এবার বিদেয় হও। সুনীল দ্বিগুন রেগে টাকাটা হাতের মুঠোয় গোল্লা পাকিয়ে সম্পাদকের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বললেন, আমি কি ভিখিরি? এই টাকা দিয়ে আপনার ছেলেমেয়েকে চানাচুর কিনে খাওয়াবেন।

সুনীল শুধু লেখক ছিলেন না, আপাদমস্তক সাহসী মানুষ ছিলেন। লেখকদের সাহসী হতেই হয়। ভারতের মতো কট্টর হিন্দুবাদী রাষ্ট্রের লেখক হয়েও তিনি অবলীলায় বলতে পেরেছেন, প্রতিমা দেখে তাঁর শ্রদ্ধা আসে না। বরং কামভাব জাগ্রত হয়। এমনকি তার প্রথম যৌনতার অভিজ্ঞতা— প্রতিমার ঠোঁটে চুম্বন আর বুকে হাত। এটাও তিনি কাগজে প্রকাশ করেছেন। সুনীলের মুখ থেকে শোনা যাক— ‘প্রতিমার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় সর্বাঙ্গে শিহরণ হল। কী অপূর্ব সুন্দর মুখ এই শ্বেতবসনা রমনীর! আয়ত চক্ষু, স্ফুরিত ওষ্ঠ, ভরাট, বর্তুল দুটি স্তন। সরু কোমর, প্রশস্ত উরুদ্বয়। হয়তো এভাবে আলাদা করেও দেখিনি, সব মিলিয়ে এক শিল্প সৃষ্টি, তার অভিঘাতে তছনছ হয়ে যেতে লাগল আমার কৈশোর। জেগে উঠল পুরুষার্থ, অল্প অল্প শীতেও উষ্ণ হয়ে উঠল শরীর। না, আমার অলৌকিক অনুভূতি হয়নি। পিগম্যালিয়ানের মতন সেই মাটির মূর্তিকে জীবন্তও মনে হয়নি। মাটিরই প্রতিমা, একটি নারী, পরিপূর্ণ নারী। চোরের মতন সতর্কভাবে একবার এদিকওদিক তাকিয়ে হাত রাখলাম দেবী মূর্তির বুকে। ‘জয় জয় দেবী চরাচর সারে, কুচ যুগ শোভিত মুক্তহারে…’ সেই কুচযুগে আমার আঙুল, অামার শরীর আরও রোমাঞ্চিত হল, কান দুটিতে আগুনের আঁচ। আমি প্রতিমার ওষ্ঠে চুম্বন করলাম, আমার জীবনের প্রথম চুম্বন।’

Sunil Aaj

সুনীলের পুরো জীবনটাই সাহসের গল্প। স্কলারশিপ নিয়ে তিনি আমেরিকায় গিয়েছিলেন। তৃতীয়বিশ্বের মানুষের কাছে আমেরিকা মানে স্বর্গ। নির্ভাবনাময় সুখী জীবন। সেই আমেরিকা সুনীলকে আটকে রাখতে পারল না। অল্পতেই হাঁপিয়ে উঠলেন তিনি। বাংলাভাষায় কথা বলতে পারেন না। বাংলায় কবিতা লিখতে পারেন না। বাংলা পত্রিকার ঘ্রাণ নিতে পারেন না। তিনি সবার শাসন-বারণ-অনুরোধ-অদেশ উপেক্ষা করে সময়ের আগেই ফিরে এলেন কলকাতা। কবিতা লেখার জন্য। এতটা প্রেমেই তিনি পড়েছিলেন কবিতার!

অনিয়ম-দুর্নীতি তিনি পছন্দ করতেন না। একবার এক ধনী প্রভাবশালী অলেখককে রবীন্দ্র পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। যে কিনা কোনভাবেই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য নয়। রবীন্দ্র-নামাঙ্কিত পুরস্কারের এই অপব্যবহার সুনীলের ভালো লাগেনি। বিচারকদের ভেতর ছিলেন বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র। সুনীলের বন্ধুদের সভায় স্থির হয়— প্রমেন্দ্র মিত্রর কাছে এর কৈফিয়ত চাওয়া হবে। কণ্ঠস্বর লুকানোর জন্য সুনীল টেলিফোনে কাপড় পেঁচিয়ে প্রেমেন্দ্রের কাছে ফোন দিয়েছিলেন এবং কৈফিয়ত চেয়েছিলেন। পরে অবশ্য এই দুর্ব্যবহারের জন্য তিনি অগ্রজ প্রেমেন্দ্রের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। সাহিত্যের প্রতি এই ছিল সুনীলের ভালোবাসা। এখানে স্মর্তব্য যে, প্রেমেন্দ্র মিত্র খুবই সরল আর উদাসীন গোছের মানুষ ছিলেন। কোন অসাধু ব্যক্তি প্রমেন্দ্রের এই সরলতার সুযোগ নিয়ে থাকবে এবং বিচরকের খাতায় তার নাম ঢুকিয়ে দেবে।

বাংলাদেশের কিংবদন্তীতুল্য কথাকার হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে সুনীলের ভালো বন্ধুত্ব ছিল। যদিও সুনীল বয়সে অনেক বড় ছিলেন। তবু দুজন একই চিন্তা-চেতনা লালন করায় দুজন দুজনের কাছাকাছি হয়েছিলেন। হুমায়ূন আহমেদের বড় মেয়ে ছিল সুনীলের ভক্ত। মেয়ের বিয়েতে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য মেয়েকে না জানিয়ে তিনি সুনীলকে বিয়ের আসরে হাজির করেছিলেন।

কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় বাংলাসাহিত্যের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম।
একজীবনে সুনীল যা লিখে গেছেন, অনেক মনোযোগী পাঠকের সারা জীবনে তা পড়াও হয়ে ওঠে না। মানুষ হিসেবে সুনীলের মৃত্যু হয়েছে, কিন্তু লেখক সুনীল বেঁচে থাকবেন অনন্তকাল।

নি এম/

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71