বুধবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৮
বুধবার, ২৮শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
সেলাই : নূরিতা নূসরাত খন্দকার(প্রথম পর্ব)
প্রকাশ: ০৮:৩৩ am ০৮-০৬-২০১৫ হালনাগাদ: ০৮:৩৩ am ০৮-০৬-২০১৫
 
 
 


আমি রুখসান আলম, চাকরি করি আর বাসায় ফিরে ঘরের কাজ সেরে সেলাই করি এটা সেটা। বয়স তিরশ পেরিয়ে কিছুটা এগোলেও আমার কলিগরা কিছুতেই বিশ্বাস করে না। ওদের মতে আমার বয়স ছাব্বিশ কিম্বা বড় জোড় সাতাশ। ফর্সা না হলেও আমি আমার রঙ নিয়ে মোটেও বিচলিত নই। তবে আমার চুল নিয়ে আমি বেশ গর্বিত। কারণ বেশি ঝামেলা নেই আমার চুলে। মাথায় বিশ মগ পানি ঢাললেও শুকিয়ে যায় দুই মিনিটে। আজকাল অনেকেই অনেক রকম চিকিৎসা করে চুল ঘন করে। কিন্তু আমি কখনোই ওসব ট্রাই করে দেখিনি। মাথার নিয়ম রক্ষার্থে একটু চুল থাকা দরকার তাই থাকলেই যথেষ্ট। সে তুলনায় আমি কিন্তু টাকলা নই। পৈতৃক সূত্রে একটা ছোটখাটো বাড়ি আছে শনিরআখড়ায়। আমার দুটো ছোট ভাইবোন, দেখতে যমজের মত হলেও ওদের বয়সের পার্থক্য দুই বছর। ভাই রাফসান আলম এ বছর অনার্সে ভর্তি হয়েছে আর বোন মুসকান আলম ইন্টার পরীক্ষা আগামী বছর। প্রশ্ন আস্তেই পারে এরা আমার চেয়ে এত ছোট কেন?
আমার বাবা রাশেদুল আলম দু'বার বিয়ে করেন। আমার মা আইনুন বেগম ছিলেন প্রথমা স্ত্রী। আমার চোদ্দ বছর বয়সে মা পৃথিবী ত্যাগ করলে এক বছর পরেই বাবা ছোট খালা খাইরুন বেগমকে বিয়ে করেন। আমি তাকে মা হিসেবে মেনে নিতে দেরী করলেও আমার বাবা খাইরুন বেগমের পুত্র সন্তানের জনক হন বিয়ের পরের বছরেই। ছোট্ট রাফসানকে বিছানায় দেখে আমার পুতুল মনে হল একদিন। তারপর থেকে রাফসান আমার আদরের খেলনা হল। ওকে কোলে পীঠে নিয়ে খেলতে খেলতেই মুসকান এলো। মাকে হারিয়ে বাবাকে দূরে সরে যেতে দেখেছি, খালাকে সৎ মায়ের স্থলে রূপান্তরিত হতে দেখেছি। এই সব মন খারাপের ধকলের ভিতর দিয়ে রাফসান আর মুসকান আমার একটা আনন্দ জগত হয়ে দাঁড়ালো। আমার খালা মুসকানকে পাঁচ বছরের মাথায় আমার কোলে রেখে বিদায় নিলেন ইহজগতের যাবতীয় সম্পকের লেটা চুকে। বাবা আবারও বিমনা হতে থাকলেন সংসার-সন্তানের কাছ সাথে। চাকরি করতেন নিয়মিত, সেটা পেটের দায়ে। আর আমাদের পড়ালেখার দিকে তাঁর সুনজর ছিল বলে সেদিকে টানাপোড়ন হতে দেখিনি কখনও। শুধু তাঁর মন খারাপ থাকত, দ্বিতীয় দফায় বৌ বিয়োগের ধকল কাটাতে পারলেন না বেশিদিন। আমার যখন বাইশ বছর বয়স তখন তিনি আমার নামে শনিরআখড়ার বাড়িটা লিখে দিলেন, আর রাফসান আর মুসকানের জন্য কিছু থোক টাকা বরাদ্দ রাখেলন ব্যাঙ্কে। আমাকে একদিন সব বুঝিয়ে দিয়ে বললেন, রুখসান আম্মাজান তুমি এই বাড়িটা আর তোমার ভাই বোনকে আগলায় রাইখো। যদি আমার কখনও কিছু হইয়া যায় তুমি কিন্তু এই বাড়ির মালিক হইবা। রাফসান পুত্র সন্তান হিসেবে এই বাড়ির উত্তরাধিকার আম্মা। কিন্তু আমি সেইটা বজায় রাখি নাই। তোমারেই এই বাড়ির মালিক বানাইছি, তুমি আমার প্রথম সন্তান বইল্লা। আমার চাকরির যেই টাকা থাকব সেইগুলা রাফসানের পড়ালেখার কাজে লাগাবা। সাবালক হইলে ওরে বুঝায় দিবা। আর মুসকানের নামে কিছু টাকা রাখছি বিক্রমপুরের জমি বেইচ্যা। সেই টাকা মুসকান নাবালক থাকা অবস্থায় তুমি উঠাইতে পারবা। তোমার নিজের যত্ন নিবা। ভাইবোনদেরও আগলাইয়া রাখবা।"
"আব্বা আফনে এইসব ক্যান কইতাছেন আমারে? আফনে এমন কইরা কইতাছেন যেন কই জানি চইলা যাইতেছেন?"
"না রে বেটি কোথাও যাইতেছি না। আমার মন কইতাছে সময় থাকতে সব বুঝায় দিয়া নিশ্চিন্তে যে কয় দিন বাঁচার সেই কয়দিন বাঁচি। তয় তোমারে একখান বিয়া দিবার পারলে আমার বেশি ভাল লাগবো।"
''ক্যান আমার বিয়া হইলে রাফসান আর মুসকানের লাইগ্যা কি আফনে আবার একটা বিয়া করতেন?''
''না রে আম্মা। আমি জানি তোমার খালারে বিয়া করনে তুমি আমার উপর এহনও রাইগা আছ। কিন্তু সেই মানুষটাও তো আমারে ছাইড়া চইলা গেছে। তুমি আমারে ক্ষমা কইরা দিও আম্মা। আমি তোমারে সময় দিবার পারি না। তোমার খেয়াল রাখতে পারি না। তোমার মায়ে থাকলে তোমারে কত আদর কইরা মানুষ করত। আহা আইনুন বেগমের শোক আইজো আমার হৃদয় থাইক্কা মুছবার পারলাম না। খাইরুন বেগমও আমারে থুইয়া চইলা গেল। আম্মা তুমি আমারে কথা দাও আমি না থাকলেও তুমি পড়ালেখা কইরা মানুষের মত মানুষ হইবা। ভাইবোন দুইডারে কখনও অবহেলা করব না?''
"আব্বা আফনে চুপ করেন তো। ভাইবোন আমার কলিজার টুকরা। আফনি কি কখনও দেখছেন ওগোরে আমি আদর যত্নের কমতি রাখছি? যদি আফনার তাই মনে হয় আফনে আবার বিয়া কইরা আফনের পোলাপানের যত্ন নেন। আমারে বিয়া দিইয়া দেন তাইলে আফনের মহাশান্তি হইবো।''
সেদিন আমি ঠিকই আমার বাবাকে ভুল বুঝে খোঁচা মেরে কথা বলেছিলাম। আসলেই যে বাবা- মায়ের সাথে এক মুহূর্তের জন্যও দূরব্যাবহার করা উচিত না সেটা বুঝিনি তখন। সেদিন আব্বাকে ওভাবে কথাগুলো শুনিয়ে এখন সারাজীবনের জন্য সুঁইফোঁড়ের মত বুকে বিঁধে আছে স্মৃতি। আমার মনে আছে সেদিনই বাবার সাথে আমার কথা হয়েছিলো। এর আগে বা পরে যা হয়েছিলো সেগুলো ঠিক কথা নয়। প্রশ্ন আর উত্তর ছিল সেসব। এই ঘটনার এক বছর পর আমাদের সম্পূর্ণ একা করে চলে গেলেন বাবা। এখন আমি রাফসান আর মুসকান আমাদের আলম মঞ্জিলের অধিবাসী।
চলবে .....................
 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71