বুধবার, ২৬ জুন ২০১৯
বুধবার, ১২ই আষাঢ় ১৪২৬
 
 
স্বাধীনতার ৪৭ বছরেও স্বীকৃতি মেলেনি শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের 
প্রকাশ: ০৪:৫৫ pm ১২-১২-২০১৮ হালনাগাদ: ০৪:৫৫ pm ১২-১২-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


নটো কিশোর আদিত্য

স্বাধীনতা এসেছে, পেড়িয়েও গেছে ৪৭টি বছর। এই সুদীর্ঘ দিন-রাতগুলো একটি পরিবারের কাছে অব্যক্ত বেদনার উপাখ্যান হয়েই রইল। শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় তাঁকে কেউ মনেও করে না, মুখ ফুঁটে বলেও না তাঁর আত্মত্যাগের কথা। 

যাঁকে নিয়ে এই লেখা তিনি প্যারী মোহন আদিত্য সৎসঙ্গ কার্যকরি পরিষদের সদস্য এবং সৎসঙ্গ সংবাদ পত্রিকার সহ সম্পাদক ছিলেন। তিনি নাটক যাত্রা থেকে শুরু করে লৌহশিল্পের কাজ করে সংসার চালাতেন। ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের আদর্শে মানবতার উপাসক। তিনি হলেন আমার বাবা।

বাবা, শৈশব স্মৃতিতে তোমার স্নেহ আমাকে এখনো আবেগতাড়িত করে। আমাকে নিয়ে যায় নষ্টালজিয়ায়। তোমার চির অদৃশ্য পটে চলে যাওয়ার পর আমি শ্যাওলার মতো শুধু ভেসে বেড়িয়েছি। বার বার হয়েছি স্নেহের কাঙাল। কোন পিতা যখন তাঁর ঘরের শীতল ছায়ায় তার সন্তানকে আদর করছে; দূর থেকে তাকিয়ে শুধু দেখেছি। অশ্রুর পসরায় আমার দু’চোখ আচ্ছন্ন হয়েছে। ভিখারির মতো শুধু মনে মনে তোমাকে ডেকেছি-বাবা তুমি ফিরে এসো, ফিরে এসো। আমার বুকের মধ্যে অসম্ভব ক্রন্দনের রোলকে চেপে রেখেছি অনেক কষ্টে। সেই অবদমনের ফল্গুধারা কেউ কোনদিন দেখেনি। তোমার চলে যাওয়ার পর মাকেও হারিয়েছি দিক চিহ্নহীন পথে। বাবা তোমাকে যারা হত্যা করেছে তারা বিজয় দর্পে হেসেছে। কিন্তু আমিতো জানি, তুমিতো এ দেশের জন্য প্রাণ দিয়েছ । তোমার লোহর প্রতিটি কণা বৃথা যায়নি। আমি হয়ত নাম-গোত্র-পরিচয়হীন হয়েছি। পেয়েছি কাছের মানুষের ধিক্কার ও অবহেলা। বাবা জানতো, মানুষ কাছের মানুষের অবহেলায় বেশি কষ্ট পায়। 

তিল তিল করে গড়ে তোলা তোমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান আজ বেড়ে বেড়ে ছোট চারা গাছ থেকে মহিরুহ। শুধু সেখানে তোমার নাম কেউ জানে না। উচ্চারণ করে না মনের ভুলেও। তোমার নামে নেই কোন মনোমেন্ট, রচিত হয়নি কোনো ত্রপিটাফ। অথচ তুমি মিশে আছ এ দেশের শ্যামল মাটিতে, এ দেশের স্বাধীনতায়। বিজয় দিবসে, স্বাধীনতা দিবসের আনুষ্ঠানিকতায় ফুলে ফুলে ভরে যায় দেশ। সেই ফুলে ফুলে আমি যেন তোমারই অবয়বদেখি। শুধু তোমার আতœত্যাগের দিনটিকে আমরা স্মরণ করতে পারি না। আমার ব্যার্থতার যন্ত্রণায় নিজেই কুড়ে কুড়ে মরি। ভাবি ঈশ্বর আমাকে এমনি করে কষ্ট পাওয়ার জন্যই হয়ত পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। না হলে পিতা মাতাকে শৈশবে হারাব কেন?
 
বাবা, তোমার একনিষ্ঠতা, মেধা ও শ্রম দিয়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে গড়ে তুলে ছিলে। তোমার মানবতা বোধ আর্দশ এখনো অনেক প্রবীনগণ স্মরণ করেন। মানুষের প্রতি অপার ভালবাসা, ভেদাভেদহীনতা তুমি মহামন্ত্র রূপে গ্রহণ করেছিলে। সেই আর্দশের রূপকার ছিলেন শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্র। তার প্রতিষ্ঠিত সৎসঙ্গের তুমি ছিলে ধারক, বাহক ও সৎসঙ্গ সংবাদের পৃষ্ঠপোষক। কত বড় সংসারের ঘানী টেনেও তুমি হাসি মুখে প্রতিষ্ঠিত করেছ এই সৎসঙ্গ আশ্রম। বিত্তে বৈভবে তা বেড়েছে আকাশ চুম্বি হয়ে। শুধু মানবতার বানী যেন কেঁদে মরছে নিরবে নিভৃতে।

এই মেধাবী দেশপ্রেমিকের জন্ম আর স্কুলের সুবর্ণসময় কেটেছে পৈত্রিক ঠিকানা টাঙ্গাইল শহরের পাকুটিয়া গ্রামে। তাঁর চেতনা আর মননজুড়ে ছিল স্বাধীন বাংলাদেশের সুগভীর এক স্বপ্ন। অন্য দশজনের মতো এই স্বপ্নের কথা মনের গভীরে নীরবে-নিভৃতে লালন করেই দায় শোধ করেননি। ঊনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে স্বাধীনতার চেতনা ছড়িয়ে দিয়েছেন মানুয়ের মাঝে। লিখেছেন, বলেছেন, মানুষের ভালবাসার কথা, স্বাধীনতার স্বপ্নের কথা। ৬৯,৭০,৭১-এর উত্তাল মার্চে তাঁর ভূমিকা ক্ষুব্ধ করেছিল পাকিস্তানি হানাদার আর তাদের দোসরদের। তারা মনেও রেখেছিল, অপেক্ষায় ছিল অনুকূল সময়ের। বেশিদিন অপেক্ষাও করতে হয়নি ঘাতকদের। ২৫ মার্চের কালরাতে শুরু হওয়া গণহত্যা, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক হত্যা কেবল রাজধানীতেই আবদ্ধ থাকেনি। 

তখন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর সাথে, মাঠে নেমেছে তাদের এ দেশীয় দোসররা। দিনটি ছিল ১৯৭১-এর ১৮ এপ্রিল। প্রথম বিপর্যয়ের শিকার আমার বাবা। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতেই পাকিস্তান বাহিনীর মার্টারের গোলায় আশ্রমের মঠ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে আমার বাবা প্যারী মোহন আদিত্য মুল মন্দিরে ধ্যান অবস্থায় থাকায় তাঁকে মুর্ত্তি ভেবে গুলি করা থেকে বিরত থাকে। কিন্ত ২১মে ঘাতক দল ময়মনসিংহ যোওয়ার পথে পাকুটিয়ায় আক্রমন চালালে প্যারী মোহন আদিত্য ধরা পড়েন। অত্যাচারিত হন ঘাতকের ক্যাম্পে। আবার তিনি পালাতেও সক্ষম হন। কিন্তু ঘাতকরা হাল ছাড়ে নাই। অবশেষে ১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট আমার বাবাকে প্রথমে গুলি করে ঝাঝড়া করে দেয় এবং পরে বেয়নেট দিয়ে খুচিঁয়ে খুচিঁয়ে হত্যা করে। ঘাতক পাকবাহিনী এবং তাদের দোসররা ঘিরে ফেলে সম্পূর্ন এলাকা। বাড়ির গোপন জায়গায় লুকিয়ে থেকে গুলির শব্দ শুনেছিলেন আমার জ্যাঠামহাশয়। এই নির্মম উপাখ্যানের ইতি এখানেই।

নয় মাসের রক্তনদী আর যুদ্ধজয়ের ইতিহাস সবার জানা। পাকিস্তানের জল্লাদখানা থেকে মুক্ত হয়ে ফিরে আসেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্বাধীন দেশের হাল ধরেন তিনি। চারিদিকে গোপন ষড়যন্ত্র, অর্থনৈতিক সংকটের মাঝেও জাতির জনক খোঁজ নিতে ভুলেননি দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকরা সূর্যসন্তানদের। এরপরই থেমে যায় সব বাস্তবতা। শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের পরিবারের কাছে রাষ্ট্র কিংবা সরকারি স্বীকৃতি বলতে যা বোঝায় তা আটকে আছে গত ৪৭টি বছর ধরে। এরপর আর কোনো সরকার, আর কেউ, অন্য কোথাও শহীদ হিসেবে প্যারী মোহন আদিত্যের আত্মত্যাগের স্বীকৃতি দূরে থাক, শহীদ হিসেবে নামটুকুও স্বীকার করেনি। 

শহীদ প্যারী মোহন আদিত্যের ছোট ভাই কুঞ্জ বিহারী আদিত্য সভাপতি, সৎসঙ্গ বাংলাদেশ। তিনি দুঃখ করে একটি লেখায় লিখেছেন,”বৃটিশ শাসনের শেষ অংশে ভারত পাকিস্থানের বিভক্তি। সাধারন মানুষের অবর্ননীয় দুঃখ, দেশ ত্যাগ, সব ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে অবলোকন করেছেন প্যারী মোহন আদিত্য। ১৯৪৭ এর দেশভাগ বাঙ্গালীদের জন্য কোন সুফল বয়ে আনেনি। বৃটিশদের শোষনের চেয়েও পাকিস্তানী শাসকরা আরো বেশি শোষণ করতে শুরু করে। ব্যাপক অর্থনৈতিক বিভক্তি এ বাংলার মানুষের জীবন জীবিকা, যাপিত জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। প্যারী মোহন আাদিত্যের জীবনেও সেই প্রভাব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। ১৯৭১ সালে ২৫মার্চ পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী বাঙ্গালী জাতির উপর বর্বোরচিত হামলার আগে (২৪শে মার্চ) তৎকালীন পুর্ব পাকিস্থানের জাতীয় সংসদের স্পীকার আব্দুল হামিদ চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য শামসুর রহমান খান শাহজান, ভবেশ বোষ, বাসেদ সিদ্দিকী সহ আরো বিশিষ্ট ব্যাক্তির বিভিন্ন সময়ের পরার্মশে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেন এবং কিছু অর্ঘ্য দান করেছিলেন আপদকালীন ফান্ডে। সাথে ছিলেন বড় ভাই রাস বিহারী আদিত্য এবং অমরেন্দ্র নাথ আদিত্য।”

আমার বাবার এই আত্মত্যাগের বিনিময়ে আমরা সামান্যতম কোনো আর্থিক, বৈষয়িক সুবিধা রাষ্ট্র কিংবা সরকারের কাছে চাই না। আমরা শুধু শহীদ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিটা চাই। চাই ইতিহাসের পাতায় তাঁর নামটা থাকুক। শহীদ সন্তানের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে অনেক চেষ্টা হয়েছে, স্বীকৃতি মেলেনি।’ 

নি এম/নটো কিশোর আদিত্য

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

সম্পাদক : সুকৃতি কুমার মন্ডল 

 খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

+8801711-98 15 52

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2019 Eibela.Com
Developed by: coder71