সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৩রা পৌষ ১৪২৫
 
 
স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তীর ৫৫তম মৃত্যূ বার্ষিকী আজ
প্রকাশ: ০৫:১২ am ০৭-০৩-২০১৭ হালনাগাদ: ০৫:১২ am ০৭-০৩-২০১৭
 
 
 


প্রতাপ চন্দ্র সাহা ||

স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বিপ্লবী অম্বিকা চক্রবর্তী ( জন্মঃ- ১৮৯২ - মৃত্যুঃ- ৬ মার্চ, ১৯৬২ )

প্রথম মহাযুদ্ধের সময় বিপ্লবী দলের কাজে জড়িত থাকায় অম্বিকা চক্রবর্তী গ্রেপ্তার হন। ১৯১৮ সালে মুক্তি পান। মাস্টারদা সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী চট্টগ্রামে দেওয়ানজী পুকুরপারে 'সাম্য আশ্রম' প্রতিষ্ঠা করে ওখানে থাকতেন। সেখানে গোপনে বিপ্লবীরা জমায়েত হত। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিপ্লবী দলের অন্যতম নেতা চারুবিকাশ দত্ত তাঁর সহকর্মীদের নিয়ে "অনুশীলন" দলের সাথে যুক্ত হয়ে যান। এভাবে চট্টগ্রামেও বাংলার অন্যান্য জেলার মত দু'টি বিপ্লবী দল গড়ে ওঠে। দুই দলে বিভক্ত হওয়ার পর চট্টগ্রামে যে বিপ্লবী দলটি নিজস্ব স্বতন্ত্রতা বজায় রেখে কংগ্রেসের প্রকাশ্য আন্দোলনে কোলকাতার "যূগান্তর" দলের সঙ্গে সহযোগিতা করত, সে দলের সাংগঠনিক কমিটি ছিল নিম্নরূপ- সভাপতি- সূর্য সেন; সহসভাপতি- অম্বিকা চক্রবর্তী; শহর সংগঠনের দায়িত্বে- গণেশ ঘোষ ও অনন্ত সিংহ; গ্রামের সংগঠনের দায়িত্বে- নির্মল সেন। এছাড়া লোকনাথ বলকে ছাত্র আন্দোলন ও ব্যায়ামাগার গঠন প্রভৃতি কাজের দায়িত্ব দেয়া হয়। অনুরূপ সেন বিপ্লবীদলের সংবিধান লিখলেন এবং তাঁকে ও নগেন্দ্রনাথ সেনকে কলকাতার অন্য দলগুলোর সাথে যোগাযোগ এবং অস্ত্র সংগ্রহের দায়িত্ব দেয়া হয়।

নাগরখানা পাহাড় খন্ডযুদ্ধ
১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে অনেক বিপ্লবী এই আন্দোলনে যোগ দেন। গান্ধীজীর অনুরোধে বিপ্লবীরা তাদের কর্মসূচি এক বছরের জন্য বন্ধ রাখেন। সূর্য সেন অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দিলেন। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্র ও বিপ্লবী অনন্ত সিংহ ছাত্র ধর্মঘট পরিচালনা করার জন্য স্কুল থেকে বহিস্কৃত হন। মহাত্মা গান্ধী ১৯২২ সালে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করলে বিপ্লবী দলগুলো আবার সক্রিয় হয়ে উঠে। তখন চট্টগ্রাম কোর্টের ট্রেজারী থেকে পাহাড়তলীতে অবস্থিত আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কারখানার শ্রমিক ও কর্মচারীদের বেতন নিয়ে যাওয়া হতো। ১৯২৩-এর ১৩ ডিসেম্বর টাইগার পাস এর মোড়ে সূর্য সেনের গুপ্ত সমিতির সদস্যরা প্রকাশ্য দিবালোকে বেতন বাবদ নিয়ে যাওয়া ১৭,০০০ টাকার বস্তা ছিনতাই করে। ছিনতাইয়ের প্রায় দুই সপ্তাহ পর গোপন বৈঠক চলাকালীন অবস্থায় পুলিশ খবর পেয়ে বিপ্লবীদের আস্তানায় হানা দিলে পুলিশের সাথে বিপ্লবীদের খন্ড যুদ্ধ হয় যা "নাগরখানা পাহাড় খন্ডযুদ্ধ" নামে পরিচিত। যুদ্ধের পর গ্রেফতার হন সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী। রেলওয়ে ডাকাতি মামলা শুরু হয় সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তীকে নিয়ে। অনন্ত সিং আর গণেশ ঘোষের নামে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করা হয়। কলকাতা হাইকোর্টের ব্যারিস্টার দেশপ্রিয় যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্ত এই মামলায় আসামি পক্ষের আইনজীবি ছিলেন। সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী এ মামলা থেকে ছাড়া পেয়ে যান। গ্রেফতার করার পর বিপ্লবীদের উপর নির্যাতনের কারনে কলকাতা পুলিশ কমিশনার টেগার্টকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে বিপ্লবীরা। এই পরিকল্পনার কথা পুলিশ আগে থেকেই জানতে পারে। এ কারনে ২৫ অক্টোবর ১৯২৪ সালে গ্রেফতার হন গণেশ ঘোষ, নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং সহ আরো কয়েকজন। পুলিশকে বার বার ফাঁকি দিয়ে শেষ পর্যন্ত ১৯২৬ সালের ৮ অক্টোবর সূর্য সেন কলকাতার ওয়েলিংটন স্ট্রীটে গ্রেফতার হন। বন্দী হবার পর তাঁকে মেদিনীপুর সেন্ট্রাল জেলে রাখা হয়। পরে বোম্বের রত্নগিরি জেলে পাঠানো হয়, সেখান থেকে বেলগাঁও জেলে। ১৯২৭ সালে নির্মল সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং মুক্তি পান। আর ১৯২৮ সালের শেষভাগে সূর্য সেন ও গণেশ ঘোষ জেল থেকে ছাড়া পান।

ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি
১৯২৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসে নিখিল ভারত কংগ্রেস কমিটির বার্ষিক অধিবেশন হয়। ঐ অধিবেশনে চট্টগ্রাম থেকে যে প্রতিনিধিরা ছিলেন তাঁরা হলেন সূর্য সেন, অম্বিকা চক্রবর্তী, অনন্ত সিং, নির্মল সেন, লোকনাথ বল, তারকেশ্বর দস্তিদার প্রমুখ। সেখানে নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোসের সাথে সূর্য সেনের সাথে বৈঠক হয়। ১৯২৯ সালে মহিমচন্দ্র দাস এবং বিপ্লবী সূর্য সেন যথাক্রমে চট্টগ্রাম জেলা কংগ্রেসের সভাপতি এবং সম্পাদক নির্বাচিত হন। ঐ বছর বিপ্লবী নেতাদের উপর পুলিশের পাহারা আরো জোরদার করার জন্য কলকাতার কেন্দ্রীয় অফিস থেকে নির্দেশ আসে। ১১ জন গোয়েন্দা এবং চব্বিশজন পুলিশ নিয়োগ করা হলো ছয়জন বিপ্লবী নেতার জন্য। ১৯৩০ সালের শুরু থেকেই আসকার খাঁর দিঘির পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত কংগ্রেস অফিসে সূর্য সেন এবং অম্বিকা চক্রবর্তী ভবিষ্যৎ এর সশস্ত্র বিপ্লবের রুপরেখা নিয়ে বিভিন্ন নেতা কর্মীদের সাথে আলোচনা করতেন। এসব আলোচনার পর ঠিক করা হয় শুধু শহর না, বরং বিভিন্ন গ্রাম এবং কক্সবাজার থেকেও বিপ্লবীদের নেয়া হবে। আইরিশ রিপাবলিকান আর্মির বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের দলের নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় “ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি, চিটাগাং ব্রাঞ্চ”। বাংলায় “ভারতীয় প্রজাতান্ত্রিক বাহিনী, চট্টগ্রাম শাখা”।
পরিকল্পনা অনুসারে কাজের জন্য কয়েকটা দল গঠন করা হয়। সূর্য সেনের দলের সদস্য সংখ্যা ছিল ৩৫ জন, অম্বিকা চক্রবর্তীর ১৫ জন, অনন্ত সিং এবং গণেশ ঘোষের ২২ জন, নির্মল সেনের ৬ জন। এই দলগুলোর মধ্যে আবার উপদল ছিল। ইতোমধ্যেই চলছিলো অস্ত্র সংগ্রহ এবং বোমা তৈরির কাজ।

চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুন্ঠন ও জালালাবাদ যুদ্ধ
১৮ এপ্রিল ১৯৩০, শুক্রবার রাত ৮টা বিদ্রোহের দিন হিসাবে ঠিক হয়। পরে তা দশটা করা হয়। চারটা বাড়ি হতে চারটা দল আক্রমণের জন্য বের হয়। সে রাতেই ধুম রেলস্টেশনে একটা মালবহনকারী ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে উল্টে যায়। একদল বিপ্লবী আগে থেকেই রেল লাইনের ফিসপ্লেট খুলে নেয়। এর ফলে চট্টগ্রাম সমগ্র বাংলাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অম্বিকা চক্রবর্তীর নেতৃত্বে একটি ক্ষুদ্র দল শহরের টেলিফোন ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থা ধ্বংস করে। হাতুড়ি দিয়ে তারা সব যন্ত্রপাতি ভেঙ্গে দেয় এবং পেট্রোল ঢেলে সেখানে আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয়। আরেকটি দল পাহাড়তলীতে অবস্থিত চট্টগ্রাম রেলওয়ে অস্ত্রাগার দখল করে নেয়। উন্নতমানের রিভলবার ও রাইফেল গাড়ীতে নিয়ে অস্ত্রাগারটি পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগানো হয়। তবে সেখানে কোনো গুলি পাওয়া যায়নি। সর্বশেষ পরিকল্পনা অনুযায়ী বিপ্লবীরা দামপাড়ায় পুলিশ রিজার্ভ ব্যারাক দখল করে নেয়। এই আক্রমনে অংশ নেয়া বিপ্পবীরা দামপাড়া পুলিশ লাইনে সমবেত হয়ে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মিলিটারি কায়দায় কুচকাওয়াজ করে সূর্য সেনকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সূর্য সেন অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের ঘোষনা করেন। 
চট্টগ্রাম সম্পূর্ণরুপে ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল চারদিন। কিন্তু এরমধ্যে বিপ্লবীদের খাদ্যসংকট দেখা দিল এবং সূর্য সেন সহ অন্যদের কচি আম, তেঁতুল পাতা, কাঁচা তরমুজ এবং তরমুজের খোসা খেয়ে কাটাতে হয়। সূর্য সেন সহ ছয়জন শীর্ষস্থানীয় বিপ্লবীকে ধরার জন্য ইংরেজ সরকার ৫০০০ টাকা পুরস্কার ঘোষনা করে। ১৯৩০ সালের ২২ এপ্রিল বিপ্লবীরা যখন জালালাবাদ পাহাড়ে (চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পাহাড়) অবস্থান করছিল সে সময় সশস্ত্র ইংরেজ সৈন্যরা তাঁদের আক্রমণ করে। প্রচন্ড যুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর ৭০ থেকে ১০০ জন এবং বিপ্লবী বাহিনীর ১২ জন নিহত হয়। অম্বিকা চক্রবর্তী গুরুতরভাবে আহত হন। সঙ্গীরা তাঁকে মৃত মনে করে ত্যাগ করে চলে যায়। গভীর রাতে জ্ঞান ফিরে আসে ও পাহাড় ত্যাগ করে একটি নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যান। কয়েক মাস পরে ধরা পড়েন। বিচারে প্রথমে প্রাণদণ্ড ও পরে আপিলে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর দণ্ড হয়। ১৯৪৬ সালে মুক্তি পাবার পর কমিউনিস্ট আন্দোলনে যুক্ত হন। দেশবিভাগের পর উদ্বাস্তু পুনর্বাসনের চেষ্টায় একটি সমবায় গঠন করেন। ভারতের প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বঙ্গীয় সাধারণ সভার সদস্য হন। ১৯৪৮ সালে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি বেআইনি ঘোষিত হলে আত্মগোপন করেন। ১৯৪৯-৫১ সালে পুনরায় কারাবাস করেন।

জন্ম
অম্বিকা চক্রবর্তীর জন্ম চট্টগ্রামে। তাঁর পিতার নাম নন্দকুমার চক্রবর্তী। ১৯৬২ সালের ৬ মার্চ কলকাতার রাজপথে দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করেন।

এইবেলাডটকম/প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71