শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
স্বামী বিবেকানন্দ ও পঞ্চমতের দুর্গাপুজা, বিশেষ নিবন্ধ-০২
প্রকাশ: ১২:১৭ am ০৭-১০-২০১৬ হালনাগাদ: ১২:১৭ am ০৭-১০-২০১৬
 
 
 


অরুন শীল: হিন্দু ধর্মে স্বীকৃত হয়েছে পঞ্চমত বা পাঁচজনের পূজা।এই মত মূলতঃ হিন্দু ধর্মের একতার দিক টিকে ফুটিয়ে তোলে।

আসুন এই বিষয়ে একটু আলোকপাত করা যাক হিন্দু ধর্মে পূজাগুলির মধ্যে পূজা শুরুতেই প্রথমেই করা হয় গণেশের পূজো। শ্রীগণেশ মঙ্গলমূর্তি। তিনি সকলের আগে পূজ্য। সে যে কোনো পূজাই হোক না কে। গণ+ইশ্ – যিনি গণের মধ্যে অগ্রনায়ক বা গণের অধিপতি তাকেই গণেশ বা গণনায়ক বলা হয়। গন শব্দের এক অর্থ বহু লোকের সমাহার।

অর্থাৎ সমস্ত লোক যদি বিভেদ ভুলে একত্র হয় সেই গণশক্তির প্রতীক গণেশ প্রকাশিত হন। গণেশ শ্রম শক্তির প্রতীক। তাই সর্ব অগ্রে গণেশের পূজো। গণেশের উপাসক গাণপত্য। এরপর সূয দেবতার পূজা। সূয থেকেই সমস্ত জগত সংসার সৃষ্টি। সূয সৃষ্টির কারন।

সূয আছেই বলে জীবজগৎ টিকে আছে। সূয অন্ধকার মোচোন করে। সূযোর আলোকে জীবানু সকল নষ্ট হয়। প্রাতেঃ তাই সূর্য বন্দনা করা হয়। বর্তমানে সূযলোক থেকে তড়িৎ শক্তি উৎপন্ন করা হয়। সূয সৃষ্টির বীজ। তাই সূর্যের নামে অর্ঘ প্রদান করা পূজায় একান্ত মাষ্ট কর্তব্য।নচেৎ পূজা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। সূযের উপাসক সৌয। জগত পালক ভগবান নারায়নের পূজা ।

 ভগবান নারায়ন বা ভগবান হরি এই জগতকে পালন করেন। এরজন্য তাঁকে বহুবার মনুষ্য রূপে ধরাতে অবতীর্ণ হতে হয়। তিনি জীবশিক্ষা প্রদান করেন ও অসুর ধ্বংস করে সৃষ্টি চালনার পথ নিষ্কণ্টক করেন। মুখ্য দশাবতার ছাড়াও আরোও আংশিক অবতার এমনকি হংস ও কপিল অবতারের কথা শাস্ত্রে আছে।

খালি জন্ম দিলেই হয় না, তাকে যেমন লালন পালন করতে হয় তেমনি সৃষ্টি পালন করেন ভগবান নারায়ন।তাই ভগবান নারায়নের পূজা। ভগবান নারায়ন বা ভগবান হরির উপাসক বৈষ্ণব ।

এরপর আসে ভগবান শিবের পূজো।ভগবান শিব কে সংহার কর্তা বলা হলে-এই সংহার বলতে সংহরণ কে বোঝায়।শিব জীবের পশুভাবকে ত্রিশূলে মোচোন করে নিজ সত্ত্বায় বিলীন করেন  তাই তাঁর হস্তে মৃগ মুদ্র। শিকারী যেমন মৃগ অন্বেষণ করে তেমনি ভগবান শিব স্বীয় ভক্তদের অন্বেষণ করেন। তাছাড়া ধ্বংসের মধ্যে সৃষ্টির বীজ থাকে।

ধ্বংসের পরেই সৃষ্টি হয়। একনাগারে সৃষ্টি হতে থাকলে পৃথিবীর ব্যালেন্স একদিকে চলে যাবে- তাই ধ্বংসের ও প্রয়োজন। বৈশাখের প্রচন্ড তাপদাহের পর যেমন বর্ষার বৃষ্টি ধরিত্রীকে সিক্ত করে নতুন প্রান সঞ্চার করে তেমনি ধ্বংসের রুদ্রলীলার পর প্রানের সঞ্চার হয়। শিবের উপাসক হলেন শৈব।এরপর আসে শক্তিদেবীর পূজা।

ভগবান বিষ্ণু বা ভগবান শিব স্বীয় লীলা প্রদর্শন করেন। কিন্তু সেই লীলা প্রকাশের জন্য শক্তির প্রয়োজন।যেমন আপনি একটি চালের বস্তা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যাবেন আপনাকে শক্তি প্রয়োগ করে সেটাকে ওঠাতে হবে। প্যারালাইসিস রোগী কিন্তু এটা পারবে না , কারন তাঁর অঙ্গ অসাড়, সেখানে কোনো শক্তি কাজ করছে না। এই শক্তিকেই আদ্যাশক্তি বলা হয়।তিনি ভগবান বিষ্ণুর শক্তিরূপে যোগমায়া আবার তিনি ভগবান শিবের শক্তি মহাকালী।

এই দেবীই জগদ্ধাত্রী বা দুর্গা যিনি জগত ধারন করে আছেন। মাধ্যাকর্ষণ আব অভিকর্ষ শক্তি যা বলা হয় সব এই আদ্যাশক্তির প্রকাশ। তাই এই শক্তির পূজা আবশ্যক। শক্তির উপাসক দের শাক্ত বলে। এখানে দেবী পঞ্চমতে দেবীকে জয়দুর্গা রূপে পূজা করা হয়। এই হলো পঞ্চমতের পূজা বা হিন্দু ধর্মের পঞ্চ শাখার একত্র মিলন,বৃহৎ হিন্দু জাতির প্রতিষ্ঠা এই পঞ্চমত থেকেই শুরু।এবার নিরাকারের প্রসঙ্গ আসি। ঈশ্বর সাকার ও নিরাকার। যে তাকে যেভাবে নেয়।

পূজাতে আমরা যে ঘট স্থাপন করি, তাতে কোনো দেব বা দেবীর অবয়ব দেখা যায় না। এটা ভগবানের নিরাকার সত্ত্বার প্রতীক। লক্ষ্য করলে দেখবেন এই ঘট কিন্তু সম্পূর্ণ লাল শালু বা শাটি বা ধুতি দিয়ে ঢেকে দেবার নিয়ম।বারোয়ারী পূজায় এই নিয়ম মাষ্ট। নিরাকার কে দেখা যায় না।ঘটকেউ আচ্ছাদিত করলে দেখা যায় না।

এটি ভগবানের নিরাকার সত্ত্বার প্রতীক। আবার ভগবানের সাকার পূজার আগে ধ্যান মন্ত্র বলে পূজারী নিজের মাথায় পুস্প দিয়ে হৃদয়ে ভগবানের পূজা কল্পনা করে ধ্যান করেন। এটি ভগবানের সর্ব ব্যাপক ময় রূপকে তুলে ধরে।এটি নিরাকার সত্ত্বা। যে বা যারা পঞ্চমতকে পূজা না করে পূজায় বসে শাস্ত্র মতে সে পূজা নিস্ফল হয়। যারা এই পঞ্চমতকে স্বীকার না করে তাদের মা শীতলার হাতের বস্তু টি নিয়ে আঘাত করে হিন্দু সমাজ থেকে তাড়ানো উচিৎ।

তবেই ঐক্যপূর্ণ হিন্দু জাতি গঠিত হবে ।আবার যারা পঞ্চদেবতার স্থানে কল্পনা করে অনান্য দেবতার পূজা করেন তাঁদের পূজাও নিস্ফল। অর্থাৎ শাস্ত্রকার গণ বহুমতের মধ্যে থেকেও বৃহৎ হিন্দু ঐক্য পূর্ণ সমাজের দৃষ্টান্ত দিয়ে গেছেন। অপরদিকে ১৯০১ খ্রিস্টাব্দে স্বামী বিবেকানন্দ বেলুড় মঠে প্রথম দুর্গাপুজো করলেন।

আর সেই থেকেই বেলুড় মঠে দুর্গাপুজোর প্রচলন হল। সেই পুজোর মাত্র আট মাস পরেই ১৯০২ খ্রিস্টাব্দের ৪ জুলাই স্বামীজি মহাসমাধিস্থ হলেন। তাঁর শততম প্রয়াণ বর্ষে ফিরে দেখা যাক বিবেকানন্দের সেই দিনগুলিকে।অনেক দিন ধরেই স্বামী বিবেকানন্দের মনে এই ইচ্ছেটা ছিল যে তিনি বেলুড়মঠে দুর্গাপুজো করবেন। কিন্তু নানা কারণে তা আর হয়ে ওঠেনি।১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে বেলুড়মঠ প্রতিষ্ঠার পর স্বামীজি প্রায়ই তাঁর প্রিয় বেলগাছতলায় বসে সম্মুখে প্রবাহিতা গঙ্গার দিকে তাকিয়ে আপন মনে গাইতেন.বিল্ববৃক্ষমুলে পাতিয়া বোধন/গণেশের কল্যাণে গৌরীর আগমন।/ঘরে আনব চন্ডী, কর্ণে শুনব চন্ডী,/আসবে কত, জটাজুটধারী।

এরপর একদিন ১৯০১ খ্রিস্টাব্দের মে-জুন মাস নাগাদ স্বামীজির অন্যতম গৃহী শিষ্য শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী বেলুড়মঠে এলে বিবেকানন্দ তাঁকে ডেকে রঘুনন্দনের অষ্টবিংশতি তত্ত্ব বইটি কিনে আনার জন্য বললেন।শরৎচন্দ্র চক্রবর্তী কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করলেন,আপনি রঘুনন্দনের বইটি নিয়ে কি করবেন? স্বামীজি বললেন, এবার মঠে দুর্গোৎসব করবার ইচ্ছে হচ্ছে।যদি খরচ সঙ্কুলান হয় ত মহামায়ার পুজো করব।তাই দুর্গোৎসববিধি পড়বার ইচ্ছা হয়েছে।তুই আগামী রবিবার যখন আসবি তখন ঐ পুস্তকখানি সংগ্রহ করে নিয়ে আসবি।

যথাসময়েই শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী বইখানি বিবেকানন্দকে এনে দিয়েছিলেন।চার-পাঁচ দিনের মধ্যে বইটি পড়া শেষ করে বিবেকানন্দ তাঁর স্নেহভাজন শিষ্যের সঙ্গে আবার দেখা হতেই জানিয়েছিলেন, রঘুনন্দনের স্মৃতি বইখানি সব পড়ে ফেলেছি, যদি পারি তো এবার মার পূজা করব।এরপর দীর্ঘদিন কেটে গেছে।পুজোর সময়ও এসে গেল।কিন্তু পুজোর এক সপ্তাহ আগেও এ নিয়ে কোনও কথাবার্তা বা উদ্যোগ দেখা গেল না।হয়ত এ বারও বিবেকানন্দের ইচ্ছাটির পূরণ হল না।কিন্তু হঠাৎই একদিন, তখন পুজোর আর মাত্র চার-পাঁচ দিন বাকি, স্বামীজি কলকাতা থেকে নৌকা করে বেলুড়মঠে ফিরেই রাজা কোথায়? রাজা কোথায়? বলে স্বামী ব্রহ্মানন্দ মহারাজের খোঁজ করতে লাগলেন।

(স্বামী ব্রহ্মানন্দকে স্বামী বিবেকানন্দ রাজা বলে সম্বোধন করতেন)। স্বামী ব্রহ্মানন্দকে দেখতে পেয়েই বিবেকানন্দ বলে উঠলেন এবার মঠে প্রতিমা এনে দুর্গাপূজা করতে হবে, তুমি সব আয়োজন করে ফেল। সবে আর মাত্র চার-পাঁচটা দিন বাকি রয়েছে। এত কম সময়ের মধ্যে সব আয়োজন কীভাবে করবেন, প্রতিমাই বা পাওয়া যাবে কি না, এই সব ভেবে ব্রহ্মানন্দজি বিবেকানন্দের কাছে দুটো দিন সময় চাইলেন।

বিবেকানন্দ বললেন,আমি ভাব-চক্ষে দেখেছি এবার মঠে দুর্গোৎসব হচ্ছে এবং প্রতিমায় মার পূজা হচ্ছে। স্বামী ব্রহ্মানন্দজিও তাঁর এক অদ্ভুত কথা স্বামী বিবেকানন্দকে জানালেন।দিন চারেক আগের ঘটনা। ব্রহ্মানন্দজি বেলুড়মঠের গঙ্গাতীরে বসেছিলেন।হঠাৎই দেখলেন দক্ষিণেশ্বরের দিক থেকে মা দুর্গা গঙ্গা পার হয়ে মঠের বেলগাছতলায় এসে উঠলেন। স্বামীজি আর ব্রহ্মানন্দ মহারাজের মধ্যেকার এই সব কথাবার্তা বেলুড়মঠের অন্যান্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়তেই বেশ হই হই পড়ে গেল।

ব্রহ্মানন্দ মহারাজ ব্রহ্মাচারী কৃষ্ণলালকে কলকাতার কুমারটুলিতে পাঠালেন কোনও প্রতিমা পাওয়া যাবে কি না দেখে আসতে।আর কী আশ্চর্য! ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল কুমারটুলিতে গিয়ে দেখলেন যে মাত্র একটিই সুন্দর প্রতিমা সেখানে অবশিষ্ট রয়েছে।যিনি বা যাঁরা সেই প্রতিমাটি তৈরি করতে দিয়েছিলেন, সে দিনও পর্যন্ত তাঁরা সেটি নিতে আসেননি।ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলাল শিল্পীকে ওই প্রতিমাটি পাওয়া যাবে কি না জিজ্ঞাসা করতে শিল্পী একটি দিন দেখে নেওয়ার সময় চাইলেন। বেলুড়মঠে ফিরে এসে এই খবর স্বামী বিবেকানন্দকে জানাতেই তিনি ব্রহ্মচারী কৃষ্ণলালকে বললেন,যেমন করেই হোক তুমি প্রতিমাখানি নিয়ে আসবে।

লেখক: অরুন শীল সাংবাদিক ও যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট.

 

এইবেলাডটকম/পিসি 

 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71