মঙ্গলবার, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৪ঠা পৌষ ১৪২৫
 
 
স্মরণ করি ‘নয়া ধানের আঘ্রানে পাগল’ হেমাঙ্গ বিশ্বাসকে
প্রকাশ: ১২:০৮ pm ১৫-১২-২০১৬ হালনাগাদ: ১২:০৮ pm ১৫-১২-২০১৬
 
 
 


পাপিয়া মিত্র : যে জিনিসটা তাঁর শিশুমনকে সব চেয়ে বেশি আঘাত দিত সেটা হল শিল্পী হিসেবে, ঢুলি হিসেবে, গীতিকার হিসেবে যারা তাঁকে মুগ্ধ করত, তারাই যখন নানা ভাবে উৎপীড়িত হত।

এই মানবতাবোধই ক্রমে তাঁর কিশোরমনে এনেছিল স্বদেশচেতনা। শ্রমজীবী মানুষের মুখে যে সব লোকায়ত সুর ঘুরে বেড়াত সেই সুরগুলিই তাঁর সঙ্গীত-জীবনের বুনিয়াদ। জমিদার-পুত্র হয়েও এই একাত্মবোধই শৈশবেই তাঁকে জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে তোলে। ১৮ বছর বয়সে তিনি আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করেন ও কারারুদ্ধ হন, ফলে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন।

বহুমুখী প্রতিভার এক অগাধ ভাণ্ডার, মূলত ভাটিয়ালি ও লোকগায়ক, গণসঙ্গীতে দিয়েছিলেন নতুন রূপ। ধানের গন্ধে বড়ো হয়ে ওঠা ‘সুজন নাইয়া’র জন্মদিন আজ, ১৪ ডিসেম্বর (১৯১২)। তিনি হেমাঙ্গ বিশ্বাস। মাঠে-প্রান্তরের শ্রমজীবী মানুষের মাঝে বড়ো হয়ে উঠেছিলেন মাটির কাছাকাছি থাকা হেমাঙ্গ। অসমের শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জের মিরাশি গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা হরকুমার বিশ্বাস ও মা সরোজিনী বিশ্বাস।

হেমাঙ্গের লেখা থেকে জানা যায়, মিরাশি গ্রামে ছিল শালি ধানের মাঠ। আশ্বিন-কার্তিক মাসে সড়কের মাথায়, আলের ধারে ঢেউ খেলত ময়নাশাইল, কার্তিকশাইল, কালিজিয়া, কৃষ্ণচূড়া ধান। সেই সব ধানের নানা রঙ, হরেক গন্ধ। কচি ধানের শিষ টেনে দুধ খেতেন ছোট্ট লালুবাবু ওরফে হেমাঙ্গ বিশ্বাস। এ ছবি কোনো স্নেহশীল চাষির চোখে পড়লে বলতেন, “ধানের বুকে ওখন ক্ষীর, ছিড়ো না, পাপ হয়”। এর পরে বহু বছর পার হয়ে যায়। বাংলা দু’ভাগ হয়। কলকাতায় বসে ‘ছিন্নমূল’ কবি হেমাঙ্গ লিখলেন, “কার্তিক মাসে বুকে ক্ষীর ক্ষেতের ধানে ধানে, অঘ্রাণে রান্ধুনি পাগল নয়া ধানের আঘ্রাণে”। তাঁর কথায়, “অঘ্রাণে আমাদের দেশ ভারী সুন্দর হয়ে ওঠে। ধানের গন্ধে বড়ো হয়ে উঠেছি। এই ধান আমায় গান দিয়েছে।”

সেই গান কৃষক আন্দোলনকে আরও স্ফুরিত করেছে। কাকডাকা ভোরে হেমাঙ্গর ঘুম ভাঙত। কখনও কাঠের তৈরি পেষা কলে আখমাড়াইদের আওয়াজে, আবার কখনও আহির ভৈঁরোর খুব কাছাকাছি আজানের সুরে। ছোটোবেলার মিউজিক বলতে তাঁর কাছে ছিল আখমাড়াইয়ের ‘গান’ আর আজানের ‘ডাক’।

খেটে খাওয়া মানুষের পাশে থাকা ও তাদের জীবনসংগ্রামের কথা শোনা ছিল হেমাঙ্গের জীবনের বৈশিষ্ট্য। যে হেতু তিনি সিলেট অঞ্চলের মানুষ ছিলেন তাই সেখানকার আঞ্চলিক সুর ভাটিয়ালি ও সারি হেমাঙ্গকে টানত। হবিগঞ্জ হাইস্কুল থেকে পাশ করে শ্রীহট্ট মুরারিচাঁদ কলেজে পড়ার সময়ে তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন। আইন অমান্য আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে লবণের প্যাকেট হাতে ত্রিপুরা পর্যন্ত হেঁটে প্রচারে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯৩২ সালে কমিউনিস্ট পার্টির সংস্পর্শে আসেন। পরে কারাবন্দি অবস্থায় যক্ষ্মারোগে আক্রান্ত হলে শারীরিক অসুস্থতার কারণে মুক্তি পান। ১৯৪৮-এ তেলেঙ্গনা আন্দোলনের সময়ে ফের গ্রেফতার হয়ে তিন বছর কারারুদ্ধ রইলেন। নানা বিপদসংকুল পথে জীবন এগিয়ে চলল। কখনও মাথা হেঁট করতে বা মন খারাপ করতে দেখা যায়নি।

শ্রমজীবী মানুষদের সাংস্কৃতিক মঞ্চে আনার এক অক্লান্ত প্রয়াস ছিল তাঁর। মাটির সুরের গান, প্রান্তিক মানুষের লৌকিক আঙ্গিক, তাঁদের বাচনভঙ্গিই তাঁর কাছে এক সময়ে মানুষের গান হয়ে উঠল। লোকসঙ্গীত ও গণসঙ্গীতের ক্ষেত্রে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। হেমাঙ্গের কর্মকাণ্ডের বিরাট দিক ছিল অসমে গণনাট্য ও গণসংস্কৃতি গড়ে তোলা। অসমিয়া সুর তাঁকে খুব  আকৃষ্ট করত। তাই নানা সুর নিয়ে তিনি নিরন্তর গবেষণা চালিয়ে গিয়েছেন।

সে সময়ের ‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান’, ‘কিষাণ ভাই তোর সোনার ধানে বর্গী নামে’, ‘তোর মরা গাঙে আইল এ বার বান’ ইত্যাদি গান বাংলা ও অসমের প্রাণে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল। অসমে তাঁর সঙ্গে ছিলেন বিনোদবিহারী চক্রবর্তী, সাহিত্যিক অশোকবিজয় রাহা, সেতার-বাদক কুমুদ গোস্বামী প্রমুখ। অসমিয়াদের ভালোবাসা থেকে নিজের বাড়ির নাম রাখলেন ‘জিরণি’ অর্থাৎ ‘বিশ্রাম’। চিন-ভারত মৈত্রীর ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। বাংলায় অনুবাদ করেন বহু চিনা ভাষার গান। দু’বার চিনে গিয়েছিলেন। হেমাঙ্গ শব্দের চিনা অনুবাদ করেন ‘চিন শিন’।

শিয়াখালার বেণীমাধব বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের স্ত্রী রাণু বিশ্বাস। বিশ্বাস-দম্পতির পুত্র মৈনাক ও কন্যা রঙ্গিলী। স্ত্রী রানু বিশ্বাস শুনিয়েছিলেন তাঁর তাৎক্ষণিক গান বাঁধার কথা। মৈনাককে (লু সুন) শান্ত করার জন্য বা ঘুম পাড়ানোর জন্য গান ধরতেন ‘কচি কচি কলাপাতা লাড়ু চড়ে, আমার লু সুন ঘুমে ঘুমে ঢলে পড়ে’। ১৯৪৩-এর মন্বন্তরের তাৎক্ষণিক গান বাঁধলেন ‘মন্বন্তরে মরেনি মানুষ, মরেছিল মানবতা’। এই ভাবে পিট সিগারের ‘উই শ্যাল ওভারকাম’-এর তাৎক্ষণিক বঙ্গ সংস্করণ ‘আমরা করব জয়’ সর্বজনবিদিত। এ ভাবে তৈরি হয়েছে বহুল প্রচারিত প্রচুর গান।

পঞ্চাশের দশকের শুরুতে বা তারও আগে নিজের লেখা ও সুর দেওয়া গানে হেমাঙ্গ দেশ তোলপাড় করেছিলেন। ‘মাউন্টব্যাটেন’ আমাকে উদ্বেল করেছিল, বলছিলেন মৃণাল সেন। ওঁর বিশ্বাস ও আদর্শ থেকে এক পা-ও সরে দাঁড়াননি। আইপিটিএ-র প্রতিষ্ঠাকালে অনেকেই একটি আদর্শ সামনে রেখে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু পরে বাম-রাজনীতিতে এল শত মতানৈক্য। নিজের বিশ্বাসের প্রতি অটল থেকে কখনও মাথা নোয়াননি। বিহু-ভাওয়াইয়া-ভাটিয়ালির সুরে গাওয়া গান নানা প্রান্তরের মানুষকে উজ্জীবিত করেছেন। কল্যাণ সেনবরাটের কথায়, “লোকসুর ও লোককথা নিয়ে হেমাঙ্গদা বিপ্লবের ও আন্দোলনের গান গেয়েছেন। লোকসঙ্গীত মিশে গিয়েছিল গণসঙ্গীতে। ওঁর কাছে গান শিখতে গিয়ে শিখেছিলাম সঙ্গীত কী ভাবে পরিচালনা করতে হয়”। পরিচালনক্ষমতা  ছিল অসাধারণ। ওঁর  হাত ধরে ভূপেন হাজারিকা, নির্মলেন্দু চৌধুরী, মঘা ওঝাই গণনাট্যে আসেন। কলকাতা থেকে শম্ভু  ভট্টাচার্য ও মন্টু ঘোষকে অসমের গণনাট্য স্কোয়াডে  নিয়ে গিয়েছিলেন প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য।

হেমাঙ্গ বিশ্বাস বিশ্বাস করতেন জাতীয়তাবোধ যখন আন্তর্জাতিকতাবাদের মোহনায় এসে মেশে তখনই গণসঙ্গীতের জন্ম। 

এইবেলাডটকম/এএস

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71