শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৬ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
সৎসঙ্গের অবিচ্ছেদ্য অংশ শহীদ প্যারী মোহন আদিত্য
প্রকাশ: ০৪:৩৬ pm ০৬-১২-২০১৭ হালনাগাদ: ০৪:৪১ pm ০৬-১২-২০১৭
 
মোঃ বেলায়েত হোসেন (বীর মুক্তিযোদ্ধা)
 
 
 
 


মুক্তিযুদ্ধের সময়ে টাঙ্গাইলে পাকিস্তান রক্ষার নামে স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতা বিচ্ছিন্ন কোন ঘটনা নয়। সারা বাংলাদেশের ঘটনা প্রবাহের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ মাত্র। ৭ই মার্চ ১৯৭১ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভষণে-এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম। এ ভাষণ শুনেই প্যারী মোহন আদিত্য বীরপ্রতীক মোঃ খোরশেদ আলম তালুকদারের কাছে তাঁর বড়ীতে ৮ মার্চ সকালেই চলে যায়। মোঃ খোরশেদ আলম তালুকদার আমার আত্বিয়। আমিও গিয়ে দেখি প্যারী মোহন বাড়ীর সামনে মাচাতে বসে আছে। 

প্যারী মোহন আদিত্যের পরিবার স্বচ্ছল ছিলনা। তিনি কঠোর পরিশ্রম করত। লোহার দোকানে লোহার জনিসপত্র তৈরী করে তা আবার নিজেই বাজারজাত করত। চার ভাইয়ের মধ্যে প্যারী মোহন ছিল দ্বিতীয়। তাঁর উপরেই ছিল সংসারের ভার। লোহার দোকানেরর কাজের পাশাপাশী পাকুটিয়া বাজারে একটি মুদির দোকানও দিয়ে ছিল। সেই দোকানে বীরপ্রতীক মোঃ খোরশেদ আলম তালুকদার সহ পাকুটিয়ার আশে পাশের গ্রামের অনেকেই ওখানে বসতেন। প্যারী মোহন আদিত্য গল্প লিখত, কবিতা লিখত, নাটক-গান-বাজনা এমন কি যাত্রাও করত। তার লেখা গল্প শুনার জন্য ঐ দোকানে আড্ডা জমত। দেশের প্রতি ভালবাসা, মানুষের প্রতি ভালবাসা; তা দেখে আমি অবাক ছিলাম।

শ্রীশ্রীঠাকুর অনুকূল চন্দ্রের পরম ভক্ত ছিল প্যারী মোহন আদিত্য। ১৯৫৮ সনে ভারতের বিহার থেকে মাথায় করে ঠাকুরের পাদুকা এই পাকুটিয়াতে নিয়ে আসে। আমি ঐদিন বুঝলাম প্যারী মোহন কত বড় একজন ভক্ত। আমার বাড়ী থেকে আশ্রম কোয়াটার মাইল।  ঠাকুরের পাদুকা নিয়ে আসতেছে শুনে মুহূর্তেই ছড়ে পড়ল তা সবখানে। এলাকার মানুষ দেখার জন্য আশ্রমে ছুটে চলল। ঐ সময় সারাদেশ থেকে অনেক ভক্ত মাঘী পূর্ণিমা উৎসবে আসছে। তখন সৎসঙ্গে এত দল ছিল না। সবাই একছিল।

ঠাকুরের পাদুকা নিয়ে আসার সময় কি যে আবেগ ছিল তা, বুঝানো যাবে না। আজকের মত মোবাইল বা ক্যামেরা যদি থাকত তা’হলে আজকের মানুষ, আজকের ভক্তগণ তা দেখে বুঝত কেমন ভক্ত ছিল প্যারী মোহন আদিত্য। এই গ্রামে প্যারী মোহনের জন্ম না হলে এখানে আশ্রম হত না। আর ঠাকুরের পাদুকাও আসত না। এটা আমাদের এলাকার জন্য গৌরবের।

আজ যেমন বিভিন্ন স্থানে যতায়াত ও যোগাযোগ কত সহজ, তখন তা ছিল অনেক কঠিন। মাইলের পর মাইল প্যারী মোহন হেটে হেটে ঠাকুরের কাজ করত।

আমাকে কাকা বলে ডাকত, একবার আমাকে বলল, ’কাকা চল পাবনা হিমাইতপুর ঠাকুরবাড়ী যাই। আমিতো মাঝে মাঝে যাই এবার তোমাকে নিয়ে যাব। সাথে থাকবে চিড়া, গুর আর মুড়ি। আমি ওর কথা মত দেখে আসলাম পবনা ঠাকুরবাড়ী। আর কি বিশাল মেকানিক্যাল ওযার্কসব। সরকারের নিয়ন্ত্রনে থাকায় আর কিছু দেখতে পারলাম না। ওয়ার্কসবটা ঠাকুর উইল করে দিয়েছেনআছাহাব আসাব উদ্দিন সাহেবকে। ঠাকুরের পৌষ্য পুত্র। 

প্যারী মোহন আদিত্য ছিল একজন সমাজ সেবক ও শ্রীশ্রীঠাকুরের সৎসঙ্গ আশ্রমের এবং সৎসঙ্গ সংবাদের কর্মী। তিনি ছিলেন গ্রাম ও প্রতিবেশীর বন্ধু ও সহযোদ্ধা। লম্বা ও ছিপছিপে দেহের মানুষটি ছিল খুবই সাদা মাটা, তাকে ভাল না বেসে কেউ পারত না।  তার মধ্যে উচ্চাভিলাষ ও অহংকার বোধ ছিল না। তিনি প্রতি বাড়ী-বাড়ী ঘুরে বেড়াত, সবার সুখ-দুঃখের সাথী হত। তার মধ্যে ছিল না কোন ভেদাভেদ, কে হিন্দু, কে মুসলমান। 

১৯৬৪-৬৫ সালে প্যারী মোহন আদিত্য অনেক বিপদের সম্মূখীণ হয়। কিছু কু-প্রকৃতির লোকজনের পরামর্শে  প্যারী মোহনকে বাড়ী থেকে বের করে দেন বড়ভাই রাসবিহারী আদিত্য। প্যারী মোহন আমাদের বাড়ীতে গিয়ে ওঠে। তারপর মধুপুর কয়দিন থাকে। পরে ওদের মামার বাড়ী ধাইরেল গিয়ে কিছুদিন থাকে। তারপর প্যারী মোহনের মামা ও আমি মিলে এটা মিলমিশ করাই। 

১৯৬৪ সালে আশ্রমে ডাকাতি হয়। তাতেও এই ব্যক্তিই টার্গেট ছিল। কিন্তু তিনি অনেক র্ধয্যশীল তাই এ বাধা থেকেও পার পায়।

১৯৬৭ সালে আবারও প্যারী মোহন আদিত্যের ঘরে একটা একটা বড় ধরনের চুরি হয়। কিছু দিন পর দেখা যায় ঐ সমস্ত জিনিস এমন কিছু লোকের কাছে। তারা উক্ত নিজেদের বলে চালিয়ে দিচ্ছে। তাঁর শ্বশুর বাড়ী অনেক ধনাঢ্য ছিল বিধায় তাঁর স্ত্রীর শ্বশুর বাড়ী থেকে পাওয়া। তাও চুরি হয়ে গেল। প্যারী মোহন আদিত্যের বাবা ১৯৬৯ সালে এবং তার পরের বছরই ১৯৭০ সালে মা মারা যাওয়াতে আরো ভেঙ্গে পড়ে। মা-বাবার প্রতি যেমন ছিল শ্রদ্ধা তেমনি বড় ভাই রাসবিহারী আদিত্যের প্রতিও ছিল শ্রদ্ধা ও ভক্তি এবং ছোট ভাইদের প্রতিও ছিল স্নেহ ও ভালবাসা। ঠাকুরের আদর্শ বলতে যা তার সবটাই ছিল প্যারী মোহনের মধ্যে। তাই তো ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র তাঁকে অনেক ভালবেসে তার চাওয়াতেই নিজের পাদুকা প্যারী মোহনের মাথায় তুলে দিলেন আশ্রম প্রতিষ্ঠানের জন্য।

ভক্তপ্যারী মোহন আদিত্য শুধু ঠাকুরের ভক্তই ছিলনা; ছিল মানুষের ভক্ত, গরীব-দুঃখিদের ভক্ত, ছিল দেশপ্রেমীক। তিনি সৎসঙ্গ সংবাদে লেখা-লেখী ও সংবাদিকতার মাধ্যমে মানবতা ও বাঙ্গালী জাতীয়তা বোধ প্রচার করত এবং অংশ নেয় সক্রীয় মুক্তিযুদ্ধা হিসাবে। মুক্তিযুদ্ধাদের সেবা, যত্ন, সংবাদ সংগ্রহে অংশ গ্রহন তার প্রথম কাজ।

বীরপ্রতিক মোঃ খোরশেদ আলম তালুকদার প্যারী মোহন আদিত্যকে অনেক স্নেহ করতেন। তাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয় তার সাথেই। ১৯৭১ এর ২১ মে পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে আক্রমন করে এবং পাকুটিয়া বাজার সহ অনেক ঘর বড়ীতে পাক বাহিনী আগুন ধরিয়ে দেয়। পাকুটিয়া বাজার থেকে প্যারী মোহনকে ঘাটাইল পাক ক্যম্পে ধরে নিয়ে যায়। পরে সে ঐ ক্যাম্প থেকে পালাতে সক্ষম হয়। কি আত্যাচারই যে করে ছিল পাক বহিনী। কেমন অত্যাচার করতে পারে তার প্রমান প্যারী মোহন আদিত্যকে দেখে বুঝা যেত। মানুষটি ফর্সা থাকায় প্রতিটা আঘাত খুবই স্পস্ট দেখা যেত, কি নির্মম অত্যাচারই যে করেছে। তার কিছু দিন পরেই এল তার জীবন অবসান।

১৯৭১ এর ৮ আগষ্ট ১১নং সেক্টরের কাদেরীয়া বহিনীর হেড কোয়াটার কোম্পানীর কমান্ডার খোরশেদ আলম তালুকদার (বীরপ্রতীক) কোম্পানীসহ পাকুটিয়া সৎসঙ্গ আশ্রমে অবস্থান করছিলেন। এমন সময় টাঙ্গাইল হইতে মধুপুর যাওয়ার জন্য পাক হানাদার বাহিনী পাকুটিয়া আশ্রম আক্রমন করে এবং এলোপাথারী গুলি চালায় তখন আশ্রমে অবস্থানরত মুক্তিযোদ্ধারাও পাল্টা গুলি চালায়। এমন সময় পাক হানাদার বাহিনীর গুলি প্যারী মোহন আদিত্যের তলপেটে লাগিয়া বহির হইয়া যায়। মুল মন্দিরে সামনে সে পরে যান। ৩/৪ জন পাক সেনা দৌড়ে গিয়ে টেনে হিচঁরে সামনে নিয়ে এসে লাথি আর বেয়নেট চার্চ করে এবং বলতে থাকে মুক্তি কাহা। এর মধ্যেও প্যারী মোহন তাদের মুখে থু থু ছিটিয়ে দেয়। মোঃ খোরশেদ আলম তার অন্য জোয়ান সহ তিনি নিরাপদ দুরত্বে চলে যান। পাক বহিনীর পাকুটিয়া থেকে চলে গেলে বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে থাকা সবাই আসতে থাকে। আমি ছিলাম অন্য কোম্পানীর জোয়ান বা যোদ্ধা। আমিও শোনা মাত্র এসে প্যারী মোহনের মাথাটা আমার কোলে নিলাম। পরে প্যারী মোহনের বড়ভাই কাদঁতে কাদঁতে এসে আমার কাছে থেকে তিনি তার ভাইকে কোলে তুলে নিলেন। ততক্ষনে প্যারী মোহন আদিত্যের বুকের রক্তে মন্দির প্রঙ্গন ভিজে গিয়েছিল। প্রচন্ড যন্ত্রনায় তাঁর মুখ কুকঁড়ে কুকঁড়ে উঠছে। পিশাচেরা টেনে হিচরে বেয়নেট দিয়ে খঁচিয়ে খুঁচিয়ে ঝাঝরা করে দিয়েছে শরীর। তখন সমস্ত গ্রামে বিরাজ করছিল এক ভুতুরে নিস্তদ্ধতা। শরীরে ক্ষত থেকে ক্রমাগত রক্ত ক্ষরিত হয়ে ভেসে যাচ্ছিল সবুজ ঘাস। তিনি কাঁপা কাঁপা ঠোটে বলল এ দেশ একদিন স্বাধীন হবে, দেশের স্বার্থে জাতির স্বার্থে স্বাধীনতা বিরোধীদের সাথে কোন আপোষ করোনা। এই মুক্তিযুদ্ধের চুড়ান্ত বিজয় আমি দেখে যেতে পারলাম না। আর নাটোদের দেখ। 

প্যারী মোহন আদিত্যের মরদেহ দুদিন পর সৎকার করা হয়। কোথায় করবে তার স্থান ঠিক করতে পারছিল না। আবার যদি আক্রমন চালায় এ ভয়ে। আমি প্যারী মোহনকে আমার কাঁধে করে দাস বাড়ী পর্যন্ত নিয়ে গিয়ে আবার আশ্রমে ফেরত আসি। পরে আশ্রমের দক্ষিন পাশের তার সৎকার করা হয়। আজও শ্বশানটি অবহেলিত ভাবে পড়ে আছে। আজ আশ্রমটি আরো বড় হয়েছে, ঠাকুরের সেই পাদুকা এখনও আছে কিন্তু নেই প্যারী মোহন আদিত্য,  নেই কোন স্থানে প্যারী মোহন আদিত্যের নামটি।

এসএম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71