শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮
শনিবার, ৭ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
হাওরে দুঃখ: ঋণের চাপে 'মাথা নষ্ট' সংখ্যালঘুদের
প্রকাশ: ১০:৫০ am ১৪-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ১০:৫০ am ১৪-০৬-২০১৭
 
 
 


ডেস্ক নিউজ: মাত্র ১০ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন ভাটি তাহিরপুর গ্রামের মতীন্দ্র চন্দ। গ্রামের মানুষের কাছে সুনীল নামে পরিচিত তিনি।

নিজের নামে ঋণ নেওয়ার সুযোগ নেই বলে মতীন্দ্র তার স্ত্রী অর্চনা রানী সরকারের নামে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) উদ্দীপন থেকে এ ঋণটি নিয়েছিলেন।

অর্চনা উদ্দীপনের সদস্য। চাপের কারণে মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে উদ্দীপনের কিস্তির বাকি হাজারখানেক টাকা একসঙ্গে শোধ করে দিয়েছেন মতীন্দ্র।

এখন অপেক্ষা করছেন একটু ভালো দাম পেলে পোষা ছাগলটি বিক্রি করে মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া টাকা শোধ করে দেবেন। অথচ পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে হাওর ডুবে যাওয়ার আগে প্রায় সবটাই শোধ হয়ে এসেছিল অর্চনার নামে নেওয়া উদ্দীপনের ঋণ।


ভাটি তাহিরপুর সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার শনির হাওর ও মাটিয়ান হাওরের মধ্যবর্তী একটি গ্রাম। গত ২৭ মার্চ থেকে সুনামগঞ্জে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে পাহাড়ি ঢল নামা শুরু হয়। এরপর একের পর এক হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় বোরো ধান।

জেলা প্রশাসনের তথ্যানুযায়ী, সুনামগঞ্জে এবার ১৫৪টি হাওরে দুই লাখ ২৩ হাজার ৮২ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছিল। মাটিয়ান হাওর এপ্রিলের শুরুতে ডুবে গেলেও শনির হাওর টিকে ছিল ২৩ এপ্রিল পর্যন্ত।

শনির হাওর রক্ষায় হাওরের মানুষের লড়াইয়ের গল্প সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের মাধ্যমে সারাদেশের মানুষের জানা আছে। হাওরপাড়ের মানুষ যখন মাঠের ধান রক্ষার লড়াইয়ে নিয়োজিত ছিল তখনও এনওজিগুলোর মাঠকর্মীরা তৎপর ছিলেন ঋণের কিস্তি আদায়ে।

মতীন্দ্র তখনই মহাজনের কাছ থেকে সুদে টাকা নিয়ে কিস্তির বাকিটা শোধ করে দিয়েছেন বলে জানালেন। তার কাছে মহাজনের নাম জানতে চাইলে তিনি এড়িয়ে গিয়ে বলেন, 'গেরামের ম্যালা মাইনষে লগি্ন টেকা লাগায়। হাজারে ১০০ টেকা সুদ দেওন লাগে। সুদের টেকা দিলেই অয়। আসল লইয়া কেউ এত মাথা ঘামাইন না।' তিনি বলেন,

'ঋণের চাপে মাথা নষ্ট অবস্থা অয়ছিন। উদ্দীপনের কিস্তিওয়ালারা বাড়িত আইয়া বইয়া থাকতাইন। শরম থাইক্কা বাঁচনের লাইগ্যা লগি্ন টেকা আইন্না কিস্তি শোধ দিছি।'

উদ্দীপনের তাহিরপুর ব্রাঞ্চের ব্যবস্থাপক সবিনয় রায় কিস্তি শোধ করার জন্য কাউকে জবরদস্তি করার অভিযোগ ঠিক নয় বলে দাবি করেন। তার সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার কয়েক দফা মুঠোফোনে আলাপ হয়।

তিনি সকালে কিস্তি আদায়ের জন্য বাড়ি বাড়ি যাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, 'শুধু আমরা না, ব্র্যাক, আশাসহ সব এনজিওই যাচ্ছে। তবে কিস্তি পরিশোধের জন্য কেউ চাপ দিচ্ছে না।

কিস্তি আদায়ের বিষয়ে জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কোনো চিঠি আমরা পাইনি।' পরে বিকেলে দাবি করেন, প্রধানমন্ত্রী কিস্তি আদায় বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে যাওয়ার পর তারা সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্যই গ্রামে গ্রামে যাচ্ছেন।

কেউ নিজে থেকে কিস্তি পরিশোধ করতে চাইলে তা গ্রহণ করছেন। যাদের ঋণ শেষের পথে, তারা কিস্তি শেষ করে নতুন ঋণ নিতে চাইছে। কেউ কেউ নিয়েছেও।

তাহিরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম জানালেন, 'এনজিওগুলোর সমন্বয় সভায় কিস্তি আদায় স্থগিত রাখার নির্দেশ স্পষ্ট করে বলে দেওয়া হয়েছে।

তার পরও কারও কারও বিরুদ্ধে কিস্তি আদায়ের জন্য জোরজবরদস্তি করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।' সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মো. সাবিরুল ইসলাম বলেন, 'এনজিওগুলোকে নিয়ে সভা করা হয়েছে।

রেজুলেশন হয়েছে, কিস্তি আদায় না করার জন্য। প্রত্যেক এনজিওকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। এর পরও কেউ ফসলহারা কৃষক পরিবারের কাছ থেকে বকেয়া কিস্তি আদায় করলে সেটি দেখা হবে।'

উল্লেখ্য, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ৩০ এপ্রিল সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে ত্রাণ বিতরণের করতে গিয়ে কৃষিঋণের অর্ধেক সুদ মওকুফের ঘোষণা দেন এবং এনজিওগুলোকে ঋণের কিস্তি আদায় বন্ধ রাখতে বলেন। সবাইকে নতুন করে ঋণ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হবে বলেও জানান।

প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণার পর একটু রাখঢাক করা হলেও হাওরের কোথাও এনজিওদের কিস্তি আদায় বন্ধ হয়নি বলে দাবি করেন পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পীযুষ পুরকায়স্থ টিটু।

গত শুক্রবার সন্ধ্যায় 'সুনামগঞ্জের খবর' নামে স্থানীয় একটি দৈনিক পত্রিকার কার্যালয়ে ব্র্যাকের সিনিয়র মিডিয়া ম্যানেজার মাহবুবুল আলম কবীরের সঙ্গে আলাপের একপর্যায়ে তিনি এ অভিযোগ আনেন।

ব্র্যাকের এই কর্মকর্তা স্থানীয় সাংবাদিক ও সুধীজনের কাছে এরই মধ্যে ব্র্যাকের পক্ষে ১৬ কোটি টাকা ত্রাণ সহায়তা দেওয়ার কথা জানিয়ে বলেন, দ্বিতীয় দফায় তারা আরও ত্রাণ কর্মসূচি হাতে নিতে যাচ্ছেন এবং সে জন্য হাওরের মানুষের অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনগুলো নির্ধারণের চেষ্টা করছেন।

ওই আলাপচারিতায় উপস্থিত জেলা সিপিবির সভাপতি চিত্তরঞ্জন তালুকদার, দৈনিক সমকালের জেলা প্রতিনিধি ও স্থানীয় দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর সম্পাদক পঙ্কজ দে, হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সদস্য সচিব বিন্দু তালুকদার, পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি কাসমির রেজা, সাধারণ সম্পাদক পীযুষ পুরকায়স্থ টিটু প্রমুখ অনেক করণীয়ের মধ্যে সর্বাগ্রে এনজিওগুলোর কিস্তি আদায় বন্ধের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

উত্তরে মাহবুবুল আলম কবীর বলেন, ব্র্যাকের পক্ষ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত হাওরাঞ্চলে ঋণের কিস্তি ও সঞ্চয়ের বিষয়ে কোনো ধরনের চাপ না দিতে বলা হয়েছে। শুধু তাই নয়, সদস্যদের চাহিদামতো সঞ্চয় ফেরত এবং প্রয়োজনে ঋণ দেওয়ারও বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ১১ মে ব্র্যাকের মাইক্রোফাইনান্স কর্মসূচির পরিচালকের এই নির্দেশ মাঠ পর্যায়ে পাঠানো হয়।

পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সাধারণ সম্পাদক পীযুষ পুরকায়স্থ টিটু ওই আলাপচারিতার ফাঁকেই মুঠোফোনে মাহবুবুল আলম কবীরকে তাহিরপুর বাজার সমিতির সভাপতি দিলীপ চন্দকে ধরিয়ে দেন।

পরে সমকালের পক্ষে দিলীপ চন্দের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ব্র্যাক, আশা ও উদ্দীপন তিনটি এনজিওর কাছেই তার ঋণ রয়েছে এবং সবাই মিলে কিস্তির তাগাদা দিয়ে তার জীবন ওষ্ঠাগত করে তুলেছে।

ব্র্যাকের কাছ থেকে সাত লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। শেষ দুই কিস্তির টাকা এখন আর দিতে পারছেন না। শুধু ব্র্যাক নয়, অন্য ঋণদাতাদেরও নিজের অক্ষমতার কথা জানিয়ে দিয়েছেন।

মাহবুবুল আলম কবীর তখনই এ বিষয়ে কিছু বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে ঢাকায় ফিরে জানান, কিস্তি স্থগিতের সুবিধাটি শুধুই কৃষকদের জন্য প্রযোজ্য হবে।

পরে গতকাল দিলীপ চন্দকে ফোনে বিষয়টি জানানো হলে তিনি আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। বলেন, 'আমি ব্যবসা করি। কিন্তু আমারও জমিজমা আছে।

ঘরে ফসল তুলতে পারলে হাজার মণ ধান থাকত এখন। শুধু এইবারই না। গত বছরও ফসলহানির শিকার হয়েছি। আমার ব্যবসা রড-সিমেন্টের। এই আকালে হাওরে কে বিল্ডিং বানাবে? খাবারের দোকান আছে একটা, হাওরে এখন হোটেলে খাওয়া মানুষের কাছে বিলাসিতার সামিল হয়ে গেছে, তাই হোটেলে লালবাতি জ্বলছে।'

সাংবাদিক পঙ্কজ দে প্রায় একই কথা বললেন। তিনি বলেন, 'হাওরে ফসলহানি হলে ধনী-গরিব এক কাতারে এসে দাঁড়ায়। তা ছাড়া আমাদের কাছে অজস্র প্রমাণ আছে এনজিওগুলো সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে ঠিকই ফসলহারা কৃষকদের দুয়ারে হাজির হচ্ছে কিস্তি আদায়ের জন্য। কিস্তি না দিলে পরের বছর ঋণ পাবে না, এ ধরনের নানা ভয়ভীতিও দেখাচ্ছে।

এনজিওগুলো মাঠে কত টাকা ঋণ দিয়ে রেখেছে তা আমাদের জানা নেই। তবে খোঁজখবর নিয়ে এটা নিশ্চিত হয়েছি, কৃষি ব্যাংক ও বিআরডিবিসহ ২০টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গত জুন পর্যন্ত সুনামগঞ্জের এক লাখ ৭৩ হাজার ৬৩১ জন কৃষককে ৩০২ কোটি ৩৮ লাখ ৫৭ হাজার টাকা কৃষি ঋণ দিয়েছে।

প্রায় তিন হাজার কোটি টাকার ফসল হারানো কৃষক কি ঋণ মওকুফের আশা করতে পারেন না? ঋণ মওকুফ তো দূরের কথা, নতুন করে ঋণ পাবেন কি-না এ নিয়ে ধূম্রজাল কাটেনি এখনও। অথচ ঋণ নেই হাওরে এমন কৃষক খুঁজে পাওয়া কঠিন।' খবর: সমকাল

 

এইবেলাডটকম/পিসিএস 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71