বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
হারিয়ে গেছে হরিশঙ্কর-বাসুদেব মূর্তিসহ প্রত্নপ্রমাণ
প্রকাশ: ০৫:২৮ pm ১৩-০৪-২০১৮ হালনাগাদ: ০৫:২৮ pm ১৩-০৪-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


ঢাকার হাজার বছরের বেশি সময়ের প্রাচীনত্বের প্রত্নপ্রমাণগুলো এখন নিখোঁজ। ব্রিটিশ আমলে পিলখানায় পাওয়া গিয়েছিল প্রায় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রা। চকবাজারে পাওয়া গিয়েছিল একাদশ-দ্বাদশ শতাব্দীর বাসুদেব মূর্তি। তেজগাঁওয়ে পাওয়া গিয়েছিল সেন আমলের হরিশঙ্কর মূর্তি। ঢাকার এই সব প্রাচীন নিদর্শন এখন আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

উল্লিখিত প্রাচীন প্রত্নসম্পদের বর্তমান অবস্থান বিষয়ে প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাসবিষয়ক গবেষক এবং বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মিউজিয়ামসহ সংশ্নিষ্ট সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে খোঁজ করে কোনো সন্ধানই পাওয়া যাচ্ছে না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে পরিচালিত ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি রাজধানী ঢাকার প্রাচীন শিলালিপি এবং স্থাপত্য-সংশ্নিষ্ট অন্যান্য প্রত্নসম্পদ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনুসন্ধান চালিয়ে আসছে। খোঁজ করতে গিয়ে তারাও উল্লিখিত প্রত্নসম্পদের সন্ধান পায়নি। কমিটির মতে, ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের প্রাচীন ইতিহাস চর্চা উপেক্ষিত হয়ে আসছে। 

এর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন প্রত্নসম্পদ পিলখানায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রা। খ্রিষ্টীয় বিশ শতকের প্রথমভাগে এটি পাওয়া গিয়েছিল বিজিবি সদর দপ্তর চত্বরের একটি প্রাচীন পুকুরের কাছে। মুদ্রাটির প্রতিলিপি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯১০ খ্রিষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে জার্নাল অব দি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গলের নিউ সিরিজ ষষ্ঠ খণ্ডে, প্রত্নতত্ত্ববিদ এইচ ই স্ট্যাপলটন-এর লেখা 'কনট্রিবিউশন্স টু দ্য হিসট্রি অ্যান্ড এথনোলজি অব নর্থ ইস্টার্ন ইন্ডিয়া' শীর্ষক প্রবন্ধের অংশ হিসেবে। 

১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয় ঢাকা মিউজিয়াম, যার বর্তমান নাম বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। ঢাকা মিউজিয়াম প্রতিষ্ঠার আগে বাংলাদেশে প্রাপ্ত প্রত্নসম্পদের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নিদর্শন রক্ষিত হয়েছে কলকাতার কয়েকটি জাদুঘরে। পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রার বর্তমান অবস্থান বিষয়ে ভারতের কলকাতার ভারতীয় মিউজিয়াম, আশুতোষ মিউজিয়াম, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বেঙ্গল মিউজিয়াম, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকার মিউজিয়াম, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষৎ মিউজিয়ামসহ সংশ্নিষ্ট স্থানগুলোতে খোঁজ নিয়েছে ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটি। খোঁজ নিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর এবং বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে। কিন্তু খোঁজ পাওয়া যায়নি পিলখানায় প্রাপ্ত সেই প্রাচীন মুদ্রার। 

পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন স্বর্ণমুদ্রাটি এইচ ই স্ট্যাপলটন গুপ্ত আমলের বলে মত ব্যক্ত করেন। তিনি উল্লেখ করেন, মুদ্রার এক পিঠে রয়েছে ধনুকধারী রাজা। অপর পিঠে রয়েছে রানী বা দেবী। তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, মুদ্রাটির ধরন সব অর্থেই নতুন। আহমদ হাসান দানী পিলখানায় প্রাপ্ত স্বর্ণমুদ্রাটিকে অভিহিত করেছেন 'গুপ্ত অনুকৃতি স্বর্ণমুদ্রা' হিসেবে। তিনি মুদ্রাটিকে সপ্তম শতাব্দীর বলে উল্লেখ করেছেন।

ঢাকার প্রাচীনত্বের আরও একটি নিদর্শন চকবাজারের চুড়িহাট্টা মসজিদ চত্বরের মাটির নিচ থেকে প্রাপ্ত বাসুদেব মূর্তি। চুড়িহাট্টা মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল ১৬৫০ খ্রিষ্টাব্দে সুবেদার শাহ সুজার আমলে। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কারের জন্য চুড়িহাট্টা মসজিদের আঙিনা খননকালে পাথরের বাসুদেব মূর্তি পাওয়া যায়। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রকাশিত রহমান আলী তায়েশের 'তাওয়ারীখে ঢাকা' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, মূর্তিটি তখন মসজিদের সামনে রাস্তার পাশে রাখা ছিল। ব্রিটিশ আমলের শেষভাগে প্রকাশিত যতীন্দ্রমোহন রায়ের 'ঢাকার ইতিহাস' গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়, ঢাকার তৎকালীন ম্যাজিস্ট্রেট জে টি রেঙ্কিন সেই বাসুদেব মূর্তিটি সংগ্রহ করে রেখেছিলেন কালেক্টরেট অফিসে। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত 'বাংলাপিডিয়া'য় উল্লেখ করা হয়, চুড়িহাট্টা মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে পাওয়া বাসুদেব মূর্তিটি রক্ষিত আছে কলকাতা ইন্ডিয়ান মিউজিয়ামে।

ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম বুলেটিন-এর ৩৭ খণ্ডে (২০০২ খ্রিষ্টাব্দ) প্রকাশিত 'পাল সেন স্কাল্পচারস ইন দি আর্কিওলজি সেকশন, ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম' শীর্ষক প্রবন্ধে ভারতীয় মিউজিয়ামে রক্ষিত প্রাচীন মূর্তির যে তালিকা দেওয়া হয়েছে, তাতে ঢাকায় প্রাপ্ত বাসুদেব মূর্তিটির উল্লেখ নেই। ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির একটি প্রতিনিধি দল কলকাতায় ভারতীয় মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান, ঢাকা থেকে প্রাপ্ত কোনো বাসুদেব মূর্তি তাদের সংগ্রহে নেই। অতীতে ছিল কি-না এ বিষয়ে কোনো তথ্যও তাদের জানা নেই। 

এ ব্যাপারে বাংলাপিডিয়ার প্রধান সম্পাদক অধ্যাপক সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমকালকে বলেন, আমরা রেকর্ড থেকে লিখেছিলাম। এখানে কোনো গ্যাপ থাকতে পারে। হতে পারে মূর্তিটি নিখোঁজ হয়ে গেছে অথবা হারিয়ে গেছে।  

মূর্তিটি ঢাকা কালেক্টরেটে রাখা ও হস্তান্তর বিষয়ে কমিটির পক্ষ থেকে ঢাকা জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, মূর্তিটি সংগ্রহ ও হস্তান্তর বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারছেন না। কারণ বাসুদেব মূর্তি বিষয়ে কোনো তথ্য ঢাকা জেলা প্রশাসনের কাছে নেই। 

জনশ্রুতি অনুযায়ী, মন্দিরের স্থলে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের শিলালিপিতে 'কুফর ধ্বংস' করার কথা উল্লেখ থাকা এবং পরবর্তীকালে মসজিদ চত্বরে মাটির নিচ থেকে বাসুদেব মূর্তি উদ্ধারের ঘটনা এখানে প্রাচীন মন্দিরের অস্তিত্বের সমর্থন পাওয়া যায়। খ্রিষ্টীয় ত্রয়োদশ শতকের পর এ দেশে আর পাথরের মূর্তি তৈরি করা হয়নি। 

প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার মতে, তুর্কি অভিযানের আগে এখানে হয়তো মন্দির ছিল। তুর্কি অভিযানের ভয়ে মূর্তিটি মাটির নিচে পুঁতে রাখা হয়। পরবর্তীকালে হয়তো অঞ্চলটি জনবিরল এলাকায় পরিণত হয়। পরিত্যক্ত মন্দিরটি একসময় ভগ্ন মন্দিরে পরিণত হয়। মুঘল আমলে ভগ্ন মন্দিরের স্থলে নির্মাণ করা হয় মসজিদ।

ঢাকায় প্রাচীন নগরায়ণের প্রমাণ হিসেবে পণ্ডিতরা তেজগাঁওয়ে প্রাপ্ত হরিশঙ্কর মূর্তিটির কথাও গুরুত্বের সঙ্গে উল্লেখ করে থাকেন। মূর্তিটির কথা প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ও ইতিহাসবিদ ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর লেখা 'সাম ফ্যাক্টস এবাউট ওল্ড ঢাকা' শীর্ষক প্রবন্ধে। 'বেঙ্গল পাস্ট অ্যান্ড প্রেজেন্ট' শীর্ষক জার্নালের ৪১ খণ্ড প্রথম অংশ ১৯৩৬ খ্রিষ্টাব্দের জানুয়ারি-মার্চ সংখ্যায় প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধে ড. ভট্টশালী প্রাক-মুঘল যুগে, এমনকি প্রাক-মুসলিম যুগেও ঢাকায় নগরের অস্তিত্ব ছিল বলে মত দেন। প্রাক-মুসলিম যুগের ঢাকার নগরায়ণের প্রত্নপ্রমাণ হিসেবে প্রবন্ধে তিনি পিলখানায় প্রাপ্ত প্রাচীন মুদ্রা এবং তেজগাঁওয়ে প্রাপ্ত হরিশঙ্কর মূর্তির কথা উল্লেখ করেন। 

তেজগাঁওয়ে একটি প্রাচীন পুকুর খননকালে হরিশঙ্কর মূর্তিটি পাওয়া গিয়েছিল। ড. নলিনীকান্ত ভট্টশালীর মতে, তেজগাঁওয়ে প্রাপ্ত হরিশঙ্কর মূর্তিটি সেন আমলের। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, কালো ক্লোরাইট পাথরের মূর্তিটির উচ্চতা আড়াই ফুট। মূর্তিটির অর্ধেক অংশ হরি বা বিষ্ণু এবং অর্ধেক অংশ শঙ্কর বা শিব। 

এ ব্যাপারে ঢাকার স্থাপত্যবিষয়ক গ্রন্থ প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ঢাকার প্রাচীনত্ব এখনও নির্ণিত হয়নি। ঢাকার প্রাচীনত্ব নির্ণয় এবং ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে প্রতিবেদন এবং গ্রন্থ প্রণয়ন ও প্রকাশ কমিটির কাজের মূল লক্ষ্য। ঢাকার প্রাচীনত্ব বিষয়ে কমিটি ইতিমধ্যে বেশ তথ্য সংগ্রহ করেছে, পর্যায়ক্রমে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হবে।


বিডি

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71