সোমবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৫ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
হিন্দুদের সঙ্গে বেইমানি, মুসলিম তোষণ করেও লাভ হয়নি যোগেন মন্ডলের
প্রকাশ: ১২:৫৪ pm ৩০-০১-২০১৮ হালনাগাদ: ১০:৪০ am ৩১-০১-২০১৮
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 


পাকিস্তান সরকারের প্রথম আইন এবং শ্রমমন্ত্রী হয়েছিলেন যিনি তিনি কিন্তু বেশিদিন থাকতে পারনেনি সে দেশে৷ একরাশ হতাশা নিয়ে পাকিস্থান ত্যাগ করে ফিরে এসেছিলেন ভারতবর্ষেই৷ সেই ব্যক্তি হলেন বরিশালের যোগেন মন্ডল ৷ এটাই বড় ট্রাজেটি যে স্বাধীন ভারতে দলিতরা নিরাপদ নয় বরং পাকিস্তান অনেক নিরাপদ ভেবে পাকিস্তানের দাবিকে সমর্থন জানিয়েছিলেন যে বঙ্গসন্তান, বছর তিনেক কাটতে না কাটতে তাঁর মোহভঙ্গ হয়েছিল৷ জিন্নার ভরসায় পাকিস্তানে গেলেও ১৯৫০ সালে হতাশ এই বাঙালিকে ফিরতে হয়েছিল ভারতবর্ষে ৷


১৯০৪ সালের ২৯ জানুয়ারি জন্ম গ্রহণ করেন যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল৷ রাজনৈতিক জীবনের প্রথম দিকে তিনি ছিলেন সুভাষচন্দ্রের অনুগামী৷ সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে কংগ্রেসের দূরত্ব বাড়লে যোগেন যোগ দেন বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকরের শিডিউলড কাস্ট ফেডারেশনে৷ এটা ঘটনা নমঃশূদ্রদের নেতা হওয়ার দরুন যোগেন অনুভব করেছিলেন যুগ যুগ ধরে এদেশের বর্ণ হিন্দুদের কাছে শূদ্ররা কতটা অবহেলিত ও অত্যাচারিত ৷ যার ফলে তাঁর উপলব্ধি হয়েছিল, নিজেকে এবং শূদ্রদের হিন্দু বলে মনে করা উচিত নয়৷ পাশাপাশি মুসলিম লিগের পাকিস্তান দাবির সঙ্গে তাঁর কোনও বিরোধ থাকা উচিত নয় বলেই তখন তাঁর ধারণা হয়৷ তখন যোগেন মন্ডলের যুক্তি ছিল, বাংলায় মুসলিমদের অর্থনৈতিক স্বার্থ আর তপশিলী জাতিদের স্বার্থ একই রকম, তাছাড়া তপশিলী জাতি এবং মুসলমান উভয়ই শিক্ষাগত দিক থেকে পিছিয়ে রয়েছে৷

সেই সময় পূর্ববঙ্গে বসবাসকারী কৃষিজীবী নমঃশূদ্ররাই ছিলেন হিন্দুদের একটা বড় অংশ৷ বঞ্চিত এই সব মানুষদের দলিত ছাড়াও সেই সময় এদের জাতিগত ভাবে চণ্ডাল বলা হত৷ এদিকে মেকলের ছাঁচে গড়া একদিকে হিন্দু উচ্চ ও মধ্যবিত্ত এবং অন্যদিকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জেরে সুবিধাভোগী জমিদার -শ্রেণির বেশির ভাগটাই ছিল হিন্দু উচ্চবিত্তের নিয়ন্ত্রণে৷ এরফলে তথাকথিত উচ্চ এবং মধ্যবিত্তের নেতৃত্বে একের এক নানাবিধ আন্দোলন ও সামাজিক সংস্কার সংগঠিত হলেও তার সঙ্গে সেভাবে একাত্মবোধ করেনি সমাজের নিচের তলায় থাকা দলিত এবং মুসলমানেরা৷ ৷ আর এই মানসিক দূরত্বটাই যেন রাজনৈতিক রূপ পায় যোগেন্দ্রনাথের ভাবনায়৷

এতদিনের সামাজিক প্রেক্ষাপটকে মাথায় রেখে যোগেন্দ্রনাথ আশংকা করেছিলেন , বর্ণহিন্দুদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ক্ষমতায় এসে শাসন করলে দলিতদের স্বার্থরক্ষা সম্ভব নয়৷ বিশেষত ১৯৪৬ সালে কংগ্রেসের সঙ্গে আম্বেদকরের বিরোধ চরমে ওঠে এবং কংগ্রেস লেজিসলেটিভ অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে আম্বেদকরকে হারাতে উদ্যোগী হয়৷ তখন যোগেন মন্ডল ঝুঁকে পড়েন বাবাসাহেবের দিকে ৷ মূলত তাঁরই উদ্যোগে এবং মুসলিম লিগ ও অ্যাংলো -ইন্ডিয়ান সদস্যদের সমর্থনে বাংলা থেকে আম্বেদকরের সেই সময় নির্বাচনী জয় আসে৷

আবার এটাও ঠিক মুসলিম লিগেরও তখন যোগেন্দ্রনাথের মতো একজনকে প্রয়োজন ছিল৷ ফলে পাকিস্তানের জনক বলে খ্যাত মহম্মদ আলি জিন্নাই সেই সময় যোগেনকে আশ্বাস দিয়েছিলেন পাকিস্তানে যে কোনও ধর্মের লোক সেখানে স্বাধীনভাবে তাদের নিজ নিজ ধর্মাচারণ করতে পারবে৷ তারফলে যোগেন মন্ডলের ধারণা হয়েছিল নবগঠিত পাকিস্তানে দলিত হিন্দুদের বেশি নিরাপদ আশ্রয়৷ ব্যাস এরফলে ১৯৪৭ সালের ১৪ অগস্ট পাকিস্তানের জন্ম হলে যোগেনই পাকিস্তানের কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি-র অস্থায়ী চেয়ারম্যান হন এবং আইন ও শ্রমমন্ত্রীর দায়িত্ব পান৷ তাছাড়াও তিনি কমনওয়েলথ ও কাশ্মীর বিষয়ক দ্বিতীয় মন্ত্রীর মর্যাদায় অধিষ্ঠিত ছিলেন।

কিন্তু পাকিস্তানে থাকতে থাকতে মোহভঙ্গ হতে থাকে যোগেনের৷ লক্ষ্য করতে থাকেন সেদেশে দলিতদের উপর কেমন করে আক্রমণ বাড়ছিল৷ বিশেষত জিন্নার মৃত্যু পর সেখানে ধর্মাচারণের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে থাকে৷ পাকিস্তানকে ইসলামি রাষ্ট্র ঘোষণার দাবি জোরদার হতে থাকে এবং যোগেন এর বিরোধিতা করলেও তিনি অনুভব করেন তার কথার গুরুত্ব থাকছে না৷ তিনি মন্ত্রিসভায় আরও দুজন দলিতমন্ত্রীর দাবি তুললেও তৎকালীণ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকাৎ আলি খান তা অগ্রাহ্য করেন৷ ততদিনে তিনি বুঝে ফেলেছেন পাকিস্তানে সংখ্যালঘুরা আদৌ সুরক্ষিত নয়৷

পদে পদে যোগেন মন্ডল অপদস্ত হচ্ছেন মন্ত্রিসভায় ৷ পাকিস্তানের নানা জায়গায় সংখ্যালঘু নিধন শুরু হয়েছে অথচ সরকার নিরব দর্শক৷ ফলে তিনি ১৯৫০ সালে অক্টোবর মাসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর পদত্যাগ পত্র পাঠিয়ে দিলেন৷ তখন নব গঠিত দেশে পশ্চিমী পাকিস্তানীদের হাতেই শুধুমাত্র সংখ্যালঘু বাঙালি হিন্দুরা নিপীড়িত শোষিত হচ্ছিল তা নয়। যোগেন হতাশ হয়েছিলেন পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের আচরণেও । তিনি তার পদত্যাগপত্রে যোগেন উল্লেখ করেছিলেন, এটা বলা অন্যায্য নয় যে পাকিস্তানে বসবাসকারী হিন্দুদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে ‘নিজভূমে পরবাসী’ করা হয়েছে৷

কালের নিয়মে বরিশালের যোগেন মন্ডল পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে ফিরতে চাইলেন৷ ইতিহাস বড় জটিল৷ কটা বছরের ব্যবধানে বদল গেল এত কিছু  ভারতে দলিতরা নিরাপদ নয় বলে দাবি তুলে পাকিস্তানে যিনি গিয়েছিলেন তিনটে বছর কাটতে না কাটতে তাঁকেই ফিরতে হল কলকাতায়৷ তার পরে বেশ কয়েক বছর এই বাংলায় থাকলেও জনগণের কাছে তাঁর তেমন কোনও গুরুত্ব ছিল না৷ ১৯৬৮ সালে ৫ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রথম আইন ও শ্রমমন্ত্রী মৃত্যু হল এই বাংলার বনগাঁয় ৷ তবে তার আগে ১৯৬৭ সালে বারাসাত কেন্দ্র থেকে ভোটে দাঁড়িয়ে হেরেছিলেন বরিশালের যোগেন মন্ডল৷


প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71