মঙ্গলবার, ২০ নভেম্বর ২০১৮
মঙ্গলবার, ৬ই অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের জনক পিসি রায়
প্রকাশ: ১২:৫১ pm ০২-০৮-২০১৬ হালনাগাদ: ১২:৫১ pm ০২-০৮-২০১৬
 
 
 


রাজশাহী প্রতিনিধি : আজ ২আগষ্ট জগত বিখ্যাত বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পিসি রায়) ১৫৫তম জন্মবার্ষিকী। সরকারী উদাসীনতার কারনে পিসি রায়ের স্মৃতিচিহ্ন আজ বিলুপ্তির পথে। এই অমর বিজ্ঞানী খুলনা জেলার পাইকগাছা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী রাড়ুলী গ্রামে ১৮৬১ সালের ২ আগস্ট জন্ম গ্রহণ করেন।

তার জন্ম গৌরবে শুধু তার জন্মভূমি অবহেলিত পদ পাইকগাছা উপজেলার রাড়ুলী গ্রামই ধন্য হয়নি বরং সমগ্র ভারতবর্ষের মানুষ তার জন্ম গৌরবে গৌরবান্বিত।  আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ছিলেন একজন ব্যতিক্রমধর্মী মানুষ। তিনি নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছেন এইভাবে আমি বৈজ্ঞানিকের দলে বৈজ্ঞানিক, ব্যবসায়ী সমাজে ব্যবসায়ী, গ্রাম সেবকদের সাথে গ্রাম সেবক, আর অর্থনীতিবিদদের মহলে অর্থনীতিজ্ঞ।” রসায়ন শাস্ত্রে অসামান্য অবদানের জন্য আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় দুনিয়া জুড়ে পরিচিত হন।

পিতা আরবী, ফার্সী ও ইংরেজী ভাষায় জমিদার হরিশ্চন্দ্র রায়। মাতা ভূমন মোহিনী দেবী একজন গৃহিনী। পিতা-মাতার আদরের সন্তানটি হলেন প্রফুল্ল চন্দ্র রায়। পিতা তাকে ডাকতেন ফুলু বলে। ছোট বেলায় মায়ের নিকট শির হাতেখড়ি। জীবন শুরু হয় পাঁচ বছর বয়স থেকে। এরপর পাঠশালা এবং পরে পিতার প্রতিষ্ঠিত এম.ই. স্কুলে ৯ বছর পর্যন্ত লেখাপড়া করে পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কোলকাতায় চলে যান। ১৮৭২ সালে কোলকাতার হেয়ার স্কুলে ভর্তি হন। ১৮৭৪ সালে ৪র্থ শ্রেনীতে পড়ার সময় গুরুতর রক্ত-আমাশয়ে আক্রান্ত হওয়ায় ২ বছর পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যায়। এই পড়াশুনা বন্ধ হয়ে যাওয়া তার জীবনে আশীর্বাদ হয়ে উঠে। এই সময় পিতা হরিশ চন্দ্র রায়ের লাইব্রেরীতে পড়াশুনা করে পৃথিবীর জ্ঞান ভান্ডারের সন্ধান পান। ১৮৭৬ সালে কেশব চন্দ্রসেন প্রতিষ্ঠিত আলবার্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৮৭৮ সালে তিনি প্রথম বিভাগ পেয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বৃত্তি না পাওয়ায় তার শিকার নিরাশ হলেও তিনি মনে করতেন পরীক্ষার নম্বরই মানুষের জীবনের শেষ কথা নয় যারা পরীক্ষায় ভালো করেছে তারা অনেকেই পরবর্তী জীবনে লোকচুর আড়ালে চলে গেছে। জীবনের ক্ষেত্রে সাফল্যের জন্য স্থির সুষ্ঠুভাবে অধ্যাবসায়ের সঙ্গে শিক্ষালাভ অনেক বেশী ফলপ্রদ।

১৮৮০সালে মেট্রোপলিটন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) থেকে ২য় বিভাগে এফ.এ. পাশ করে প্রেসিডেন্সি কলেজে বি.এ. ভর্তি হন। ১৮৮২ সালে তিনি এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃত্তি লাভ করে লন্ডন চলে যান এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে বি.এস.সি তে ভর্তি হন। ১৮৮৫ সালে ঐ কলেজে পড়ার সময় সিপাহী বিদ্রোহের আগে ও পরে বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে ভারতবর্ষ ও ইংল্যান্ডে আলোড়ন সৃষ্টি করেন। পরবর্তীতে Essay on India নামে প্রবন্ধটি বই আকারে প্রকাশিত হয়। এডিনবার্গ কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বি.এস.সি পাশ করে একই  বিদ্যালয়ে ডক্টরেট ডিগ্রির জন্য গবেষনা শুরু করেন। তারগবেষণার বিষয় ছিলো অন পিরিয়ডিক কাসিফিকেশন অফ এলিমেন্টস।

১৮৮৭ সালে তিনি সফলতার সাথে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষনা পত্রটি শ্রেষ্ঠ বিবেচিত হওয়ায় তাকে ১০০ পাউন্ড হোপ প্রাইজ পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। ডক্টরেট ডিগ্রি পাওয়ার পরও তিনি আরও এক বছর অন এ্যানালিসিস অফ ডাবল সালফেটস এন্ডদেয়ার কৃস্টাল বিহেভিয়ার বিষয়ে সেখানেই গবেষনা করেন। পড়াশুনা শেষ করে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় দেশে ফিরে আসেন এবং প্রথমে প্রেসিডেন্সি কলেজ এ এবং পরবর্তীতে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞান কলেজে পালিত অধ্যাপক এবং ১৯৩৭ সাল থেকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমৃত্যু (Emiritius Professor) এমিরিটাস প্রফেসর হিসেবে দ্বায়িত্ব পালন করেন। শিক হিসেবে পড়ানোর সময় উদ্দীপক উপাক্ষান বর্ণনার মত করে সাহিত্যের প্রাঞ্জল ভাষায় রসায়নের বিষয়গুলি তিনি ছাত্রদের নিকট তুলে ধরতেন। আত্মচরিত তিনি বলেছেন প্রেসিডেন্সি কলেজে আমার ২৭ বছর অধ্যাপনা জীবনে আমি সচেতনভাবে প্রধানত: নিচের কাসেই পড়াতাম। কুমোর যেমন কাদার ডেলাকেতার পচ্ছন্দমত আকার দিতে পারে হাই স্কুল থেকে সদ্য কলেজে আসা ছাত্র-ছাত্রীদের তেমনি সুন্দরভাবে গড়ে তোলা যায়। আমি কখনও কোন নির্বাচিত পাঠ্যবই অনুসরন করে পাঠদান দিতাম না। শিক্ষক হিসেবে তিনি বলতেন সর্বত্র জয় অনুসন্ধান করিবে কিন্ত পুত্র ও শিষ্যের নিকট পরাজয় স্বীকার করিয়া সুখীহইবে। একজন শিক্ষক তার ছাত্রকে কতটুকু ভালোবাসেন বা দিকনির্দেশনা দেন তার প্রমান পাওয়া যায় আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের কর্মকান্ডে। ফজলুল হক (শের-এ বাংলা) ৫/৬ দিন কাছে না আসলে একদিন বিকালে প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তার বাসায় যান।

ফজলুল হক তখনও খেলার মাঠে থাকায় তিনি তার জন্য দোয়া করেন। ফজলুল হক ফিরে এসে স্যারকে দেখে তিনি কখন এসেছেন জানতে চাইলে বলেন তোমাদের হিসেবে এক ঘন্টা আর আমার হিসেবে ষাট মিনিট শিক্ষক  হিসেবে  স্যার পিসি রায়ের নিরপেক্ষতা ও ধর্মবিষয়ে উদারতার প্রমান পাওয়া যায়। ১৯১৫ সালে কুদরত-ই খুদা (একমাত্র মুসলিমছাত্র) এম.এস.সি তে (রসায়ন) প্রথম শ্রেনী পাওয়ায় কয়েকজন হিন্দু শিক্ষক তাকে অনুরোধ করেন প্রথম শ্রেণী না দেওয়ার জন্য, কিন্ত আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্ররায় রাজী না হওয়ায় তারা প্রস্তাব দেন একজন হিন্দু ছেলেকে ব্রাকেটে প্রথম শ্রেণী দেয়ার জন্য, তিনি সে প্রস্তাবেও সম্মত হননি।

আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও স্যার জগদীশচন্দ্র বসু একই প্রতিষ্ঠানের, একই সময়কার শিক্ষক ও বিজ্ঞানী ছিলেন। কিন্ত স্যার পি.সি রায়ের ছাত্ররাই পরবর্তীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞানী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন, সে কারনেই স্যার পি.সি.রায়কে বিজ্ঞানীদের বিজ্ঞানী বলা হত। তার কৃতি ছাত্রদের মধ্যে শের-এ বাংলাএ,কে ফজলুল হক, ড: মেঘনাথ সাহা, হেমেন্দ্র কুমার সেন, বিমান বিহারী দে, ড:কুদরত-ই-খুদা, প্রিয়দা ভন্জন রায়, জ্ঞানেন্দ্র নাথ রায়, জ্ঞান চন্দ্র ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্র নাথ মুখোপদ্যায়, রাজেন্দ্র লাল দে, প্রফুল্ল কুমার বসু, বীরেশচন্দ্র গুহ, অসীমা চ্যাটার্জী প্রমূখ।

১৯১২ সালে লন্ডনে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত বিশ্ববিদ্যালয় সমূহের কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট ড: প্রফুল্ল চন্দ্র রায় ও দেবপ্রসাদ সর্বাধিকারীকে প্রতিনিধিনির্বাচিত করে পাঠান। এই সময় ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয় পি.সি. রায়কে সম্মানসূচক ডক্টরেট উপাধি প্রদান করেন। এছাড়া তিনি কলিকাতা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মহীশুর ও বেনারস বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সম্মান সূচক ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন। তার গবেষনা পত্রের জন্য স্যার উইলিয়াম রামসিতাকে অভিনন্দন জানান। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড: এইচ. ভেলি স্বাগত জানিয়ে বলেন, “তিনি (অধ্যাপক রায়) সেই আন্তর্জাতিক খ্যাতনামা প্রতিনিধি যে জাতি সভ্যতার উচ্চস্তরে আরোহণ করত: এমন এক যুগে বহু রাসায়নিক সত্যের আবিস্কার করিয়াছিলেন, যখন এদেশ (ইংল্যান্ড) অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত ছিল। অধ্যাপকরায় এ্যামোনিয়াম নাইট্রাইট সম্মন্ধে যে সত্য প্রমান করিয়াছেন তাহা প্রচলিতমতবাদের বিরোধী।একই বছর স্যার পি.সি রায় ব্রিটিশ সরকার কতৃক Companion of the Indian Empire(C.I.E.) উপাধিতে ভূষিত হন এবং ১৯১৯ সালে নাইট উপাধি দিয়ে ব্রিটিশ সরকার তাকে সম্মানিত করেন। ১৯৩২ সালে স্যার পি.সি রায়ের সত্তরতম জন্মজয়ন্তীর অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন কবিগুরু রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর।

সভাপতির ভাষণে কবিগুরু বলেন আমরা দুজনে সহযাত্রী, কালের তরীতে আমরা প্রায় একঘাটে এসে পৌছেছি। পরে কবিগুরু আচার্যদেবের হাতে একটি তম্রিফলক উপহার দেন। কবির স্বরোচিত দুটি ছত্র তাতে উৎকীর্ণ ছিলো-  প্রেম রসায়নে ওগো সর্বজনপ্রিয় করিলে বিশ্বের জনে আপন আত্মীয়। ১৮৮৭ সালে ডক্টরেট ডিগ্রিলাভের পর বিজ্ঞানের গবেষনায় স্যার পি.সি. রায়ের যে যাত্রা শুরু হয়েছিলো, ১৮৯৫ সালে মারকিউরাসনাইট্রাইট আবিস্কারের ফলে সফল বিজ্ঞানী হিসেবে তার স্বীকৃতি মেলে। এরপরে ১২টি যৌগিক লবন ও ৫ টি থায়োষ্টার আবিস্কার এবং ১৪৫ টি গবেষনা পত্র প্রকাশকরেন। পরবর্তীতে ডাচ একাডেমী লন্ডনের রসায়ন সমিতি তাকে অনারারী ফেলোনির্বাচিত করেন। হিন্দু রসায়ন শাস্ত্রের ইতিহাস লিখে স্যারপি.সি. রায় ১২০০ শতাব্দী এবং তারও পূর্বের ভারতবর্ষের রসায়ন চর্চার ইতিহাসতুলে ধরে প্রমান করেন, যখন ইউরোপ-আমেরিকার মানুষ গাছের ছাল বা বাকল পরে লজ্জা নিবারণ করতো, তখন ভারতবর্ষের মানুষ পারদের ব্যবহার এবং সাতন পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত ছিলো। স্যারপি.সি. রায় ১৮৯২ সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল এ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যাল প্রতিষ্ঠা করেন যা পরর্তীতে বেঙ্গল কেমিকেল এ্যান্ড ফার্মাসিউটিক্যালওয়ার্কাস লি: নামে ১৯০১ সালের ১২ এপ্রিল আত্মপ্রকাশ করে এবং পরবর্তীতে নিজজেলা খুলনার মানুষের কমর্সংস্থানের কথা চিন্তা করে সমবায় ভিত্তিক প্রফুল্ল চন্দ্র কটন টেক্সটাইল মিলস লি: প্রতিষ্টা করেন।

১৯০১ সালের ডিসেম্বরে গান্ধীজি মহামতি গোখলের সাথে কলিকাতায় আসলে, তিনি তার সাথে স্যার পি.সি. রায়ের পরিচয় করিয়ে দেন। গান্ধীজির মুখে প্রবাসী ভারতীয়দের দু:খ-দুর্দশার কথা শুনে কলিকাতাবাসীদের এবিষয়ে জানানোর জন্য ১৯০২ সালের ১৯ জানুয়ারী কলিকাতার আর্লবাট হলে (বর্তমান কফি হাউজ) এক সভার ব্যবস্থা করেন। তখনকার দিনে এই সভা এতই সফল হয়েছিলো কলিকাতার সকল সংবাদপত্র এ বিষয়ে সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ করে। গান্ধীজির অনাড়ম্বরপূর্ন জীবন ও মানুষের জন্য তার মমত্ববোধ স্যার পি.সি. রায়ের জীবনে গভীরভাবে রেখাপাত করেছিলো বলেই তিনি নিজেকে কংগ্রেসের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত করতে পেরেছিলেন। বৃটিশ গোয়েন্দা দপ্তরে স্যার পি.সি. রায়ের নাম লেখা ছিল বিজ্ঞানী বেশে বিপ্লবী। ১৯১৯ সালে ১৮ জানুয়ারী রাউলাট আইনের বিরুদ্ধে টাউন হলে চিত্তরঞ্জন দাসের সভাপতিত্বে এক সভা হয়। স্যার পি.সি.রায় সেখানে যোগ দিয়ে বলে আমি বৈজ্ঞানিক, গবেষণাগারেই আমার কাজ, কিন্ত এমনসময় আসে যখন বৈজ্ঞানিককেও দেশের আহবানে সাড়া দিতে হয়। আমি অনিষ্টকর এইআইনের তীব্র প্রতিবাদ করছি।

১৯২৫ সালের জুনে বর্তমান সাতক্ষিরা জেলার তালার সৈয়দ জালাল উদ্দীন হাসেমী ও ডুমুরিয়ার মাওলানা আহম্মদ আলীকে সঙ্গে নিয়ে অসহযোগ আন্দোলন প্রচারে গান্ধীজি খুলনায় আসলে স্যার .সি. রায় স্টিমার ঘাঠে তাদের স্বাগত জানান। স্যার পি.সি.রায় ছিলেন সম্বর্ধন কমিটির সভাপতি।১৯২৫ সালে কোকনাদ কংগ্রেসের কনফারেন্সে সভাপতি মাওলানা মোহাম্মদ আলীর অনুপস্থিতে কিছু সময় স্যার পি.সি. রায় সভাপতিত্ব করেন। একই সময় পাইকগাছা উপজেলার কাটিপাড়ায় ভারত শেবাশ্রেম নামে একটা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করে নিজ জন্মভূমির এলাকার মানুষকে চরকায় সুতো কাঠার মাধ্যমে স্বদেশী আন্দোলনে উদ্বুদ্ধ করেন। বিজ্ঞান কলেজের বারান্দায় একটা চরকা স্থাপন করে তিনি নিজেও সুতা কাটতেন। ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের লবন আইন অমান্য আন্দোলনের খুলনা জেলার স্থান হিসেবে স্যার পি.সি. রায়ের নিজের গ্রাম রাড়ুলিকে নির্বাচন করেন।

১৯০৩ সালে পিতার প্রতিষ্ঠিত এম.ই স্কুলকে উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয়ে রুপান্তরিত করেন এবং তিনি ও তার ভাই নলিনী কান্ত রায়চৌধুরী রাড়ুলী, বাকা, কাটিপাড়া, খেসরা প্রভৃতি গ্রামের বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের এক সভা থেকে আর.কে.বি.কে. হরিশচন্দ্র ইনষ্টিটিউট নাম করন করেন।একই স্থানে স্যার পিসি রায়ের পিতা উপমহাদেশে নারী শিক্ষার উন্নয়নকল্পে ভূবনমোহিনীর নামে ১৮৫০ সালে গ্রামে বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকরেন। ১৯১৮ সালে বাগেরহাটে তার অর্থানুকূল্যে বাগেরহাট কলেজ স্থাপিত হয় যা পরে স্যার পি.সি. রায়ের আপত্তি সত্বেও তারই ছাত্র শের-এ-বাংলা ফজলুল হকের প্রস্তাবে পি.সি. কলেজ নামে পরিচিতি পায়। এছাড়া সাতক্ষিরা চম্পাপুল স্কুলও স্যার পি.সি. রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রতিষ্ঠিতহয়। উল্লেখ্যঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে পিসি রায় ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত ১ ল ৩৬ হাজারটাকা দান করেন। খুলনার দৌলতপুর বিএল কলেজ, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, কারমাইকেল মেডিকেল কলেজ, বরিশালে অশ্বর্ণী কুমার ইনষ্টিটিউশন, যাদবপুর হাসপাতাল, চিত্তরঞ্জন ক্যান্সার হাসপাতাল সহ প্রায় অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানেতিনি অর্থনৈতিক অনুদান দিয়েছেন। দেশ বিদেশে তার স্থাপিত প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞান সাধনায় স্মরণ করছে সর্বস্তরের মানুষ।স্যার পি.সি.রায় বাঙালী জাতি চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং দেশের সমবায় আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। তদানিন্তন সময়ে পল্লী মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নে সমবায় ব্যাংক পদ্ধতি চালুকরেন।

১৯০৯ সালে নিজ জন্মভূমিতে কো-অপারেটিভ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯২৩ সালে দুর্ভি মোকাবিলায় ধর্মগোলা ও সমবায় ভান্ডার স্থাপনের পরামর্শ দেন।১৯১৭ সালে বেঙ্গল কেমিক্যাল সমবায় সমিতি, ১৯১৮ সালে বঙ্গবাসী কলেজকো-অপারেটিভ ষ্টোর এন্ড কেন্টিন, ১৯২১ বেঙ্গল কো-অপারেটিভ সোসাইটি সহ অনেকসমবায় সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। আজও প্রতিষ্ঠানগুলো স্বমহিমায় এগিয়ে চলছে। দেশ-বিদেশে তার স্থাপিত প্রতিষ্ঠান ও বিজ্ঞান সাধনায় ফলক স্মরণ করে সর্বস্তরের মানুষ। ব্যক্তি জীবনে তিনি ছিলেন অবিবাহিত।

১৯৪৪ সালে ১৬ জুনকোন উত্তরসূরী না রেখে জীবনাবসান ঘটে বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের। শেষ জীবনে তার স্মৃতি শক্তি লোপ পেয়েছিলো, স্পষ্ট করে কথা বলতেপারতেন না, এমন কি নিজের বিছানা ছেড়ে উঠে বসতে পারতেন না। তার মৃত্যুর খবরপেয়েই শের-এ-বাংলা ফজলুল হক, মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিম উদ্দীন, শিক্ষামন্ত্রীনাজিম উদ্দীন খান, সিভিল সাপ্লাই মন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দি ওঅন্যান্য বিশিষ্টজনেরা ছুটে যান শেষ বারের মত এই মহান মানুষকে দেখার জন্য। মৃত্যুর ৬৮ বছর পর ব্রিটেনের বিরল সম্মানে ভূষিত হলেন বিজ্ঞানী স্যার আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় (পি.সি রায়)। ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য কালটিভেশন অব সায়েন্সের এক অনুষ্ঠানেব্রিটেনের রয়্যাল সোসাইটি অব কেমিষ্ট্রির (আরএসসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) রবার্ট পার্কার জানান, তাঁরা বাঙ্গালী বিজ্ঞানী প্রফুল্লচন্দ্র রায়কে কেমিক্যাল ল্যান্ড মার্ক প্লাক” দিয়ে বিশেষ সম্মাননা জানাবেন। এ খবর পেয়ে বিজ্ঞানীর জন্মস্থান পাইকগাছা, খুলনাসহ সর্বত্র ছড়িয়েপড়লে এলাকায় আনন্দের বন্যা বয়েছিল।

রসায়ন গবেষণায় অসামান্য অবদানের কৃতি হিসেবে আরএসসি কেমিক্যাল ল্যান্ড মার্ক প্লার্ক দিয়ে থাকে।বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র বেঙ্গল কেমিক্যালের প্রতিষ্ঠাতা এবং মার্কিউরাসনাইট্রাইটের আবিষ্কারক। এই আবিস্কারের জন্য আরএসসি তাঁকে এ বিরল সম্মাননা জানান। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীর পদচারনা ও নিজ হাতের ছোঁয়ায় অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আজও অবহেলীত রয়েছে। খুলনা জেলা থেকে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেনি পিসি রায়ের জন্মভূমি পর্যন্ত। পাইকগাছা উপজেলা থেকে এখনও বিছিন্ন ফাদার অব নাইট্রাইট খ্যাত বিজ্ঞানী স্যার পিসি রায়ের জন্মস্থান রাড়–লী গ্রামটি আজও অবহেলিত। সরাসরি সড়ক যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যমবোয়ালিয়ায় কপোতা নদের উপর আজও নির্মিত হয়নি ব্রীজটি, কবে হবে তা কেউ বলতে পারেনা। তবে এ অঞ্চলবাসী আশায় বুক বেঁধেছেন। পিসি রায়ের স্মৃতি বিজড়িত ভবনগুলো রক্ষনাবেক্ষণেরঅভাবে ধ্বংস হতে চলেছে। সংরক্ষণে এখনই পদপে না নিলে এক সময় তা কালেরগর্ভেহরিয়ে যাবে। দিন দিন সেগুলো শ্রীহীন হচ্ছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়বিভিন্ন ভাবে অপচেষ্টা চলে পি,সি রায়ের জন্মভূমি স্মৃতি চিহ্ন বসতভিটাদখলের।

এইবেলাডটকম/অরুন/এএন

 

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71