শুক্রবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮
শুক্রবার, ৩০শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫
 
 
‘গৌরাঙ্গ চন্দ্র আদিত্য’ যাত্রার বিবেক
প্রকাশ: ০৯:৪৮ am ২৭-০৭-২০১৭ হালনাগাদ: ০৯:৪৮ am ২৭-০৭-২০১৭
 
এইবেলা ডেস্ক
 
 
 
 



‘যুগের চাকা ঘুরছে উল্টো

ভন ভন করে ভাই,

সাচ্চা পথে হাজার বাঁধা

বাঁচার উপায় নাই।’

 

অথবা

 

‘মানুষের অন্তরে মন ও বিবেক থাকে

মন যা হোক তাই করে ফেলতে বলবে,

আর বিবেক তা নিয়ন্ত্রণ করবে।

বিবেক বলে উঠবে– ‘তুই করিস নারে ভুল।’

এই কথাগুলো যাত্রাশিল্পের বিবেক গৌরাঙ্গ আদিত্য’র। বয়স ৮৫ ছাড়িয়েছে, কিন্তু মনের বয়সে এখনো কিশোর, উদ্যমী ও মিষ্টভাষী। একসময় যাত্রা পরিচালনা করতেন এখন যাত্রার বিবেক চরিত্রে অভিনয় করেন। চার মেয়ে, দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলেই যাত্রার সাথে যুক্ত আছেন।

বাংলাদেশের যাত্রা শিল্পের অন্যতম প্রতিভাবান শিল্পী, গীতিকার ও সুরকার ওস্তাদ গৌরাঙ্গ আদিত্য দেশের অন্যতম প্রবীণতম বিবেক। স্বর্গীয় রমেশ চন্দ্র শীল ও স্বর্গীয় ঊষা রাণীর একমাত্র সন্তান গৌরাঙ্গ চন্দ্র আদিত্য।

নেত্রকোণা জেলার মোহনগঞ্জে বেড়ে ওঠা এই শিল্পীর জন্ম ভারতের নদিয়া জেলার নবদ্বীপ গ্রামে। বাবার পেশা ক্ষৌরকার মানে চুল কাটা। রমেশ শীল চেয়েছিলেন, একমাত্র সন্তান এই পেশায় নিজের জীবন গড়ে তুলুক, কিন্তু গৌরাঙ্গ বেশিদিন এই পেশায় নিজেকে স্থায়ী হতে পারেননি। অবশ্য রমেশ চন্দ্র শীল নিজেও যাত্রা করতেন। গৌরাঙ্গ’র মন পড়ে থাকতো গানের প্রতি। যাত্রাদলের প্রতি। পরে যখন দেখলেন গৌরাঙ্গের ক্ষৌরকার পেশায় মন নেই তখন তিনি গানের হাতেখড়ি দিলেন। পরবর্তীতে ওস্তাদ বীরেন চন্দ্র গোস্বামী, ওস্তাদ বিজয়কৃষ্ণ ভট্টাচার্য ও ওস্তাদ গোপাল দত্তের কাছে উচ্চাঙ্গসঙ্গীতে তালিম নেন গৌরাঙ্গ। কিশোর বয়সে কৃষ্ণলীলায় নদের নিমাই চরিত্রে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে তিনি যাত্রাজীবনে পা রাখলেন। যাত্রাপালার বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করলেও তাঁর আগ্রহ যাত্রপালার বিবেক চরিত্রের প্রতি। কারণ এই চরিত্রে অবচেতন মনের সৎ চিন্তা ও ন্যায়বোধের প্রতিনিধিত্ব করা যায়।

১৮৯৪ সালে যাত্রাপালার এই বিবেক চরিত্রের জন্ম হলেও মনস্তাত্ত্বিক চরিত্রটি প্রথম আবিষ্কার করেন পালাকার অহীভূষণ ভট্টাচার্য। চট্টগ্রামের নামকরা যাত্রাদল বাবুল অপেরায় কাজ করার মধ্যদিয়ে গৌরাঙ্গ’র যাত্রাজীবন শুরু। এইভাবে তিনশরও বেশি যাত্রাপালায় তিনি অভিনয় করেছেন। সেই সময়ে পূর্ব পাকিস্তানে নবরঞ্জন অপেরা, বুলবুল অপেরা, গণেশ অপেরা এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে বাংলাদেশে নবরঞ্জন অপেরা, চারণিক নাট্যগোষ্ঠী, কৃষ্ণকলি অপেরা, বঙ্গশ্রী অপেরা প্রভৃতি যাত্রাদলে তিনি অভিনয় করেন। পঞ্চাশ বছরেরও বেশি সময় তিনি বিবেক চরিত্রে গান গেয়েছেন। যশ-খ্যাতি অর্জন করেছেন।

যাত্রা জগতের সকলেই তাঁর নামটি অতি শ্রদ্ধায় উচ্চারণ করেন। মূলত বিবেকের গান করা এবং বিবেক চরিত্রে অভিনয় করেই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। দেশবরেণ্য শিল্পী কিরণ চন্দ্র রায় তাঁর অনুপ্রেরণায় আজকের এই অবস্থানে। এছাড়া জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ন্যান্সিকেও তিনি গান শিখিয়েছেন। দেশের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো এই গুণীজন কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন।

জাতীয় শিল্পকলা একাডেমী পুরস্কার, অমলেন্দু স্মৃতি পুরস্কার, নেত্রকোণা জেলা শিল্পকলা পরিষদ কর্তৃক সম্মাননা, বাংলাদেশ যাত্রাশিল্পী সমন্বয় পরিষদসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে সংবর্ধনা, পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। অসংখ্য মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন।

২.

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দাপিয়ে বেড়ানো এই শিল্পী বর্তমানে অচল হয়ে ঘরে বন্দি হয়ে আছেন। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণের ফলে তাঁর শরীরের বাম পাশ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে গেছে। ঘর থেকে বের হয়ে যাত্রাপালায় বিবেকের চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন না বলে এখন উপার্জন বন্ধ। হাস্যোজ্জ্বল গৌরাঙ্গ আদিত্য এখন দিন পার করছেন কষ্টের মধ্য দিয়ে। নড়াচড়া করতে না পেরে এখন তিনি ছোট্ট ঘরটিতে ছটফট করছেন। চারিদিকে ছড়িয়ে আছে অসংখ্য সম্মাননা আর ক্রেস্ট। সেইসব পুরানো স্মৃতি হাতড়ে বেড়ানো ছাড়া এখন তাঁর আর কিছুই করার নেই। ঘর থেকে বেরিয়ে যাত্রাপালায় বিবেকের চরিত্রে অভিনয় করার আকুলতায় প্রতিনিয়ত খাবি খাচ্ছেন এই গুণীজন।

সদা হাসোজ্জ্বল তিনি কখনোই কারো মনে আঘাত করে কথা পর্যন্ত বলেননি। ছোট বড় সবাইকেই ভাই বলে সম্বোধন করতেন। মনেপ্রাণে তিনি গানের মানুষ, প্রাণের মানুষ, এই মাটির মানুষ। তিনি এখনো বিশ্বাস করেন, মানুষের ভালবাসা পেতে এবং ভালবাসা দিতে কাজ করেছেন সবসময়। শেষ সময়ে আর কিছু চান না। প্রচণ্ড আশাবাদী হয়ে স্বপ্ন দেখতে চান।

আশাবাদী, স্বপ্নবান এই গুণীজনকে আমাদের উচিত আবার আগের মতো গান গাইবার সুযোগ করে দেয়া, উচিত তাঁর প্রিয় যাত্রাপালার মঞ্চে বিবেকের চরিত্রে অভিনয় করতে দেয়া। দীর্ঘ পঞ্চাশেরও বেশি সময় ধরে তিনি আমাদেরকে যা দিয়েছেন প্রতিদানস্বরূপ কোনো দান দক্ষিণা নয় বরং তাঁর সাথে থেকে তাঁকে আরেকবার যাত্রাপালার মঞ্চে বীরদর্পে সুস্বাগত জানানো আমাদের একান্ত কর্তব্য।

সম্প্রতি তাঁর চিকিৎসার সাহায্যে নাট্য প্রদর্শনী নিয়ে এগিয়ে এসেছে ঢাকার ৫টি নাট্যদল। যৌথভাবে এ নাট্য প্রদর্শনীর আয়োজন করছে থিয়েটার আর্ট ইউনিট, প্রাচ্যনাট স্কুল অব আ্যাকটিং অ্যান্ড ডিজাইন, লোকনাট্য দল (বনানী), সুবচন নাট্য সংসদ এবং ম্যাড থেটার। ২২-৩০ জুলাই পর্যন্ত জাতীয় শিল্পকলায় চলা এই নাট্য প্রদর্শনীতে আমাদের সবারই অংশগ্রহণ করা উচিত। নিজের দায়িত্ববোধ থেকে যাত্রার কিংবদন্তী বিবেক গৌরাঙ্গ চন্দ্র আদিত্যকে আবার আমাদের মাঝে ফিরিয়ে আনা উচিত।

আমি অধীর আগ্রহে গুণী এই শিল্পীর প্রত্যাবর্তনের অপেক্ষায় আছি। 

প্রচ

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71