বুধবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮
বুধবার, ১১ই আশ্বিন ১৪২৫
 
 
‘‘বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে দুর্যোগ এর লক্ষণ"
প্রকাশ: ১১:১৭ pm ২৮-০৫-২০১৭ হালনাগাদ: ১১:১৭ pm ২৮-০৫-২০১৭
 
 
 


শ্যামল রায়: আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনাপত্র, অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির ধারক বাহক রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ কোনপথে যাচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী অধিকাংশ মানুষের মনে আজ এই প্রশ্ন!

মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনা পত্রে সুস্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে মানবিক মর্যাদা, সাম্য, ও সুশাসনের কথা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুতির সময়টা অর্থাৎ ষাটের দশকজুরে পৃথিবীর দেশে দেশে ধনবাদি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে শোষিত মানুষের যে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল সেখানে বিশেষ করে ছাত্র ও শ্রমিক শ্রেনীর মধ্যে মার্ক্সবাদ এর প্রভাব দারুন ভাবে জাগরন ঘটিয়েছিল।

আমি এ ও জানি আমার সাথে অল্প সংখ্যক রাজনৈতিক নেতাকর্মী একমত হবেন যে, মুক্তিযুদ্ধের ক্ষেত্র প্রস্তুতিকালে বঙ্গবন্ধু আওয়ামীলীগ এর চেয়ে ছাত্রলীগ এর উপর বেশী নির্ভরশীল ছিলেন। তখনকার ছাত্রনেতারা ছিলেন অসাধারণ মেধাবী এবং তাদের উদ্বুদ্ধকরণ ক্যাপাসিটি ছিল প্রখর, তাদের বক্তব্য শুনলে মানুষের ক্ষুধা তৃষ্ণা ভুলেযেত।

এখনকার রাজনীতিতে মেধা বা পড়ালেখার বিশেষ প্রয়োজন হয় না, শুধু গায়ে শক্তি হাতে হোন্ডা আর পকেটে কালো টাকা থাকলে তারাই রাজনীতির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেন। ছাত্রলীগ এর রাজনীতি আমিও করেছি, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র হয়েও ঠিকাদারি বা টেন্ডার সিডিউল কেমন তা চোখে দেখি নাই। এখন ছাত্রলীগ ঠিকাদারি বানিজ্যে সর্বক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রকের ভুমিকায়। দলীয় এমপি নেতারা ও তাদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার স্বার্থে এই অপকর্মটির রাস্তা দিন দিন প্রশস্ত করে চলেছেন। ফলে নিজ ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা আভ্যন্তরীণ মারামারি ও খুনখুনিতে লিপ্ত হচ্ছে।

রাজনৈতিক নেতারা দলের মধ্যে ষড়যন্ত্র বা আত্তঘাতি সিদ্ধান্ত গ্রহন করলে অতন্দ্র প্রহরীর ভুমিকায় থাকা সহযোগী সংগঠন সেই ষড়যন্ত্রকারীদের প্রতিহত করবে। বঙ্গবন্ধু যখন ৬ দফা দিয়েছিলেন তখন আওয়ামীলীগ এর ওর্যাকিং কমিটিতে দলের মধ্যে থাকা আত্তঘাতি ষড়যন্ত্রকারীদের প্রভাবে পাশ করাতে পারে নাই। ছাত্রলীগ এর তুখোড় নেতৃত্বের চাপে সেদিন ষড়যন্ত্রকারীরা কচ্ছপের মত তাদের মাথা ভিতরের দিকে লুকিয়ে নিয়েছিলেন।

এখন আর সেই রাজনীতি নাই। কাজেই রাজনৈতিক নেতারা যদি ষড়যন্ত্রকারীদের ক্ষপ্পরে পড়ে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তবে জাতিকে তার মুল্য দিতে হবে।

স্বাধিনতা অর্জনের পরে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আর্দশিক দন্দের ব্যর্থ প্রতিযোগীতার লড়াইয়ে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মুলশক্তি দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে রাষ্ট্র তার সঠিক নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে পারে নাই। ফলে অসময়ে অকারনে জীবন দিতে হয়েছে স্বাধিনতার মুল স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে।

বঙ্গবন্ধুর শাসনামলে যে ভুল রাজনীতির চাড়াগাছগুলো সৃষ্টি হয়েছিল তার হত্যার পরে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সেই গাছগুলোকে বেড়ে উঠার জন্য সার জল দিয়ে খুব যত্ন করেছিলেন। আরেক সামরিক শাসক হোসেন মোহাম্মদ এরশাদের সাশনামলে সেই গাছগুলোর বীজ সারা বাংলাদেশে চাষাবাদ করা হয় এবং ব্যপক ফলন হয় তাতে। তখন থেকেই বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক শক্তির উত্থান ঘটে। সরকারের ছত্রছায়ায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাধানো হয়।

স্বাধীনতা বিরোধী কুখ্যাত রাজাকার মাওলানা মান্নানদের মন্ত্রী সভায় স্থান দিয়ে রাজাকার ধর্ম ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে পূনর্বাসনের সুযোগ করে দেয়া হয়। ১৯৯০ সালে তিন জোটের শরিক সমস্ত রাজনৈতিক দল যুগপৎ দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রামে বহু রক্তের বিনিময়ে জনগনের আন্দোলনের কাছে তিন জোটের রুপরেখা অনুযায়ী সামরিক জান্তা ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলেন। ৯১ এর নির্বাচনে কাকতালীয় ভাবে ক্ষমতায় আসেন বেগম জিয়ার দল বিএনপি। বেগম জিয়া যদি সেদিন ক্ষমতায় এসে তিন জোটের রুপরেখা ছুরে ফেলে না দিতেন, আওয়ামীলীগ পরস্পর বিরোধী বক্তব্য না দিতেন এবং গন আন্দোলনের অর্জনকে সবাই মিলে সুসংহত করতে পারতেন তাহলেও বাংলাদেশ তার সঠিক গতিপথ পরিবর্তন করতে পারত বলে মনে করি না।

একটি জাতি তার জাতিরাষ্ট্র গঠনে ও বিপ্লবউত্তোর জাতীয় ইতিহাস প্রনয়নে একবারই সুযোগ পায়, আমরা ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালে মোট দুই বার সুযোগ পেয়েছিলাম। কিন্তু আমরা রাজনীতিবিদরা তা সঠিক ভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছি। ২০০১ সালে বেগম জিয়ার দল দ্বিতীয় বারের মত নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় এসে যে ভুল রাজনীতির জম্ম দিয়েছিলেন তার চরম মুল্য দিতে হয়েছে ১/১১ সরকারের মাধ্যমে একেবারে তছনছ করে দিয়েছে বিএনপিকে।

এই তছনছ হওয়া বিএনপির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল নিরঙ্কুশ বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসেন শেখ হাসিনার দল আওয়ামীলীগ। ৯০ পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের ভোটের পরিসংখ্যান যদি দেখি তাহলে দেখা যায় আওয়ামীলীগ ৩১%, বিএনপি ২৭%, জাতীয় পার্টি ৬%, জামায়াত ইসলাম ৩%, বাদবাকি অন্যন্য সবদল মিলে ৮% অবশিষ্ট ২৫% ভোট বিএনপি বা আওয়ামীলীগ কারোরই স্থায়ী নয়।

এই ২৫% দলনিরপেক্ষ ভোট যখন যাকে যতটুকু প্রয়োগ করে তাদের সেই রকম বিজয় আমরা দেখতে পাই। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামীলীগ এর নির্বাচনী ইসতেহারকে স্বাগত জানিয়ে এই ভোটাররা শতভাগ ভোট আওয়ামীলীগ জোটকে দিয়েছিল বলেই আওয়ামীলীগ এর এত বড় বিজয় হয়েছিল।

এই ২৫% ভোট যে আওয়ামীলীগ এর স্থায়ী দলীয় ভোট নয় এটা আওয়ামীলীগ ভুলে গিয়েছে। এই ভুলে থাকার রাজনৈতিক মোহে আবদ্ধ হওয়ার সুযোগে দলের আভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রকারীরা দলকে ধীরেধীরে আওয়ামীলীগ এর নীতি আর্দশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ঘোষনা পত্র থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

যার প্রথম লক্ষন পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলাম সংবিধানে রেখে দেয়া, দ্বিতীয় লক্ষন ২০১৪ সালে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচনে ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত করা, তৃতীয় লক্ষন হেফাজতের পরামর্শ অনুযায়ী পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করা, চতুর্থ লক্ষন হেফাজতের নির্দেশে সুপ্রিমকোর্ট চত্তর থেকে ন্যায় বিচারের প্রতিক ভাস্কর্য রাতের আধারে সরাইয়া ফেলা, পঞ্চম লক্ষন মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের মুক্তমনা, মুক্তচিন্তার সংগঠনের কার্যক্রমের উপ পুলিশি নির্যাতন পরিচালনা করা,সর্বশেষ মারাত্বক লক্ষন দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর ব্রাহ্মনবাড়িয়া, গবিন্দগঞ্জ, পটুয়াখালী, বরগুনা, গোপালগঞ্জ, সাতক্ষিরা, নোয়াখালী,মুন্সিগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় সরকারী দলের উগ্রপন্থীরা ক্রমবর্ধমান হারে হামলা লুটপাট, হত্যা ও নির্যাতনের মহোৎসব চালাচ্ছে।

এদেশের সকল ধর্মের মানুষের সম অধিকারের কথা সংবিধানে উল্লেখ থাকলেও আইনের শাসনের দুর্বলতা ও নাগরিক বান্ধব প্রশাসন না হওয়ার কারনে ক্ষমতাসীন দলের সুযোগ সন্ধানীরা সবসময়ে রাজনীতির পেশি শক্তির প্রভাব ব্যবহার করে সমাজের ক্ষতির পাশাপাশি নিজেদের রাজনৈতিক দলের নীতি আর্দশ ও জনপ্রিয়তাকেও প্লান করে দিয়েছে।

এর সাথে নতুন করে যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা বিরোধী কিছু ইসলাম পন্থী রাজনৈতিক শক্তির সাথে সরকার ও আওয়ামীলীগ এর আপোষকামীতার রাজনীতি। হেফাজত ইসলামের নেতাদের কথামত যদি আওয়ামীলীগ তার ধারাবাহিকতা অব্যাহত রাখে তবে আওয়ামীলীগ কেও বেগম জিয়ারমত নিরঙ্কুশ বিজয়ের মত মুল্য দিতে হবে।

যদিও বাংলার মানুষ তা দেখতে চায় না কিন্তু আওয়ামীলীগ কি পারবে এই ধর্ম ব্যবসায়ী আর অসৎ রাজনীতিবিদদের ক্ষপ্পর থেকে বেড় হয়ে আসতে।

পারবে কি মুক্তিযুদ্ধের ঘোষনাপত্র বাস্তবায়ন করতে? এই প্রশ্নটি রেখে সজকের লেখাটি ইতি টানলাম।

 

লেখক: শ্যামল রায়, প্রধান সমন্বয়কারী বাংলাদেশ জাতীয় হিন্দু মহাজোট।

 

এইবেলাডটকম

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
Study in RUSSIA
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71