সোমবার, ১৭ ডিসেম্বর ২০১৮
সোমবার, ৩রা পৌষ ১৪২৫
 
 
জৈব প্রযুক্তি ব্যবহারের এক জন মডেল কৃষানী শ্যামনগরের গীতা রানী
প্রকাশ: ০৯:০২ pm ২২-০৬-২০১৭ হালনাগাদ: ০৯:০২ pm ২২-০৬-২০১৭
 
 
 


রনজিৎ বর্মন; (শ্যামনগর, সাতক্ষীরা ,প্রতিনিধি): উপকুলীয় এলাকার কৃষি জলবায়ু পরিবর্তন জনিত কারণ, লবনাক্ততার প্রকোপ, খরার প্রবনতা সহ অন্যান্য কারণে বিপন্ন হতে চলেছে।

জলাবদ্ধতা,মিষ্টি পানির সংকট ফসলে মাত্রাতিরিক্ত রাসায়নিক সার কীটনাশকের ব্যবহারে চাহিদার তুলনায় ফসল প্রাপ্তি কমে যাচ্ছে। জৈব প্রযুক্তির ব্যবহার কমিয়ে রাসায়নিক বা বিভিন্ন কোম্পানির ঔষধ ব্যবহারে ফসলের স্বাদ থাকছেনা। এ সব কিছু বিবেচনা করে কৃষির উদ্ভাবক নারী সে হিসেবে গীতা রানী মন্ডল(৩৮)পেশা গত কৃষক নিজ স্বামী রনজিৎ মন্ডলের সাথে চ্যালেঞ্জ করে জৈব প্রযুক্তি বা ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে নিজ ভিটায় স্বামীর উৎপাদিত ফসলের পাশাপাশি বেগুন চাষ করলেন।

শেষ সময় দেখা গেল অধিক ফসল পেতে অতি উচ্চ মাত্রায় স্বামী রনজিৎ মন্ডল ফসলের ক্ষেতে সার কীটনাশক ব্যবহার করলেন এবং ফসল পেলেন কম।কিন্ত পাশাপাশি গীতা রানী একই ফসল চাষ করলেন ভার্মি কম্পোস্ট সার ব্যবহার করে তাতে দেখা গেল গীতা রানীই বেশি ফসল পেলেন। এবং তার  তৈরী ফসল খেয়ে স্বাদ বা অন্যান্য কারণে গীতার প্রশংসা করলেন। পাড়াপ্রতিবেশিরা প্রথমদিকে গীতাকেও মূল্যায়ন করতে চাননি।কিন্ত প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস ও অন্যান্য কারণে গীতার উৎপাদিত ফসলের ফলন বৃদ্ধি ও খেতে স্বাদ পাওয়ায় পরিবারের সদস্যরা গীতার পরামর্শ অনুযায়ী পরিবারের দেড় বিঘা ভিটাতে ফুলকপি, বাঁধাকপি, টমেটো, আলু, মরিচসহ অন্যান্য শীতকালিন  ফসলের চাষ করলেন। এবং এ সকল ফসলের প্রায় অর্ধাংশ বিক্রী করলেন ৪০ হাজার টাকায়।

গীতা রানী মন্ডলের বাড়ী সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার  কাশিমাড়ী ইউনিয়নের শংকরকাটি গ্রামে।তার চিরঞ্জিত ও সম্বিত নামে দুটি পুত্র সন্তান রয়েছে । চিরঞ্জিত ম্যানেজমেন্ট শেষ বর্ষ ও সম্বিত মার্কেটিংএ ৩য় বর্ষে খুলনা আযম খান কমার্স কলেজে অনার্স পড়েন। গীতা রানী বলেন তার দিন মজুর স্বামীর পক্ষে দুটি সন্তানকে এক সাথে খুলনায় অনার্স পড়ানো সম্ভব হতনা। তাই সন্তানদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে মাতা গীতা রানীও প্রানান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে উদ্যোগ গ্রহণ সম্পর্কে গীতা রানী বলেন  বেসরকারী সংগঠন নকশীকাঁথা পরিচালিত শংকরকাটি নাগরিক কমিটির সদস্য হিসেবে বিভিন্ন সভায় অংশ গ্রহণের সুযোগ হয়।সেখানে ফসলের ক্ষেতে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার সম্পর্কে জানতে পারেন এবং তিনি উদ্বুদ্ধ হয়ে ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ২টা মাটির চারি ক্রয় করেন তিন শত টাকা দিয়ে। এর পর ৫০ কেজি করে গোবর এক একটা চারিতে দেন।পর এনজিএফ সংগঠনের সহায়তায় ৩ শ গ্রাম কেঁচো ক্রয় করে চারিতে রাখেন। প্রথম দিকে তিনি সঠিকভাবে বুঝতে না পারায় ভার্মি কম্পোস্ট সঠিক ভাবে তৈরী করতে পারেননি বলে জানান।

তিনি আবার ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নতুন ভাবে শুরু করেন। এবং এ সময় তার ছেলে শংকরকাটি সততা সংগঠনের এক জন সদস্য হওয়ার কারণে ভিএসও বাংলাদেশের সহায়তায় বিগ লটারী ফান্ডের  মাধ্যমে নকশীকাঁথার বাস্তবায়নে ১৫ হাজার টাকা সুদ মুক্ত ঋণ গ্রহণ করেন। এ ঋণের কিছু টাকা ভার্মি কম্পোস্ট তৈরীতে কাজে লাগিয়ে বাঁকি টাকা বসত ভিটার দেড় বিঘা জমিতে সবজি চাষ করেন। এর মাঝে ভার্মি তৈরী ও এর ব্যবহার সম্পর্কে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার নিকট থেকে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।

এর পর তিনি দুটি চারিতে উৎপাদিত ভার্মি কম্পোস্ট দ্বারা নিজের ক্ষেতের ফসল তৈরী সহ বিক্রী করেছেন  বর্তমানে তিনি ১০টি চারি বসিয়ে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরী করছেন এবং তার দেখা দেখি পাড়া প্রতিবেশিরা অনুসরণ করেছেন এবং এখনও করছেন।  তিনি জানান একটি চারিতে ৩০ কেজি করে মোট ৬০ কেজি সার এক এক বার উঠিয়ে বিক্রী করেন।  

১২টাকা দরে প্রতি কেজি  ভার্মি কম্পোষ্ট সার বিক্রী করেন।বেশ কয়েক মন  সার  বিক্রী করেছেন ও কেঁচো বিক্রী করেছেন ১০০ টাকা দরে প্রতি কেজি।  আনুমানিক ২০ হাজার টাকার। তার উৎপাদিত সার নিজ ফসলের ক্ষেতে   শীতকালীন সবজিতে ব্যবহার করে ফুলকপি বিক্রী করেছেন ১০ হাজার টাকার,বাঁধা কপি বিক্রী করেছেন ১২ হাজার টাকার,লাল শাক বিক্রী করেছেন ৩ হাজার টাকার। বর্তমানে ক্ষেতে  বেগুন, কাঁচা মরিচ , বরবটি সহ অন্যান্য ফসল রয়েছে। এ সব ফসল তৈরীতে তার ব্যয় ছিল প্রায় ১০ হাজার টাকা। তিনি বলেন তার স্বামী রনজিৎ মন্ডল তার এ কার্যক্রমকে প্রথমে উৎসাহিত না করলেও ফসলের বৈচিত্রতা ও ফলন দেখে এখন নিজেই তার কথা অনুযায়ী সবজি চাষ করেন।

তিনি ভার্মি কম্পোস্ট ও উৎপাদিত ফসলের আয়ের দ্বারা একটি গাভি ও গরু মোটা তাজা করণের জন্য এঁড়ে গরু ক্রয় করেছেন, নিজ বসত ঘর টিন দিয়ে ছাউনি করেছেন  এবং প্রতিমাসে দুই সন্তানকে প্রায় ৭ হাজার করে টাকা পাঠাচ্ছেন। এ ছাড়া তিন লক্ষ টাকা দিয়ে ৫কাঠা জমি ক্রয় করেছেন। প্রতি মাসে ৪/৫ হাজার টাকা বিভিন্ন সমিতিতে সঞ্চয় করছেন।

গীতা রানী বলেন তার ভার্মি কম্পোস্ট তৈরী প্রক্রিয়া দেখে প্রতিবেশি সনজিত মন্ডল, অরবিন্দ সরদার, অসিত সরদার, অনুপম মন্ডল সহ অনেকে ভার্মি কম্পোস্ট তৈরী করেছেন ফসলের ক্ষেতে ব্যবহার করে ভাল ফলন পেয়েছেন। এখন গীতা রানী বিভিন্ন সংগঠনের কৃষি বিষয়ক বা ভার্মি কম্পোষ্ট তৈরীর বিষয়ক প্রশিক্ষণ প্রদান করে থাকেন। বেসরকারী সংগঠন এসডিএফের গ্রুপ সভাপতি। তার অধীনে ১২৯ জন মহিলা। বেসরকারী সংগঠন এনজিএফের এক জন সফল খামারী। বেসরকারী সংগঠন লির্ডাসের সফল কৃষক হিসেবে পুরস্কার স্বরুপ নিড়ানী,কোদাল,দা সহ অন্যান্য পুরস্কার পেয়েছেন।

তিনি আরও বলেন রাসায়নিক সার ব্যবহারে ফসলের ক্ষেতে বেশি পোকা মাকড় লাগে। ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারে ফসলে পোকা মাকড় কম লাগে। তাছাড়া এ সার ব্যবহারে মাটির উর্বরতা শক্তি বৃদ্ধি করে।ফসলে পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়,লবনাক্ততা দূর হয়,ফসল বৃদ্ধি পায়, মাটির স্বাস্থ্য ভাল থাকে ও উৎপাদিত ফসলের স্বাদ খেতে  ভাল লাগে। তবে তিনি ফসলের ক্ষেতে পানির সমস্যার কথা বলেন।বিশেষ করে শুকনা মেীসুমে এ সংকট বেশি বলে জানান।

গীতা রানী এখন ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহারের এক জন মডেল কৃষক হিসেবে পাশাপাশি দেওল,বেতাঙ্গি,খুটিঘাটা ও অন্যান্য স্থানে প্রশিক্ষণ প্রদান করেছেন বেশ কয়েকজন কৃষককে। নকশীকাঁথার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন কৃষক প্রশিক্ষণে অংশ গ্রহণ ও প্রশিক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণ করেছেন বলে জানান। ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া জানা গীতা রানী খুব কম বয়সে আর্থিক অস্বচ্ছল স্বামীর সংসারে আসেন।  ভবিষ্যতে তিনি আরও এক দেড় বিঘা জমিতে ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করে ফসল  উৎপাদন করতে চান এবং পরিবারকে আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী করতে চান ও দুই সন্তানকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে চান।

এ বিষয়ে  নকশীকাঁথার পরিচালক চন্দ্রিকা ব্যানার্জি বলেন ভিএসও বাংলাদেশের সহায়তায় বিগলটারী ফান্ডের অর্থায়নে শংকরকাটি গ্রামকে কৃষিতে একটা আর্দশ গ্রাম তৈরির পরিকল্পনা করেছে এ গ্রামের যুব সম্প্রদায় ও কৃষকবৃন্দ। তাদের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে নকশীকাঁথা উপজেলা কৃষি অফিসের সহায়তায় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান সহ কৃষি ক্লিনিক তৈরীর মাধ্যমে পরামর্শ প্রদান করে যাচ্ছেন।

 

এইবেলাডটকম/গোপাল/এসএম/সুমন

 
 
 
   
  Print  
 
 
 
 
 
 
 
 
আরও খবর

 
 
 
 
 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : নিন্দ্রা ভৌমিক

খবর প্রেরণ করুন # info.eibela@gmail.com

ফোন : +8801517-29 00 02

a concern of Eibela Foundation

Request Mobile Site

 

 

Copyright © 2018 Eibela.Com
Developed by: coder71